অপারেশন মাসাদা

উপন্যাস হারুন ইবনে শাহাদাত আগস্ট ২০২৪

[ গত সংখ্যার পর ]

রিমান্ডে আমর

প্রতিরক্ষা বাহিনী আইডিএফের মাসাদার দফতর। ইন্টারোগেশন সেল। জায়গাটি মাটির ওপরে না কি নিচে ঠিক বোঝা যাচ্ছে না। পাশের সেল থেকে কান্নার শব্দ আসছে। কিছুক্ষণ আগে আমরের ওপর দিয়ে বড়ো একটা ঝড় বয়ে গেছে। তখন ওর দুই চোখ কালো কাপড়ে বাঁধা ছিল। তাই কত জন ইসরাইলি সৈন্য এত জেরা করেছে, বলতে পারছে না। তবে ওর মনে হয় কম করে হলেও পাঁচজন তো হবেই। প্রশ্নের পর প্রশ্ন করে আমরকে অপ্রস্তুত করার যত কৌশল আছে তার কোনোটিই প্রয়োগ করতে বাদ রাখেনি। কিন্তু না আমরকে তারা টলাতে পারেনি। ইলেকট্রিক শক পর্যন্ত দিয়েছে। শক দেওয়ার আগে একজন বিশ্রী হাসি হাসতে হাসতে বলেছে, ‘এই তো সত্য বলার মেশিন লাগিয়ে দিচ্ছি! মেশিন লাগানোর আগে সত্য কথা বলো। তোমাকে কে পাঠিয়েছে?  মাসাদায় কেন এসেছো? মেশিন লাগালে কিন্তু মুখে আর মিথ্যে কথা বের হবে না। শুধু শুধু কষ্টকে বরণ করার আগে, বুদ্ধিমান বালকের মতো সত্য কথাটি বলে দাও? কথা দিচ্ছি আমরা তোমার কোনো ক্ষতি করবো না। ছেড়ে দেবো।’

আমর বারবার একই কথা বলে যাচ্ছে, ‘আমরা দেখতে এসেছি, তোমাদের কতবার বলবো। এটা তো একটা পর্যটন স্পট। কত মানুষই তো আসে, আমিও...’

‘বুঝেছি, সোজা কথায় কাজ হবে না। মেশিন লাগবেই।’ বলে ওরা ওকে ইলেকট্রিক শক দিতে থাকে। আমর আল্লাহর সাহস প্রার্থনা করতে করতে তন্দ্রাচ্ছন্ন হয়ে পড়ে। ওর চোখে রাজ্যের ঘুম এসে ভর করে। চেয়ারের ওপর সে অজ্ঞান হয়ে পড়ে। আমর মারা যাচ্ছে ভেবে নির্যাতনকারী সৈন্যরা চলে যায়। যাওয়ার আগে চোখের বাঁধন খুলে দেয়। কতক্ষণ এভাবে অজ্ঞান অবস্থায় পড়েছিল ওর মনে পড়ে না। জ্ঞান ফেরার পর চোখ খুলে দেখে একটি হাজার ওয়াটের বাল্ব ওর মাথার ওপর জ্বলছে। তার নিচে আমরকে শক্ত করে বেঁধে রাখা হয়েছে। পাশের টেবিলে পানির বোতল, জুস, আপেল, ব্রেড ও চিকেন ফ্রাই রাখা। কিন্তু চোখে দেখলেও চেখে দেখার উপায় নেই। হাত বাঁধা। হাত খোলা থাকলেও লাভ হতো না। কারণ টেবিলটি ওর হাতের সীমানার বাইরে। পেটে প্রচণ্ড ক্ষুধা। পিপসায় গলা শুকিয়ে আসছে। ওর চিৎকার করে কাঁদতে ইচ্ছে করছে। কিন্তু না। সে চোখ বন্ধ করে আয়াতুল কুরসি ও দোয়া ইউনুস পড়ছে।

বাইরে বুটের শব্দ। আমর চোখ খুলে না।

‘এখানে কেন এসেছো পুচকে, সত্য কথা বললে এখনই তোমাকে তোমার বন্ধুর কাছে নিয়ে যাবো।’ জেনারেল গুনিয়া বেন কর্কশ গলায় বলেন।

‘বললাম তো আমরা মাসাদা ঘুরে দেখতে এসেছি।’

‘দুনিয়ায় এত জায়গা থাকতে এখানে কেন?’

‘দুনিয়ার কত দেশ থেকে মানুষ ইসরাইলে আসে তেলআবিব বাইবেল পার্ক আর মাসাদার দুর্গ দেখতে, আমিও এসেছি মাত্র গাজা...’

‘তেলআবিব যাওয়ার ইচ্ছেও আছে?’

‘অবশ্যই। পবিত্র ভূমির সবকিছু দেখবো।’ 

তেলাআবিবকে পবিত্র ভূমি বলায় জেনারেল গুনিয়া বেনের মন একটু একটু নরম হয়। সে জানতে চায়, ‘পবিত্র ভূমি বললে কেন?’

‘এ দেশের প্রতি ইঞ্চি জমিতে মুসা (আ), ঈসা (আ), ইবরাহিম (আ)...’

‘মুসা’র জন্য তুমি শান্তির প্রার্থনা করলে?’

