নজরুলের কিশোর গানে ঈদ
প্রবন্ধ নিবন্ধ মোহাম্মদ জসিম উদ্দিন মার্চ ২০২৫
কাজী নজরুল ইসলাম আমাদের জাতীয় কবি। ১৯৭২ সালের ২৪ মে আনুষ্ঠানিকভাবে তাঁকে জাতীয় কবির সম্মান দিয়ে ভারত থেকে বাংলাদেশে আনা হয়। তিনি সর্বপ্রথম জাতীয় কবির স্বীকৃতি পান ১৯২৯ সালে। নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বসু কেবল বাংলাদেশের নয় সারা ভারতের জাতীয় কবি হিসেবে ঘোষণা করেন। কিন্তু ১৯৪৭ সালে বাংলাদেশিদের হাতে স্বাধীন ভারত বা পাকিস্তানের দায়িত্ব ছিল না। সাতচল্লিশের স্বাধীনতার পর ভারতীয়রা নজরুল মুসলিম হওয়ায় তাঁকে অবহেলা করতে থাকে। সবকিছু ভুলে নজরুলকে জাতীয় কবি তো করেইনি; তাঁকে সামান্যতম শ্রদ্ধাটিও করেনি। একাত্তরের পরে বাংলাদেশিরা তাঁকে বাংলাদেশে নিয়ে আসেন। তিনি স্থায়ীভাবে হয়ে ওঠেন আমাদের। কিন্তু গত চুয়ান্ন বছর তাঁকে অবহেলিত ও অসম্মান করা হয়েছে রাষ্ট্রীয়ভাবে। কিন্তু ৩৬ জুলাইয়ে কিশোর ও যুবকরা বাংলাদেশকে প্রকৃত স্বাধীনতা উপহার দিয়েছে। তারা এ স্বাধীনতাকে দ্বিতীয় স্বাধীনতা ও বাংলাদেশকে নতুন বাংলাদেশ বলেই সবার মাঝে পরিচিত করে দিয়েছে। তাদের দাবিতে সরকার নজরুলকে নতুন বাংলাদেশের জাতীয় কবি হিসেবে গেজেট প্রকাশ করে।
নজরুল শিশু-কিশোরদের নিয়ে অনেক কবিতা, ছোটগল্প, নাটিকা ও গান লিখেছেন। নজরুল জানতেন এ কিশোররাই একদিন দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাবে। তাঁর সে বিশ্বাসকে ধারণ করেছে কিশোররা। জুলাই বিপ্লবে কিশোররা প্রতি মুহূর্তেই নজরুলের কবিতা ও গানের মাধ্যমে অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়াই করেছে। একইভাবে এ কিশোররা ঈদের আনন্দ উদ্যাপন করার সময় নজরুলের বিখ্যাত গান “ও মন রমজানের ওই রোজার শেষে এলো খুশির ঈদ/তুই আপনাকে আজ বিলিয়ে দে, শোন আসমানি তাগিদ।”-এর মাধ্যমে ইসলামের সকল শিক্ষা নিয়ে থাকে এবং আনন্দ-উৎসব করে থাকে।
ঈদ মানে কেবল খুশি নয়। ঈদ মানে সকলের মাঝে বন্ধুত্ব স্থাপন করা। অন্যের বিপদে এগিয়ে আসা। এ তাগিদ নজরুল দেননি। এটি আসমানি কিতাব বা আল-কুরআনের বাণী। তাই নজরুল বলেছেন, “তুই আপনাকে আজ বিলিয়ে দে”। কেন বিলাতে হবে? কাদের জন্য বিলাতে হবে? এর উত্তরও এই গানে নজরুল দিয়েছেন, “শোন আসমানি তাগিদ।” আমাদের কিশোররা জানে আল্লাহ মানুষকে সৃষ্টি করেছেন, নিজের জন্য নয়; মানুষের জন্য।
