Home স্বাস্থ্য কথা কিশোর বয়সে অনিদ্রা কারণ ও প্রতিকার -ডা. এহসানুল কবীর

কিশোর বয়সে অনিদ্রা কারণ ও প্রতিকার -ডা. এহসানুল কবীর

ঘুম আল্লাহ পাকের এক বড়ো নিয়ামত। একটা ঘুমহীন রাত কাটানো কত যে কষ্টের তা ভুক্তভোগী ছাড়া আর কে বুঝবে? জীবনের স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় ঘুম একটা বিশেষ অংশ। একটা আইরিশ প্রবাদ আছে, “A good laugh & deep sleep is the best cures in the Doctor’s book অর্থাৎ ডাক্তারদের ভাষ্য অনুযায়ী প্রাণবন্ত হাসি আর গভীর ঘুম সবচেয়ে ভালো রোগ নিরাময়কারী।” চিকিৎসাবিজ্ঞানীদের মতে, খাদ্যাভ্যাস ও ব্যায়ামের পরে আমাদের সুস্বাস্থ্যের তৃতীয় ভিত্তি হলো ঘুম। অল্প ও অগভীর ঘুম আমাদের শরীরের মধ্যে নানান জটিলতা তৈরি করে।

বড়োদের মতো কিশোরবেলায় তাই ঘুম বড়োই প্রয়োজন। বিশেষ করে এই বয়সে সারাটা দিন তাদের প্রচণ্ড ব্যস্ততায় কাটাতে হয়। যেমন- পড়াশুনার চাপ, কোচিং ক্লাসের চাপ, গানের ক্লাস, চিত্রাঙ্কন ক্লাসের চাপ, পরীক্ষার টেনশন, ভালো রেজাল্ট করার প্রতিযোগিতা, রোদে পুড়ে-বৃষ্টিতে ভিজে খেলাধুলার আনন্দ ইত্যাদি নানান কাজে দিনের অনেকটা সময় পার হয়ে যায়। পাশাপাশি শরীরের ওপর দিয়ে বয়ে যায় বাড়তি ঝক্কি। উপরন্তু ডিজিটাল এই যুগে মোবাইল গেম আর ইন্টারনেট আসক্তিতে কিশোরবেলার ঘুমের ১২টা বেজে যাচ্ছে। তাই অনিদ্রা এখন যেন তাদের নিত্যসঙ্গী। তাই এবার এই জরুরি বিষয়ে কিছু কথা বলতে চাই।

✪ অনিদ্রা বলতে কী বুঝায়?
এটা এমন একটা অবস্থা যে, একটা নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় ঘুমাতে না পারার ক্ষমতাই হলো অনিদ্রা। ইংরেজিতে একে ইনসোমনিয়া (ওহংড়সহরধ) বলে।

✪ ঘুমের উপকারিতা
একজন সুস্থ মানুষের দৈনিক ৬ থেকে ৮ ঘণ্টা করে ঘুমানো উচিত।
– ঘুমালে সারা শরীরের ক্লান্তি দূর হয়
– কাজে নতুন উদ্দীপনা তৈরি হয়, চিন্তাশক্তি বৃদ্ধি পায়, সৃজনশীলতা বাড়ে
– মনে প্রশান্তি থাকে, জীবনে শৃঙ্খলা ফিরে আসে
– হজমশক্তি বৃদ্ধি পায়, শারীরিক বৃদ্ধি ত্বরান্বিত হয়
– রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি পায়।

✪ অনিদ্রার কারণ
– অনিয়মিত ঘুমের রুটিনের কারণে বা ঘুমের প্যাটার্ন চেঞ্জ হলে
– বিছানা চেঞ্জ হলে বা বিছানা পছন্দ না হলে
– অধিক রাত অবধি পড়াশুনা করলে
– অধিক দিবানিদ্রা হলে
– কোনো দুঃসংবাদ শুনলে বা ঝগড়া-বিবাদ, মারামারি করলে
– পারিবারিক অশান্তি বা বন্ধুদের সাথে মনোমালিন্য হলে
– খাবারে অনিয়ম হলে
– অতিরিক্ত সময় ধরে মোবাইল গেম খেললে বা টিভি দেখলে
– শারীরিক কোনো সমস্যা থাকলে বা দীর্ঘমেয়াদি রোগ ভোগের কারণে।

