Home গল্প বশির পোস্টম্যানের বাঘ শিকার দেওয়ান -মোহাম্মদ শামসুজ্জামান

বশির পোস্টম্যানের বাঘ শিকার দেওয়ান -মোহাম্মদ শামসুজ্জামান

ব্যাংকিং পেশা সত্যিই এক আজব পেশা। বিশেষ করে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাজ। সারাক্ষণ চোখ কান খোলা রেখে করতে হয় কাজ। এ সময়ে আকাশে ঝলমলে রোদ, না মেঘে ঢাকা সূর্য। রাস্তায় মানুষজনে হট্টগোল না মিছিলের স্লোগান, জানবার কোন ফুরসুতই থাকে না। বাগানে গোলাপ না ডালিয়া, এ তালাশেও সময় থাকে না। শুধু হিসাব-নিকাশ আর লেনদেন। কাজ আর কাজ। আর ডিপার্টমেন্টের প্রধান হিসেবে আমার দায়িত্বটা আরও এক হাত ওপরে। আরও জটিল। একদিকে যেমন ভল্টের হাজার হাজার কোটি টাকার ঝুঁকি, আবার অন্য দিকে শত শত চাবির চিন্তা। চারদিক থেকে শুধুই মানসিক চাপ। এর ওপর আবার আছে তদারকির দায়িত্ব। বাজ পাখির দৃষ্টি নিয়ে মাঝে মাঝেই টহল দিতে হয় কাউন্টার। চালাক-চতুর কর্মীদের ফাঁকি দেওয়ার ফাঁকফোকরগুলো চিহ্নিত করতে হয়। গ্রাহকদের সেবার মান ঠিক রাখতে হয়। সেদিনও খাতাপত্র স্বাক্ষর করে সকাল সকাল বেরিয়ে পড়লাম। অনেকক্ষণ হাঁটাহাঁটির পরও কোনো অসঙ্গতি চোখে পড়ল না। কাজকর্ম চলছে সব ঠিকঠাক। একটা প্রশান্ত মন নিয়ে চেম্বারে যাব যাব করছি এমন সময় কার যেন অনুনয় বিনয় কানে এলো। কে যেন কাতর স্বরে আবেদন করছে। থমকে দাঁড়ালাম। দৃষ্টিটা ঘূর্ণির মতো পাক খেতে খেতে বিকৃত ও ছেঁড়া-ফাটা নোট বিনিময় কাউন্টারে গিয়ে আটকে গেল। কয়েক ধাপ এগিয়ে গিয়ে বিষয়টা বোঝার চেষ্টা করলাম। কাউন্টারের ওপাশে কাঁচা-পাকা চুলের পঞ্চাশোর্ধ্ব একজন ভদ্রলোক। ক্ষয়রোগগ্রস্ত রোগীর মতো ফ্যাকাশে তার মুখ। একগাদা পচা বিকৃত নোট হাতে অসহায়ের মতো অনুনয় বিনয় করছে। কিন্তু কাউন্টার ইনচার্জ নিরুত্তর। অন্যের কাজ নিয়ে ব্যস্ত তিনি। নিষ্পলক চোখে চেয়ে থাকলাম সেদিকে। বোঝার চেষ্টা করলাম। এক মিনিট, দুই মিনিট, পাঁচ মিনিট। কিন্তু অবস্থার কোনো হেরফের হচ্ছে না। ভদ্রলোক কাকুতি মিনতি করেই যাচ্ছেন। আর ইনচার্জ বরাবরের মতো নিশ্চুপ। নোট বদল করে দেবার মতো কোনো উত্তরই দিচ্ছেন না। আমি মর্মাহত হলাম। নিজেকে আর ধরে রাখতে পারলাম না। আরও দু’ কদম এগিয়ে গেলাম। ঠিক ইনচার্জের চেয়ারের পিছনে গিয়ে দাঁড়ালাম। প্রশ্ন করলাম, ভদ্রলোকের কী হয়েছে? অমনভাবে অনুরোধ করছেন কেন?