নজরুল এ গানে মনে করিয়ে দিয়ে বলেছেন, পৃথিবীর সকল কল্যাণকর সৃষ্টির পেছনে মুসলমানদের অবদান রয়েছে। তাঁরাই জ্ঞান-বিজ্ঞান-গণিত-দর্শন সব কিছুর পেছনে কাজ করেছে। কিন্তু আজ নানা কারণে মুসলমানদের এ অবদান যেমন চেপে রাখা হয়েছে, তেমনি আবার তা মুসলমানরা নতুন করে কিছু করতেও ভুলে গেছে। কেননা নজরুল বলেছেন, “মুর্দা মুসলমান।” কিন্তু নজরুল জানে আজকের কিশোররাই আগামীদিন হারানো গৌরবকে ফিরিয়ে আনতে পারবে। তাই নজরুল কিশোরদের আহ্বান করলেন, “আজ ভাঙাইতে নিঁদ/ “ও মন রমজানের ওই রোজার শেষে এলো খুশির ঈদ।”
নজরুল মুসলিম বিজয়ের গল্প করেছেন কিশোরদের সাথে। তাদের মনে করিয়ে দিলেন যে মাঠে তারা ঈদের নামাজ পড়তে যাবে সে মাঠে ইসলামের জন্য বহু যুদ্ধ, উহুদের যুদ্ধসহ অসংখ্য যুদ্ধ করেছে। এ মাঠে বহু মুসলিম শহীদ হয়েছেন। বহু গাজী হয়েছেন। তাই নজরুল তাঁদের ইতিহাসের এ সত্যটি উপলব্ধি করার জন্য শিশু-কিশোরদের আহ্বান করলেন। তাদের গেয়ে শোনালেন, “আজ পড়বি ঈদের নামাজ রে মন সেই সে ঈদগাহে/ যে ময়দানে সব গাজী মুসলিম হয়েছে শহীদ।”
নজরুল কিশোরদের মাধ্যমেই সম্প্রীতির দায়িত্ব দিয়েছেন। তিনি জাতি-ধর্ম-বর্ণ ভুলে গিয়ে এবং নিজেদের মধ্যে দুশমনি চিন্তাকে পাশ কাটিয়ে দোস্ত বা বন্ধু হওয়ার আহ্বান করেছেন। প্রেম ও ভালোবাসা দিয়ে কেবল দেশকে নয়, বিশ্বকে জয়ের কথাও বলেছেন। তাঁর ভাষায়, “আজ ভুলে যা তোর দোস্ত-দুশমন, হাত মেলাও হাতে,/ তোর প্রেম দিয়ে কর বিশ^ নিখিল ইসলামে মুরিদ।” এটি প্রকৃত অর্থে ইসলামের শিক্ষা। কাজী নজরুল ইসলাম বলেছেন, “যারা জীবন ভরে রাখছে রোজা, নিত্য উপবাসী/সেই গরীব ইয়াতীম মিসকিন দে যা কিছু মুফিদ”। আর তিনি এ কথাও বলতে ভুলেননি এ নির্দেশনাটি “আসমানী (কুরআনের) তাগিদ।”
“ঢাল হৃদয়ের তশতরীতে শিরনি তৌহিদের,/ তোর দাওয়াত কবুল করবেন হজরত হয় মনে উম্মীদ।”
এই লাইনগুলোতে কিশোরদের মনে এক চিত্র ফুটে উঠেছে। এখানে নজরুল ইসলামের ভাবাদর্শ ও আধ্যাত্মিকতার গভীর তাৎপর্য বহন করে। প্রথম লাইনটি তৌহিদের অর্থাৎ আল্লাহ যে এক এবং অদ্বিতীয় তার কথা বলা হয়েছে। এখানে “তশতরী” শব্দটি থালার প্রতীক হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে, যা একটি উপহারের চিত্র ধারণ করেছে। “শিরনি” উপহার বা অন্যের জন্য কিছু করার চিত্র বহন করে। “ঢাল হৃদয়ের তশতরীতে” বলতে বোঝানো হয়েছে, একজন ইসলাম ধর্মে বিশ্বাসী তাঁর হৃদয়কে একটি পবিত্র থালা হিসেবে প্রস্তুত করেছেন। এই চিত্রকে একটি বিশুদ্ধ ও পরিশুদ্ধ হৃদয়ের মাধ্যমে প্রকাশ করেছেন।
