ফাইটার জেট আকাশে বিস্ময়

প্রচ্ছদ রচনা আহমেদ বায়েজীদ অক্টোবর ২০২৫

চারিদিকে যুদ্ধের দামামা। ফিলিস্তিনের গাজা উপত্যকা ও ইউক্রেনের যুদ্ধ বহু মানুষের প্রাণ কেড়ে নিয়েছে। মাঝখানে পাকিস্তান ও ভারত করেছে তিন দিনের ভয়ংকর এক যুদ্ধ। দুই বছর আগে যুদ্ধ করেছে আজারবাইজান ও আর্মেনিয়া। উত্তর কোরিয়া প্রতিদিন যুদ্ধের হুমকি দিচ্ছে। আবার ইরান ও ইসরায়েলের যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। প্রশান্ত মহাসগরীয় অঞ্চলে চলছে তাইওয়ানের সাথে চীনের দ্বন্দ্ব। রাশিয়ার সাথে ন্যাটোভুক্ত দেশগুলোর উত্তেজনা চলছে কয়েক বছর ধরে। যে-কোনো দিন শুরু হয়ে যেতে পারে নতুন করে আরও একটি যুদ্ধ।

একটা সময় যুদ্ধ ছিল ঢাল-তলোয়ার আর বল্লমের। সেই দিন অতীত। সময় এখন প্রযুক্তির, তাই যুদ্ধ চলে আকাশপথেও। আকাশ যুদ্ধের সবচেয়ে বড়ো উপকরণ ফাইটার জেট। যুদ্ধবিমানের যতগুলো ক্যাটাগরি আছে তার মধ্যে ফাইটার জেট সর্বাধুনিক। ‘এয়ার সুপেরিয়রিটি’ বা আকাশে শ্রেষ্ঠত্ব রক্ষা ফাইটার জেটের প্রধান কাজ। শত্রুপক্ষের বিমান যাতে নিজেদের আকাশে এসে বোমা বা মিসাইল হামলা চালাতে না পারে সেটা নিশ্চিত করতে কাজ করে ফাইটার জেট।

পাশাপাশি এই ধরনের যুদ্ধবিমান থেকে শত্রুর টার্গেট লক্ষ্য করে হামলাও চালানো যায়। এতে থাকে শক্তিশালী মিসাইল বা ক্ষেপণাস্ত্র, যে কারণে শত মাইল দূর থেকে ফাইটার জেট শত্রুর অবস্থানকে টার্গেট বানাতে পারে। ফাইটার জেটের শ্রেষ্ঠত্ব নির্ভর করে আকাশে এর দক্ষতা, উচ্চ গতি, অস্ত্রের ক্ষমতা ও রাডার-সেন্সরের শক্তির ওপর। বর্তমান সময়ে চলছে পঞ্চম প্রজন্মের ফাইটার জেটের যুগ। শব্দের চেয়েও বেশি গতিতে ছুটে বেড়ায় এই আকাশ দানব।


শুরুর কথা

প্রথম বিশ^যুদ্ধের আগেই যুদ্ধবিমান আবিষ্কৃত হয়। তখন শত্রুর এলাকায় গিয়ে বোমা ফেলে আসত যুদ্ধবিমান, যেগুলোকে বলা হয় বোম্বার। এ ছাড়া বেলুনে করেও বোমা পাঠানো হতো। তখন ডিফেন্স ইঞ্জিনিয়াররা চিন্তা করলেন, শত্রুর বিমান ও বেলুন যাতে আমাদের আকাশে প্রবেশ না করতে পারে সেটি ঠেকাতে হবে। সেই চিন্তা থেকেই মূলত ফাইটার জেটের উৎপত্তি। তখনও মাটি থেকে মিসাইল ছুঁড়ে বিমান ধ্বংস করার মতো পদ্ধতি আবিষ্কৃত হয়নি। তাই আকাশে উঠে শত্রুর বিমানকে আঘাত করার চিন্তা নিয়ে প্রথম ফাইটার জেট বানানো হয়ে।