‘কেন করবো না। তিনি তো আল্লাহর রাসূলদের (আ) একজন।’

জেনারেল গুনিয়া বেনের ভেতর ভাবান্তর লক্ষ করা যায়। আমর বুঝতে পারে গুনিয়া বেনের রাগ আস্তে আস্তে কমছে। আমর ইচ্ছে করেই ফিলিস্তিন শব্দ উচ্চারণ না করে এ পবিত্র ভূমি বলেছে। কারণ ফিলিস্তিন বললে গুনিয়া বেনের মাথা আরো গরম হওয়ার আশঙ্কা আছে, সে তা জানে। আবার ইসরাইল নামের সাথে পবিত্র ভূমি আমর বলতে পারে না। তাই কৌশল করে এই পবিত্র ভূমি বলছে।

জেনারেলে গুনিয়া বেন এবার শান্ত গলায় বলে, ‘সত্যি তুমি আমাদের এ পবিত্র ভূমি দেখতে এসেছো? তোমার মনে কোনো খারাপ উদ্দেশ্য নেই?’

‘না আমার মনে আছে মহৎ ও পবিত্র উদ্দেশ্য।’

‘সেই মহৎ আর পবিত্র উদ্দেশ্যটি কী?’

‘আমি তো এর আগে একাধিকবার বলেছি, শোনো আবার বলছি, এ পবিত্র ভূমি দেখে এর মালিকের সন্তুষ্টি লাভ করা।’ আমর ভূমির মালিক বলতে মনে মনে আল্লাহকে স্মরণ করলেও জেনারেল গুনিয়া বেন মনে করছে, তাদেরকেই আমর ভূমির মালিক বলছে।

তাই সে হাসতে হাসতে বলে, ‘ভূমির মালিক খুব সুন্দর করে এ পর্যটন স্পট সাজিয়েছেন তাই না?’

‘অবশ্যই। এ কথা মানতেই হবে।’

‘আচ্ছা। তাহলে আমি তোমার বাঁধন খুলে দিতে বলছি। সন্ধ্যায় লেজার লাইট শো, থিয়েটার এবং বেলুন উৎসবের সময় তোমাকে তোমার বন্ধুর কাছে নিয়ে যাওয়া হবে। টেবিলে রাখা খাবার খেয়ে এখানেই তুমি ততক্ষণ অপেক্ষা করবে।’

‘ঠিক আছে। তবে তোমরা আমার সাথে অন্যায় করছো। আমাকে আমার বন্ধু ডেভিডের সাথে ঘুরে ঘুরে গোটা এলাকাটা দেখতে দিচ্ছো না। এখানে এই জেলখানায় বন্দি করে রেখেছো। এ কথা জানলে কোনো মুসলমান কেন কোনো খ্রিষ্টানও তোমাদের এই স্পটে আসবে না। তোমাদের সরকার কোটি কোটি ডলারের রাজস্ব হারাবে।’

‘এ নিয়ে তোমাকে ভাবতে হবে না। ইউনেস্কো ২০০১ সালে এটিকে ‘ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইট’ হিসাবে ঘোষণা না করলে আমরা কোনো খ্রিষ্টানকেও এখানে আসতে দিতাম না। ইসরাইল রক্ষার দুর্গ হিসেবেই ব্যবহার করতাম।’

‘কোনো খ্রিষ্টানকেও কি আমার মতো তোমাদের রিমান্ডের মুখোমুখি হতে হয়?’

‘একে তুমি রিমান্ড বলছো?’

‘তো কী বলবো?’

‘জাস্ট নিরাপত্তার জন্য জিজ্ঞাসাবাদ। হ্যাঁ। বিশেষ করে নেটিভ খ্রিষ্টান, যারা মানবতাবাদের নামে মুসলমানদের  পক্ষে কথা বলে, তাদের কেউ এলে অবশ্যই তোমার মতো আপ্যায়নের মুখোমুখি হতে হয়। ঐ আহমেদ দারবিশ, খলিল জিবরা, এডওয়ার্ড সাঈদের মতো কেউ এলে তিনি খ্রিষ্টান না ইহুদি না মুসলিম দেখা হয় না।’

‘কেন?’

‘ওরা আমাদের ঈশ্বর প্রতিশ্রুত রাজ্য মেনে নিতে চায় না।’

‘জোর যার মুল্লুক তার তোমাদের ঈশ্বরের নীতি হতে পারে আল্লাহর নীতি নয়।’ আমর অস্ফুট কণ্ঠে বলে ওঠে।

‘কী বললে?’

‘তেমন কিছু না, আল্লাহ খোদা ঈশ্বর এই আর কী?’ আমর জেনারেল গুনিয়া বেনকে রাগিয়ে সন্ধ্যার অপারেশন মাসাদা ভণ্ডুল করার মতো বোকামি করতে চায় না।

‘কোনো চালাকি করবে না। বুঝলে পুচকে। তোমাদের ঐ গুলতি আর পাথরের তামাশা বন্ধ করো। ঐ সব আদিম যুগে চলতো এখন দরকার বোমা, বন্দুক, ট্যাংক বুঝলে?’

