সাইফুল আজম দ্য লিভিং ঈগল

প্রতিবেদন আহমেদ ইবনে হাবিব অক্টোবর ২০২৫

৫ জুন, ১৯৬৭।

জর্দানের মাফরাক বিমানঘাঁটির দিকে উড়ে আসছে দখলদার ইসরাইলি বাহিনীর চারটি ডেসল্ট সুপার মিস্টেরে ফাইটার জেট। এর আগে একই দিন ইসরাইলি বাহিনীর দেড় শতাধিক বিমান একযোগে অভিযান চালিয়ে ধ্বংস করে দিয়েছে মিসরের কয়েকটি বিমানঘাঁটি। ঝটিকা আক্রমণে রীতিমতো পঙ্গু হয়ে যায় মিসরের এয়ার পাওয়ার। সে তুলনায় জর্দানের বাহিনীর শক্তি আরও কম। ইসরাইলের শক্তিশালী বিমানবাহিনীর বিরুদ্ধে তাদের টিকে থাকার কোনো আশাই ছিল না। এমতাবস্থায় জর্দানের বিমানবাহিনীর কমান্ডারগণ মাফরাক ঘাঁটি রক্ষার দায়িত্ব দেন সাইফুল আজম নামের এক পাইলটকে। বয়সে তরুণ; কিন্তু অসীম সাহসী আর কৌশলী যোদ্ধা। যদিও তিনি জর্দানের নাগরিক নন, দেশটিতে তিনি ছিলেন অতিথি। তবুও চোখের সামনে ইসরাইলি আগ্রাসন দেখে বসে থাকতে পারেননি।

ফ্রান্সের তৈরি সুপার মিস্টেরে ফাইটার জেটকে মোকাবিলার মতো কোনো উন্নত ফাইটার জেট ছিল না জর্দানি বাহিনীর কাছে। তবুও অদম্য সাইফুল আজম আরও তিনজন জর্দানি পাইলটকে নিয়ে আকাশে উড়াল দিলেন। তাদের বাহন ছিল ব্রিটেনের তৈরি হকার হান্টার, যেগুলো ততদিনে পুরোনো হয়ে গেছে। তবুও দমবার পাত্র নন সাইফুল আজম। আগ্রাসী ইসরাইলি বাহিনীর বিরুদ্ধে নিজেদের দুর্বল বিমান নিয়েই শুরু করেন ডগফাইট। তার চোখে-মুখে তখন শত্রুকে প্রতিরোধের নেশা। যেন হয়ে ওঠেন এক শিকারি ঈগল।

অব্যর্থ নিশায় ধ্বংস করেন একটি ইসরাইলি সুপার মিস্টেরে। নিহত হয় একজন পাইলট ও একজন ক্রু। এরপরও লড়াই চলতে থাকে বাকি তিনটি ইসরাইলি ফাইটারের বিরুদ্ধে। কিছুক্ষণ পর সাইফুল আজমের আরও একটি মিসাইল আঘাত হানে ইসরাইলি বিমানে। গোলার আঘাতে বিমানটিতে আগুন ধরে যাওয়া টের পেয়েই পালাতে শুরু করে পাইলট। কোনোমতে সীমান্ত পেরিয়ে ইসরাইলি ভূখণ্ডে ঢুকে সেটিও বিধ্বস্ত হয়।

দুই বিমানের ধ্বংস হওয়া দেখে ইসরাইলি বাহিনীর অন্য দুটি বিমান আর লড়াই করার সাহস দেখায়নি। রণে ভঙ্গ দিয়ে জর্দানের আকাশসীমা থেকে পালিয়ে যায় তারা। বড়ো ধরনের ক্ষতি থেকে রক্ষা পায় জর্দানের বিমানবাহিনী ও তাদের মাফরাক বিমানঘাঁটি। অকুতোভয় এই যোদ্ধার বীরত্বে ব্যর্থ হয় ইসরাইলি মিশন। জর্দানিদের কাছে বীরে পরিণত হন পাইলট সাইফুল আজম।