প্রথমদিকের ফাইটার জেটগুলো ছিল আকারে ছোট, বহন করত হালকা অস্ত্র। কাঠ ও ফেব্রিকের কাঠামোতে তৈরি বিমানের গতি ছিল ঘণ্টায় সর্বোচ্চ ১৬০ কিলোমিটার। তবে এই বিমানগুলো যুদ্ধক্ষেত্রে কার্যকর প্রমাণিত হলো। পাশাপাশি আকাশে শ্রেষ্ঠত্বের গুরুত্ব অনুভব করল বিভিন্ন দেশ। ফলে তারা ফাইটার জেটের উন্নয়নে মনোযোগ দিলো। প্রথম বিশ^যুদ্ধ চলাকালে কাঠের বদলে ধাতব বডির ফাইটার জেট আকাশে উড়ল।

দ্বিতীয় বিশ^যুদ্ধের সময় সব ফাইটার জেটে যুক্ত হলো মেশিনগান। গতি বেড়ে দাঁড়াল ঘণ্টায় ৬৪০ কিলোমিটার পর্যন্ত। ইঞ্জিনে এলো আধুনিকতা। তৈরি হতে শুরু করল দুই ইঞ্জিনের ফাইটার জেট। পঞ্চাশের দশকে বসল রাডার প্রযুক্তি। ফলে পাইলটরা দূরে থাকা শত্রুর বিমান চোখে দেখতে না পেলেও রাডারের মাধ্যমে শনাক্ত করতে পারতেন। ১৯৬০-এর দশকে কামানের পাশাপাশি যুক্ত হয় ‘এয়ার টু এয়ার’ মিসাইল। ভিয়েতনাম যুদ্ধে ফাইটার জেট খুবই কার্যকর ভূমিকা পালন করে। এরপর সময়ের সাথে সাথে পাল্লা দিয়ে বেড়েছে ফাইটার জেটের গতি, মিসাইল পাওয়ার, ইলেকট্রনিক ওয়ারফেয়ার প্রযুক্তি।

‘এয়ার সুপেরিয়রিটি’ বা আকাশে শ্রেষ্ঠত্ব রক্ষার লক্ষ্যে এই বিমান তৈরি করা হলেও ধীরে ধীরে এতে বৈচিত্র্য আসতে থাকে। কিছু বিমানে স্থল টার্গেটে হামলার (‘এয়ার টু ল্যান্ড’ মিসাইল) সুবিধা যুক্ত করা হয়। এ ছাড়া কিছু বিমান নজরদারির কাজে ব্যবহৃত হয়। কোনো ফাইটার জেটে পাইলট একাই লড়াইয়ের কাজ করেন। আবার কোনোটিতে পাইলটের পাশাপাশি এক বা দুজন ক্রু থাকেন।


‘ফাইটার জেট’ নামটি যেভাবে এলো

দুই সিটের একটি বিমান-যেটির সামনের অংশে একটি মেশিনগান ফিট করা ছিল, সেটিকেই ইতিহাসে প্রথম ‘ফাইটার’ নামে ডাকা হয়। এটি প্রথম বিশ^যুদ্ধকালীন বা তার কিছু আগের কথা। এটি কোনো অফিশিয়াল নাম ছিল না। ব্রিটিশ ইঞ্জিনিয়ার ও সৈন্যরা বিমানটিকে ফাইটার নামে ডাকতে পছন্দ করতেন। কারণ বিমানটি ছিল আকাশপথের যোদ্ধা। এর কাজ ছিল আকাশে শত্রুর বিমানের বিরুদ্ধে লড়াই করা।

