Home চিত্র-বিচিত্র অলস প্রাণী শ্লথ -অতুল করিম

অলস প্রাণী শ্লথ -অতুল করিম

পৃথিবীতে প্রায় এক লাখ কোটির বেশি প্রাণী বাস করে। অনেক প্রাণীই নিজেদের আলাদা বৈশিষ্ট্যের জন্য জায়গা করে নিয়েছে মানুষের মনে। তেমন একটি প্রাণী শ্লথ।
শ্লথ নামের অর্থ অলস। এরা অলস প্রকৃতির প্রাণী। শুয়ে-বসেই দিন কাটে এদের। কিছু না করে সারাদিন অলসভাবে কাটাতে পারলেই খুশি থাকে এই প্রাণী।
জীবনের প্রায় ৯০ শতাংশ সময় এরা গাছের ডালে উল্টো হয়ে ঝুলে থেকে কাটিয়ে দেয়। আর এভাবে তারা চলতে পারে মিনিটে সর্বোচ্চ প্রায় ৪.৫ ফুট পর্যন্ত। এদের ওজনের মাত্র ২৫-৩০ শতাংশ এদের পেশি, যা মানুষের ক্ষেত্রে ৪০-৪৫ শতাংশ।
সায়েন্স ওয়ার্ল্ড রিপোর্ট শ্লথকে চালাক প্রাণী বলতে বেশি পছন্দ করে। কারণ শ্লথ জানে, বেশি নড়াচড়ায় শক্তি ক্ষয় হয় বেশি। তাই তারা কম নড়াচড়া করে।
ছয় কোটি বছর আগে পৃথিবীতে আসা এই প্রাণীর প্রজাতি ছয়টি। শ্লথ পৃথিবীর সবচেয়ে ধীরগতির স্তন্যপায়ী প্রাণী। মধ্য এবং দক্ষিণ আমেরিকায় এদের পাওয়া যায়।
প্রজাতিভেদে দুই ধরনের শ্লথ রয়েছে। একটিকে বলা হয় দুই পদাঙ্গুলি শ্লথ। অন্যটি তিন পদাঙ্গুলি শ্লথ। পায়ের আঙুলের সংখ্যা এক হলেও হাতের আঙুলের ভিন্নতা রয়েছে।
দুই প্রজাতির শ্লথ চেহারা প্রায় একই রকম। এরা ২৪ থেকে ৩১ ইঞ্চি লম্বা হতে পারে। প্রজাতির ওপর নির্ভর করে ওজনে ৩ থেকে ৮ কেজি হতে পারে। এদের মুখের ওপরে ১০টি এবং নিচের পাটিতে ৮টি দাঁত থাকে।
শ্লথের মাথা গোলাকার, চোখ বিষাদ মাখা, ছোটো কান এবং লেজ ছোটো ও মোটা। শ্লথ তাদের মাথা ২৭০ ডিগ্রি পর্যন্ত ঘোরাতে সক্ষম। তাই তারা চতুর্দিকে নজর রাখতে পারে।
দুই আঙুলওয়ালা শ্লথ সামান্য বড়ো হয়, কিন্তু এদের প্রকৃতি তিন আঙুলওয়ালা শ্লথের মতোই। তিন আঙুল ওয়ালা শ্লথের মুখের বর্ণ এমন দেখে মনে হয় এরা সবসময় হাসছে। তাদের ঘাড়ে দু’টি বাড়তি কশেরুকা থাকে যা তাদের মাথা প্রায় বৃত্তাকারে ঘোরাতে সাহায্য করে।
শ্লথের রয়েছে বিশেষ ধরনের হাত ও দীর্ঘ পা এবং বাঁকানো নখর, যা তাদের সহজে গাছের ডালে উল্টো ঝুলে থাকতে সাহায্য করে। এরা মাটিতে হাঁটতে পারে না। যখন এরা মাটিতে থাকে অনেকটা হামাগুড়ি দিয়ে নিজেদের টেনে নিয়ে চলে। তবে এরা খুব কমই মাটিতে নেমে আসে আর এসময় তাদের গতি মিনিটে এক ফুটের বেশি নয়। সপ্তাহে মাত্র একবার এরা নিচে নামে।
ডাঙার তুলনায় পানিতে চলতে এরা খুব ওস্তাদ। সাঁতারের ক্ষেত্রে এরা বেশ দক্ষ। ডাঙার তুলনায় পানির তলায় এদের গতি তিন গুণ দ্রুত হয়। সাঁতারে এদের গতি মিনিটে ১৩.৫ ফুট পর্যন্ত হতে পারে, যা গাছের ডালে কিংবা মাটিতে চলাচল থেকে অনেক বেশি। সাঁতারের ক্ষেত্রে এরা শ্বাস ধরে রাখতে পারে প্রায় ৪০ মিনিট পর্যন্ত। এই সময় শ্লথের হৃদস্পন্দন কমতে কমতে প্রায় শূন্য হয়ে যায়। স্বাভাবিকের তুলনায় এক তৃতীয়াংশ কমে যায় হৃদস্পন্দনের গতি।
