ভার্চুয়াল রিয়্যালিটির জগতে

সাইন্স ফিকশন সাদবিন আল জুবায়ের জুন ২০২৫

সৈকত রহমান। একজন আবিষ্কারক। আবিষ্কারের জন্য তিনি আমেরিকায় খুব ভালো একটি চাকরি পেয়েছিলেন। ভালো বেতনের পাশাপাশি থাকা-খাওয়ারও ব্যবস্থা ছিল। তিনি অনেক বছর ধরে সেই কোম্পানিটিতে চাকরি করেন। কিন্তু একদিন তার কাজে বিফলতার কারণে তার বস রেগে তাকে খুব অপমান করেন। এমনকি তার দেশকে হেয় করেও অনেক কিছু বলেন। সৈকত তার বসের প্রত্যেকটি কথা সহ্য করলেও তার দেশকে হেয় করাটা মেনে নিতে পারেননি। তাই তিনি তখনই চাকরি থেকে পদত্যাগ করেন।

পরে তার বস নিজের ভুল বুঝতে পারেন এবং সেটি স্বীকারও করেন। সৈকতকে পদত্যাগ না করার জন্য অনুরোধ করেন এবং এত ছোটোখাটো বিষয়ে যেন রাগান্বিত না হন, সেই সম্পর্কেও বলেন। কিন্তু তখন সৈকত বললেন, ‘আমার দেশকে হেয় করা হলে সেটি আমার জন্য কোনো ছোটো ব্যাপার না।”

সৈকত বাংলাদেশে ফিরে আসেন। তিনি একজন দেশপ্রেমিক মানুষ। বাংলাদেশে এসেও সৈকত বিভিন্ন আবিষ্কার চালিয়ে যান। সেই আবিষ্কারগুলো দেশের উন্নয়নের পাশাপাশি তিনি বিদেশি ক্রেতাদের কাছে বিক্রি করেন। বিক্রি করার আগে তিনি সকল ক্রেতাদের একটি গোপন কোড দিয়ে দেন, যেন অন্য কোনো ব্যক্তি তার আবিষ্কার সম্পর্কে জানতে না পারেন। এবারের আবিষ্কারটি একটু ভিন্ন। ভার্চুয়াল রিয়্যালিটির ঘর, যেটি কোটি কোটি টাকা দিলেও তিনি বিক্রি করবেন না। এই আবিষ্কারটি সম্পূর্ণই তার নিজের জন্য তৈরি। অনেক বিদেশি ক্রেতা এসেছিলেন এটি কিনতে। কিন্তু তারা ব্যর্থ হয়েছেন। তারপরেও একদিন একজন লোক তার এই আবিষ্কারটি কিনতে আসেন। লোকটি একটি সুটকেস হাতে ঠিকানা অনুযায়ী সৈকতের বাসায় যান। গিয়ে কলিং বেল টিপ দেন। সৈকত কলিং বেলের আওয়াজ পেয়ে দরজা খুললেন। লোকটি বললেন, ‘শাইক্যাট, রাইট?’

‘শাইক্যাট নয়, সৈকত।’

লোকটি বলল, ‘ইউ মিন, শৈক্যাট?’

সৈকত বিরক্ত হয়ে বললেন, ‘হুম। এসো, ভেতরে এসো। তুমি কে এবং কোথা থেকে এসেছ অনুমান করতে কোনো অসুবিধা হচ্ছে না, তবু তোমার মুখ থেকে একবার শুনি। কিছু যদি মনে না করো তাহলে গোপন সংখ্যাটি কত?’

‘নাইনটি থ্রি থাউজেন্ড থ্রি হান্ড্রেড।’

‘তো এবার বলো।’

লোকটির নাম জ্যাক। এসেছে আমেরিকা থেকে। বাংলা ভাষা বোঝে। একটু-আধটু বলতেও পারে। নিজের সম্পর্কে আরও বলল, ‘আমি মুন হেইজের এরো কম্পিউটিশন থেকে এসেছি। আমি সফটওয়্যার ডিভিশনের একজন ডিভিশন ম্যানেজার।’

সুটকেস থেকে টাকা বের করে সৈকতের সামনে রাখল এবং বলল, ‘ইফ ইউ ডোন্ট মাইন্ড, একটা কথা বলতে পারি?’

