আনন্দ ও ইবাদতের এক অনন্য ঈদ

প্রবন্ধ নিবন্ধ জয়নুল আবেদীন আজাদ মার্চ ২০২৫

প্রকৃতিতে কত রং। ফুলের রং ও সুবাস আমাদের আনন্দ দেয়। প্রকৃতিতে আনন্দের একটি বার্তা আছে। আনন্দ মানুষের প্রিয় বিষয়। তবে আনন্দ এমনিতে এসে যায় না। আনন্দের জন্যও ভিত্তি প্রয়োজন। এই ভিত্তিকে আমরা ‘কাজ’ হিসেবে বিবেচনা করতে পারি। পরীক্ষার ফল ভালো হলে আমরা আনন্দিত হই। খেলায় জিতলেও আমরা খুশি হই। নিজের বাগানে ফুল ফুটলে আমাদের মুখেও হাসি ফুটে ওঠে। এই যে এতক্ষণ হাসি-খুশি ও আনন্দের কথা বললাম, এর পেছনে কি কোনো কাজ রয়েছে? যারা একটু বড়ো হয়েছো, তারাতো বেশ সহজেই বলে উঠবে, হ্যাঁ রয়েছে তো এবং সেটা হলো রমজানে সিয়াম পালন। ঠিক আছে, আজ না হয় শুধু রোজার ঈদ নিয়েই কথা বলি, কুরবানির ঈদ নিয়ে অন্য সময়।

বন্ধুরা আমরা জেনেছি, রমজানে যারা সিয়াম পালন করেন তাদের সবার ফলাফল একরকম হয় না। অনেক রোজাদারের পূর্ববর্তী সব গুনাহ ক্ষমা করা হবে। আবার অনেক রোজাদার ক্ষুধা-পিপাসার কষ্ট ছাড়া আর কিছু পাবে না। যেমন বুখারি শরিফের হাদিসে বলা হয়েছে, “যে ব্যক্তি ঈমানের সাথে এবং আল্লাহর কাছে সাওয়াব পাওয়ার খাঁটি নিয়তে রমজানের সিয়াম পালন করবে, তার পূর্ববর্তী সব গুনাহ ক্ষমা করা হবে।” বুখারি শরিফের অন্য হাদিসে বলা হয়েছে, “যে ব্যক্তি পাপ, মিথ্যা বা অন্যায় কথা ও কাজ, ক্রোধ, মূর্খতাসুলভ ও অজ্ঞতামূলক কর্ম ত্যাগ করবে না, তার পানাহার ত্যাগ করাতে আল্লাহর কোনো প্রয়োজন নেই।” এখন হয়তো আমরা বুঝতে পারবো, শুধু পানাহার ত্যাগের নাম সিয়াম নয়। সাথে থাকতে হবে আল্লাহর সন্তুষ্টি ও সাওয়াব লাভের খাঁটি নিয়ত। আর মিথ্যা ও অন্যায় থেকে দূরে থাকাও রোজাদারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এভাবে যারা রোজা বা সিয়াম পালন করবে, তাদের তো খুশি হওয়ার একটি ভিত্তি তৈরি হয়ে গেল। এমন রোজাদারদের জন্যই তো প্রকৃত ঈদ, প্রকৃত আনন্দ। 

ছোটবেলা থেকেই আমরা শুনে এসেছি, ঈদ মানে আনন্দ। এটা আসলে অর্ধসত্য। পুরো সত্য হলো, আনন্দের সাথে ঈদে রয়েছে ইবাদতের বিষয়ও। এজন্যই বলা হয়, আমাদের ঈদ এক অনন্য ঈদ। ইহকাল ও পরকালের কল্যাণে সমৃদ্ধ বান্দার ঈদ। ঈদের নতুন জামা, মজাদার খাবার ছাড়াও মুক্ত মাঠে ঈদের বিশাল জামায়াত এবং উদার আকাশের নিচে কোলাকুলির আনন্দ আমাদের দরদি সমাজ গড়তে শেখায়। সালাতুল ঈদ ইসলামী ভ্রাতৃত্ব, ঐক্য ও ভালোবাসার প্রতীক। ঈদের মাঠে অনেকের সাথে সাক্ষাৎ হয়, হয় সালাম ও শুভেচ্ছা বিনিময়। রোজার ঈদকে ঈদুল ফিতর বলা হয়। সমাজের দরিদ্র বান্দারাও যাতে ঈদ করতে পারে, ভালো খেতে পারে, এজন্য ঈদের সালাতের আগেই ফিতরা আদায় করতে হয়। নির্দিষ্ট পরিমাণ খাদ্যবস্তু দিয়ে কিংবা অর্থ দিয়ে ফিতরা আদায় করা যায়। আমরা রমজানের শেষে শাওয়ালের নতুন চাঁদের অপেক্ষায় থাকি। কারণ, পশ্চিম আকাশে শাওয়ালের চাঁদ দেখলেই আমরা ঈদ করতে পারি। বন্ধুরা, শাওয়ালের নতুন চাঁদের সাথে জড়িয়ে আছে চমৎকার একটি দোয়া। আমাদের প্রিয়নবী মোহাম্মদ (সা) নতুন চাঁদ দেখে যে দোয়াটি করতেন, তার বাংলা অনুবাদ হলো, “আল্লাহ সর্বশ্রেষ্ঠ। হে আল্লাহ, আপনি এই নতুন চাঁদের সূচনা করুন কল্যাণ, নিরাপত্তা ও ঈমানের সাথে। শান্তি ও ইসলামের সাথে এবং আমাদের প্রভু যা ভালোবাসেন ও পছন্দ করেন তা পালনের তাওফিকসহ। হে নতুন চাঁদ, তোমার এবং আমাদের রব আল্লাহ।” দোয়াটির বাংলা অনুবাদ পেশ করলাম উপলব্ধির জন্য। তবে তোমরা মূল দোয়াটি মুখস্থ করে নিতে পারো।

