সোশ্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং

আইটি কর্নার নাদিম নওশাদ ফেব্রুয়ারি ২০২৫

বর্তমান যুগে টেকনোলজির সাথে কোনো না কোনোভাবে আমরা সবাই যুক্ত। এমন মানুষ পাওয়া মুশকিল যে স্মার্টফোন ব্যবহার করে না। সোশ্যাল মিডিয়ায় নেই এমন মানুষ পাওয়া আর সোনার হরিণ পাওয়া এখন প্রায় একই বিষয়। আমাদের দৈনন্দিন জীবনে, হাতের ঘড়ি থেকে শুরু করে পায়ের জুতা পর্যন্ত প্রতিটা পদক্ষেপেই প্রযুক্তি ওতপ্রোতভাবে জড়িত। আর টেকনোলজি বৃদ্ধির সাথে সাথেই বেড়েছে মানুষের নিরাপত্তার ঝুঁকিও।

এই ঝুঁকিগুলোর মধ্যে সোশ্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং অন্যতম। সোশ্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং-এর মাধ্যমে মানুষের সরলতা, দুর্বলতা বা অসাবধানতাকে কাজে লাগিয়ে ব্যক্তিগত তথ্য, কোনো সিস্টেম বা কোনো প্রতিষ্ঠানের গোপন তথ্য দেখার মাধ্যম তৈরি করে নেওয়া হয়।

এটাকে একটা শিল্পও বলতে পারো। মানুষকে ধোঁকা দেবার শিল্প। এটাকে শিল্প বলার কারণ হলো, সাধারণ হ্যাকিং বলতে আমরা যা বুঝি সোশ্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং এ তেমন কোনো প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয় না। সোশ্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং এ কোনো প্রকার হ্যাকিং কৌশল ব্যবহারের পরিবর্তে ব্যবহার করা হয় মানুষের বিশ্বাস করার সাধারণ প্রবণতাকে। কারণ, অনেক ক্ষেত্রেই হ্যাকিং কৌশল ব্যবহারের থেকে মানুষের সরল বিশ্বাসকে কাজে লাগানো অনেক বেশি সহজতর। উদাহরণ স্বরূপ বলা যেতে পারে, কোনো ব্যক্তির পাসওয়ার্ড ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে কোড করে হ্যাক করার থেকে বোকা বানিয়ে পাসওয়ার্ড চুরি করা অনেক বেশি সহজ।

বর্তমানে ফিশিং স্ক্যামগুলো হলো সবচেয়ে প্রচলিত ও বেশি ব্যবহৃত সোশ্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং আক্রমণ। বিভিন্ন সোশ্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং টুলকীট ব্যবহার করে হ্যাকাররা বিভিন্ন ফিশিং পেজ তৈরি করে তার লিংক লোভনীয় অফারসহ নির্দিষ্ট ব্যক্তিকে লক্ষ্য করে ইমেইল, টেক্সট ম্যাসেজ, সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে পাঠানো হয়। 

বর্তমানে অবশ্য বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান অত্যাধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে ফিশিং স্ক্যাম সহজে শনাক্ত করতে পারে। তবে এ কথাও সত্য যে ফিশিং স্ক্যাম শনাক্ত করার মানে এই নয় যে, ফিশিং স্ক্যাম থেকে আমরা একেবারে নিরাপদ। ফিশিং স্ক্যাম শনাক্ত করার প্রযুক্তি ব্যবহার হবার সাথে সাথে ফিশিং স্ক্যামের প্রযুক্তিও অত্যাধুনিক হয়েছে। বর্তমানে অ্যাটাকাররা বিভিন্ন ফ্রেমওয়ার্ক ব্যবহার করছে শনাক্তকারী প্রযুক্তিকে বোকা বানাতে।

যখনই কোনো ভুক্তভোগী ফিশিং লিংকে ক্লিক করে, তখনই ভুক্তভোগীর ডিভাইসে একটা হ্যাকিং কোড চলে। হ্যাকিং কোড সফলভাবে চললে ভুক্তভোগীর ডিভাইসের যাবতীয় তথ্য হ্যাকারের হাতে চলে যায়। হ্যাকার তখন ভুক্তভোগীর ডিভাইসের তথ্যগুলো এনক্রিপ্ট করে ভুক্তভোগীর কাছে অর্থ দাবি করে। এ ধরনের অর্থ দাবি করার ঘটনাকে র‌্যানসামওয়্যার বলে। 

নিচে কিছু সোশ্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং কৌশল দেওয়া হলো যেগুলো ফিশিং স্ক্যামে ব্যবহৃত হয়।