কাউন্টার ইনচার্জ থতমত খেলেন। চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়ালেন, বললেন স্যার একগাদা পোকায় খাওয়া ও পচা নোট নিয়ে এসেছেন তিনি। এগুলোর বিনিময় মূল্য দেওয়ার মতো ক্ষমতা আমার নেই।
– তাই বলে আপনি নিরুত্তর থাকবেন? কিছুটা রেগে গেলাম। দরকার হলে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা কিংবা দাবি শাখায় পাঠিয়ে দেবেন। ইনচার্জ তবুও নিরুত্তর। বিমূঢ়ভাবে দাঁড়িয়ে থাকলেন।
কাউন্টারের ওপাশের ভদ্রলোকের চোখ এবার চকচক করে উঠল। একটা আশা ও উচ্ছ্বাস নিয়ে হাত জোড় করে বললেন, স্যার আমি একজন সরকারি চাকুরে, নোটগুলো আমার অফিসের। ড্যাম্প হয়ে গেছে। বিনিময় মূল্য না পেলে বিপদে পড়বো। অনেক ক্ষতি হবে আমার।
বিষয়টা আমায় ভাবিয়ে তুলল। লক্ষ করলাম পাশ ঘেঁষে আরও একজন বৃদ্ধ হাত জোড় করে দাাঁড়িয়ে আছেন। করুণ দেখাচ্ছিল তার মুখ। বুঝলাম তাদের মধ্যে কোনো ছলনা কিংবা অন্য কোনো মতলব নেই। নিতান্ত বিপদে পড়েই এসেছেন। কিছু সময় আড়ষ্ট থেকে বললাম, আপনারা হাত নামান, ভেতরে আসুন। দারোয়ান তাদেরকে দিয়ে গেলেন। শীততাপ নিয়ন্ত্রিত কার্পেট মোড়ানো চেম্বারে ঢুকে তারা দু’জনে ভ্যাবাচেকা খেয়ে গেলেন। চেয়ারে বসবেন কি বসবেন না ভেবে পাচ্ছেন না। দু’জনেরই দৃষ্টি গেল সিসিটিভি ক্যামেরার মনিটরের দিকে। হাঁ করে তাকিয়ে থাকলেন। আমি তাদের আড়ষ্টতা ভাঙতে বললাম, বসুন।
ভদ্রলোক এবার সহাস্যে সামনের চেয়ারে বসলেন। আর বৃদ্ধ লোকটি তখনও বিস্ময়ে তাকিয়ে থাকলেন। আমি তাকে তাগাদা দিয়ে বললাম, কই আপনিও বসুন। তবুও তিনি গদ গদ চোখে তাকিয়ে থাকলেন। পরক্ষণে একটু দূরে কার্পেটের ওপর বসতে চাইলেন।
– না, না ওখানে নয়, থামিয়ে দিলাম তাকে। পরে ভেবে দেখলাম নিশ্চয় সাহেব পিয়নের ব্যাপার স্যাপার আছে। সুতরাং বিষয়টা চাপা দিতে বললাম, ঠিক আছে আপনি পিছনের সোফায় গিয়ে বসুন। বৃদ্ধের চোখ মুখ এবার উজ্জ্বল হয়ে গেল। আমার দিক থেকে দৃষ্টি সরিয়ে ভদ্রলোকের দিকে তাকাল। তারপর কিছুটা ইতস্তত করে সোফায় গিয়ে বসল। ভদ্রলোক এবার বক্তব্য পেশ করতে লাগলেন। ঠিক যেন কাঠগড়ায় দাঁড়ানো কোনো আসামির মতো কাঁপা কাঁপা গলায় বলতে লাগলেন, আমি একজন সরকারি চাকরিজীবী। সাব পোস্টমাস্টার। টাকাগুলো অফিসের সিন্দুকে ছিল। কীভাবে উইপোকায় খেল আর ড্যাম্প হলো বুঝতে পারিনি। এখন যদি দয়া না করেন তাহলে আমার মতো একজন ছাপোষা মানুষের পক্ষে এই ক্ষতি পূরণ করা কঠিন হয়ে দাঁড়াবে। দয়া করে একটা উপায় বের করুন, স্যার।
প্রথমেই একটা ধাক্কা খেলাম আমি। পোস্ট অফিস আর পোস্টমাস্টার শব্দের সাথে আমার জীবনের যোগসূত্র গভীর। বিষয়টা বুঝতে না দিয়ে নিজেকে সামলে নিয়ে বললাম, একি বলছেন আপনি? এতো আপনার অধিকার। দয়ার কোনো প্রশ্ন আসছে না। এবার বলুনতো কোন পোস্ট অফিসের পোস্টমাস্টার আপনি?