শ্লথ মায়েরা তাদের বাচ্চার প্রতি যত্নবান হয়। জন্মের পর ৬ মাস তারা মায়ের সঙ্গে লেগে থাকে। গাছের মধ্যে চলাচলের সময় তারা মায়ের পেট আঁকড়ে ধরে রাখে।
শ্লথদের সম্পর্কে ধারণা রয়েছে তারা ঘুমায় বেশি। অথচ সাম্প্রতিক সময়ে গবেষণায় জানা যায়, শ্লথ সর্বোচ্চ ১০ ঘণ্টা ঘুমায় দিনে। গবেষণাটি চালিয়েছে জার্মানির ম্যাক্স প্লাংক ইনস্টিটিউটের একদল গবেষক। দলের নেতা নিলস রটেনবার্গ বিবিসিকে বলেছেন, শ্লথ আসলে সাড়ে ৯ ঘণ্টার মতো ঘুমায় যা প্রচলিত ধারণার চেয়ে অনেক কম।
তবে চিড়িয়াখানায় শ্লথকে অনেক বেশি সময় ঘুমাতে দেখা যায়। এ ব্যাপারে যুক্তরাজ্যের নরউইচ বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালের ড. নিল স্ট্যানলি বলছেন এটা স্বাভাবিক যে প্রাণিকুল যখন বনে থাকে, তখন তারা কম ঘুমায়। এটা সব প্রাণীর ক্ষেত্রেই বলা যায়। কারণ চিড়িয়াখানায় তাদের খাবারের সন্ধানে যেতে হয় না।
শ্লথ সচরাচর তৃণভোজী হয়ে থাকে। গাছের কচি পাতা, কুঁড়ি, কচি ডাল এবং ফল খেয়ে বেঁচে থাকে। তবে কিছু কিছু প্রজাতির শ্লথ ছোটো ছোটো পোকামাকড় এবং ছোটো আকারের সরীসৃপ খেয়ে থাকে। একবার খাদ্য গ্রহণ করার পর হজম হতে প্রায় ৩-১৫ দিন লাগে। এই পরিপাক প্রণালীর জন্য এদের পাকস্থলী শরীরের দুই-তৃতীয়াংশ জায়গা দখল করে থাকে।
শ্লথ ধীরগতি হওয়ার কারণ এদের বিপাকীয় হার একদমই কম। এরা লতা পাতা খেয়ে অভ্যস্ত হওয়ায় এগুলো হজম করে শক্তির উৎপাদন করা অত্যন্ত জটিল প্রক্রিয়া হয়। এই সমস্ত তৃণজাতীয় খাদ্য থেকে খুবই কম শক্তি পাওয়া যায় ফলে এরা শক্তি সঞ্চয় করতে বেশির ভাগ সময় স্থির থাকে। অত্যন্ত ধীরে নড়াচড়া ও চলাফেরা করে শক্তির অপচয় রোধ করে। এরা দিনে ১৫ ঘণ্টা স্থির অবস্থায় কাটিয়ে দেয় এবং ঘুমিয়ে কাটায়।
শিকারির আক্রমণ থেকে রক্ষার জন্য এরা কামড়িয়ে, থাবা দিয়ে সজোরে আঘাত করে এবং চিৎকার করে। বাজ জাতীয় শিকারি পাখির হাত থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য এরা সবুজ পাতার আড়ালে লুকিয়ে থাকে ও নড়াচড়া করে না বললেই চলে। গাছে থাকাটা এদের জন্য নিরাপদ। কেননা, জাগুয়ার বা ঈগল এরকম শিকারিদের থেকে সুরক্ষা হিসেবে গাছ কাজ করে। এ ছাড়া কখনো খাবার বা সঙ্গীর খোঁজে তারা মাটিতে নেমে আসে।
শ্লথ এতটাই ধীর যে, এদের গায়ে শৈবাল জন্ম নিতে পারে। অবশ্য শৈবালের সাথে এদের মিথোজীবী সম্পর্ক আছে। অন্যদিকে, শৈবালের সবুজ বর্ণ শ্লথকে প্রাকৃতিক ছদ্মবেশ দেয়। ফলে, তারা শিকারিদের চোখ এড়াতে পারে।

SHARE

Leave a Reply