লাল চব্বিশের বীরশ্রেষ্ঠ শহীদ আবু সাঈদ

প্রচ্ছদ রচনা ড. মোজাফফর হোসেন ফেব্রুয়ারি ২০২৫

মৃত্যু সবসময় শীতল। কিন্তু কিছু মৃত্যু আছে যা উষ্ণতার, গৌরবের, অহংকারের, সম্মানের ও মর্যাদার। যেমন আবু সাঈদের মৃত্যু। আবু সাঈদের মৃত্যু শহীদি মৃত্যু। শহীদি মৃত্যুর সম্মান মৃত্যুর পরের জীবনে পাওয়া যায়। তবে দুনিয়াতেও এর সম্মান ব্যাপক ও প্রশংসিত। আল্লাহ বলেন- ‘শহীদরা কখনো মরে না’। শহীদরা তাদের পছন্দ মতো আত্মীয়স্বজন নিয়ে জান্নাতে থাকার অধিকার প্রাপ্ত হবেন। এ কারণেই অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানো প্রশংসার, গর্বের।


আবু সাঈদ যেভাবে শহীদ হয়েছিলেন

স্বাধীনতার পরও বাংলাদেশের মানুষ বৈষম্যের শিকার হয়েছে। যেমন চাকরি পাবার ক্ষেত্রে বৈষম্য। শিক্ষায় বৈষম্য। গ্রাম-শহরের বৈষম্য। বৈষম্য দিন দিন বাড়ছিল। বৈষম্যের সাথে সাথে বেড়ে চলছিল মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা। খুনের ঘটনা প্রত্যহ ঘটতো। সামাজিক ন্যায়বিচার ছিল না। দেশ থেকে একের পর এক অর্থ পাচারের ঘটনা ঘটে যাচ্ছিল। এ সবের বিরুদ্ধে দেশের মানুষ কথা বলতে গেলে আওয়ামী লীগ সরকার জনগণকে শায়েস্তা করতে মিথ্যা মামলা দিতো। ধরে নিয়ে জেলখানায় রাখতো; বিনা বিচারে হত্যা করতো; গুম করতো। ছাত্ররা প্রতিবাদ করতে গেলে ছাত্রলীগের ছেলেরা সাধারণ ছাত্রদের ধরে ধরে মারতো। হল থেকে বের করে দিতো। এমনকি পিটিয়ে মেরেও ফেলতো। যেমন- বুয়েটের শিক্ষার্থী আবরার ফাহাদকে পিটিয়ে মেরে ফেলা হয়েছে। এ সবের পাশাপাশি চলছিল চাকরিতে কোটা বৈষম্য। এই বৈষম্য নিরসনের দাবিতে সমগ্র দেশের ছাত্ররা গড়ে তুলেছিল কোটাবিরোধী ছাত্র আন্দোলন। আবু সাঈদ ছিলেন সেই আন্দোলনের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সমন্বয়ক। সরকার কোটা আন্দোলনকে তিরস্কার করতে থাকে। ছাত্রদের দাবি-দাওয়াকে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করে। আন্দোলন বেগবান হলে ছাত্রলীগকে সরকার লেলিয়ে দেয় আন্দোলন দমাতে। চলে ছাত্রদের ওপর ছাত্রলীগের অত্যাচার। প্রতিবাদে ছাত্ররা ফুঁসে ওঠে। অতিষ্ঠ হয়ে এবার ছাত্ররা সরকার পতনের ডাক দেয়। সমগ্র দেশ ছাত্র আন্দোলনে উত্তাল হয়ে ওঠে। সরকার পতনের দাবিতে সাধারণ মানুষও ছাত্রদের সাথে নেমে আসে রাস্তায়। রংপুরে রাস্তায়ও গণবিপ্লবের স্লোগান ওঠে। আবু সাঈদের নেতৃত্বে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা অভ্যুত্থানের লক্ষ্যে রাস্তায় নেমে আসে। সরকার ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে পড়ে। আন্দোলন দমাতে পুলিশকে গুলি করার নির্দেশ দেয়। পুলিশের গুলির প্রতিবাদে ছাত্র সমাবেশের সামনে থাকা আবু সাঈদ পুলিশের দিকে বুক চিতিয়ে দাঁড়ান। নিরস্ত্র আবু সাঈদকে পুলিশ গুলি করে। পর পর কয়েকটি গুলি আবু সাঈদের বুকে লাগে। ধরাধরি করে ছাত্ররা আবু সাঈদকে হাসপাতালে নেওয়ার সময় তিনি মৃত্যুবরণ করেন। আবু সাঈদের মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়লে বাংলাদেশের ছাত্র-জনতা বিক্ষোভে ফেটে পড়ে। আবু সাঈদ ১৬ জুলাই শহীদ হন। ১৬ জুলাই থেকে ৫ আগস্ট পর্যন্ত গুলি করে একের পর এক প্রায় দুই হাজারেরও অধিক ছাত্র-জনতাকে হত্যা করে ফ্যাসিস্ট হাসিনার নির্দেশে পুলিশ।


ছাত্র হিসেবে শহীদ আবু সাঈদের কৃতিত্ব

মৃত্যুর সময় আবু সাঈদ ছিলেন রংপুর বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি ভাষা ও সাহিত্য বিভাগের অনার্স পরীক্ষার ফল প্রার্থী। এর আগে তিনি রংপুর সরকারি কলেজ থেকে জিপিএ ৫ পেয়ে এইচএসসি পাস করেন। তার আগে তিনি খালাশপীর দ্বিমুখী উচ্চবিদ্যালয়, পীরগঞ্জ থেকে গোল্ডেন ৫ পেয়ে এসএসসিতে উত্তীর্ণ হন। আবু সাঈদ স্থানীয় জাফরপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে ট্যালেন্টপুল বৃত্তি পেয়ে পঞ্চম শ্রেণিতে উত্তীর্ণ হন। তখন থেকেই আবু সাঈদ মেধাবী ছাত্র হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন।