আমর বুঝতে পারে, ফিলিস্তিনের সাহসী শিশু-কিশোররা ওদের ট্যাংকের সামনে গুলতি আর পাথর নিয়ে অন্যায়ের প্রতিবাদ আর প্রতিরোধ গড়ার যে সাহস দেখায় তাকেই তাচ্ছিল্যভরে এমন পরিহাস করছে,  জেনারেল গুনিয়া বেন। আমর মনে মনে ভাবছে জেনারেল থাক তার তাচ্ছিল্য নিয়ে। এ তাচ্ছিল্যের মোকাবেলায় শক্ত ও সত্য বললে ওরা আরো বেশি শক্তি নিয়ে ওদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়বে। তাই আমর আর কোনো কথা বলে না। চুপচাপ টেবিলে রাখা খাবারের দিকে হাত বাড়ায়। 

মি. বেন হাসতে হাসতে বলে, ‘গুড বয়।’ বুটের খট খট শব্দ করে জেনারেল বের হয়ে যায়।

আল-ইদ্রিসির ল্যাবে গাজী ব্রিগেড

গাজী ব্রিগেড অপারেশন মাসাদার প্রস্তুতি নিতে ব্যস্ত। মাসাদার গোটা চিত্র এখন ওদের কাছে পরিষ্কার। কিন্তু তারপরও ওরা সাবধান। কারণ শত্রুকে দুর্বল ভাবতে নেই। এমন অনেক তথ্যই থাকতে পারে না। যা ওরা এখনো জানতে পারেনি। সেসব দিক মাথায় রেখেইে অপারেশনের ছক আঁকতে হবে। এমনভাবে কাজ করতে হবে যেন মাসাদার জায়নবাদী ইহুদি বাহিনী কিছুতেই বুঝতে না পারে যে, সব তথ্য আসছে ডেভিড আর আমরের নিকট থেকে। তাহলে আর ওদের বাঁচানো যাবে না। অথচ গাজী ব্রিগেডের মূল টার্গেট বিজয়। রক্ত ক্ষয় নয়। জানমালের যত কম ক্ষতি করে বিজয় ছিনিয়ে আনা যায়, এভাবেই সাজানো হচ্ছে সবকিছু।

জায়াদরা এবারের অপারেশনে সাপোর্ট টিম হিসেবে কাজ করবে। তথ্য সংগ্রহ ও প্রযুক্তি সাপোর্টই মূল কাজ। মূল অপারেশনে অংশ নেবে হামাসের প্যারাসুট টিম। তাদের কাজ মাসাদায় বন্দিদের উদ্ধার করা। সন্ধ্যায় যখন লেজার লাইট শো আর থিয়েটারের আসর বসবে তখনই প্যারাসুট টিম নামবে মাসাদায়। শত্রুরা যখন ব্যস্ত থাকবে আনন্দ উল্লাসে তখনই চলবে উদ্ধার অভিযান। পরিকল্পনা চূড়ান্ত করতে প্যারাসুট টিমের লিডার খালিদ সাইয়েদ কমান্ডো বাহিনীর সদস্যদের নিয়ে বসেছেন জায়াদের গাজী ব্রিগেডের সাথে।

‘বন্দি শিবিরগুলোর অবস্থান এখনো পরিষ্কার না। আমরের অবস্থান নিশ্চিত হওয়া গেলে বিষয়টি সহজ হবে।’ খালিদ বলেন।

‘বিষয়টি খুবই কঠিন। কারণ ওদের পেগাসাস নেটওয়ার্ককে ফাঁকি দেওয়া কঠিন।’ খুদে বিজ্ঞানী আম্মার জায়েদি বিজ্ঞের মতো গম্ভীর কণ্ঠে বলে।

‘এই কঠিনকে সহজ করতেই হবে। তা না হলে অপারেশনের আসল উদ্দেশ্য হাসিল হবে না।’ খালিদ সাইয়েদ বলেন।

‘ঠিক বলেছেন। আমাদের উদ্দেশ্য রক্তক্ষয় না। জীবন বাঁচানো। মাসাদায় বন্দিদের মধ্যে হামাসের সদস্যদের সাথে আছেন ইসলামী চিন্তাবিদ, মানবতার পক্ষের কয়েকজন নেটিভ ও ইউরোপিয়ান খ্রিষ্টান সমাজকর্মী, সাংবাদিক, নারী ও শিশু। তাদের মুক্ত করা জরুরি।’

‘ঠিক। বিলম্ব হলে ওরা তাদের হত্যা করে ফেলবে।’

‘মানবতার দুশমনদের কাছে বেসামরিক ব্যক্তি, নারী-শিশু কেউ নিরাপদ নয়।’

‘ওরা আসলে মানসিক বিকারগ্রস্ত।’

‘এবার আসল কথায় আসা যাক।’

‘বলুন। বন্দিশিবিরগুলোর অবস্থান নির্ণয় করতে হবে।’

অনেক ক্ষণ চুপচাপ সবার কথা শুনছিল হাম্মাদ। এবার সে মুখ খুলে, ‘আমার মাথায় একটি আইডিয়া এসেছে।’

‘কী সেই আইডিয়া?’ জানতে চান খালিদ। 

‘মানে ডেভিডকে তো ওরা সব দর্শনীয় স্থানগুলো দেখিছে। আমরকে ডেভিডের কাছ থেকে সরিয়ে কোন দিকে নিয়ে গেছে, তার চিত্র আমাদের কাছে আছে। অতএব মাসাদার গোটা মানচিত্রটা সামনে নিয়ে আমরা প্রাথমিকভাবে ধারণা করতে পারি।’

‘কী ধারণা করতে পারি?’ জায়াদ জানতে চায়।

‘ডেভিডকে যেখানে নেওয়া হয়নি।’

‘গুড আইডিয়া।’ সবাই একসাথে বলে ওঠে।

খালিদ সাইয়েদ বলেন, ‘মানচিত্র সামনে নিয়ে দূরত্ব নির্ণয় করে আমরা আমাদের কবুতরগুলোকে সেদিকে পাঠাবো।’ 

