কুরবানির গরু
গল্প মুহাম্মদ ইব্রাহিম বাহারী জুন ২০২৫
সকাল থেকে রাস্তা দিয়ে শত শত গরু নিয়ে টমটম, পিকআপ, ট্রাক ছুটছে হাটের দিকে। সাদা-কালো-লাল নানান রকমের গরুতে ভর্তি এসব বাহন। গরুগুলোর শং চমৎকার! কোনোটার শিং লম্বা, কোনোটার খাটো কোনোটার আবার বাঁকানো। এসব গরু দেখতে সুন্দর, পাথরের মতো মজবুত ও খুবই স্বাস্থ্যবান। বুধবার কুশুলিয়ার বিখ্যাত গরুর হাট। হাটের পাশে রঘুনাথপুর গ্রাম। এই গ্রামেরই ছেলে বাঁধন। দুপুর পর্যন্ত সে এই গরু দেখে গরু গণনা করে সময় পার করে। ভাবে এত্ত গরু! কোথায় থাকে? বাঁধনের বয়স ছয় বছর। রঘুনাথপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রথম শ্রেণির ছাত্র। বাবার সাথে নানান বিষয়ে তার সওয়াল জবাব। জোহরের নামাজ শেষে খাবার টেবিল বাবার কাছে জানতে চায় কুরবানির পশুর গল্প, জানতে চায় ইতিহাস। কুরবানি কেন করতে হবে? কোথা থেকে এলো কুরবানি?
খাওয়া শেষে বাবা বাঁধনকে পাশে নিয়ে শোনালেন সেই ঐতিহাসিক কুরআনের কাহিনি।
বাবা বললেন-হযরত ইবরাহিম (আ) ছিলেন নিঃসন্তান। তিনি আল্লাহর কাছে একটি পুণ্যবান সন্তান চাইলেন। এরপর আল্লাহ তাঁকে দান করলেন ইসমাইল (আ)-কে। শিশু ইসমাইল (আ) যখন বাবার সাথে হাঁটতে শিখলেন, তখনই ঘটল এক অদ্ভুত ঘটনা। মহান আল্লাহ ইবরাহিম (আ)-কে স্বপ্নে আদেশ করলেন শিশুপুত্রকে কুরবানি করার জন্য। তিনি ছেলের কাছে অনুমতি চাইলেন। এরপর ইসমাইল (আ) যা বলেছিলেন, তা পড়ে চমকে উঠল বাঁধন। চমকে উঠল এই ভেবে যে, ছোট্ট একটি শিশু কীভাবে এত সাহসের পরিচয় দিতে পারে! কীভাবে আল্লাহকে এত ভালোবাসতে পারে! কী বলেছিলেন তিনি? পিতা-পুত্রের সেই সংলাপ কুরআনে উদ্ধৃত হয়েছে এভাবে, “ইবরাহিম বলল, ‘হে আমার ছেলে! আমি স্বপ্নে দেখেছি যে, তোমাকে জবাই করছি। এখন তোমার অভিমত কী?’ সে বলল, ‘হে আমার পিতা! আপনাকে যা আদেশ করা হয়েছে, আপনি তা-ই করুন। আল্লাহর ইচ্ছায় আমাকে ধৈর্যশীলদের অন্তর্ভুক্ত পাবেন’!”