– কালিকাপুরের পোস্টমাস্টার আমি। এটা নওগাঁ জেলার মান্দা থানায় পড়ে, তিনি চোখ জ্বল জ্বল করে তাকালেন। আমি চমকে উঠলাম। দুইয়ে দুইয়ে যেমন চার হয় তেমনি ভাবে মিলে যাচ্ছে সবকিছু। যে চিন্তাটা মাথার ভেতর ঘুরপাক খাচ্ছিল সেটা এবার সত্য হতে চলেছে। ভেতর থেকে সবকিছু শীতল হয়ে আসছে। আমার আব্বাও ছিলেন একজন পোস্টমাস্টার। আমাদের জন্মস্থানও এই মান্দা থানায়। তখন পাকিস্তান আমলের প্রথম যুগ। আব্বার প্রথম পোস্টিং হয়েছিল এই কালিকাপুর পোস্ট অফিসেই। আমার বড়ো দুই বোন ছাড়া তখন আমরা কেউ জন্ম নেইনি। তারপর অনেক বছর, কয়েক যুগ কেটে গেছে। অনেক ঘটনা ঘটে গেছে। আমরা আরও কয়েক ভাই বোন পৃথিবীর আলো বাতাস দেখেছি। দেশটাও পাকিস্তান থেকে বাংলাদেশ হয়েছে। আব্বা আম্মাও এখন আর বেঁচে নেই। কালিকাপুর পোস্ট অফিসের সাথে আমার কিংবা আমাদের পরিবারের আর কোনো সম্পর্কই নেই। দেখিনিও কোনো দিন। একেবারে দলছুট হয়ে ভাইবোনরা যে যেখানে পারছি চাকরি-বাকরি করছি। এই অবস্থায় কোনো দায়বদ্ধতা নেই আমার। তবুও ভেতরে কেমন মোচড় দিয়ে উঠছে। খচখচ করছে কাঁটা ফোটার মতো। কোথায় যেন একটা টান। মনটা কেমন নরম হয়ে আসছে। নিজেকে সংযত করা কষ্ট হচ্ছে। তবুও আবেগের লাগাম টেনে ধরলাম, বললাম, দেখি আপনার নোটগুলো। বের করুনতো।
অনেকক্ষণ ধরে নোটগুলো নাড়াচাড়া করলাম। আবার দেখলাম। কিন্তু নোটগুলোর অবস্থা এতই খারাপ যে মূল্য প্রদান করবার যোগ্য মাত্র দশ বারটি নোট। বাদবাকির অবস্থা একেবারেই অথৈবচ। সোজা পাঠাতে হবে দাবি শাখায়। কিন্তু সেখানে যে সব নোট বাতিল হবে তাতে কোনো সন্দেহ নেই। এখন কী উত্তর দেওয়া যায়? অন্য কেউ হলে এতক্ষণ সোজাসাপটা বলে ফেলতাম। মাথা থেকে ঝামেলা নামাতাম। কিন্তু গোল বেধেছে আব্বার পোস্ট অফিস বলে। যে অফিসে আমার মরহুম আব্বার প্রথম জীবন কাটিয়েছেন, যেখানে তার স্মৃতি জড়িয়ে আছে, এখন সে অফিসের একজন পোস্টমাস্টারকে ফেরত দেই কী করে? নীরস চোখে তাকালাম তাদের দিকে। লক্ষ করলাম পিছনের বৃদ্ধ লোকটি গভীর আগ্রহে তাকিয়ে আছেন। মনে হচ্ছে আদালতে একজন বিচারকের রায় শোনবার জন্য অপেক্ষা করছেন তিনি। কিছু সময় চুপচাপ থেকে পোস্টমাস্টারকে জিজ্ঞেস করলাম, উনি কে? পোস্টমাস্টার সাথে সাথে বুঝতে পারলেন না। বুঝতে তার মিনিট খানেক সময় লাগল। ঘাড় ঘুরিয়ে বললেন ও আমাদের অফিসের নাইটগার্ড। খুবই বিশ্বস্ত। তাই সাথে করে নিয়ে এসেছি।
– এই বৃদ্ধ বয়সে নাইটগার্ড! উনার তো অবসরে যাবার কথা, আশ্চর্য হয়ে মন্তব্য করলাম আমি।
– ঠিকই বলেছেন, পোস্টমাস্টার ম্লান হাসলেন। বললেন, আগে পোস্টম্যান হিসেবে নিয়মিত কাজ করেছেন। অবসরে গেলেন। কিন্তু দুঃখ তার পিছু ছাড়ল না। উপোস করতে লাগলেন। অবশেষে তাকে এই অফিসেই নাইটগার্ড হিসেবে চাকরি দেওয়া হয়েছে। এটা কোনো সরকারি চাকরি নয়। স্থানীয়ভাবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। কথাটা বুঝতে আমারও এক মিনিট পার হলো, আবার তার দিকে তাকালাম। বললাম কী নাম আপনার?