১৯২০-এর দশকে এ ধরনের বিমানকে অফিশিয়ালি ‘স্কাউট’ নামে ডাকত ব্রিটিশ বিমানবাহিনী। মার্কিনিরা ডাকত পারসুইট নামে। যে কারণে ওই সময়ে মার্কিন বাহিনীর বিমানগুলোর নামের সাথে ‘পি’ বর্ণ যুক্ত করা হয়, যেমন পি-৪৭ থান্ডারবোল্ট। তবে ১৯২০-এর দশকের শেষ দিকেই এসব যুদ্ধবিমানকে ‘ফাইটার’ নামে ডাকতে শুরু করে ব্রিটিশরা। ১৯৪০-এর দশকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বাহিনীও ফাইটার নামটি পছন্দ করে। ধীরে ধীরে সারা বিশে^ ছড়িয়ে পড়ে নামটি। পরবর্তীতে জেট ইঞ্জিন যুক্ত হওয়ার পর এটির নাম হয়ে যায় ফাইটার জেট।


ফাইটার জেটের পাঁচ প্রজন্ম

ফাইটার জেটের একেকটি যুগকে ‘জেনারেশন’ বা প্রজন্ম হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। ১৯৪০-৫০ সময়ে নির্মিত বিমানগুলো প্রথম জেনারেশন হিসেবে পরিচিত। এই সময়টাতে বিমানগুলোর ইঞ্জিনের আধুনিকায়ন ও কারিগরি দিক ক্রমশ উন্নত হতে থাকে। পিস্টন ইঞ্জিনের বদলে আসতে থাকে জেট ইঞ্জিন। বাড়তে থাকে গতি। তবে তখনও কামান ও মেশিনগান ছিল এর প্রধান অস্ত্র। এই সময়ের বিমানগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য যুক্তরাষ্ট্রের এফ-৮৬, রাশিয়ার মিগ-১৫।

দ্বিতীয় প্রজন্ম ধরা হয় ১৯৫০ থেকে ১৯৬০-এর দশককে। বিমানে যুক্ত হয় রাডার ও ইনফ্রারেড সিস্টেম। অস্ত্র হিসেবে আসে সেমি অ্যাকটিভ গাইডেড মিসাইল। ইঞ্জিন হয় উন্নত। এই সময়ে যুক্তরাষ্ট্র আকাশে ওড়ায় এফ-১০৪, রাশিয়া আনে মিগ-২১। তৃতীয় প্রজন্ম বলা হয় ১৯৬০ থেকে ১৯৭০-এর দশককে। এই সময়ে এতে যুক্ত হয় ম্যানুয়েভারঅ্যাবেলিটি বা আকাশে কসরত দেখানোর ক্ষমতা। এর ফলে আকাশে ডিগবাজি খাওয়াসহ নানা ধরনের কসরত করতে পারে বিমানগুলো। শত্রুর মিসাইলকে ফাঁকি দিতে এগুলো করা হয়। মিসাইলও উন্নত হতে থাকে। এই সময়ে কিছু মাল্টিরোল ফাইটার আসে, যারা স্থল টার্গেটে হামলা ও নজরদারির কাজও করতে পারে। তৃতীয় প্রজন্মের ফাইটারের মধ্যে উল্লেখযোগ্য মিগ-২৩, এফ-৪ ইত্যাদি।