সৈকত সুটকেস থেকে একটি ডলারের বান্ডিল বের করে দেখতে দেখতে বললেন, ‘বলো।’

‘তুমি আমাদের কান্ট্রিতে এত স্যালারিতে জব করতে, ছোটো একটি রিজনে সেটি ছেড়ে দিলে কেন?’

‘তুমি কি বুঝবে এ ব্যাপার? আমার দেশকে হেয় করা কোনো ছোটো কারণ নয়।’

‘ইয়েস ইয়েস। আই গট ইট। ইউ আর আ প্যাটরিয়ট। আই এম সরি।’

তারপর সৈকত সেই ডলারের বান্ডেলটি সুটকেসের ভেতর রেখে দিলেন। জ্যাক বলল, ‘এক মিলিয়ন ডলার থেকে শুধু একটা বান্ডিল চেক করলে? বাকিগুলো যদি ফেইক হয়?’

সৈকত হেসে উত্তর দিলেন, ‘তাহলে বুঝতে হবে তুমি খুব ভাগ্যবান। চলো, তুমি যেই উদ্দেশ্যে এখানে এলে সেখানে নিয়ে যাই।’

তারা ভার্চুয়াল রিয়্যালিটির ঘরটিতে গেলেন। সেই ঘরটিতে অনেক ধরনের যন্ত্রপাতি। একটি চেয়ার রয়েছে। তার পাশে একটি হেলমেট। চেয়ারটির সামনে একটি মেশিন আছে। ঘরের ওপরে বিভিন্ন ধরনের তার, সার্কিট, কাচ ইত্যাদি রয়েছে। জ্যাক বলল, ‘ওয়াও! এটাই কি সেই অ্যামেইজিং হার্ডওয়্যার?’

‘হ্যাঁ। অ্যামেইজিং কি না তা অবশ্য জানি না, কিন্তু এটি আমার আবিষ্কারের মধ্য থেকে অন্যতম শ্রেষ্ঠ আবিষ্কার। রিস্ক প্রসেসর লাগানো। অনেকগুলো স্পার্ক ইঞ্জিন স্ট্যান্ডার্ড বাস দিয়ে জুড়ে দেওয়া হয়েছে। প্রসেসর যেটুকু মেমোরি নিতে পারে পুরোটাই দেওয়া আছে। অনেক কষ্ট করে ক্লক স্পিডটা দ্বিগুণ করে দিয়েছি। এর প্রসেসিং পাওয়ার এখন অনেকটা সুপার কম্পিউটারের সমান। তবে এর আসল কাজ এর সফটওয়্যারে।’

জ্যাক আগ্রহ নিয়ে বলল, ‘আমি দেখতে চাই।’

সৈকত জ্যাককে মেশিনটির সামনে রাখা চেয়ারটিতে বসালেন। হেলমেটটি দিয়ে জ্যাককে বললেন, ‘নাও, হেলমেটটি পরো। চোখের সামনে দুটো ছোটো লেন্স আর তার পেছনে তিনটা এল.ই.ডি আছে, সেখান থেকে সরাসরি চোখে আলো পাঠিয়ে দেখার অনুভূতি তৈরি হবে। ভয় পাবার কিছু নেই। তুমি কি প্রস্তুত জ্যাক?’

‘ইয়েস, আই অ্যাম রেডি।’

সৈকত মেশিনটি চালু করলেন। মুহূর্তের মধ্যেই জ্যাক চলে যায় অন্য একটি জায়গায়। জায়গাটি একটি প্রাসাদের মতো। খুব সুন্দর। হাঁটতে হাঁটতে সে বলল, ‘মাইন্ড ব্লোয়িং!’

ধীরে ধীরে হেলমেটটি খুলতেই দেখা গেল সে আগের জায়গাতেই আছে। সৈকত বললেন, ‘কি, কেমন লাগল?’

‘এখনো আমার বিলিভ হচ্ছে না কী ছিল সেটা!’