– বশির উদ্দির, উত্তর দিলেন তিনি।
বশির উদ্দিন! চমকে উঠলাম আমি। অঙ্ক কেমন মিলে যাচ্ছে। বয়স দেখে সহজে অনুমান করা যাচ্ছে ইনি সেই বশির উদ্দিন, আব্বার প্রথম জীবনের পোস্টম্যান। যাকে নিয়ে আম্মা কতনা রসালো গল্প শুনিয়েছেন। আমার মনটা কেমন ঘুড়ির মতো অতীত পানে উড়তে লাগল। আম্মার মুখে শুনেছি আত্রাই নদীর পাড় ঘেঁষে ছিল কালিকাপুর পোস্ট অফিস। আর অফিস সংলগ্ন ছিল পোস্টমাস্টারের কোয়ার্টার। যেটা সব পোস্ট অফিসেই থাকে। বশির পোস্টম্যান ঐ অফিসে কর্মরত থাকলেও স্থানীয় বাসিন্দা ছিলেন। নদীর খেয়াঘাটের কাছেই ছিল তার বসতবাড়ি। যাই হোক তার বিশ্বস্ততা ও কাজের দক্ষতার বলে যে কোনো মানুষকে তিনি ঘায়েল করতে পারতেন। আপন করে নিতে পারতেন। আব্বার ক্ষেত্রেও ঘটেছিল তাই। অফিসের কাজকর্ম করতেন যথানিয়মে আবার পোস্টমাস্টারের বাসার খোঁজখবরও রাখতেন রাত বিরাতে। বাসার ছোটখাটো কাজও করতেন স্বেচ্ছায়। আম্মার কাছ থেকেই শুনেছি পোস্ট অফিসটি নদীরপাড় ঘেঁষা হলেও পিছনে ছিল প্রাকৃতিক শোভার নিসর্গ। শিমুল বটপাকুর আর বাঁশঝাড়ে ঠাসা একটা ছোটখাটো বনভূমি ঝোপ ঝাড় বনলতার এই জঙ্গলে সারাক্ষণ পাখ-পাখালির কূজন লেগেই থাকতো। আর যেখানে পাখ-পাখালি সেখানেতো সাপ-খোপ, শেয়াল-বেজির আড্ডাতো থাকবেই। এ কারণে বোধ হয় আম্মার বিবাহিত প্রথম জীবন কেটেছিল আনন্দেই। বনফুলের গন্ধে, পাখির কূজনে আর রাতের তারা গুনে গুনে কেটেছিল দিনকাল। কিন্তু গোল বাধল শীতের শিশির সিক্ত এক ভোরে। ফজরের আজানের পরপরই আম্মা গিয়েছিলেন কলতলায় ওজু সারতে। শিউলি ফুলের সৌরভে ওপরের দিকে তাকিয়ে একটা লম্বা শ্বাস নিয়েছিলেন। হঠাৎ একটা সন্দেহ দানা বাঁধল তার বুকে। গাছের ডালে একটা রশি না অন্য কিছু। আবছা আলোয় আরও মনোযোগ দিয়ে পরখ করলেন তিনি। মুহূর্তে শিউরে উঠলেন। পরক্ষণে চিৎকার দিয়ে দৌড়ে ঘরে এলেন। ওটা রশি না আস্ত একটা সাপ। কী ভৌতিকভাবে নড়াচড়া করছিল গাছে। এরপর থেকে একটা ভয় জেঁকে বসেছিল তার ভেতর। সন্ধ্যা শুরুতে তিনি ডুমুর জঙ্গলের দিকে তাকাতেন না। দিনের আলো ফুরিয়ে গেছে কি না যাচাই করতেন না। জোনাকিদের মিটিমিটি আলো দেখবার আগেই ঘরে খিল দিতেন। ঘটনাটা আর চাপা থাকল না। বাসার গণ্ডি পেরিয়ে খবরটা পোস্ট অফিসেও জানাজানি হলো। সকলেই মুখ তুললেন আব্বার দিকে। নরম গলায়, খসখসে গলায় হাসিতে ফেটে পড়লেন। ক্লার্ক কাদির হাসির দমক সামলাতে সামলাতে বলনে, স্যার কোনো ভয় নেই। ওটা একটা ডারাস সাপ, বিষ নেই দাঁতে। হয়তো পাখির ডিম নয়তো ছানা খেতে উঠেছিল গাছে। এরকম দু-চারটা সাপ প্রায় আমাদের নজরে আসে। কোনো ভয় নেই। বুক চিতিয়ে চলতে বলবেন বেগম সাহেবাকে।
অফিসে যখন এমন মুখরোচক কথার বান। সকলের মুখে হাসির হিল্লোল তখন বশির পোস্টম্যান নিশ্চুপ। আপন মনে সিল মারতে লাগলেন খাম পোস্ট কার্ডে। কোনো প্রতিক্রিয়াই লক্ষ করা গেল না তার ভেতর।
