মুক্ত আকাশ

তোমাদের গল্প আজিম মাহমুদ মিরাজ এপ্রিল ২০২৫

আজ আকাশের মনের আকাশে বৈশাখের মেঘ জমেছে। বাবা-মায়ের চাকরির কারণে প্রতি ছয় মাসেই বাসা বদলাতে হয়। আজ আবার বদলাতে হলো। তাই তার মন খুব খারাপ। খেলার কোনো সাথী নেই। একা একা সারা দিন কাটায়। খিদে পেলে বুয়াকে বলে। বুয়া খেতে দেয়। ওর এত এত খেলনা তবুও সে খেলে না। এক দিন সে বুয়াকে বলল- খালা, তোমার কোনো ছেলেমেয়ে নেই?

- কেন বলো তো বাবা?

- বলো না আছে নাকি।

- আছে তো। ওর নামও আকাশ।

- কোথায় থাকে তোমার ছেলে?

- ও? এখন হয়তো মাঠে খেলছে।

- ওকে একদিন নিয়ে এসো। 

- আচ্ছা সে দেখা যাবে। 

তারপর মাস খানেক কেটে গেল। আকাশ প্রতিদিনের মতো ঘুম থেকে উঠে দেখে তার বাবা-মা অফিসে চলে গেছে। বুয়া এখন বাজারে। টেবিলের ওপর তার খাবার রাখা। হাতমুখ ধুয়ে নাস্তা করে নেয় আকাশ। তারপর বারান্দায় গিয়ে দাঁড়িয়ে মাঠের ছেলেদের খেলা দেখে। এমন সময় বুয়ার দরজা খোলার শব্দ শুনতে পায় আকাশ। একটু পরে বুয়া যেন কাকে ধমক দিলো। সে বাইরে বেরোতেই দেখে তার বয়সি একটা ছেলে দাঁড়িয়ে ঘরের সব কিছু দেখছে। আকাশ কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করলো- তুমি কে? 

- আকাশ। তোমার নাম?

- আমার নামও আকাশ।

- ওমা! দেখো না এই ছেলেটা আমায় ভ্যাচাচ্ছে।

- ভ্যাচানো মানে কী?

- ও মা তুমি ওটা জানো না? এর মানে কারো কথাকে নকল করা।

- না, আমি নকল করছি না। আমার নাম আকাশ।

- ও, তাহলে তো তুমি আমার মিতা।

- মিতা। কিন্তু মিতা তো মেয়েদের নাম। 

- না, ওই মিতা নয়। যদি দু’জন মানুষের নাম একরম হয় তবে তারা দু’জন দু’জনের মিতা।

- ও, বুঝেছি আমি জানতাম না। তুমিই তাহলে বুয়ার ছেলে।

- হ্যাঁ।

- তুমি আমার সাথে খেলবে? আমার অনেক খেলনা আছে। কিন্তু খেলার সাথী নেই।

- ঠিক আছে খেলবো।

- চলো তাহলে, আমার খেলার ঘর দেখাই।

সন্ধ্যায় বুয়া কাজ শেষ করে আকাশের জন্য খাবার রেডি করে চলে গেল তার ছেলেকে নিয়ে। খাবার খেয়ে আকাশ শুয়ে পড়লো।

একদিন আকাশ খুব অসুস্থ হয়ে পড়লো। তার বাবা-মা সকালে বুঝতে পারেনি। পরে রাতে বুয়াকে বাড়ি না ফিরতে দেখে জিজ্ঞেস করলো- কী হয়েছে। 

- বাবু ছোট বাবুর খুব অসুখ করেছে। ওরা ব্যাগ-পত্র ফেলে আকাশের কাছে ছুটে যেতেই দেখে ওর পাশে একটা ছোট ছেলে বসা। দৌড়ে এসে আকাশের পাশে বসে ওর মাথায় হাত বুলিয়ে জিজ্ঞেস করলো- কী হয়েছে তোমার বাবা?

বুয়ার ছেলে আকাশ বলল- অসুখ করেছে। অসুখ করবে নাই বা কেন? সারা দিন ঘরে বসে থাকলে অসুখ করবেই।

আকাশের বাবা বলল- তুমি থামো তো পাকা ছোকরা। তোমার জ্ঞান নিতে হবে না।

কথাগুলো শুনে বুয়ার ছেলে আকাশের খুব মন খারাপ হলো। এ রকমভাবে তাকে কেউ বকেনি। কান্নার ভাব মাখা মুখটা মায়ের আঁচলের নিচে লুকিয়ে ফেললো। আকাশের মা-বাবা আকাশকে নিয়ে হাসপাতলে গেল। পেছন পেছন বুয়াও গেল। বুয়া মালিকের ছেলেকে নিজের ছেলের মতোই দেখতো। তাই মায়া ত্যাগ করতে পারলো না। বুয়া হাসপাতালে এসে দেখে, ডাক্তাররা  আকাশকে একটা রুমে নিয়ে যাচ্ছে। আকাশের মা পেছন ফিরে দেখে বুয়া। দৌড়ে বুয়াকে এসে বলল- তোর জন্য এসব হয়েছে। কোথায় ছিলি তুই? যা এখান থেকে!