এরপরই নজরুল বন্ধুত্বের ও ভ্রাতৃত্বের এক সুন্দর আহ্বান জানান। তিনি কিশোরদের আহ্বান করলেন, “তোদের মারল’ ছুঁড়ে জীবন জুড়ে ইট পাথর যারা/সেই পাথর দিয়ে তোলরে গড়ে প্রেমেরই মসজিদ।” এই লাইনগুলো অর্থপূর্ণ, এবং এখানে গভীর দর্শন রয়েছে। এখানে নজরুল বলতে চেয়েছেন যে-কোনো সমস্যা, আঘাত এবং কণ্টকে শক্তি হিসেবে ব্যবহার করে জীবনে ভালোবাসা, ঐক্য এবং শান্তি প্রতিষ্ঠা করা।
“তোদের মারল’ ছুঁড়ে জীবন জুড়ে ইট পাথর যারা”-এই অংশটিতে সমাজ বা অন্য কেউ যদি আমাদের প্রতি অন্যায় করে, অত্যাচার করে ও খারাপ আচরণ করে বা কষ্ট দেয়, সেই কষ্ট এবং অবহেলা বা অন্যায়ের প্রতিটি ইট-পাথরের মতো শক্তিশালী ও ধারালো হতে পারে। কিন্তু সেই আঘাতকে প্রেমে পরিণত করে ক্ষমা প্রদর্শন করতে হবে। শত্রুদের সাথে ভালোবাসার মসজিদ তৈরি করতে হবে। এই মসজিদ সবার ধৈর্য এবং সৃজনশীলতার প্রতীক। এই লাইনগুলো মানুষের জীবনে সংগ্রাম, আঘাত এবং প্রতিকূল পরিস্থিতিতে হিংসা-বিদ্বেষ ভুলে বন্ধুত্বের সম্পর্ক গড়ে তোলার কথা বলেছেন।
নজরুল এ কথাগুলো কুরআন ও হাদিসের আলোকেই বলেছেন। আল্লাহ রাব্বুল আলামিন অন্যকে কষ্ট দিতে নিষেধ করেছেন। আল্লাহ বলেছেন, “অপরাধ না করা সত্ত্বেও যারা মুমিন পুরুষ ও নারীদের কষ্ট দেয়, তারা মিথ্যা অপবাদ ও প্রকাশ্য পাপের বোঝা বহন করে।” অন্যকে কষ্ট দিলে কী পরিণাম হবে, এ বিষয়ে রাসূল (সা) বলেছেন, “তোমরা অন্যদের কষ্ট দেবে না, তাদের লজ্জা দেবে না এবং তাদের গোপন দোষ অনুসন্ধানে লিপ্ত থাকবে না। কেননা কেউ তার ভাইদের গোপন দোষ অনুসন্ধানে লিপ্ত থাকে আল্লাহ তার দোষকে প্রকাশ করে দেবেন।”
কাজী নজরুল ইসলাম কিশোরদের মাধ্যমে দেশ-জাতি ও মানুষের মধ্যে সম্প্রীতি ও বন্ধুত্ব তৈরি করার আহ্বান করেছেন এই গানে। এ গানটি শুধু একটি গান নয়। এটি একটি সুন্দর উপদেশ। এটি যারা অনুভব করবে তাদের মাধ্যমে মুসলিম জাতির ইতিহাস-ঐতিহ্য যেমন বৃদ্ধি পাবে তেমনি মুসলিম জাতি মানুষের মাঝে অনুসরণীয় হয়ে উঠবে। পাশাপাশি কাল কিয়ামতের দিনও মুক্তি পাবে। তাই নজরুলের কাছে ঈদ কেবল আনন্দ নয়; এটি একটি শিক্ষা। ঈদ একটি বিশ^বিদ্যালয়, যেখানে মানুষ শিখবে এবং সবাইকে নিয়ে একটি সুন্দর পৃথিবী নির্মাণ করবে।
আরও পড়ুন...