এক সপ্তাহ পর। শীতের সকালের কুয়াশা যেমন ধীরে ধীরে সরে যায়, রোদের ঝিকিমিকি নজরে আসে, তেমনিভাবে আম্মার মন থেকেও ভয়টা উধাও হচ্ছিল। অনিচ্ছা সত্তেও¡ ভোরে কলতলায় যেতে শুরু করলেন। এমনি এক সকালে বশির পোস্টম্যানের মুখোমুখি হলেন তিনি। কিছুটা অন্য রকম দেখাচ্ছিল তাকে। পরনে লুঙ্গির ওপর খাকি জামা আর কালো রঙের কোমরবন্ধ। পায়ে খড়ম, হাতে তীক্ষè বর্ষা। চোখের মণিতে যেন শিকারির দৃষ্টি। সালাম দিয়ে মাথা নিচু করে বললেন মা জননী, আজ থেকে ডিউটি শুরু করেছি। কোনো ভয় নেই আপনার।
আম্মা চোখ কপালে তুললেন। বিহ্বলতা কাটিয়ে বললেন, কিসের ডিউটি।
– এই যে আপনি ভয় পেয়েছিলেন, বশির পোস্টম্যান একটু থামলেন। তারপর আবার বলতে লাগলেন, এখন থেকে ফজর নামাজ ও এশার নামাজের সময়, মোট দু’বার করে চক্কর দেবো। কোনো ভয় করবেন না। বুকে সাহস নিয়ে বের হবেন।
আম্মা মৃদু হাসলেন। রক্তিম আভা ছড়িয়ে পড়ল তার চোখে মুখে। মাথায় ঘোমটা দিয়ে বললেন, এ ডিউটির কথা কে বলেছেন? আপনার সাহেব কী বলেছেন?
– সাহেব কেন বলবেন? বশির পোস্টম্যান চোখ কপালে তুললেন, আমার একটা দায়িত্ব আছে না!
আম্মা আবার হাসলেন। কৃতজ্ঞতার চোখে বশির পোস্টম্যানকে ধন্যবাদ জানালেন। প্রতিদিন ভোরে ও রাতের প্রথম প্রহরে মোট দু’বার করে গলা খাঁকারি ও টর্সের আলো ফেলে উপস্থিতি জানান দিতে লাগলেন বশির পোস্টম্যান। আম্মাও সাহস ফিরে পেলেন। কলতলায় আর শিউলি তলায় যেতে কোনো রকম ভয়ডর করতেন না। সময় ভালোই কাটছিল তার।
পাখিদের ডুমুর ফল আর নিম ফল খেতে খেতে শরতের শেষে হেমন্ত এলো। কুয়াশার চাদরে ঢেকে গেল প্রকৃতি। এমনি এক সকালে আম্মা শিউলিতলায় ঝাঁট দিতে ব্যস্ত ছিলেন। আব্বা উঠবো উঠবো করছিলেন। হঠাৎ পোস্ট অফিসের সামনে মানুষ জনের শোরগোল শোনা গেল। আব্বা ভয় পেলেন। ভীষণ ভয়। রাতের আঁধারে পোস্ট অফিসে কোনো অঘটন ঘটেনিতো? কোনো চোর চোরট্টা সিন্দুক ভেঙে সরকারি ক্যাশ নিয়ে যায়নিতো। তড়িঘড়ি করে কম্বলের উষ্ণতা থেকে তিনি বেরিয়ে এলেন। গায়ে চাদর না জড়িয়ে শুধু গেঞ্জি গায়ে বাইরে এসে দাঁড়ালেন। প্রথম প্রথম কোন কিছুই তার বোধগম্য হলো না। তার মানে পরক্ষণে তিনি হতবাক, সামনে মানুষের একটা বৃত্তাকার জটলা আর জটলার মাঝে একটা ডোরাকাটা বাঘ। কেমন হাত পা এলিয়ে টানটান হয়ে শুয়ে আছে। আব্বা আরও কাছাকাছি এলেন। এবার তার ভারী নিঃশ্বাস বুক ঠেলে গলার কাছে আটকে গেল। বাঘের ঘাড়ে এক পা দিয়ে বীর বাহাদুরের মতো দাঁড়িয়ে আছেন তারই কর্মচারী বশির পোস্টম্যান। কেমন তালগোলে ব্যাপার। আব্বা আর স্থির থাকতে পারলেন না। বিষয়টা খোলাসা করতে বশির পোস্টম্যানকে জিজ্ঞেস করলেন, কী ব্যাপার বশির!