ফাইটার জেটের চতুর্থ প্রজন্ম এখন বিশ^ব্যাপী রাজত্ব করে বেড়াচ্ছে। ১৯৭০-৮০-র দশকে উদ্ভাবিত বিমানগুলো নতুন নতুন প্রযুক্তি নিয়ে আসে। এই বিমানগুলো ডগফাইটে নতুন নতুন কৌশল দেখাতে শুরু করে। পাশাপাশি শত্রুর রাডারকে ফাঁকি দেওয়ার প্রযুক্তি যুক্ত হয়। এই সময়ে আকাশে ওড়ে যুক্তরাষ্ট্রের এফ-১৬ ফাইটিং ফ্যালকন, রাশিয়ার সু-২৭, ফ্রান্সের মিরেজ-২০০, চীনের জে-১০ প্রভৃতি। পরের দশ বছরে এই প্রযুক্তি কিছুটা আধুনিক হয়ে যেসব বিমান তৈরি হয় সেগুলোকে বলা হয় ৪.৫ জেনারেশন। এই জেনারেশনের সবচেয়ে বড়ো অগ্রগতি ইলেকট্রনিক্যালি স্ক্যানেড অ্যারে রাডার। এই রাডারের সাহায্যে পাইলট চারপাশে শত্রুর বিমান ও স্থল স্থাপনা সম্পর্কে দ্রুত তথ্য পান। ইউরো ফাইটার টাইফুন, রাফাল, সু-৩৫, জে-১০-সি এই জেনারেশনের বিমান।

ফাইটার জেটের জগতে বিস্ময় হয়ে এসেছে পঞ্চম প্রজন্মের বিমানগুলো। ২০০৫ সালের পর এই প্রজন্মের ফাইটার আসে। যুক্তরাষ্ট্র তার ইউরোপীয় মিত্রদের নিয়ে তৈরি করে এফ-২২ র‌্যাপ্টার, এফ-৩৫ লাইটনিং, রাশিয়া বানায় সু-৫৭ আর চীন বানিয়েছে জে-২০ ও জে-৩৫ এর মতো অত্যাধুনিক বিমান। এই বিমানগুলো হাজির হয়েছে স্টিলথ প্রযুক্তি নিয়ে। যে কারণে এরা সহজে শত্রুর রাডারে ধরা পড়ে না। শব্দের চেয়ে দ্রুত গতিতে ছোটে এগুলো। এরা একসাথে কয়েকটি টার্গেট চিহ্নিত করে হামলা চালাতে পারে। ছুঁড়তে পারে দূরপাল্লার মিসাইল। পাইলটের হেলমেট তার চোখের সামনে চারপাশের সব তথ্য হাজির করে জানিয়ে দেয় কোথায় কী ঘটছে।


ডগফাইট

আকাশে দুটি ফাইটার জেটের লড়াইকে বলা হয় ‘ডগফাইট’। এই লড়াইয়ে অন্য কোনো টার্গেটে আঘাত হানার বদলে প্রতিপক্ষের ফাইটার জেটের ওপর হামলার চেষ্টা করে। একটি অন্যটিকে এয়ার-টু-এয়ার মিসাইল ও কামানের গোলা নিক্ষেপ করে ঘায়েল করতে চেষ্টা করে। শত্রুর মিসাইল আসতে দেখলে পাইলটরা তার বিমানকে নিয়ে নানা কসরত করেন। কখনো ডিগবাজি খাওয়ান, কখনো ইঞ্জিন বন্ধ করে নিচে পড়ার ভান করেন, আবার কখনো নাক খাড়া করে ওপরে উঠে যান। মিসাইলকে ফাঁকি দিতেই এসব করতে হয় ফাইটার জেটকে।

দুই পক্ষের ফাইটার জেটের মধ্যকার এই লড়াই কখনো ‘ওয়ান টু ওয়ান’ বা একটির সাথে একটির হতে পারে। অথবা একসাথে অনেকগুলো বিমানের মধ্যেও হতে পারে। সর্বশেষ পাকিস্তান ও ভারতের মধ্যকার তিন দিনের যুদ্ধে দুই দেশের বিমানবাহিনীর পাইলটরা বড়ো আকারের ডগফাইটে জড়িয়ে পড়েছিলেন।

