Home Featured শিক্ষাপাতা সুলুসশৈলীতে হুরুফে কাসিয়ার -মোহাম্মদ আবদুর রহীম

সুলুসশৈলীতে হুরুফে কাসিয়ার -মোহাম্মদ আবদুর রহীম

আজকের সকালটা কুয়াশার ঘন আবরণে ঢেকে আছে। পৌষ মাসের শেষ দিকে শীত জেঁকে বসেছে। ক্যালিগ্রাফি ক্লাসের ছাত্ররা অপেক্ষা করছে ওস্তাদজির জন্য। তিনি ক্লাসে ঢুকতেই সবাই জোরে সালাম দিলো, আসসালামু আলাইকুম ওস্তাদজি। কেমন আছেন আপনি।
-অলাইকুম সালাম অরহমাতুল্লাহ। আলহামদুলিল্লাহ। ভালো আছি। তোমরা কেমন আছো?
– আলহামদুলিল্লাহ, আল্লাহপাকের মেহেরবানিতে ভালো আছি।
রায়হান বলল, নতুন বছরের শুভেচ্ছা জানাই। শীতের এই সময়ে খেজুর রসের পিঠা খুব মজাদার। তোমরা কে কে গ্রামে বেড়াতে গিয়ে পিঠা খেয়েছো? সবাই হাত তুললো দেখে রায়হান হেসে দিয়ে বলল, মাশা আল্লাহ! আশা করি আল্লাহপাকের মেহেরবানিতে তোমাদের শীতের বেড়ানো মজাদার আর শিক্ষণীয় হয়েছে আলহামদুলিল্লাহ।
– আজকের দরসে আমরা ক্যালিগ্রাফির হুরুফে কাসিয়ার নতুন দু’টি হরফ লেখা শিখবো ইনশাআল্লাহ। আর সেটা হলো- হরফ ক্বফ ও হরফ লাম। এর পরের দরসে আমরা হরফ নুন শিখবো। খুব দ্রুত আমাদের মুফরাদাত পর্ব শেষ হয়ে যাবে আশা করছি। তোমরা খুব মনোযোগ দিয়ে ক্লাস করবে এবং বাড়ির কাজ করে আনবে।
সবাই একসাথে বলল, জি ওস্তাদজি।
-এখন তোমাদের বাড়ির কাজগুলো দেও, আমি সেগুলো যাচাই করে দেখি কতদূর সঠিক হয়েছে আর এই ফাঁকে তোমরা একে একে বোর্ডে হরফ সোয়াদের দুই সুরত লিখে দেখাও।
সবার হরফ লেখা শেষ হলে, রায়হান সেগুলোর কোথায় কোথায় ভুল আছে তা চিহ্নিত করে শুধরে দিলো।
রায়হান বলল, আজকের দরসে প্রথমে হরফ ক্বফ শিখবো। তারপর লাম হরফ।
‘ক্বফ’, ‘ফা’ এবং ‘ওয়াও’ এই তিন হরফের রস বা মাথা একই রকম। তবে জিসম বা শরীর আলাদা। এ ছাড়া উসুলে সালাসা (কিয়াসা, ইত্তেযাহ ও যাভিয়া) অনুযায়ী এ তিন হরফের রস সামান্য পরিবর্তন আছে। যা এখন তোমাদের দরকার নেই।
আমরা ক্বফ হরফের রস কীভাবে লিখতে হয়, আগে সেটা দেখি। এর পরিমাপ বা কিয়াসা দৈর্ঘ্যে ও প্রস্থে দুই কৎ বরাবর। তবে উচ্চতা বরাবর আধা কৎ বাড়তি হয় রসের ভেতর ছোট্ট একটা চোখ রাখার কারণে। কলম ডান দিকের নিচের কৎ বরাবর নব্বই ডিগ্রি জাভিয়া রেখে বাম দিকে দুই কৎ বরাবর কলম যাবে এবং যাওয়ার সময় সামান্য একটা ঢেউ হবে। এরপর কলম ধীরে ধীরে ওপরে উঠে ডান দিকে যাবে, এ সময় কলমের নিচের ঠোঁট খেয়াল রাখতে হবে যেন সেটা আধা কতের বেশি না ওঠে। ওপরের ঠোঁট আমরা দুই কৎ মাপের রেখা তিন ভাগ করে বাম থেকে প্রথম ভাগ বরাবর রেখে আবার ধীরে ধীরে ডান দিকে সামান্য গোলায়িত ভাব নিয়ে নুযুল হবে, এই রস লিখবার সময় ভেতরের চোখটা মাপ মতো সুন্দর করতে হবে। কলমের যাভিয়া ডান দিকে-৪৫-৬০-৯০ তারপর বামদিকে-৮০-৬০-৪৫ দারাজাহ (ডিগ্রি) বরাবর রাখতে হবে।

