৩৬ জুলাই যেভাবে সবার হয়ে ওঠে

জুলাই-নিবন্ধ সাইদুল ইসলাম জুলাই ২০২৬

৪ আগস্ট। সেদিন সম্মুখযুদ্ধে প্রায় ১০০ জন আন্দোলনকারী শাহাদাত বরণ করেছিলেন। আমরা তখন রাজধানীর সায়েন্সল্যাবে অবস্থান করছিলাম। আওয়ামী লীগের পার্শ্ববর্তী অফিসে অস্ত্রধারী ছাত্রলীগের সন্ত্রাসীরা তখন অ্যাকশনে। দূর থেকেই ছাত্র-জনতার দিকে গুলি ছুঁড়ে পালিয়ে যাচ্ছিল তারা। যদিও আমি সেই গুলির সম্মুখীন হইনি, তবুও যেকোনো মুহূর্তে আক্রমণের আশঙ্কা বিরাজমান ছিল।

আমাদের চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিপার্টমেন্টের বন্ধু মাইনু। সে প্রতিবাদী ও সত্যপ্রিয়। সে এখন গাজীপুরে থাকে, কিন্তু ছাত্র-জনতার আন্দোলনে যোগ দেওয়ার জন্য সকাল থেকেই পান্থপথ-সায়েন্সল্যাবের দিকে অবস্থান করছিল। যদিও সে আমার সঙ্গে যোগাযোগ করেনি, তবে আমি জানতে পেরেছি ব্যাচমেটদের হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ থেকে। বন্ধু মাইনুকে নিয়ে ব্যাচমেটদের উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা দেখে ভালো লাগল। যদিও তারা অনেকে সরাসরি আন্দোলনে নামতে পারেনি, তবু মাইনুর জন্য সবার মধ্যে তৈরি হওয়া অস্থিরতা প্রমাণ করে-মাইনুর মাধ্যমে এই আন্দোলন তাদের সবাইকে স্পর্শ করেছে।

আমি কিছুটা নিশ্চিত হয়ে বলতে পারি, যদি আজ মাইনু বাড়ি না ফেরে, তাহলে পরবর্তী দিন থেকে ব্যাচমেটদের কেউই আর রাজপথে নামা থেকে বিরত থাকতে পারবে না। ঠিক এভাবেই একেকটি শাহাদাত, হতাহত আর নিখোঁজের ঘটনা একেকটি গ্রুপ কিংবা একেকটি জনগোষ্ঠী, কিংবা পুরো এলাকাকে রাজপথে নামিয়ে আনতে বাধ্য করেছে চব্বিশের গণ-আন্দোলনে।

বিকেলের দিকে বন্ধু মাইনুর মেসেজটি গ্রুপের সবাইকে স্বস্তি দিয়েছে-“আলহামদুলিল্লাহ, সুস্থ আছি। ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা। কারওয়ান বাজারে ছিলাম, যাচ্ছিলাম শাহবাগ। কারওয়ান বাজারে গুলির শব্দ শুনে ওইদিকে গিয়েছিলাম। এখন চলে এসেছি, রাতে অফিসে যাব।”

৫ আগস্ট লংমার্চে অংশগ্রহণ করার জন্য সিএনজি নিয়ে উত্তরা যাচ্ছিলাম, তখন সকাল ৮টা বাজে। মায়ের কাছে কল দিলাম, হাসিমুখে কথা বললাম। এও ভাবছি, হয়তো মায়ের সঙ্গে এটাই শেষ কথা। বিদায়ের কথা মুখে না বললেও, মনে মনে যেন এক প্রকার বিদায়ই নিলাম। মায়ের বিকাশ নম্বরে কিছু খরচের টাকাও পাঠিয়ে দিলাম। জানি না, মাকে খেদমত করার আর সুযোগ হবে কিনা। এগুলো ভাবতে গিয়ে নিজেকে ধরে রাখাটা কঠিন। মোবাইলের এই পাশে নিজেকে শক্ত করে ধরে আছি, যেন মা স্বাভাবিক থাকেন। একনাগাড়ে মায়ের কথাগুলো শুনে গিয়েছি-“বাবা, আমি রাতে নামাজ পড়ে তোমাদের জন্য দোয়া করেছি। দেখিস, যতটুকু পারবে একটু সেইফ থাকবে। আমরা দুর্বল মানুষ।”

মা নিজের ভাষায় কথাগুলো সর্বোচ্চ আকুতি নিয়ে বলে যাচ্ছেন।

হোয়াটসঅ্যাপে বড় আপুর মেসেজটা পেয়ে চোখের কোণে পানি চলে এলো। মেসেজটা যেন আমার মনকে আরও একবার সজীব করে তুলল-“সাইদুল, কী খবর? বি কেয়ারফুল... বাট মা কষ্ট পাবে। তোর কথা বারবার মনে পড়ে...বেশি দোয়া করি, আল্লাহ যাতে বিপদ থেকে বাঁচিয়ে রাখেন। দোয়া রইল।”

এইভাবে বাংলাদেশের সর্বদক্ষিণের টেকনাফে আমার মা-বোনদেরও এই আন্দোলন গভীরভাবে স্পর্শ করেছিল।

আপনার মন্তাব্য লিখুন
অনলাইনে কিশোরকন্ঠ অর্ডার করুন
লেখকের আরও লেখা

সর্বাধিক পঠিত

আর্কাইভ

আরও পড়ুন...

CART 0

আপনার প্রোডাক্ট সমূহ