Home গল্প তোমাদের গল্প মা পাখিটা -আজম সিদ্দিক রুমি

মা পাখিটা -আজম সিদ্দিক রুমি

সকাল হলে মা পাখিটা অফিসের জন্য বেরিয়ে পড়ে। কাজ শেষে পুষ্টিকর খাবার নিয়ে ছুটে আসে বাসায়। ছোটো দুটো ছানা। তাদের জন্য মা পাখির মন ছটফট করে। এই দূরত্ব খুব কষ্টদায়ক। বড় একটি অফিসে চাকরি করে। ছানা দুটো অনাহারে। এসে খাবার মুখে তুলে দেয়। খাবার খেয়ে কী যে হাসিখুশি! তা দেখে প্রাণ ভরে যায়। ছোটো সংসার দিব্যি চলে যাচ্ছে। মনে হতেই আঁতকে উঠে এইতো সেদিন এক সাথে কত্ত ওড়াউড়ি। কত্ত খুনসুটি। সুন্দর দিনগুলো আমাদের ছিল। আবদার না করতেই পছন্দের জিনিসগুলো সব কিছু হাজির করতো। কতই না সুখময় ছিল! ভাবতে অবাক লাগে! হঠাৎ একদিন দুপুরে অফিসের গুরুত্বপূর্ণ কাজে ঐ যে বের হলো কোথায় গেল কী হলো কোন হদিস মিলে না! মা পাখিটি খোঁজার কোনো কমতি রাখেনি। কত সংবাদ সম্মেলন করে কোনো কাজ হয়নি। বুকের ভেতর আকাশসম বেদনা নিয়ে পথ চলা শুরু হয়। কোথায় যাবে কী করবে কিছু বুঝে উঠছে না? প্রিয়জন হারানো যে কত কষ্টের যার হারায় সে-ই বুঝে! সবাই সবার নীড়ে ফিরে কত আনন্দ আহ্লাদে মেতে উঠছে। সবকিছু দেখে নীরবে বুক ভরা ব্যথা নিয়ে রাত যায় দিন আসে কিন্তু সে প্রিয়জন আর ফিরে আসে না। চতুর্দিকে পাখি মুখে কথাবার্তা কত শোনবে, নিত্যদিন। বিরক্তি এসে যায়। অসহায় হয়ে শোনে আর কান্না করে। এ যেন নিয়তি! এভাবেই কেটে যাচ্ছে সপ্তাহ, মাস, বছর তার কোনো সন্ধান মিললো না। অবশেষে সিদ্ধান্ত নিলো কিছু একটা করতে হবে। দিনদিন আর্থিক অবস্থাও দুর্গতি। বিভিন্ন চরায় উতরায় পেরিয়ে একটি চাকরি পেয়ে যায় ভালো পোস্টে। অনেকে বলে তার পরিশ্রম তাকে এখানে এনেছে আবার অনেকে ঠাট্টা উপহাস করছে! চাকরি যেন তার সাথে এই সমাজে যায় না। শুধু পুরুষ পাখিদের চাকরি করতে হবে নারী পাখিদের চাকরি করা যাবে না। না কোনো বাধা, প্রতিবন্ধকতা তাকে থামাতে পারেনি। তার স্বপ্নকে রুদ্ধ করতে পারেনি। সবকিছু মেইনটেইন করে শালীনতার সাথে চাকরি করছে। তারতো কোনো সমস্যা হয় না। সমাজের পাখিদের এত সমস্যা কেন? কর্ম করা খারাপ নয় যদি তা হালালকর্ম হয়। এখানে ব্যক্তিগত শ্রদ্ধা আছে। একজন আরেকজনের প্রতি রেসপনসিবিলিটি আছে। কই আমার সহপাঠীদের মাঝে কাউকে হেয় করতে দেখি না। সকলে সচেতন। বরং তারা আমাকে ফুল দিয়ে বরণ করে নিয়েছেন। ভালোবাসায় আবদ্ধ করেছেন। কাছে টেনে নিয়েছেন। আশার বাণী শুনিয়েছেন। যত সমস্যা মনে হয় আমার আশপাশের পাখিদের! এই পরিবর্তনে কাজ করা প্রয়োজন। বিভিন্ন সচেতনতামূলক প্রোগ্রাম ও কর্মশালা করা উচিত। যেন, কেহ কাউকে এমন অসহায়ত্বের সময় অবহেলা না করে। হেয় না করে। পাশাপাশি থেকে সাপোর্ট দেয় একজন আরেকজনের উপকারে সবাই সবার জন্য এগিয়ে আসে। নারী পাখিও পরিবার পরিজন সাথে নিয়ে অন্য অফিসে চাকরি করতে পারে এটা স্বাভাবিক। দোষের কিছু নয়। সৎ থেকে সৎ পথে উপার্জন করা হেয় নয়, সম্মানের এবং গর্বের বিষয়।
মা পাখিটি ধৈর্যশীল ইতিবাচক চিন্তারও একজন বাস্তববাদী। যখন যে কাজ করে মন দিয়ে করে। শেষ না করে উঠবে না। যদি না করতে পারে তবু অবহেলায় ফেলে রাখে না অন্তত চেষ্টা করে যায় হাল ছাড়ে না। সৃষ্টিশীলও বটে। এই অফিসের তিনজন বড় কর্মকর্তা আছে। তার মধ্যে সেও একজন। তার সফলতা ও উচ্চতর ডিগ্রির জন্য প্রমোশন হয়ে এখন সকলের প্রধান হিসেবে নিয়োগ প্রাপ্ত হয়েছে। তার প্রতিষ্ঠিত ছানা কেয়ার হোম। এই কেয়ার হোম এখন অনেক পাখপাখালির স্বপ্নের জায়গা হয়ে দাঁড়িয়েছে। কোনো কাজ ছোট নয়। একটি অফিসে ৫০ জন কর্মচারী সকলের ছোটো বড়ো ছানা রয়েছে তাদের দেখাশোনা করার জন্য মা পাখিটি মন্ত্রী পাখির কাছে দরখাস্ত করেছিল। যেন চাকরিজীবী সকল পাখির ছানা লালন পালনে কেয়ার হোমের অনুমোদন পায়। অনুমোদন গৃহীত হয়। পরে এটি দেশে জাতীয় পর্যায়ে স্বীকৃতি পায়। এখন প্রতিটি ছোটো বড়ো সরকারি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে ‘ছানা কেয়ার হোম’ রয়েছে। শত শত বেকার পাখপাখালির কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা হয়েছে। বেকারদের জন্য একটি নীরব বিপ্লব। এবং দেশের জন্যও গর্বের এই উদ্যোগটি। মা পাখিকে এখন অনেক সংবর্ধনা ও স্বর্ণের মেডেল দেওয়া হচ্ছে। চারিদিকে তারই আলাপ আলোচনা চলছে। এসব মনে করতেই দু’নয়ন বেয়ে অশ্রু গলগল করে ঝরে পড়ছে। ছানা দুটো মা পাখিকে বলছে কী হয়েছে তোমার মা? এই খুশির দিনে কেন কাঁদছো? আজতো আনন্দের দিন। হ্যাঁ, আনন্দের দিন আমাদের সব দুঃখ বিলীন হয়েছে। কিন্তু আজ যদি তোদের বাবা পাখি বেঁচে থাকতো কতই না খুশি হতো! মা পাখিটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়লো।

SHARE

Leave a Reply