মে মাসের ৭ তারিখের লড়াইয়ে অবতীর্ণ হয়েছিল দুই দেশের কমপক্ষে ১২৫টি ফাইটার জেট। ওই দিন ভারতীয় বিমানবাহিনী আকাশ থেকে পাকিস্তানে হামলা শুরু করলে পাকিস্তানও ফাইটার জেট উড্ডয়ন করে। এরপর শুরু হয় ডগফাইট। তবে কোনো দেশের ফাইটার জেটই সীমা অতিক্রম করে অন্য দেশের আকাশে প্রবেশ করেনি। নিজ নিজ আকাশে থেকে পরস্পরের দিকে মিসাইল ছুঁড়েছে। লড়াইয়ে ভারতের ছয়টি ফাইটার জেট ধ্বংস করার কথা জানায় পাকিস্তান। এর মধ্যে আবার তিনটি ছিল ফ্রান্সের তৈরি অত্যাধুনিক রাফাল ফাইটার জেট। তবে পাকিস্তানের কোনো বিমান ধ্বংস করতে পারেনি ভারত। যে কারণে ওই ডগফাইটে স্পষ্টতই পাকিস্তান বিজয়ী হয়েছিল।

ডগফাইটের সূচনা হয়েছিল প্রথম বিশ^যুদ্ধের সময়। তখনকার দিনে যুদ্ধবিমানগুলো প্রযুক্তিতে অতটা উন্নত ছিল না, তাদের ছিল না দূরপাল্লার মিসাইল। যে কারণে দুই পক্ষের বিমান কাছাকাছি থেকেই পরস্পরের ওপর হামলা করত। আকাশে দুই বিমানের মধ্যে প্রথম লড়াইয়ের ঘটনাটি ঘটে ১৯১৪ সালের ১৫ আগস্ট। একটি সার্বিয়ান ও একটি অস্ট্রো-হাঙ্গেরিয়ান বিমানের মধ্যে গুলি বিনিময় হয় সেদিন। উভয় বিমানের ক্রুরা রিভালভার দিয়ে পরস্পরের দিকে গুলি ছোঁড়েন। এটিই ছিল ইতিহাসের প্রথম ‘ডগফাইট’। একটি বিমান থেকে গুলি করে আরেকটি বিমান ধ্বংসের প্রথম ঘটনাটি ঘটে একই বছর ৫ অক্টোবর। ফ্রান্সের রেইমস শহরের কাছে ফরাসি বিমানবাহিনীর ভিশন-৩ নামের একটি বিমান থেকে করা গুলিতে ভূপাতিত হয় জার্মান বাহিনীর এভিয়াটিক-বি নামের একটি নজরদারি বিমান। ফরাসি বিমানটির ক্রুরা মেশিনগান থেকে গুলি চালায়। জার্মান বিমানটি রাইফেল দিয়ে পালটা গুলি চালায়। তবে শেষ পর্যন্ত জার্মান বিমানটি বিধ্বস্ত হয়।

তবে এখনকার সময়ে মিসাইল ও রাডারের ক্ষমতা উন্নত হওয়ায় বহু মাইল দূর থেকেও ডগফাইট চলে। চোখে দেখতে না পেলেও রাডারের সংকেত দেখে পাইলটরা মিসাইল ছোঁড়েন শত্রুর বিমান লক্ষ্য করে। এভাবেই একে অন্যকে ধ্বংস করার চেষ্টা করেন। অনেকে এটিকে আকাশে মরণখেলা হিসেবে সাব্যস্ত করেন।


ইজেকশন সিট সিস্টেম

যুদ্ধক্ষেত্রে শত্রুর মিসাইলের আঘাতে বা অন্য কোনো কারণে যুদ্ধবিমান ধ্বংস হলেও পাইলটরা রক্ষা পান। এখানে রয়েছে প্রযুক্তির অবদান। এটিকে বলে ইজেকশন সিট সিস্টেম। যেখানে বিমানের সিটটিকে বিশেষভাবে তৈরি করা হয়। যদি শত্রুর মিসাইল আঘাত হানে বা কোনো দুর্ঘটনা ঘটে এবং পাইলট ও ক্রুরা বুঝতে পারেন বিমানটি বিধ্বস্ত হতে যাচ্ছে-তাহলে তারা বিমান ছেড়ে শূন্যে বেরিয়ে আসেন।