মিটিং শেষে প্যারাসুট টিমের লিডার খালিদ সাইয়েদ তার দলবল নিয়ে চলে যান। ডিজিটাল কবুতরগুলো ওড়ানোর উপযোগী করতে। দেখতে কবুতর মনে হলেও, আসলে এটি হামাসের ডিজিটাল গোয়েন্দা ড্রোন। দূর থেকে দেখে নয়, হাতে নিয়েও বোঝার উপায় নেই এগুলো আসলে কবুতর নয়। কবুতরগুলোর চোখগুলো এক একটা হাই ফোকাসের ডিজিটাল ভিডিও ক্যামেরা। কবুতরগুলো খুব দ্রুত হামাসের নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্রে নিখুঁত ছবি পাঠাতে সক্ষম। তুরস্ক, বাংলাদেশ আর সৌদি আরবের বায়ো-রোবটিক বিজ্ঞানীদের সাহায্যে ইরানের গোপনীয় ল্যাবে এগুলো তৈরি করা হয়েছে। এর বিভিন্ন অংশ বিচ্ছিন্নভাবে গাজায় আনার পর এগুলোকে কার্যকর করা হয়। এর বিশেষ সুবিধা হলো, এগুলো চালাতে কোনো ব্যাটারির প্রয়োজন পড়ে না। দিনে বেলায় সূর্যের আলো এবং রাতে বাতাস থেকে সক্রিয়ভাবে হাইড্রোজন সংগ্রহ করে চলতে সক্ষম।

খালিদ সাইয়েদ এই টিমকে কাজ বুঝিয়ে দিয়ে চলেন আল-ইদ্রিসির ল্যাবে। তার সাথে আছে খুদে বিজ্ঞানী আম্মার জায়েদি ও হাম্মাদ। আল-ইদ্রিসি এক দক্ষ ভূগোলবিদ, মানচিত্রাঙ্কনকার। এটি তার ছদ্মনাম। তার আসল নাম বিশেষ কারণে গোপন করা হয়েছে। 

বিশ্ববিখ্যাত মুসলিম ভূগোলবিদ, মানচিত্রাঙ্কনকার এবং মিশরতত্ত্ববিদ  আবু আবদুল্লাহ মুহাম্মাদ আল-ইদ্রিসি আল-কুরতুবী আল-হাসানী আস-সাবিত আল-ইদ্রিসির নাম ব্যবহার করা হয়েছে, তার ছদ্মনাম হিসেবে। আল-ইদ্রিসি ১১০০-১১৬৫ খ্রিষ্টাব্দের একজন আরব মুসলিম ভূগোলবিদ, মানচিত্রাঙ্কনকার এবং মিশরতত্ত্ববিদ ছিলেন। তিনি ১১৫৪ সালে সর্বপ্রথম বিশ্বের মানচিত্র তৈরি করেছিলেন।

আল-ইদ্রিসির ল্যাবে আসতে তারা ব্যবহার করেছেন ছোটো পাতালযান। রেলপথের মতো বিশেষ রুটে নিঃশব্দে খুব দ্রুত গতিতে চলে এই বিশেষ যান। তবে রুটটির একটি বৈশিষ্ট্য হলো যানটি চলার সময় স্বয়ংক্রিয়ভাবে পথ তৈরি হয়, গন্তব্যে পৌঁছার পর ঐ পথের আর অস্তিত্ব খুঁজে পায় না কেউ। 

বিশাল ল্যাবটি দেখে বোঝার উপায় নেই। এটি যুদ্ধবিধ্বস্ত গাজার কোনো এলাকা। ল্যাবে বসে একান্তে গবেষণায় ব্যস্ত আল ইদ্রিসি। খালিদ সাইয়েদ তার কক্ষে প্রবেশ করে সালাম দিলেন।

‘আসসালামু আলাইকুম। কেমন আছেন জনাব?’

‘ওয়ালাইকুম আসসালাম। আলহামদুলিল্লাহ, আপনি কেমন আছেন? নিশ্চয় কোনো জরুরি বিষয় নিয়ে এসেছেন?’

‘আলহামদুল্লিাহ, মহান রবের রহমতে আমরা ভালো আছি। সামনে একটি জরুরি অপারেশনের জন্য আপনার সাহায্য দরকার।’

‘আচ্ছা, বলুন। কীভাবে আপনাকে সাহায্য করতে পারি।’

‘আপনি তো জানেন ডেড সির পাশে প্রাচীন দুর্গ মাসাদায় শত্রুরা গোয়েন্দা ঘাঁটি করেছে।’

‘হ্যাঁ, জেনেছি। ওরা পর্যটন ব্যবসার আড়ালে ফাঁদ পেতেছে।’

‘ঠিকই শুনেছেন। ওরা অনেককেই গ্রেফতার করেছে। মারাত্মক বিষয় হচ্ছে পেগাসাস প্রযুক্তি ব্যবহার করে গাজা ও ফিলিস্তিনের ওপর সার্বক্ষণিক নজরদারি করছে। আশপাশের মুসলিম দেশগুলোও ওদের নজরদারির বাইরে নয়। তাই ওখানে অভিযান পরিচালনা জরুরি হয়ে পড়েছে।’

‘হ্যাঁ ঠিক বলেছেন। আমাদের নীরবতায় ওদের উৎসাহ দিন দিন বাড়ছে।’

‘তাই এখনই লাগাম টানতে হবে।’

‘তা না হলে ওদের দখলদারিত্ব ও আগ্রাসন থামানো কঠিন হয়ে পড়বে।’

‘এখন আমি কীভাবে সাহায্য করতে পারি বলুন?’