সবার দৃষ্টি এবার আব্বার দিকে। বৃত্তের এক অংশ ফাঁকা হয়ে গেল। বশির পোস্টম্যান সিংহ থেকে বিড়াল বনে গেলেন। মাথা নিচু করে বললেন, স্যার বাঘ! বাঘ মেরেছি আমি। আব্বার চোখে ধন্ধ। ফ্যাল ফ্যাল করে কিছুক্ষণ চেয়ে থেকে বললেন কোথায়? কেমন করে? সাথে কে ছিল?
– কেউ ছিল না, উত্তর দিলেন বশির পোস্টম্যান। ফজর নামাজ শেষে একাকী মেরেছি।
– কেমন করে! বিস্ময় যেন শেষ হচ্ছে না আব্বার চোখ থেকে। আবছা আলোতেও বশির পোস্টম্যানের চোখ জ্বলজ্বল করে উঠল। বললেন, আজ ডিউটি করতে গিয়ে দেখি সামনে একটা ডোরাকাটা জন্তু। পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছিল না। ভেবে ছিলাম কোনো বড়সড় বন বিড়াল হবে। কিন্তু গোঁ গোঁ আওয়াজে বুঝতে আর বাকি থাকল না। এতো এক জ্বলজ্যান্ত বাঘ। বুকটা কেঁপে উঠল। এখন কী করি? দৌড়াতে গেলেই তো মহা বিপদ। পিছন থেকে মটকে দেবে ঘাড়। কী করি! হঠাৎ বুকে কোত্থেকে সাহস পেলাম। অজানা শক্তিতে বললম ধরলাম। থরথর করে কেঁপে উঠল হাত। বাঘটা তখনও গোঁ গোঁ করে যাচ্ছে। চোখ রাঙাচ্ছে। যে কোনো সময় ঝাঁপিয়ে পড়বে। আর দেরি করলাম না। সর্বশক্তি দিয়ে বল্লমটা বসিয়ে দিলাম ওর বুকে। ফিনকি দিয়ে রক্ত বেরিয়ে এলো। একটা প্রচণ্ড ঝাঁকুনি। আক্রমণের চেষ্টা করল বাঘটি। কিন্তু ততক্ষণে বল্লমের ফলা আটকে গেল ওর দুই চোখের মধ্যিখানে। বাঘটি প্রচণ্ড দাপাদাপি শুরু করল। তারপর অপেক্ষার পালা। ধীরে ধীরে নিস্তেজ হয়ে পড়ল। বশির পোস্টম্যানের বাঘ শিকারের কাহিনি এখানেই শেষ। সেটা কোনো সাধারণ জাতের বাঘ ছিল না মেছো বাঘ, তা জানা যায়নি। তবে তার এই শিকার কাহিনি ছড়িয়ে পড়ল সারা কলিকাপুরে। শেষে পুরো মান্দা থানায়।
অতীত কাহিনি থেকে ফিরে এসে বশির পোস্টম্যানের দিকে তাকালাম। লক্ষ করলাম তিনি কেমন অসহায় দৃষ্টিতে চেয়ে আছেন। চোখে শিকারির কোনো চিহ্নই লক্ষ করা যাচ্ছে না। মুখটাও করুণ। মনে হচ্ছে ডিপার্টমেন্টের টাকা রক্ষা করাটাই তার মুখ্য বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু এ মুহূর্তে আমি কী করতে পারি? ডিপার্টমেন্টের প্রধান চেয়ার দখল করলেও আমার একটা সীমাবদ্ধতা আছে। সব ক্ষমতা হাতে নেই। অফিসের নিয়ম অনুসারে এ নোটগুলো পাস করবার এখতিয়ার আমার নেই। পাঠাতে হবে দাবি শাখায়। সেখানে যে ফলাফল শূন্য হবে, তা হলফ করে বলা যায়। তাহলে আমি কী করবো? অফিসের নিয়মটাই কি বলে দেব? উত্তর খুঁজে পাচ্ছি না। একটা ভালোবাসা, একটা শ্রদ্ধা ক্রমশ আমাকে বশ করে ফেলছে। অতীতের সিঁড়ি বেয়ে আমি ক্রমশ এগিয়ে যাচ্ছি। স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি আব্বা আম্মাকে। দেখতে