একটু পরে ডাক্তার বেরিয়ে আসতেই আকাশের বাবা বলল- কী হয়েছে ডাক্তার?

- দেখুন সকালের আগে কিছু বলা যাচ্ছে না। ও হ্যাঁ, কাল সারা দিন ও কী করেছিল?

আকাশের বাবা উত্তর দিতে না পেরে লজ্জায় নিচের দিকে তাকিয়ে রইলো। বুয়া এসে বলল- আমি ওর দেখাশোনা করি। আমার ছেলের সাথে খেলা করছিল আকাশ বাবু। তখন আকাশ বাবু মাঠে খেলার কথা বললে আমার ছেলে না করে দেয়। আকাশ বাবুর বাবা বকবে বলে। তাই রাতে মন খারাপ ছিল।

- আপনারা কেমন বাবা-মা, সন্তানের খোঁজ পর্যন্ত নেন না। ডাক্তার চলে গেল। পরদিন সকাল বেলা ডাক্তার আকাশকে দেখে বলল- ও এখন ভালো আছে। ঔষধের ঘোর এখনো কাটেনি তাই জ্ঞান ফিরছে না।

ওর বাবা বলল- আমরা কি ওকে বাড়ি নিয়ে যেতে পারি?

- হ্যাঁ পারেন তবে জ্ঞান ফিরলে আমাকে একটা কল করবেন।

আকাশকে নিয়ে ওর বাবা-মা বাড়ি এলো। এসে দেখে বুয়া প্রতিদিনের মতো কাজ করছে। আকাশের বাবা-মা কিছু বলেনি আর বুয়াকে। আকাশকে আকাশের বিছানায় শুইয়ে দিলো। বুয়া কাজের ফাঁকে আকাশকে দেখতে এলো। বুয়া ফেরার সময় আকাশ বলল- মিতা কোথায় বুয়া?

বুয়া দেখে বলে উঠলো- সাহেব, ম্যাডাম, আকাশ বাবুর জ্ঞান ফিরেছে!

আকাশের বাবা-মা জেগে উঠলো। আকাশের জ্ঞান ফিরেছে দেখে তারা খুব খুশি। আকাশের বাবা বুয়ার ছেলেকে বলল- কালকের কথায় তুমি কি আমার ওপর রাগ করেছ?

- না, আসলে আগে কেউ এভাবে বকেনি তো তাই একটু মন খারাপ হয়ে ছিল। এখন ভালো হয়ে গেছে।

তার পর আকাশের মা গিয়ে বুয়ার কাছে বলল- বুয়া আমাদের মাথা ঠিক ছিল না। তুমি কিছু মনে করো না। আমি তোমার কাছে ক্ষমা চাচ্ছি।

- না-না-না, ম্যাডাম কী করছেন। ভুলটা আমারই। আমি ঠিক করে খেয়াল রাখিনি।

- তোমার কোনো ভুল নেই। তুমি যথাসাধ্য করেছ। আর আমরা বাবা মা হয়ে যা করতে পারিনি তুমি তা করেছ। আমরাই তো তোমাকে নিষেধ করেছি ওকে বাইরে না নিতে।

বুয়ার ছেলে আকাশ এই ফাঁকে, অন্য আকাশের কাছে গিয়ে বলল- কেমন আছ এখন। জানো আমি খুব চিন্তায় পড়ে গিয়েছিলাম যখন দেখি তুমি অসুস্থ হয়েছ। তুমি তাড়াতাড়ি সেরে ওঠো। আমরা এক সাথে খেলবো।

কিছুদিনের মধ্যেই আকাশ সুস্থ হয়ে উঠলো। এখন দুই আকাশ প্রাণ খুলে খেলে যেন আকাশের দু’টি খণ্ড মিলিত হয়েছে।

আপনার মন্তাব্য লিখুন
অনলাইনে কিশোরকন্ঠ অর্ডার করুন
লেখকের আরও লেখা

সর্বাধিক পঠিত

আর্কাইভ

আরও পড়ুন...

CART 0

আপনার প্রোডাক্ট সমূহ