সৈকত হেসে বললেন, ‘হাহা, চাইলে আবার দেখতে পারো।’

জ্যাক মাথা নাড়ল। সৈকত আবার তার মাথায় হেলমেটটি লাগিয়ে দিলো। এবার জ্যাক ভিন্ন একটি জায়গায় এলো, যেখানে শুধু পাহাড় আর পাথর, কিছুটা আদিম যুগের মতোই। তারপর হঠাৎ দূর থেকে ড্রাগনের মতো একটি পাখি সাঁ করে তার কাছে উড়ে আসতে লাগল। তার আগেই জ্যাক ভয়ে হেলমেটটি খুলে ফেলল এবং দেখল চেয়ারটিতেই বসে আছে।

সৈকত দেখে হাসলেন। জ্যাক সৈকতকে বলল, ‘আমি কি এই চেয়ারেই বসে ছিলাম? আমি গ্যারান্টি দিয়ে বলতে পারি আই ওয়ান্ট হেয়ার।’

‘তুমি সারাক্ষণ এখানেই এবং এই চেয়ারেই বসে ছিলে।’

‘আনবিলিভেবল!’

‘আমার এতগুলো আবিষ্কারের মধ্যে এটিই আমার শ্রেষ্ঠ আবিষ্কার। দেশ-বিদেশ থেকে অনেক ক্রেতা আসেন কোটি কোটি টাকা নিয়ে এই মেশিনটি কিনতে, কিন্তু একজনও সফল হয়নি। এই মেশিনটি আমার কাছে অমূল্যবান, কোটি কোটি টাকা দিলেও আমি এটি বিক্রি করব না। আশা করি বুঝতে পেরেছ তার কারণ।’

জ্যাক সৈকতের কথা শুনতে শুনতে তার ডান হাতটা পেছনে নিল এবং বলল, ‘আমি বুঝতে পেরেছি এই মেশিনটি তোমার কাছে ভেরি প্রিশিয়াস। আচ্ছা এই মেশিনটা মানে সিস্টেমটা কি ব্যবহার করা ভেরি হার্ড?’

‘না, খুব কঠিন না। শুধু চেয়ারটায় বসা আর হেলমেটটা পরাই কাজ। আর এই সিস্টেমটি একটি বাক্সের মধ্যেও রাখা যায়, যেটা আমার কাছে আছে। বাটন চাপলেই কাজ আবার আগের মতো করবে। শুধু ইউনিক্স জানলেই...’ বলার সময় হঠাৎ করে জ্যাক একটি বন্দুক সৈকতের মাথায় ধরেন আর বলল, ‘আই অ্যাম স্যরি শৈক্যাট, ভেরি স্যরি। তুমি যেটা তৈরি করেছ, ওয়ার্ল্ডে সেটির ট্রিলিয়ন ট্রিলিয়ন ডলারের বিজনেস হবে। এত ম্যাসিভ একটা জিনিস তোমার একা ক্রিয়েট করার কথা না। ভেরি ব্যাড। হাও এভার, তোমার সাথে আমার কোনো হিংসা, বিদ্বেষ, শত্রুতা কিছুই নেই। আই রিয়েলি অ্যাপ্রিশিয়েট ইউ। বাট আমি যেই জিনিস পাই না, সেটি আমি ছিনিয়ে নিই। ভার্চুয়াল রিয়্যালিটির জগতে হয়তো তোমার নাম থাকার কথা ছিল। কিন্তু রিয়েল ওয়ার্ল্ড খুব সেলফিশ।’

সৈকত অনেক চেষ্টা করে একটা কথা বলতে চাইল, ‘দাঁড়াও, একটা ব্যাপার তুমি...’ ঠাস করে একটা গুলির আওয়াজ এলো। সৈকত মেঝেতে পড়ে গেল। রক্ত বয়ে যাচ্ছে।

জ্যাক তখন তার পকেট থেকে রুমাল বের করে বন্দুকটি মুছতে মুছতে বলল, ‘ফুল (ঋড়ড়ষ)! ভেরি ফুল। তুমি যত ট্যালেন্টেড হও না কেন ফুল হলে এই ওয়ার্ল্ড তোমার জন্য না।’ তারপর বন্দুকটি সৈকতের লাশের হাতে ধরিয়ে দিলো। বোঝানো হলো সৈকতকে হত্যা করা হয়নি। সে আত্মহত্যা করেছে। জ্যাক বলল, ‘হুম, সুইসাইড বলে সাজাতে এখন আর একটা কাজ বাকি, টেবিলের ওপর ইমাজিনারি কোনো গার্লের একটা লেটার রেখে যেতে হবে।’