পাচ্ছি তাদের সোনা ঝরা দিনগুলো আর তাদের বিশ্বস্ত বশির পোস্টম্যানকে। আব্বা আম্মা জান্নাতবাসী হলেও বশির পোস্টম্যান এখনও জীবিত। তিনি এখন আমার সামনে। তাহলে কি অতীত ভুলে গিয়ে আব্বা আম্মাকে উপেক্ষা করে বশির পোস্টম্যানকে ফিরিয়ে দেব? এতে কি বশির পোস্টম্যানের প্রতি সুবিচার করা হবে? এমনকি আব্বা আম্মার প্রতিও সুবিচার করা হবে? উত্তরটা মর্মান্তিক। হৃদপিণ্ডটা বুক চিরে বেরিয়ে আসতে চাইল। না না এমন অমানবিক আচরণ করা আমার পক্ষে ঠিক হবে না। পিতৃঋণ বলেতো একটা কথা আছে। তাহলে কী করতে পারি আমি? অনেকক্ষণ নির্বাক হয়ে থাকলাম। যেচে পড়ে উপকার করতে গিয়ে কী বিপদে না পড়ছি। হঠাৎ আমার চোয়াল শক্ত হয়ে এলো। একটা আলোর রেখা দেখতে পেলাম। অবশ্য সে পথে সাধারণত কেউ যেতে চান না। আমার অফিসের মহাব্যবস্থাপক মহোদয়ের বিশেষ একটা ক্ষমতা আছে। তিনি ক্ষেত্রবিশেষে তাৎক্ষণিকভাবে কোনো কোনো নোটের বিনিময়মূল্য দিতে পারেন। অবশ্য এটা ভিআইপিদের বেলায়। কিন্তু আমার সামনে তো একজন থানা পর্যায়ের পোস্টমাস্টার। তার জন্য কেন এ ঝুঁকি নেব? ভাবনার কোনো কূলকিনারা খুঁজে পাচ্ছি না। তাদেরকে ফেরত দেওয়াটাই যুক্তিসংগত বলে মনে হচ্ছে। আবার তাকালাম বশির পোস্টম্যানের দিকে। বুকের ভেতর কেমন যেন করে উঠল। কোনো এক শ্রদ্ধা ভালোবাসার টানে তলিয়ে যাচ্ছি। তাদেরকে মুখের ওপর না বলতে পারছি না। অবশেষে বুকের ভেতর সাহস সঞ্চার করলাম। আসলে মহাব্যবস্থাপক মহোদয় আমাকে ভীষণ পছন্দ করেন। দ্বিতীয়ত তিনি উদার মানবিক। গেলে হয়তো বিবেচনা করতে পারেন। অবশেষে ওদেরকে বসিয়ে রেখে গেলাম মহাব্যবস্থাপকের চেম্বারে। ভেতরে তখন প্রশাসনিক কর্মকর্তা কী যেন জ্ঞান দিচ্ছেন তাকে। সুযোগ পেলেই তিনি একা একা এমনি ঘুসুর ঘুসুর করেন। অফিসে দাবার ঘুঁটি চাল দেবার চেষ্টা করেন। তবে মহাব্যবস্থাপক মহোদয় অত্যন্ত নীতিবান। সহজেই ফাঁদে পা দেন না। আমাকে দেখা মাত্রই তিনি কথা বন্ধ করলেন। মৃদু হাসলেন। জানতে চাইলেন কোনো সমস্যা? ডিপার্টমেন্টে কোনো অসুবিধা। বললাম, না।
– তাহলে, তিনি চোখ ছোটো করে তাকালেন। বললাম, একটা দায়বদ্ধতা আমার ঘাড়ে চেপে বসেছে। এ কারণে আপনার কাছে এলাম। এখন যদি আপনি বিবেচনা করেন।
– কেমন, তিনি চোখ তুললেন কপালে।
আমি একটু সাহস ফিরে পেলাম। ফুলদানির তাজা গোলাপের দিকে দৃষ্টি রেখে বলতে লাগলাম। ব্যাখ্যা করলাম বিস্তারিত। তিনি কেমন নির্বাক ও নিশ্চল হয়ে গেলেন। তিনিও যেন ঐ গোলাপ পাপড়ির কোমলতায় হারিয়ে গেলেন। কিছু সময় আমার মুখের দিকে তাকিয়ে থেকে বললেন, নোটগুলো আপনি পরীক্ষা নিরীক্ষা করে দেখেছেন? বিনিময় মূল্য প্রদান করা যায় কি?