বিমান ছেড়ে বেরিয়ে যাওয়ার জন্য তাদের ঝাঁপ দিতে হয় না। সিটের পাশে থাকে একটি ইজেকশন হ্যান্ডেল। বিপদ দেখলে এই হ্যান্ডেলে টান দিলে প্রথমে বিমানের ছাদটি উড়ে যাবে। এরপর চেয়ারটি পাইলটকে নিয়ে ছিটকে বের হয়ে যাবে বিমান থেকে।

চেয়ারটিকে বিমানের বাইরে বের করার জন্য ব্যবহৃত হয় রকেটের শক্তি। সেই শক্তির কারণে পাইলটকে নিয়ে বিমান থেকে ছিটকে কয়েক মিটার দূরে চলে যাওয়ার পর চেয়ারটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে খুলে পড়ে যায় এবং একটি ইমারজেন্সি ছোট প্যারাসুট খুলে যায়। এতে গতি কমার ফলে পাইলট কিছুটা ধাতস্থ হয়ে তার মেইন প্যারাসুট খোলার সুযোগ পেয়ে যান। তারপর ধীরে ধীরে নিচে নামেন।

এই ইজেকশন খুব দ্রুত গতিতে হয়। কখনো সেটা শব্দের চেয়ে কয়েক গুণ বেশি গতিতে। যে কারণে এতে পাইলট বা ক্রুদের আহত হওয়ার কিছুটা ঝুঁকি থাকে। তবুও বাঁচার তাগিদেই এটি করতে হয় তাদের। এ বিষয়ে তাদের নিবিড় প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়।

২০১৯ সালে পাকিস্তানে হামলা চালাতে গিয়ে ডগফাইটে ফাইটার জেট ধ্বংস হলেও ভারতীয় পাইলট অভিনন্দন বর্তমান এই পদ্ধতি ব্যবহার করে রক্ষা পেয়েছিলেন। প্যারাসুটের সাহায্যে পাকিস্তানের মাটিতে নামলে স্থানীয় জনতা তাকে আটক করে সেনাবাহিনীর হাতে তুলে দেয়। পরে তাকে ভারতে ফেরত পাঠায় পাকিস্তান সরকার।

তবে এই সিট ইজেকশন সিস্টেম শুধুমাত্র যুদ্ধবিমানে থাকে। যাত্রীবাহী বিমানের পাইলটদের জন্য এ ধরনের কোনো সিস্টেম নেই।


কোনটি সেরা

সেরা ফাইটার জেটের তালিকা করা কঠিন। তবে পঞ্চম প্রজন্মের বিমানগুলো প্রযুক্তি ও দক্ষতায় সবচেয়ে এগিয়ে। এর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের এফ-৩৫ লাইটনিং বেশির ভাগ বিশেষজ্ঞের কাছে সেরা হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে। লকহিড মার্টিনস কোম্পানির নির্মিত বিমানটি এক সিট ও এক ইঞ্জিনের। এটির নজরদারি ক্ষমতা, টার্গেটে হামলা করার ক্ষমতা অপ্রতিদ্বন্দ্বী। এর সর্বোচ্চ গতিসীমা প্রতি ঘণ্টায় ১ হাজার ৯০০ কিলোমিটার (শব্দের চেয়ে বেশি)। সেন্সর, রাডার, অ্যাটাকিং পাওয়ার ইত্যাদি দিক থেকেও এটি যে-কোনো বিমানের চেয়ে এগিয়ে। প্রতিটির নির্মাণ ব্যয় ৮০ থেকে ১০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। বিমানটি আকাশ থেকে আকাশে, ভূমিতে ও সাগরে মিসাইল ছুঁড়তে পারে। দুটি গাইডেড বোমাও বহন করতে পারে। এ ছাড়া ৩৫ মিলিমিটার কামান রয়েছে। নিজস্ব বহর তৈরি করার পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র এই বিমানটি রফতানি করেছে ইসরাইল, ব্রিটেন, পোল্যান্ড, জাপান, অস্ট্রেলিয়াসহ বেশ কিছু দেশের কাছে।