বন্ধুরা, আমরাতো জানি রমজানের পুরো মাস সিয়াম পালন করতে হয়, এটা ফরজ ইবাদত। এছাড়া রয়েছে কিছু নফল সিয়াম। এর মধ্যে রয়েছে প্রতি আরবি মাসের ১৩, ১৪, ১৫ তারিখে সিয়াম পালন করা; প্রতি সপ্তাহে সোমবার ও বৃহস্পতিবার, জিলহজ মাসের প্রথম ৯ দিন, আরাফার দিন, আশুরার দিন এবং তার আগে বা পরে এক দিন সিয়াম পালনে রয়েছে অসীম ফজিলত ও সওয়াব। বিভিন্ন হাদিস থেকে আমরা এসব বিষয় জানতে পারি। তবে কেউ নফল রোজা না রাখতে পারলে গুনাহ নেই। আমিতো খুব অল্প বললাম। তোমরা বাবা-মা’র কাছ থেকে, সম্মানিত আলেমদের থেকে আরও বেশি করে জেনে নেবে। তবে এখানে আমি একটি হাদিস উল্লেখ করতে চাই। মুসলিম শরিফে বলা হয়েছে, “যে ব্যক্তি রমজান মাসের সিয়াম পালন করবে, এরপর সে শাওয়াল মাসে ছয়টি সিয়াম পালন করবে, এটা তার সারা বছর সিয়াম পালনের মতো হবে।” কিছু বিষয়তো আমরা জেনে নিলাম। সামর্থ্য অনুযায়ী আমরা তা পালনেরও চেষ্টা করবো ইনশাআল্লাহ। 

এখন অন্য একটি বিষয়ে কথা বলতে চাইবো। তোমরা জানো, এদেশের মানুষ স্বাধীনতার জন্য যুদ্ধ করেছে। ৭১-এর পর আমরা ২৪-এ লক্ষ করলাম আর এক স্বাধীনতা যুদ্ধ। 

দ্বিতীয় স্বাধীনতা যুদ্ধের সংগ্রামীরা ৭১-এর বার্তাই বহন করছে। সাম্য, ন্যায়, মানবাধিকার মানুষের চিরন্তন আকাক্সক্ষার বিষয়। যারা এর বিরোধিতা করবে, তাদের বিরুদ্ধে লড়ে যাবে বাংলাদেশের বিপ্লবী ছাত্র-জনতা। যেমনটি তারা লড়েছে ২৪-এর জুলাইয়ে। এ লড়াই মানব মর্যাদা প্রতিষ্ঠার লড়াই। এই মর্যাদা প্রতিষ্ঠিত না হলে মানুষ ঠিকভাবে ধর্মকর্মও করতে পারে না। বাংলাদেশের মানুষ ফ্যাসিবাদী আমলে তেমন দৃশ্য লক্ষ করেছে। ঈদের জামায়াতে অংশ নিতেও অনেকে শঙ্কার মধ্যে ছিল। গ্রেফতার ও দমন আতঙ্কতো কোনো স্বাধীন গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের বৈশিষ্ট্য হতে পারে না। ফ্যাসিবাদমুক্ত বাংলাদেশে এবার ঈদের মাঠে মানুষ স্বাধীনভাবে নিঃশ^াস নেবে, মন খুলে কথা বলবে। দেশ ও জনগণের কল্যাণের জন্য আকুতি জানাবে মহান আল্লাহর দরবারে। আর একটি কাজ করবে- ‘ও মন রমজানের ঐ রোজার শেষে এল খুশির ঈদ’, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের এই গানটি তোমরা এবার গাইবে আরো উচ্চকণ্ঠে।


আপনার মন্তাব্য লিখুন
অনলাইনে কিশোরকন্ঠ অর্ডার করুন
লেখকের আরও লেখা

সর্বাধিক পঠিত

আর্কাইভ

আরও পড়ুন...

CART 0

আপনার প্রোডাক্ট সমূহ