শহীদ আবু সাঈদের মানসিকতা

শহীদ আবু সাঈদের শৈশব কেটেছে গ্রামীণ পরিবেশে। তিনি মাঠ-ঘাট, নদী-নালা, ক্ষেত-খামারে দাঁড়িয়ে নির্মল বাতাসে বুক ভরে শ্বাস নিয়েছেন। পর্যবেক্ষণ করেছেন গ্রামীণ মানুষের সহজ-সরল জীবন-যাপন। লক্ষ করেছেন ক্ষেত-খামারে কৃষকের হাড়ভাঙা পরিশ্রম ও তাদের বঞ্চনা। এ সবের সাথে তিনি শহুরে জীবনের পার্থক্য পেয়েছেন বিস্তর। উপলব্ধি করেছেন গ্রামীণ এসব মানুষের খোঁজ-খবর রাষ্ট্র তেমন একটা রাখতে চায় না। তিনি লক্ষ্য করেছেন, এই রাষ্ট্র যারা চালায় তাদের কাছে জনগণের গুরুত্ব নেই। আবু সাঈদের বয়স ২৩ বছর। এই ২৩ বছরের ১৬ বছরই দেখেছেন সরকারের দ্বারা মানুষ কীভাবে জুলুমের শিকার হয়েছে। রাষ্ট্রের গতিবিধি গভীরভাবে লক্ষ্য করেছেন আবু সাঈদ। তিনি ধরেই নেন লেখাপড়া শেষ করে চাকরি পাবেন না। কারণ এদেশে চাকরি পেতে হলে মামা-খালু, টাকা-পয়সা থাকতে হয়। কোটার যোগ্য হতে হয়। মেধাবীরা এদেশে বঞ্চিত হয়। তিনি ভাবলেন, এ অবস্থার পরিবর্তন দরকার। এই রকম চিন্তার সময়ই ডাক আসলো কোটাসংস্কার আন্দোলনের। আবু সাঈদ বাংলাদেশের সমাজব্যবস্থা পরিবর্তনের স্বপ্ন ছোটবেলা থেকেই দেখতেন। তিনি ভাবতেন এ দেশের পরিবর্তন আনা দরকার। আবু সাঈদ কোটাসংস্কার আন্দোলনে যোগ দিলেন। হলেন রংপুর বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সমন্বয়ক। কোটা সংস্কার আন্দোলন শুরু হয় ২০১৩ সালে। ২০১৮ সালে সেই আন্দোলন আরও গতি পায়। ২০২৪ সালে ১৫ জুলাই আবু সাঈদ ফেসবুকে একটা পোস্ট দেন। সেই পোস্ট থেকে আবু সাঈদের মনের ভেতরটা অনুমান করা যায় সহজেই। সেই পোস্টে আবু সাঈদ শহীদ শামসুজ্জোহাকে উদ্দেশ্য করে লেখেন- ‘স্যার মোহাম্মদ শামসুজ্জোহা, এই মুহূর্তে আপনাকে ভীষণ দরকার। আপনার সমসাময়িক সময়ে যারা ছিলেন সবাই তো মরে গিয়েছে। কিন্তু আপনি মরেও অমর। আপনার সমাধি আমাদের প্রেরণা। আপনার চেতনায় আমরা উদ্ভাসিত।’ এরপর আবু সাঈদ সাধারণ মানুষকে আহ্বান করে লেখেন- ‘আপনারাও প্রকৃতির নিয়মে একসময় মারা যাবেন। কিন্তু যতদিন বেঁচে আছেন মেরুদণ্ড নিয়ে বাঁচুন। ন্যায্য দাবিকে সমর্থন জানান, রাস্তায় নামুন, শিক্ষার্থীদের ঢাল হয়ে দাঁড়ান। প্রকৃত সম্মান এবং শ্রদ্ধা পাবেন। মৃত্যুর সাথে সাথেই কালের গর্ভে হারিয়ে যাবেন না। আজন্ম বেঁচে থাকবেন শামসুজ্জোহা হয়ে। অন্তত একজন শামসুজ্জোহা হয়ে মরে যাওয়াটা অনেক বেশি আনন্দের, সম্মানের এবং গর্বের।’ (সংগৃহীত)

আবু সাঈদ যে মনেপ্রাণে শাহাদাতের তামান্না চেয়েছিলেন তা এই পোস্ট থেকে সুস্পষ্ট বোঝা যায়। তিনি আপাদমস্তক দেশপ্রেমিক ছিলেন। অন্যায়ের বিরুদ্ধে আপসহীনও ছিলেন, সেটাও অনুমান করা যায় এই পোস্ট থেকে। এই বীর শহীদ আবু সাঈদকে আমরা সশ্রদ্ধ সালাম জানাই। এ রকম আবু সাঈদ আমাদের ঘরে ঘরে আরও জন্মগ্রহণ করুক। ২৪ গণ-অভ্যুত্থানে যারাই শাহাদাত বরণ করেছেন তাদের পরিবারকে রাষ্ট্রের তত্ত্বাবধানে রাখার বিষয়টি নিশ্চিত করা হোক।

আপনার মন্তাব্য লিখুন
অনলাইনে কিশোরকন্ঠ অর্ডার করুন
লেখকের আরও লেখা

সর্বাধিক পঠিত

আর্কাইভ

আরও পড়ুন...

CART 0

আপনার প্রোডাক্ট সমূহ