২০২০ সালে রুশ বিমানবাহিনীতে যুক্ত হয় পঞ্চম প্রজন্মের ফাইটার জেট সু-৫৭। রাশিয়া এখন পর্যন্ত ২০টির মতো এই মডেলের বিমান তৈরি করেছে। দুই ইঞ্জিনের স্টিলথ ফাইটারটি তৈরি করেছে রুশ কোম্পানি সুখোই। ইউক্রেন যুদ্ধে এই বিমানটি দারুণ কৃতিত্ব দেখিয়েছে। শব্দের চেয়ে প্রায় দ্বিগুণ গতিতে উড়তে পারা বিমানটি ৬৬ হাজার ফুট উচ্চতায় উঠেও লড়াই করতে পারে। তিন ধরনের এয়ার টু এয়ার মিসাইল, তিন ধরনের এয়ার টু সারফেস মিসাইল ও দুই ধরনের এয়ার টু সী মিসাইল ছুঁড়তে পারে বিমানটি। এ ছাড়া এর আছে অ্যান্টিরেডিয়েশন মিসাইল ছোঁড়ার ক্ষমতা।

চীন জে-২০ ও জে-৩৫ নামের দুটি পঞ্চম প্রজন্মের বিমান তৈরি করেছে। প্রথমটির তিন শ’র বেশি এবং দ্বিতীয়টির ৮টি বিমান যুক্ত হয়েছে চীনা বিমানবাহিনীতে। দুটিই স্টিলথ ফাইটার এবং প্রযুক্তিগত দক্ষতা, সমরাস্ত্র ও ম্যানুয়েভারঅ্যাবিলিটির দিক থেকে খুবই উন্নত। জে-২০ ২০১৭ সালে সার্ভিসে যুক্ত হয়েছে। শব্দের চেয়ে দ্বিগুণ গতিতে চলতে পারে এক সিটের বিমানটি। ছুঁড়তে পারে অন্তত ৬ ধরনের মিসাইল। আর জে-৩৫ উড়তে পারে প্রতি ঘণ্টায় সর্বোচ্চ ২ হাজার ২০০ কিলোমিটার গতিতে। এটি খুব সহজেই শত্রুর রাডারকে ফাঁকি দিতে পারে।

চতুর্থ প্রজন্ম ও ৪.৫ প্রজন্মের বিমানগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বিখ্যাত যুক্তরাষ্ট্রের এফ-১৬। ২০১৮ সাল পর্যন্ত সাড়ে চার হাজারের বেশি তৈরি হয়েছে বিমানটি। পাকিস্তান, মিসর, তুরস্কসহ বিশে^র ২০টির বেশি দেশের কাছে এই বিমান রফতানি করেছে যুক্তরাষ্ট্র। ইরাক যুদ্ধ, আফগান যুদ্ধসহ বিভিন্ন দেশের হয়ে ১০টির বেশি যুদ্ধে অংশ নিয়েছে বিমানটি। ২০১৯ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি এই বিমানটির সাহায্যেই ভারতের দুটি যুদ্ধবিমান ভূপাতিত করেন পাকিস্তানি পাইলটরা। তুরস্কের হয়েও গ্রিস ও সিরিয়ায় যুদ্ধ করেছে এফ-১৬ ফাইটিং ফ্যালকন।

আপনার মন্তাব্য লিখুন
অনলাইনে কিশোরকন্ঠ অর্ডার করুন
লেখকের আরও লেখা

সর্বাধিক পঠিত

আর্কাইভ

আরও পড়ুন...

CART 0

আপনার প্রোডাক্ট সমূহ