ইবরাহিম (আ) ছেলেকে কাত করে শোয়ালেন। ছুরি চালালেন তাঁর গলায়! কিন্তু গলা কাটল না। তখন আল্লাহ ডাক দিয়ে বললেন, ইবরাহিম! তুমি তোমার স্বপ্নকে সত্য প্রমাণ করেছ। তিনি পেছনে তাকিয়ে দেখলেন একটি দুম্বা, যার শিংগুলো ছিল বড়ো বড়ো। আর চোখ দুটো ছিল অনেক সুন্দর। আবার কেউ কেউ বলেছেন, সেটি ছিল একটি হরিণ। কেউ বলেছেন পাহাড়ি ছাগল। এ ঘটনা ছিল মূলত একটি পরীক্ষা। এর মাধ্যমেই কুরবানির প্রচলন হয়েছিল।
নিজে নিজে কোনো কিছু জানার যে নির্মল স্বাদ, বাঁধন তা অনুভব করল গভীরভাবে। আর এ-ও অনুভব করল যে, আল্লাহর কাছে আত্মসমর্পণ এবং মনের পশুত্বকে বিসর্জন দেওয়াই হচ্ছে কুরবানির প্রকৃত উদ্দেশ্য।
বাবাকে প্রশ্ন করে বাঁধন, কবে কিনবে তাদের কুরবানির গরু? গরুর হতে হবে লালচে রঙের। লালচে রঙের গরু বাঁধনের পছন্দ। শনিবারের হাট থেকে গরু কেনার কথা বাবা জানালেন। বাঁধনের আর আনন্দ ধরে না। বাবার সাথে সেও হাটে যাবে গরু কিনতে, কত মজা হবে।
রাতে বাবার কাছে কুরবানির আরও অনেক বিষয় নিয়ে প্রশ্ন করল, কুরবানির শিক্ষা নিয়ে বাবা বললেন-কুরবানি কোনো চাপ বা জবরদস্তি বিষয় নয়। মানুষ স্বেচ্ছায় তার প্রতিপালকের সন্তুষ্টি অর্জনের আশায় সবচাইতে প্রিয় বস্তু ত্যাগ করার মানসিকতা সৃষ্টি করে। যেমন হজরত ইবরাহিম (আ) শুধু স্বপ্নে দেখেছেন, তোমার প্রিয় বস্তু আল্লাহর রাহে কুরবানি করো। আর অমনি তিনি তাঁর আদরের একমাত্র সন্তান হযরত ইসমাইল (আ)-কে কুরবানির জন্যে সম্পূর্ণভাবে প্রস্তুত ছিলেন। পৃথিবীতে মানুষের কাছে সবচাইতে আকর্ষণীয় বস্তুর মধ্যে অর্থসম্পদ বা টাকাকড়ি আর সন্তান অন্যতম। এই অর্থসম্পদের মোহ ত্যাগের এ মানসিকতা সৃষ্টি করাই হচ্ছে কুরবানির শিক্ষা। কুরবানি আমাদের ঈমান ও তাকওয়া বৃদ্ধি করে এবং পরকালের প্রতি আগ্রহ সৃষ্টি করে। রাসূল (সা) নির্দেশ করেছেন, ‘হে লোকসকল, তোমরা ত্রুটিমুক্ত ও উত্তম প্রাণী কুরবানি করো। কারণ কুরবানির এ পশুগুলো হবে তোমাদের জান্নাতে যাওয়ার বাহন।’
শনিবারে বাঁধনের বাবা ছেলের পছন্দমতো লালচে রঙের একটি স্বাস্থ্যবান গরু কিনল। এখন বাঁধনের বিকেল কাটে সে-ই গরুর সাথে। গড়ে ওঠে গরুর সাথে তার সখ্যতা-ভালোবাসা। স্কুলে কুরবানি ঈদের ছুটি হয়ে গেছে ইতোমধ্যে। ঈদের আর বাকি নেই। কদিন বাদে ত্যাগ-মহিমার সেই কাক্সিক্ষত দিন। এখন সারাটা দিন এই গরুর সাথে তার সময় ব্যয় হয়। ঘাসের ডগা, কলার খোসা, আমের অংশ, তলায় পড়া জামরুদ ফল কুড়িয়ে গরুর মুখে ধরা। গরু মজা করে সবকিছু গোপ গোপ করে খায়, তাতে সে আনন্দ পায়। রাতে বাবার কাছে বসে কুরবানির নানান বিষয়ে প্রশ্ন করে, বাবা সুন্দরভাবে তাকে বুঝিয়ে বলেন।
কুরবানির গোশত কী করবে বাবাকে প্রশ্ন করে বাঁধন। বাবা কয়েকটি হাদিস শোনালেন-আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে কুরবানি করা পশুর গোশত ভাগ করার একটি সুনির্দিষ্ট নিয়ম রয়েছে। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কুরবানির পশুর গোশত ভাগ করার নিয়মও বলে দিয়েছেন।
আজ কাক্সিক্ষত সেই কুরবানির ঈদ। বাঁধন যেমন খুবই চিন্তিত তেমনই আনন্দিত। আজ তার সেই পছন্দের লাল গরুটি কুরবানি করা হবে এই ভেবে চিন্তিত। সাথে সাথে আল্লাহর বিধান কুরবানি করা। আজ তাদের বাড়িতে সেই আল্লাহর হুকুম পালন করে কুরবানি করা হবে, আল্লাহ খুশি হবেন তাই তার আনন্দ। এবারের ঈদে তার নতুন জামা-জুতার কোনো বায়না নেই, নেই কোনো চাওয়া-পাওয়ার আকাক্সক্ষা। আল্লাহ যেন তাদের কুরবানি কবুল করে নেন-এই মোনাজাত বাঁধনের।
আরও পড়ুন...