সোশ্যাল মিডিয়া লিংক স্ক্যাম

অনলাইন লটারি স্ক্যাম

চাকরির প্রস্তাবের স্ক্যাম

ব্যাংকিং লিংক স্ক্যাম

ফ্রি সফটওয়্যার লিংক স্ক্যাম

বর্তমানে বিভিন্ন ধরনের সোশ্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যাটাক আছে। এ অ্যাটাকগুলোর প্রত্যেকটারই স্বতন্ত্র কৌশল আছে মানুষের দুর্বলতাকে কাজে লাগিয়ে তাদের তথ্য হাতিয়ে নেবার জন্য। নিচে কিছু সোশ্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যাটাক সম্পর্কে দেওয়া হলো।

ফিশিং : ফিশিং হলো এমন একটা সোশ্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যাটাক, যেখানে ভুক্তভোগীকে ইমেইল, মোবাইল ম্যাসেজ বা সোশ্যাল মিডিয়া ম্যাসেজের মাধ্যমে বিভিন্ন ব্যাংক, প্রতিষ্ঠানের বা সফটওয়্যারের লিংক দেওয়া হয়। ফিশিং-এর জন্য বিভিন্ন লোভনীয় চাকরির সুযোগ, লটারি জেতার সুযোগ বা কোনো প্রিমিয়াম সফটওয়্যার ফ্রিতে পাবার কথা বলা হয়ে থাকে। এর ফলে মানুষ লিংকগুলোতে ক্লিক করতে আকৃষ্ট হয়। এবং যখনই লিংকটিতে ভুক্তভোগী ক্লিক করে, তখনই সে হ্যাকিং-এর শিকার হয়।

বেইটিং : বেইটিং হলো এমন একটা সোশ্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যাটাক যেখানে বিভিন্ন লোভনীয় টেক-পণ্য (যেমন : পেন-ড্রাইভ, চার্জার) রেস্টুরেন্ট, ক্যাফেটেরিয়া বা অন্য কোনো স্থান, যেখানে মানুষের নজরে খুব সহজেই পণ্যটির ওপর পড়বে, এমন স্থানে ফেলা রাখা হয়। হ্যাকার মূলত ঐ টেক-পণ্যে হ্যাকিংয়ের কোড আপলোড করে রাখে। ফলে যখনই কেউ পণ্যটিকে তার ডিভাইসের সাথে সংযোগ করে, সাথে সাথেই তাদের ডিভাইসের নিয়ন্ত্রণ হ্যাকারের হাতে চলে যায়।

ভিশিং : ভয়েস ফিশিং-এর মাধ্যমে করা ফিশিং অ্যাটাকই ভিশিং। এ পদ্ধতিতে মানুষকে কথার জালে ফাঁসিয়ে তাদের থেকে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য চুরি করা হয়।

সোশ্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং থেকে বাঁচতে আমাদের সর্বদা সচেতন থাকতে হবে। আমাদের সোশ্যাল মিডিয়া অ্যাকাউন্ট ও ব্যাংক অ্যাকাউন্ট নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করতে হবে। কোনো রকম অননুমদিত ব্যক্তি ব্যাংক থেকে টাকা উত্তোলন করছে কি না, বিনা অনুমতিতে কেউ আমাদের সোশ্যাল মিডিয়া অ্যাকাউন্টে লগ-ইন করছে কি না, এগুলোর প্রতি আমাদের সর্বদা সতর্ক দৃষ্টি রাখতে হবে। 

প্রতিটি ইমেলের অ্যাড্রেস ভালো করে পর্যবেক্ষণ করে দেখতে হবে যে কোনো সন্দেহ প্রবণ কিছু চোখে পড়ে কি না। যদি এমন কিছু চোখে পড়ে, তাহলে সেই ইমেইল না খোলাই ভালো। এবং সাথে সাথে সেই ইমেইল অ্যাড্রেসকে স্প্যামে যুক্ত করতে হবে।  

কোনো প্রকার চাকরি, লটারি বা অন্য কোনো প্রলোভনসহ কোনো লিংক আমাদের সামনে এলে তা পরিহার করতে হবে। কোনো প্রিমিয়াম সফটওয়্যার ফ্রিতে ডাউনলোড করা যথাসম্ভব পরিহার করাই শ্রেয়।

সোশ্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং থেকে নিজেদের রক্ষা করতে সচেতনতার কোনো বিকল্প নেই। আমাদের সচেতনতা ও সাবধানতাই পারে আমাদের সোশ্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং থেকে বাঁচাতে।

আপনার মন্তাব্য লিখুন
অনলাইনে কিশোরকন্ঠ অর্ডার করুন
লেখকের আরও লেখা

সর্বাধিক পঠিত

আর্কাইভ

আরও পড়ুন...

CART 0

আপনার প্রোডাক্ট সমূহ