‘আমাদের অপারেশনের উদ্দেশ্য শুধু শক্তির জানান দেওয়া নয়, বন্দিদের মুক্ত করা এবং শত্রু সেনাদের মধ্য থেকে গুরুত্বপূর্ণ কয়েকজনকে গ্রেফতার করে পণবন্দি করা। আমাদের গেরিলা যোদ্ধারা কোথায় আক্রমণ করলে ক্ষয়-ক্ষতি কম হবে এবং বিজয়ী হয়ে ফিরে আসবে?’

‘কত কিলোমিটার পাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করবেন। আমাকে কোডটি জানালে আমি অক্ষাংশ-দ্রাঘিমাংশ দেখে একটি নিখুঁত ম্যাপ তৈরি করে দেবো, ইনশাআল্লাহ একটি নিশানাও মিস হবে না।’

এতক্ষণ পুরো বিষয়টি গাজী ব্রিগেড নেতা জায়াদ, হাম্মাদ আর খুদে বিজ্ঞানী আম্মার জায়েদি গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছিল। এবার খুদে বিজ্ঞানী আম্মার জায়েদি স্বগতভাবে বললো, ‘চমৎকার!’ 

ইদ্রিসি ওর কথা শোনার পর বললেন, ‘তুমিই তো আম্মার জায়েদি, ঠিক?’

‘হ্যাঁ ঠিক তা আপনি...’

‘কীভাবে চিনতে পারলাম, তুমি কি ভেবেছো আমি শুধু ভূগোল, মানচিত্র নিয়ে ভাবি?’

‘না মানে...’

‘মানে আমি মানুষ নিয়েও গবেষণা করি।’

‘তবে...’

‘তোমার নাম জানলাম কী করে, আসার পর তো কেউ পরিচয় করিয়ে দেয়নি!’

‘ঠিক তাই।’

‘যুদ্ধের মাঠে পরিচয়টা আগেই জানতে হয়, তারপর আসার অনুমতি, বুঝতে পেরেছো?’

‘তার মানে আমরা এখানে আসার আগেই?’

‘ঠিক তাই। তোমরা আসার আগে পরিচয়  জেনে, তারপর অনুমতি দিয়েছি। যুদ্ধের সময় এটিই নিয়ম।’

‘শুকরিয়া। আমরা আপনার সাথে পরিচিত হওয়ার সুযোগ পেলাম।’

‘কেন তোমাদের এ সুযোগ দিয়েছি জানো?’

‘না।’

‘তাহলে শোনো, স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের দাবি আদায় করতে হলে তোমাদের কত জ্ঞানার্জন করতে হবে- এ বিষয়গুলো সরাসরি দেখাতে। কত দক্ষতা অর্জন করতে হবে, তা বোঝানোর জন্য। ট্যাংক, বোমা আর গুলির সামনে গুলতি নিয়ে দাঁড়িয়ে অকাতরে জীবন দিলে হবে না। বিশ্বের সেরা সেরা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আধুনিক তথ্য প্রযুক্তির জ্ঞানার্জন করতে হবে। সাথে সাথে আমাদের জীবন আদর্শ ইসলামকে জানতে, মানতে এবং জীবনে ধারণ করতে হবে। এ সত্য তোমাদের মতো কিশোরদের বুঝতে হবে। আবেগের বশে হঠাৎ করে জীবন দিয়ে শহীদ হওয়ার মতো সহজ পথ নয়, দক্ষতা অর্জন করে বিজয়ী হওয়ার জন্য যুদ্ধে নামার জন্য কষ্ট করে লেখাপড়া করতে হবে। সাথে সাথে সাধ্য-সার্মথ্য অনুযায়ী কাজ করতে হবে। মনে রাখবে মহান আল্লাহ সূরা বাকারার সর্বশেষ আয়াত ২৮৬-তে ‘আল্লাহ কারও ওপর এমন কোনো দায়িত্ব চাপিয়ে দেন না যা তার সাধ্যাতীত। সে ভালো যা উপার্জন করে তার প্রতিফল তারই, আর মন্দ যা কামাই করে তার প্রতিফল তার উপরই বর্তায়।’ এ কথা বলে দিয়ে আমাদের তাঁর কাছে এভাবে প্রার্থনা করতে শিখিয়েছেন, “ও আমাদের রব, আমরা ভুলে গেলে বা ভুল করে ফেললে আমাদের পাকড়াও করবেন না। ও আমাদের রব, আগেকার লোকদের ওপর যেমন কঠিন বোঝা দিয়েছিলেন, আমাদের উপর তেমন বোঝা দিয়েন না। ও আমাদের রব, যে বোঝার ভার বইবার সামর্থ্য আমাদের নেই, সেই বোঝা চাপিয়ে দিয়েন না। আমাদের অপরাধগুলো মাফ করে দিন। আমাদের পাপগুলো গোপন করে দিন। আমাদের ওপর দয়া করুন। আপনিই তো আমাদের রক্ষাকর্তা। তাই অবিশ্বাসী লোকগুলোর বিরুদ্ধে আমাদের সাহায্য করুন।” 

ওরা সবাই নিবিষ্ট মনে আল-ইদ্রিসির বক্তব্য শুনছিলো। ওদের আরো একটা ভুল ভাঙলো। তা হলো ওরা মনে করেছিল, আল ইদ্রিসি আল আজহার এবং হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাস করা একজন দক্ষ ভূগোলবিদ, মানচিত্রাঙ্কনকার। এখন বুঝতে পারলো তিনি একজন ইসলামী চিন্তাবিদও। এবার বিদায়ের পালা। তিনি সবাইকে তার লেখা কয়েকটি করে বই উপহার দিলেন। 