এবার পুরোপুরি সাহস ফিরে পেলাম। বললাম, হ্যাঁ দেখেছি। নব্বইভাগ নোটই সরাসরি প্রদানে অযোগ্য। তবে আপনার বিশেষ বিবেচনায় মূল্য প্রদান করা যেতে পারে।
আমার সরল কথায় মহাব্যবস্থাপক মহোদয় আবারও আমার মুখের দিকে তাকালেন। বললেন, আপনার ওপর আমার যথেষ্ট আস্থা আছে। আমি আর পরীক্ষা নিরীক্ষায় যাবো না। আপনি দায়মুক্ত হোন, আরও মানবিক হোন। এবার নোটগুলো দিন। স্বাক্ষর করে দিই। আধাঘণ্টা পর মহাব্যবস্থাপক মহোদয়ের চেম্বার থেকে বেরিয়ে এলাম। আজ আমি উল্লসিত। সব নোটই পাস করে দিয়েছেন মহাব্যবস্থাপক মহোদয়। মনে হচ্ছে আমার পিতা-মাতার ঋণ শোধ করতে পেরেছি আমি। বিনিময়মূল্য আর প্রাণ খোলা উল্লাস নিয়ে ঢুকলাম আমার চেম্বারে। ভেতরে প্রবেশ করে দেখি বশির পোস্টম্যান আর পোস্টমাস্টার দু’জনেই নির্বিকার। বিষণœ দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে মেঝের কার্পেটের দিকে। ফলাফল জানালাম। এবার তাদের ভেতর নতুন চেতনার সূচনা ঘটল। দুজনের মুখেই হাসির রেখা ফুটে উঠল। পোস্টমাস্টার উঠে দাঁড়ালেন। বিনিময়মূল্য নিতে নিতে বললেন, এভাবে যে আমি আমার অফিসের টাকা ফেরত পাবো তা কল্পনাও করতে পারছি না। সব আল্লাহ্র ইচ্ছা আর আপনার চেষ্টা। তারপর আবার চেয়ারে বসলেন। তৃপ্তির হাসিতে দেখতে লাগলেন আমাকে। যাব যাব করছিলেন। এমন সময় বললেন, স্যার একটা কথা। থমকে গেলাম আমি। আবার কী কথা থাকতে পারে? কৌতূহলী দৃষ্টিতে বললাম কী?
সঙ্কোচ কাটাতে তিনি কিছু সময় নিলেন বললেন, মনে কিছু নেবেন না। এ দুনিয়াতে আপন ভাই আপন ভাইয়ের খবর রাখে না। উপকার করতে চায় না। কিন্তু আপনি আমাদের জন্য এত কিছু করলেন কেন? একেবারেই খাঁটি কথা। এরকম উপকার পেয়ে প্রশ্নটা তিনি করতেই পারেন। এখন আমি কী উত্তর দেব? আসল কথাটা কি বলে ফেলা ঠিক হবে? ভাবনার কোনো কূলকিনারা না পেয়ে পোস্টমাস্টারের চোখের দিকে তাকালাম। লক্ষ করলাম তার চোখের মণি স্থির। অর্থাৎ আগ্রহ প্রবল। বশির পোস্টম্যানের মুখের দিকে তাকালাম। তিনিও কৌতূহলে তাকিয়ে আছেন। সুতরাং বলতে আর কোনো বাধা থাকল না। বললাম কারণটা অদ্ভুত। শুনলে আপনি হাসবেন।
– বলুন না স্যার, কী এমন কারণ, আগ্রহ ভরে তাকালেন তিনি।
এবার আমি বশির পোস্টম্যানের দিকে আঙুল তুলে বললাম, কারণটা আপনার সঙ্গীকে ঘিরে।
– তার মানে! পোস্টমাস্টারের চোখের মণি বেরিয়ে আসতে চাইল। বশির পোস্টম্যানের চোখের মণিও কাঁপতে লাগল। বিস্তারিত বললাম। তারপর উপসংহার টেনে বললাম, আপনার সঙ্গী যেমন একবার বাঘ শিকার করেছিল। আজ তেমনি আমাকেও শিকার করে ফেলেছেন। এ কারণে এত চেষ্টা তদবির। এবার বশির পোস্টম্যান আর বসে থাকতে পারলেন না। উঠে দাঁড়ালেন। ফোঁস ফোঁস করে কেঁদে উঠলেন। কিছুসময় পরে ধরা গলায় বললেন, জীবনে সুখ-দুঃখের ভেতর অনেকবার আনন্দ পেয়েছি। তবে আজকের মতো আনন্দ কোনোদিনই পাইনি। আমার জীবন সার্থক হলো। পরক্ষণে আমার মাথায় হাত বুলাতে বুলাতে বললেন, আপনি বেঁচে থাকুন। মহান আল্লাহ আপনার রুজি হায়াত বৃদ্ধি করে দিন। আপনি দীর্ঘজীবী হোন।
আমিও তার মঙ্গল কামনা করলাম। মনে হলো তার এই প্রীতি ও সৌহার্দ্য আমার জন্য নতুন ও গৌরবের।
ঐ দিকে পোস্টমাস্টারের মুখে কোনো ভাষা নেই। তিনি যেন গভীর আগ্রহে নতুন ও পুরাতনের মাঝে সম্প্রীতির বন্ধন দেখতে লাগলেন।

SHARE

Leave a Reply