তোমাদেরকে একটা কথা খুব মনে রাখতে হবে, নিসবা জাহাবিয়া (সোনালি অনুপাত) মূলত দরব বা স্ট্রোকের সাথে সম্পর্কিত। আর দরব দুই রকম। হরফের জুঝ (অংশ) যাভিয়া (কলমের মাথার কৌণিক অবস্থান) অনুযায়ী ৪৫-৬০-৯০ দারাজাহ মনজিলে বিভক্ত থাকে, এই প্রতি মনজিল পর্যন্ত এক দরব বা স্ট্রোক। আবার এই এক মনজিলের ভেতর কলম চলার সময় কলমের কৎ ধাক্কা মেরে চলে এবং দাগ দাগ দেখা যায়, একেও দরব বলে।

একটা উদাহরণ দিলে বুঝতে সুবিধা হবে। প্রাচীনকালে মানুষ ঘোড়ায় চড়ে চলাচল করত এবং দূরের গন্তব্যে (মনজিলে মকসুদে) রাস্তার পাশে কিছু সরাইখানা থাকতো, কারণ একটা ঘোড়ারও খাবার ও বিশ্রামের দরকার আছে, এই এক সরাইখানা থেকে আরেক সরাইখানা পর্যন্ত দৌড়কে আমরা এক দরব বলতে পারি। আবার ঘোড়া দৌড়ানোর সময় প্রতি পদক্ষেপে ধুলো উড়িয়ে পায়ের দাগ রেখে যায়, একেও আমরা দরব বলি।
রস লেখার পর এখন আমরা ক্বফের জিসম লিখবো। তোমরা সোয়াদের জিসম যেমন বাটির মতো দিয়েছো, এখানে ক্বফের জিসমও সেরকম দিতে হবে। আর এই জিসমকে কাসিদাহ (টেনে লম্বা করা) কখনও কখনও দিতে হয়। এই কাসিদাহ করারও একটা নিয়ম আছে। সেটা হলো- যতটুকু আমরা কাসিদাহ করবো সেটার জন্য একটা সরল রেখা টেনে তিন ভাগ করবো। এই ভাগের মধ্যের দুটোর যেকোনো একটাতে নিসবা জাহাবিয়া রাখতে হবে।
আমরা নিসবা জাহাবিয়াকে উপুড় করা ৩ লিখে দেখাই। কখনও এই রেখার মাঝ বরাবর নিসবা জাহাবিয়া রাখা হয়। সাধারণত তিন ভাগের বাম পাশের ভাগে বেশি নিসবা জাহাবিয়া রাখা হয়। কারণ হরফের আদি শেকলে (আকৃতি) এটা রাখা বাধ্যতামূলক। এখানে জিসম কাসিদা করলে রসের বাম পাশ সামান্য প্রায় সিকি কৎ বরাবর এরতেফা করতে হয়।

এবার লাম হরফ লেখার কৌশল বলি, লাম হরফটি আলিফ ও নুন হরফের সমন্বয়ে লেখা হয়। ফলে একে আমরা মৌলিক হরফ না বলে ‘যৌগিক’ হরফ বলি। তোমরা প্রথম দরসে আলিফ শিখেছো আর হরফে কাসিয়ার জিসমও শিখেছো। সুতরাং এটা লেখা তোমাদের জন্য খুব সহজ। তারপরও সেটা লিখে দেখাই। আর লামের জিসমও আধুনিক নিয়ম অনুযায়ী কাসিদা করা যায়।

তবে আরব ক্যালিগ্রাফারদের সনাতন ধারার ওস্তাদগণ এটা করা পছন্দ করেন না। মূলত শিল্পকর্ম তৈরিতে কম্পোজিশনের প্রয়োজনে তুর্কি ওস্তাদগণ এখন এটা করে থাকেন। আশা করি তোমরা আজকের দরসটি শিখতে পেরেছো।
আজকের দরস এটুকু থাকলো। তোমরা সুন্দর করে কয়েক পাতা লিখে আনবে। মা’আস সালামাহ।

SHARE

Leave a Reply