জ্যাক মেশিনের চেয়ারটিতে বসল এবং বলল, ‘শেষবারের মতো প্রোগ্রামটা আরেকবার টেস্ট করা যাক।’

হেলমেটটি আবারো পরতে পরতে জ্যাক বলল, ‘এত ইজিলি এটা পেয়ে যাব ভাবিনি।’

হেলমেট পরার পর সে সেই সুন্দর প্রাসাদটিতে পৌঁছে গেল। হাঁটতে হাঁটতে সে একটি শব্দ শুনতে পেল। ঠক ঠক। মনে হচ্ছে একটি দরজায় টোকা দেওয়া হচ্ছে। তারপর দরজার সামনে গিয়ে বলল, ‘হু ইজ দেয়ার?’

দরজা খোলার সাথে সাথে সে জোরে একটি চিৎকার শুনতে পেল। জ্যাক ভয়ে মাথায় হাত দিলো হেলমেটটি খোলার জন্য। হায় হায়! মাথায় কোনো হেলমেট নেই। ভয়ার্ত স্বরে সে বলল, ‘হোয়াট হ্যাপেনড?’

ধীরে ধীরে কেউ একজন তার দিকে আসছে। জ্যাক বলল, ‘হু আর ইউ?’

লোকটাকে দেখা গেল। দেখতে পুরো সৈকতের মতো। তিনি বললেন, ‘তুমি কে?’

জ্যাক ভীত স্বরে বলল, ‘শৈকা...শৈক্যাট? জ্যা...জ্যাক, আই অ্যাম জ্যাক।’

সৈকতের মতো দেখতে লোকটি বললেন, ‘জ্যাক, তুমি এখানে এলে কীভাবে? তার মানে কোথাও একটা বড়ো ধরনের গোলমাল হয়ে গেছে। খুব বড়ো গোলমাল।’

জ্যাক রেগে বলল, ‘হোয়াট ননসেন্স? আমার হেলমেট কোথায়?’

‘তোমার সাথে আমার এখানে দেখা হয়েছে তার মানে মূল প্রোগ্রাম কেটে গিয়েছে। আমরা চলে গেছি নিরাপত্তার অংশে। আমরা দুজনেই এখন ভার্চুয়াল রিয়্যালিটির মধ্যে আটকে আছি। তোমার মাথায় হেলমেট নেই। কারণ এটা ভার্চুয়াল রিয়্যালিটির মধ্যেই ঘটছে।’

জ্যাক চিন্তিত হয় বলল, ‘নো! কিচ্ছু মানি না! এখান থেকে বের হব কীভাবে? বলো।’

‘একমাত্র সৈকত এসে প্রোগ্রামটা বন্ধ করলেই হবে। চিন্তা করো না, ও চলে আসবে।’

সৈকতের মতো দেখতে লোকটি আসলে সৈকতের রূপ ধারণ করা একটি এলিয়েন, যার সাহায্যে সৈকত এই মেশিনটি তৈরি করেছে। পৃথিবীতে যখন আরও এলিয়েন আসবে, তখন এই এলিয়েনটি নিজের আসল রূপ ধারণ করবে। ততদিন এলিয়েনটি সৈকতের রূপ ধারণ করে থাকবে। আর আসল সৈকতকে হত্যার কারণে জ্যাককে হয়তো বাকিটা জীবন এখানেই থাকতে হবে। জ্যাক জোরে চিৎকার করেন, ‘নোওওও! হোয়াট হ্যাভ আই ডান! আই ক্যান্ট সারভাইভ হেয়ার। নো নো নোওওও।’

জ্যাকের হয়তো বুঝতে আর বাকি নেই-লোভে পাপ, পাপে মৃত্যু।

[কিশোরকণ্ঠ জাতীয় সায়েন্স ফিকশন লেখা

প্রতিযোগিতা ২০২৪-এ নির্বাচিত সায়েন্স ফিকশন]

আপনার মন্তাব্য লিখুন
অনলাইনে কিশোরকন্ঠ অর্ডার করুন
লেখকের আরও লেখা

সর্বাধিক পঠিত

আর্কাইভ

আরও পড়ুন...

CART 0

আপনার প্রোডাক্ট সমূহ