তারপর বললেন, ‘পড়তে হবে। পড়ার বিকল্প নেই। পড়ালেখা ছাড়া কোনো জাতিই বিজয়ী হতে পারে না। মাথা উঁচু করে বাঁচতে পারে না। আমাদের প্রিয় নবীর কাছে আল্লাহর পক্ষ থেকে আমাদের জন্য যে প্রথম আদেশ এসেছে, তা হলো, ‘ইকরা’, এ কথা সবসময় মনে রাখবে।’

এক নতুন আলোর দিশা নিয়ে খালিদ সাইয়েদের নেতৃত্বে গাজী ব্রিগেডের সদস্যরা আল-ইদ্রিসির ভূগোল ল্যাব থেকে বের হলো।

চূড়ান্ত অপারেশন

সব ঠিকঠাক। আর বিলম্ব নয়। আজ রাতেই খালিদ সাইয়েদের নেতৃত্বে মাত্র ৩১৩ সদস্যের প্যারাসুট কমান্ডো টিম মাসাদায় গেরিলা অপারেশন চালাবে। চূড়ান্ত অপারেশন। ডেভিড ও কবুতরের পাঠানো ছবি এবং আল-ইদ্রিসির কোড বিশ্লেষণ করে সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করা হয়েছে। 

আজ রাত ৮টায় শুরু হবে লেজার লাইট শো। এ শো আকর্ষণীয় করতে ওড়ানো হয় ফানুস আর রঙিন বেলুন। এই সুযোগই কাজে লাগাবেন খালিদ সাইয়েদের প্যারাসুট কমান্ডো টিম, সাথে থাকবে গাজী ব্রিগেড। ব্রিগেডের দুই সদস্য আমর ও ডেভিড আগে থেকেই মাসাদায় আছে। আমরের বিপদ অনেকটা কেটে গেছে। যে এখন ডেভিডের সাথেই আছে। ওরা থাকবে শো প্রদর্শনীর মাঠে। হামাসের নিয়ন্ত্রণ কক্ষে থাকবে বাকি সদস্যরা। প্যারাসুট টিমকে জরুরি সহযোগিতা নিতে প্রস্তুত রাখা হয়েছে ড্রোন ও মিশাইল টিম। অভিযান সফল করতে আল্লাহর কাছে সাহায্য প্রার্থনা করে আর কিছুক্ষণ পরই বিশেষভাবে বানানো প্যারাসুটে উড়বে, ৩১৩ জন গেরিলা কমান্ডো। প্রতিটি প্যারাসুটেই ক্যামোফ্লেজ প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়েছে, ভূমি থেকে নির্দিষ্ট দূরত্ব অতিক্রম করার আগে রাডারেরও ক্ষমতা নেই ধরার। মাসাদা পৌঁছার আগে সেই নির্দিষ্ট দূরত্বে আসার কোনো আশঙ্কা নেই। 

বিশেষ সুবিধা হলো মাসাদায় উৎসব চলছে। শত্রুরা মনে করবে বেলুন নয় তো ফানুস উড়ছে।

৩১৩ জন গেরিলা কমান্ডো বুলেটপ্রুফ জ্যাকেট আর গ্যাসপ্রুফ মাস্ক পরে প্রস্তুত। আর মাত্র ত্রিশ সেকেন্ড পরই উড়বে। সময় গণনা চলছে.. ৩০..২৯...২৮...১..০ ফ্লাই। 

এক ঝাঁক জান্নাতি পাখি যেন আকাশে উড়াল দিলো। 

সবার মনে বিজয়ের স্বপ্ন আর শাহাদাতের তামান্না। মুক্ত স্বাধীন ফিলিস্তিন গড়তে তারা উড়ে যাচ্ছে  ইসরাইলের প্রতিরক্ষা বাহিনী আইডিএফের মাসাদার দুর্ভেদ্য দুর্গ থেকে বন্দিদের মুক্ত করে আনতে। শত্রুসেনাদের বন্দি করে সত্য-ন্যায়ের পক্ষে বিশ্ব জনমত গড়ার মহৎ মিশন নিয়ে। হত্যা তাদের লক্ষ্য নয়। মনের মাঝে নেই প্রতিহিংসার আগুন। সমরনীতি মেনে তারা এ যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়েছে বাধ্য হয়ে। প্রথম কেবলা বাইতুল মোকাদ্দেস এবং নবী-রাসূলদের পবিত্র ভূমি থেকে হিংসার বিষবৃক্ষ, মানবতার শত্রুদের উচ্ছেদ করতে। নিয়ন্ত্রণ কক্ষের মনিটরের সামনে বসা জায়াদ, হাম্মাদ ও আম্মার জায়েদি। ওদের মনে একটাই স্বপ্ন পৃথিবীর সমৃদ্ধ ও পবিত্র এ ভূমি ফিলিস্তিনে শান্তি ও সমৃদ্ধি ফিরিয়ে আনা। ওরা সবাই মনে মনে আল্লাহর কাছে মাসাদা অপারেশনের সাফল্য কামনা করছে।

দ্বিতীয় আরেকটি মনিটরে দেখা যাচ্ছে মাসাদার খোলা মাঠে চলছে লেজার লাইট শো। সবাই ব্যস্ত লেজারের আলোর ঝলকানি, ফানুস আর রঙিন বেলুনের বাহারি ওড়াউড়ি দেখতে। আমর আর ডেভিডের চোখ খুঁজছে অন্য কিছু। শত্রুদের চোখ ফাঁকি দিয়ে মাঠের অন্ধকার প্রান্তরে তিনশো তেরোটি প্যারাসুট কখন নামবে, তার অপেক্ষা করছে ওরা দু’জন। ঐ তো নীল আলোর ঝলকানি দেখাচ্ছে। আমর ডেভিডের শরীরে চিমটি কাটে। একজন ওঠার পর, কিছু সময়ের ব্যবধানে আরেকজন উঠে চলতে শুরু করে ডেড সির পাশের অন্ধকার জায়গায়।