তোমরা কি জানো এই বীর যোদ্ধা ছিলেন একজন বাংলাদেশি? জন্ম ১৯৪১ সালে পাবনা জেলায়। তখন আমাদের এই ভূখণ্ড ছিল পাকিস্তানের অংশ। সাইফুল আজমের আকাশে ওড়ার শখ ছিল ছোটবেলা থেকেই। মাধ্যমিক শেষে সুযোগ পান পাকিস্তান বিমানবাহিনীর অ্যাকাডেমিতে। ১৯৬০ সালে সাফল্যের সাথে প্রশিক্ষণ শেষে ফাইটার জেট পাইলট হিসেবে কমিশন লাভ করেন। ১৯৬৭ সালে তাকে জর্দানে পাঠানো হয় সে দেশের পাইলটদের প্রশিক্ষণ দেওয়ার জন্য। জর্দানের বিমানবাহিনী তখন ছিল অনুন্নত। তাদের ছিল না দক্ষ কোনো পাইলট। জর্দানের বাদশার অনুরোধে পাকিস্তান থেকে দুজন পাইলটকে পাঠানো হয় প্রশিক্ষক হিসেবে। তাদের একজন ছিলেন সাইফুল আজম। ঠিক সেই সময়ে শুরু হয় দ্বিতীয় আরব-ইসরাইল যুদ্ধ। একপক্ষে ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে গেড়ে বসা দখলদার রাষ্ট্র ইসরাইল, অন্যপক্ষে মিসর, সিরিয়া, জর্দান, ইরাকের মতো আরব দেশ।

ইসরাইল ওই যুদ্ধের শুরুতেই আরবদের বিমানবাহিনীকে ধ্বংস করার পরিকল্পনা করে, যাতে আকাশপথে ইসরাইলের ওপর হামলা না করতে পারে আরবরা। এরই অংশ হিসেবে ৫ জুন তারা প্রথমে মিসরের বিমানবাহিনীকে ধ্বংস করে এবং এরপর জর্দানে হামলা চালায়।

জর্দানে ইসরাইলি হামলা ব্যর্থ হওয়ার পর গোয়েন্দা সূত্রে খবর আসে ইরাকের বিমানঘাঁটিতেও হামলার পরিকল্পনা করছে ইসরাইল। দ্রুততার সাথে আরব দেশগুলো সিদ্ধান্ত নিয়ে সাইফুল আজমকে ইরাকে যাওয়ার অনুরোধ করে। তাঁর কাঁধেই দেওয়া হয় ইরাকের ‘এইচ থ্রি’ ও ‘আল ওয়ালিদ’ বিমানঘাঁটি রক্ষার দায়িত্ব। তার নেতৃত্বে প্রস্তুত করা হয় একদল পাইলটকে।

৭ জুন সকালে ইরাকের আকাশে প্রবেশ করে ইসরাইলের চারটি ভালচার বোম্বার ও দুটি মিরেজ-৩সি ফাইটার জেট। দ্রুততার সাথে সঙ্গী পাইলটদের প্রস্তুত করে কয়েকটি হকার হান্টার নিয়ে উড়াল দেন সাইফুল আজম। শুরু হয় দুই পক্ষের প্রচণ্ড ডগফাইট। ইসরাইলি হামলায় জর্দানের দুটি বিমান বিধ্বস্ত হয়, নিহত হন একজন উইংম্যান; কিন্তু অকুতোভয় সাইফুল আজম তো আর দমে যাওয়ার পাত্র নন। তার পালটা আঘাতে ধ্বংস হয় ইসরাইলের একটি মিরেজ-৩সি ফাইটার জেট। জীবন বাঁচাতে সিট ইজেক্ট করে প্যারাসুট দিয়ে নেমে আসেন ইসরাইলি ক্যাপ্টেন গিডিও দ্রোর। ইরাকি বাহিনীর হাতে বন্দি হন তিনি।

কিছুক্ষণ পর আরেকটি ইসরাইলি বোম্বারে সফল আঘাত হানেন সাইফুল আজম। সেটির পাইলটও আটক হন। পরবর্তীতে এই দুই ইসরাইলি পাইলটের বিনিময়ে কয়েক শ আরব যোদ্ধাকে ইসরাইলের হাত থেকে মুক্ত করা হয় বন্দি বিনিময় চুক্তির অধীনে।

বীরত্ব আর সাহসিকতার অনন্য এক রেকর্ড স্থাপন করেন ফ্লাইট লেফট্যানেন্ট সাইফুল আজম। মাত্র ৭২ ঘণ্টার ব্যবধানে চারটি ইসরাইলি যুদ্ধবিমান ধ্বংস করেন তিনি। মুসলিম বিশে^র কাছে বীরে পরিণত হন বাংলার এই সন্তান। আরবরা আজও গর্ব করে তাকে নিয়ে। এই কৃতিত্বের পুরস্কারস্বরূপ জর্দান সরকার সাইফুল আজমকে ‘হুসাম-ই-ইস্তিকলাল’ সম্মাননায় ভূষিত করে। ইরাক সরকারও তাকে দিয়েছিল সামরিক সম্মাননা।

