হারমিট কাঁকড়া

চিত্র-বিচিত্র আরাফাত তুষার জুন ২০২৫

চকচকে খোলসবিশিষ্ট জলজ প্রাণী কাঁকড়া। এরা সমুদ্র সৈকত, নদীর তীর কিংবা পুকুর পাড়ে ঘুরে বেড়ায়। কখনো দলবেঁধে আবার কখনো একাকী বিচরণ করে। পৃথিবীর বেশির ভাগ সমুদ্রে, নদীতে এমনকি পুকুরেও নানা প্রজাতির কাঁকড়ার বিচরণ দেখতে পাওয়া যায়। এরা সাগরপাড় থেকে শুরু করে সাগরের গভীরে বিভিন্ন স্তরে বাস করে। তবে ক্রান্তীয় অঞ্চলে শুকনো মাটিতে বসবাসরত প্রজাতিও দেখা যায়। 

নারিকেল জিঞ্জিরা নামে পরিচিত বাংলাদেশের সর্বদক্ষিণে বঙ্গোপসাগরের উত্তর-পূর্বাংশে অবস্থিত সেন্টমার্টিন দ্বীপে প্রায়ই দেখা মেলে ছোটো ছোটো কাঁকড়ার। 

ইংরেজিতে এরা ঐবৎসরঃ ঈৎধন নামে পরিচিত, বৈজ্ঞানিক নাম চধমঁৎড়রফবধ। এখন পর্যন্ত পাঁচ শ প্রজাতির হারমিট কাঁকড়া চিহ্নিত হয়েছে।

এরা আকারে বিভিন্ন রকম হয়ে থাকে। কোনোটি বেশ বড়ো আবার কিছু প্রজাতি আকারে ছোটো। হারমিট কাঁকড়ার বেশির ভাগ প্রজাতির আকার ১/২ ইঞ্চি থেকে ৪ ইঞ্চি পর্যন্ত হয়। এটি দশ জোড়া উপাঙ্গ-বিশিষ্ট প্রাণী। এদের দুটি চোখ এবং দুই জোড়া অ্যান্টেনা রয়েছে। হারমিট কাঁকড়া বন্য পরিবেশে ৩০ বছরেরও বেশি সময় ধরে বেঁচে থাকতে পারে। তবে আবদ্ধ পরিবেশে তিন থেকে চার বছর বাঁচে।

হারমিট কাঁকড়া ক্রাস্টেসিয়ান, যার অর্থ এরা স্বভাবে কাঁকড়া, গলদা চিংড়ি এবং চিংড়ির সাথে সম্পর্কিত। খোলস থেকে বেরিয়ে আসা হারমিট কাঁকড়া দেখতে প্রায় গলদা চিংড়ির মতো।

হারমিট কাঁকড়ার রয়েছে ভিন্ন বৈশিষ্ট্য। কাঁকড়া বলতে সাধারণত পিঠে খোলসযুক্ত প্রাণীকেই বোঝানো হয়। কিন্তু হারমিট কাঁকড়া এর ব্যতিক্রম। প্রাণীটির শারীরিক গঠন এবং চালচলন একেবারেই মাকড়সার মতো। এদের প্রধান ভিন্নতা এদের পিঠে খোলস নেই এবং তলপেটও অনেকটা নরম। এজন্য অনেকেই এদের খাদ্য হিসেবে গ্রহণ করে। এরা সাধারণত মৃত শামুক বা ঝিনুকের খোলসের মধ্যে বাস করে। এরা বারবার নিজের বাসস্থান পরিবর্তন করে অর্থাৎ খোলস পরিবর্তন করে। এভাবে বারবার বাসস্থান পরিবর্তন করার জন্য এদেরকে সন্ন্যাসী কাঁকড়া বলা হয়।

হারমিট কাঁকড়া অল্প বয়সে ছোটো শামুকের খোলস ব্যবহার করলেও ধীরে ধীরে বয়স ও শারীরিক গঠন বৃদ্ধির সাথে সাথে খোলসের পরিবর্তন করে। পুরোনো খোলস ছেড়ে অন্য কোনো নতুন ও বড়ো খোলসের সাথে নিজেকে খাপ খাইয়ে নেয়। এমন খোলস তারা নেয়, যেখানে সহজে ঢোকা ও বের হওয়া যায়। 

পুরোনো খোলস ত্যাগ করলে কিংবা মারা গেলে এরা এক বিশেষ ধরনের গন্ধ (ফোরামেন) ছাড়ায়, যার কারণে খোলসের সন্ধানে থাকা অন্য কাঁকড়া বুঝতে পারে সেই খোলস ফাঁকা হয়েছে। 

মৃত শামুকের খোলসের ভেতর ঢুকে ভেতরের অক্ষকে শক্তভাবে আঁকড়ে সমুদ্রের ঢেউ থেকে এরা নিজেকে রক্ষা করে। হারমিট কাঁকড়ার খোলসের ওপর প্রায়ই শেওলা বা অন্যান্য জীবের বৃদ্ধি দেখা যায়।

বর্তমানে প্লাস্টিক দূষণ হারমিট কাঁকড়ার জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। পরিবেশ বিজ্ঞানীরা দাবি করেছেন, সমুদ্রে মাইক্রোপ্লাস্টিক দূষণ এদের জনসংখ্যার ব্যাঘাত ও আচরণগত পরিবর্তন ঘটাচ্ছে। 

কুইন্স ইউনিভার্সিটি বেলফাস্ট এবং লিভারপুল জন মুরস ইউনিভার্সিটির একদল শিক্ষাবিদের নতুন গবেষণায় দেখা গেছে, মাইক্রোপ্লাস্টিকের সংস্পর্শে আসার ফলে কাঁকড়াদের পরবর্তীতে উচ্চমানের খোলস নির্বাচন করার বা প্রবেশ করার সম্ভাবনা কমে যায়।

সাধারণত স্থলজ হার্মিট কাঁকড়া সমুদ্র তীরে এসে খোলস সংগ্রহ করে। কিন্তু প্লাস্টিক দূষণের কারণে সমুদ্রের পাড়ে খোলসের চেয়ে প্লাস্টিক বেশি পড়ে থাকতে দেখা যায়। ফলে ভুলবশত অনেক সময় এরা প্লাস্টিককে শামুকের খোলস মনে করে ব্যবহার করে। প্লাস্টিকের সামগ্রিক তল মসৃণ হওয়ায় এতে ঢুকতে পারলেও তারা আর বের হতে পারে না।

এভাবে প্লাস্টিক থেকে বের হতে না পেরে আটকে গিয়ে প্রতিনিয়ত অসংখ্য হার্মিট কাঁকড়া মারা যাচ্ছে, যা এই প্রাণীটির অস্তিত্বের জন্য হুমকিস্বরূপ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

আপনার মন্তাব্য লিখুন
অনলাইনে কিশোরকন্ঠ অর্ডার করুন
লেখকের আরও লেখা

সর্বাধিক পঠিত

আর্কাইভ

আরও পড়ুন...

CART 0

আপনার প্রোডাক্ট সমূহ