‘ফারাও এলিমি মোসেস রেডি।’ ডেভিড আর আমর কোড উচ্চারণ করে।

‘রেডি মোসেস, রেডি মোসেস।’ খালিদ সাঈয়েদ জবাব দেওয়ার সাথে সাথে ওরা দু’জন কাছে যায়। খালিদ ওদের দু’জনের মুখ বিশেষ ধরনের মাস্ক দিয়ে ডেকে দেয়। মাস্কের বৈশিষ্ট্য হলো এগুলো মুখের আদলে বিশেষভাবে তৈরি। দেখে বোঝার উপায় নেই মাস্ক পরেছে। 

মাস্ক পরার ওপর ওদের দু’জনের হাতে স্কোপোলামিনের দুটি স্প্রে বোতল দিয়ে কমান্ডার বলেন, ‘অ্যাকশন।’ 

এখানে পাঠানোর আগেই ওদের দু’জনকে স্কোপোলামিন স্প্রে’র ব্যবহা শেখানো হয়েছে। এটি কোনো রাসায়নিক স্প্রে নয়, ধুতুর থেকে তৈরি স্বমোহিত করার স্প্রে। এই স্প্রে কারো নাকে প্রবেশ করলে সে কয়েক ঘণ্টার জন্য স্বমোহিত হয়ে যায়। তাকে তখন যা বলা হবে তাই করবে। বাংলাদেশি বিজ্ঞানী নাবিল জামানের তত্ত্বাবধানে এটি জর্ডানের ল্যাবে তৈরি করেছেন ফিলিস্তিনি, সৌদি আরব আর জর্ডানের বায়োকেমিস্টরা।

ডেভিড ও আমরের দায়িত্ব মাসাদার বন্দিশিবিরের চাবি হস্তগত করা। তারা এ স্প্রে ব্যবহার করে কারাগারের দায়িত্বে থাকা অফিসার ও সিপাহিদের স্বমোহিত করে করে চাবি হাতিয়ে নিয়ে তাদের মুক্ত করে প্যারাসুট বাহিনীর হাতে তুলে দেবে। লেজার লাইট শো শেষ হওয়ার আগেই বন্দিদের মুক্ত করে ১৩ সদস্যের দলটি চলে যাবে গাজায়। বাকি তিনশত সদস্য তিন ভাগে বিভক্ত হয়ে খালিদ সাইয়েদ, আমর ও ডেভিডের নির্দেশনার অপেক্ষায় থাকবে। লেজার লাইট শো শেষে থিয়েটার শুরু হলে, শুরু হবে তাদের অভিযান।

টান টান উত্তেজনা নিয়ে জায়াদের টিমের চোখ পর্যবেক্ষণ মনিটর থেকে সরছেই না। ওরা নিরাপদে পর্যবেক্ষণের এ সুযোগ পেয়েছে সৌদি আরব, ইরান, তুরস্ক ও পাকিস্তানের বিজ্ঞানীদের তৈরি বিশেষ জিপিআরএস (এবহবৎধষ চধপশবঃ জধফরড় ঝবৎারপব) সিস্টেমের মাধ্যমে কাজে লাগাচ্ছে। আমেরিকার গুগলের সাথে লিঙ্ক আছে এমন কারো সাধ্য নেই এখানে প্রবেশ করতে পারে।

‘মাশাআল্লাহ।’ জায়াদের সাথে কণ্ঠ মেলায় অন্যরা।

‘১৩ জনের প্রথম টিম এখন আকাশে।’ আম্মার জায়েদি বলে।

‘হ্যাঁ আল্লাহ আমাদের সহায়। ইনশাআল্লাহ ১৫ মিনিটের নিরাপদ সীমানায় ল্যান্ড করবে।’

লেজার লাইট লাইট শো শেষ। থিয়েটার শুরু হয়েছে। প্রতিরক্ষা বাহিনী আইডিএফ এর মাসাদার দফতরের প্রধান   জেনারেল গুনিয়া বেন নিবিষ্ট মনে থিয়েটার দেখছেন। বিশাল স্ক্রিনে দেখানো হচ্ছে খ্রিষ্টপূর্ব ৩৭ থেকে ৩১ অব্দের পৃথিবী। সামনে এ যুগের অভিনয় শিল্পীরা। এ এক অভিনব সমন্বয়। পরিবেশ তৈরি করা হচ্ছে স্ক্রিনের ওপর ডিজিটাল চিত্রে, মঞ্চে অভিনয় করছেন অভিনয় শিল্পীরা। 

হেরোদ দ্য গ্রেট এলেন। তার নির্দেশে মাসাদা মালভূমির ওপর তৈরি হচ্ছে সুরক্ষিত দুর্গ। 