সাইফুল আজমের বীরত্বের গল্প আরও আছে। ইসরাইলি বাহিনীর বিরুদ্ধে ওই লড়াইয়ে নামার আগেই তিনি পাকিস্তান বিমানবাহিনীর হয়ে দেখিয়েছেন অসামান্য বীরত্ব। সেটি ১৯৬৫ সালের পাকিস্তান-ভারত যুদ্ধে। সেই যুদ্ধে ভারতীয় বাহিনীর বিরুদ্ধে গ্রাউন্ড অ্যাটাকে দারুণ কৃতিত্ব দেখান সাইফুল আজম। যুদ্ধবিমান থেকে বোমা ফেলে ভারতের স্থল সেনাদের বেশ কিছু অবস্থান ধ্বংস করেন তিনি। মোট ১২টি গ্রাউন্ড অ্যাটাক অপারেশন সফলভাবে পরিচালনা করেন তিনি। এরপর তাকে পাঠানো হয় পাকিস্তানের আকাশে প্রবেশ করা একটি ভারতীয় বিমানকে মোকাবিলার জন্য।

শুরু হয় ডগফাইট। তার হামলায় বিধ্বস্ত হয় ভারতের ফোলান্ড নেট যুদ্ধবিমান। পাইলট মায়াদেব প্রাণে বাঁচলেও বন্দি হন পাকিস্তানের হাতে। চির প্রতিদ্বন্দ্বী ভারতের বিরুদ্ধে যুদ্ধে এই সাফল্যের পর সাইফুল আজমকে পাকিস্তানের তৃতীয় সর্বোচ্চ সামরিক সম্মাননা ‘সিরাত-ই-জুরাত’ পুরস্কারে ভূষিত করে সরকার।

সব মিলে ডগফাইটে শত্রুপক্ষের মোট ৫টি যুদ্ধবিমান ধ্বংস করার কৃতিত্ব দেখান সাইফুল আজম। তার এই কৃতিত্বের জন্য সারা বিশ^ তাকে সম্মানের চোখে দেখতে শুরু করে। ২০০১ সালে যুক্তরাষ্ট্রের বিমানবাহিনী সাইফুল আজমকে ‘লিভিং ঈগলস’ উপাধিতে ভূষিত করে। সারা বিশে^ মাত্র ২২ জন এই সম্মান পেয়েছেন।

আমাদের মুক্তিযুদ্ধেও অংশগ্রহণের পরিকল্পনা ছিল তার; কিন্তু পাকিস্তান বিমানবাহিনী বিষয়টি আঁচ করতে পেরে সাইফুল আজমের বিমান উড্ডয়নে নিষেধাজ্ঞা দেয়। স্বাধীনতার পর পাকিস্তান থেকে দেশে ফিরে আসেন। যোগ দেন বাংলাদেশ বিমানবাহিনীতে। এর মাধ্যমে চারটি ভিন্ন দেশের বিমানবাহিনীতে কাজ করার রেকর্ড গড়েন তিনি (বাংলাদেশ, পাকিস্তান, জর্দান ও ইরাক)। ১৯৭৭ সালে প্রমোশন পেয়ে উইং কমান্ডার ব্যাজ লাভ করেন এবং ঢাকা বিমানঘাঁটির অধিনায়কের দায়িত্ব পান। পরবর্তীতে আরও কিছু গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন শেষে ১৯৭৯ সালে গ্রুপ ক্যাপ্টেন হিসেবে অবসরে যান এই যোদ্ধা।

অবসরের পর সরকারের অনুরোধে রাষ্ট্রের কয়েকটি প্রতিষ্ঠানে বিভিন্ন দায়িত্ব পালন করেছেন। ১৯৯১-৯৬ সংসদে পাবনার নিজ এলাকা থেকে এমপিও নির্বাচিত হয়েছিলেন। ২০২০ সালের ১৪ জুন ঢাকার সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ইন্তেকাল করেন এই বীর বাংলাদেশি। শত্রুর কাছে যিনি ছিলেন আতঙ্ক, আর নিজ পক্ষের কাছে ছিলেন ভরসার নাম। যাকে নিয়ে আমরা শুধু গর্বই করতে পারি।

আপনার মন্তাব্য লিখুন
অনলাইনে কিশোরকন্ঠ অর্ডার করুন
লেখকের আরও লেখা

সর্বাধিক পঠিত

আর্কাইভ

আরও পড়ুন...

CART 0

আপনার প্রোডাক্ট সমূহ