ঘটনাপ্রবাহ এগিয়ে চলছে। 

ঈসা (আ)-এর আগমনকাল।

ইহুদিরা তার অলৌকিক ক্ষমতা দেখে দলে দলে তার শিষ্যত্ব গ্রহণ করছেন। 

ইহুদি রাজারা তাদের ধর্মের মূল দর্শন মানছে না। প্রজাদের কল্যাণের চেয়ে ভোগ-বিলাসে বেশি ব্যস্ত। অবশেষে তদের সামনে এলো সেই ভয়ংকর ৭০ খ্রিষ্টাব্দ। রোমান খ্রিষ্টান বাহিনীর হাতে ক্ষত-বিক্ষত হচ্ছে জেরুজালেম। ইহুদিদের বড়ো অংশ বশ্যতা স্বীকার করে নিয়েছে। কিন্তু ইহুদিদের কট্টরপন্থী সিকারি (ঝরপধৎরর) সম্প্রদায়ের ৯৬০ জন রোমান বাহিনীর বশ্যতা স্বীকার করছে না। তারা জীবনবাজি রেখে যুদ্ধ করছে। না। আর পারছে না। কৌশল বদলে আপস করে।

কিন্তু তারপর শক্তি সঞ্চয় করতে চলে যায় মাসাদার দুভেদ্য দুর্গে। রোমান বাহিনী তাদের চালাকি বুঝতে পারে। তারাও নাছোড়বান্দা। তিন বছর পর ৭৩ খ্রিষ্টাব্দে রোমান সেনাবাহিনী মাসাদা অবরোধ করে। এ অবরোধ চলে টানা তিন বছর। এই দৃশ্য যখন মঞ্চস্থ হচ্ছে, ঠিক সেই সময়ই চারদিক ঘিরে ফেলে খালিদ সাইয়েদের প্যারাসুট বাহিনীর কমান্ডো গেরিলারা। দর্শকরা প্রথমে ভেবেছিল এ হয় তো থিয়েটারেরই কোনো দৃশ্য দেখছে। তারা কিছু বুঝে ওঠার আগেই স্কোপোলামিন স্প্রে’ করা শুরু করেন প্যারাসুট বাহিনীর তিন শত সদস্য। আমর ও ডেভিড স্কোপোলামিন স্প্রে’ করে জেনারেল গুনিয়া বেনসহ  সিনিয়র সামরিক কর্মকর্তাদের স্বমোহিত করে ফেলে। 

উত্তেজনা আরো বেড়ে যায় জায়াদের গাজী ব্রিগেডের সদস্যদের মাঝে। ওরা আরো নিবিষ্টভাবে বসে মনিটারের সামনে।

‘মারহাবা। মারহাবা।’ জায়াদের সাথে সবাই একসাথে বলে ওঠে।

‘ঐ দেখো ডেভিড আর আমরের সাথে কেমন অনুগত বালকের মতো জেনারেল গুনিয়া বেন তার অফিসারদের নিয়ে প্যারা কপ্টারে উঠছে।’ হাম্মাদ আঙুল দিয়ে দেখায়।

‘সত্যি আমাদের বিজ্ঞানীদের আবিষ্কারগুলো বিস্ময়কর।’

আম্মার জায়েদির বিস্ময়ের উত্তরের জায়াদ বলে, ‘প্যারাসুটের মতো আকারের কপ্টার তৈরি করা হয়েছে ক্যামোফ্লেজ করে শত্রুর চোখকে ফাঁকি দিতে।’

‘আলহামদুলিল্লাহ। আমরা সফল। ঐ দেখো তিনশত জন কমান্ডো সবাই তাদের প্যারা কপ্টারে করে টার্গেটদের ধরে আনছে।’ হাম্মাদ আবারও দেখায়।

‘হত্যা না করে শত্রুদের ধরে আনছে কেন?’ হাম্মাদ জায়াদের কাছে জানতে  চায়।

‘ওদের নতজানু করতে। আমাদের দাবি মানতে বাধ্য করতে।’ জায়াদ বলে।

‘ঠিক। কিন্তু একি হলো?’ উত্তেজিত গলায় বলে ওঠে হাম্মাদ।

‘হ্যাঁ, তাই তো কী হলো, ঐ দেখো জায়নবাদীদের একটি জেট বিমান ছুটে আসছে।’ জায়াদ বলে।

‘তাই তো। আমর ও ডেভিডের প্যারা কপ্টারকে টার্গেট করেছে মনে হয়।’ হাম্মাদ কেঁদে ফেলে।

শাঁ-শাঁ-শাঁ শোঁ শোঁ শব্দ করে একটি মিশাইল বিমানটিকে আঘাত করে। খণ্ড খণ্ড আগুনের গোলায় আকাশ থেকে মাটি পর্যন্ত আলোকিত হয়ে ওঠে। নাসরুম মিনাল্লাহি ওয়া ফাতহুন কারিব। ‘আল্লাহর পক্ষ থেকে আসে সাহায্য ও আসন্ন বিজয়।’ শব্দের প্রতিধ্বনি সাথে সাথে ওদের মনিটর বন্ধ হয়ে যায়।

‘আলহামদলিল্লাহ। অপারেশন সফল হয়েছে। মাসাদা থেকে সবাই নিরাপদে ফিরেছে।’ জায়াদের সাথে সাথে সবাই আলহামদুলিল্লাহ, আল্লাহু আকবার বলে সেজদায় লুটিয়ে পড়ে।

(এই উপন্যাসের প্রতিটি ঘটনা ও চরিত্র কাল্পনিক। যদি ঘটনা বা চরিত্রের সাথে 

মিলে যায় তা কাকতালীয়। - লেখক)

আপনার মন্তাব্য লিখুন
অনলাইনে কিশোরকন্ঠ অর্ডার করুন
লেখকের আরও লেখা

সর্বাধিক পঠিত

আর্কাইভ

আরও পড়ুন...

CART 0

আপনার প্রোডাক্ট সমূহ