✪ অনিদ্রার কুফল
– পড়ালেখায় অমনোযোগিতা, স্মৃতিশক্তি হারিয়ে যাওয়া, পরীক্ষার রেজাল্ট খারাপ হওয়া
– ক্ষুধামন্দা, ওজন কমে যাওয়া, শারীরিক বৃদ্ধি ব্যাহত হওয়া
– মাথা ব্যথা, শরীর ব্যথা হওয়া
– অস্বস্তি, হতাশা, উদ্বেগ সৃষ্টি
– বদহজম, গ্যাস্ট্রিকের সমস্যা
– উচ্চরক্তচাপ, ডায়াবেটিসের ঝুঁকি
– ত্বকের লাবণ্যতা কমে যায়, চেহারা কুশ্রী হয়ে যায়
– রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা হ্রাস পায়
– আত্মহত্যার প্রবণতা সৃষ্টি হতে পারে।

✪ সুনিদ্রার জন্য করণীয়
ঘুম একটা সর্বজনীন ব্যাপার। এটা যেন অনেকটা বিনামূল্যের একটা স্বাস্থ্যব্যবস্থা। তাই ঘুমের সমস্যা দেখা দিলে প্রথমেই চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া দরকার। কিছু থেরাপি, জীবনযাত্রার পরিবর্তন ও কিছু প্রাকৃতিক কৌশল অনুসরণের মাধ্যমে অনিদ্রা থেকে পরিত্রাণ পাওয়া যায়।
– প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময়ে ঘুমানোর চেষ্টা করা। একবার অভ্যাস চালু হয়ে গেলে ঘুমানোর জন্য আর হাপিত্যেস করার দরকার হবে না।
– ঘুমানোর আগে মানসিক চাপমুক্ত থাকতে হবে। সকল দুশ্চিন্তা আল্লাহ পাকের ওপর ন্যস্ত করে নিশ্চিন্ত মনে ঘুমিয়ে যেতে হবে।
– প্রতিদিন ঘুমানোর আগে হালকা ব্যায়াম করা যেতে পারে। এছাড়া বলা হয়ে থাকে যে, সপ্তাহে কমপক্ষে ৫ দিন ৩০ মিনিট করে শরীরচর্চা করলে ঘুমের মান ভালো হয়।
– রাতে ঘুমানোর ২/৩ ঘণ্টা আগেই রাতের খাবার খেয়ে নিতে হবে।
– শোবার ঘর আরামদায়ক করতে হবে ঘুমানোর উপযোগী করতে হবে।
– বিছানায় কম সময় কাটানো অর্থাৎ ঘুম ছাড়া অন্য কাজ করা উচিত না অর্থাৎ বিছানায় শুয়ে শুয়ে না পড়া, টিভি না দেখা, মোবাইল-ট্যাব-ল্যাপটপ কোনটাই চালানো উচিত নয়।
– খাদ্যাভ্যাসে কিছুটা পরিবর্তন আনা দরকার। যেমন- ঘুমানোর আগে চা-কফি পান না করাই উত্তম। তার বদলে ফল, মধু, দুধ খাওয়া যেতে পারে।
– জোর করে জেগে থাকার চেষ্টা না করা। কোনো কোনো সময় মনে হতে পারে যে আমার হাতের কাজ শেষ করে তারপর ঘুমাবো। এমনটি না করে বরং নির্দিষ্ট সময়ে ঘুমিয়ে পড়া উচিত।
– প্রতিদিন ঘুমানোর আগে একটা ভালো কাজ করা। যেমন- বই পড়া, কুরআন তেলাওয়াত করা, কোন বন্ধুকে ভালো একটা উপদেশ দেওয়া, আগামী দিনের জন্য ভালো একটা সঙ্কল্প করা ইত্যাদি।
– সবচেয়ে বড়ো কথা যে, নিদ্রা উদ্রেককারী ওষুধ সেবন করা থেকে দূরে থাকা। কারণ স্বাভাবিক ঘুমে মনে যেরকম প্রশান্তি পাওয়া যায়, ওষুধের মাধ্যমে সেটা হয় না। আর ওষুধে একবার অভ্যস্ত হয়ে পড়লে পরবর্তীতে ওষুধের ডোজ বাড়ালেও ঘুমটা যেন সেই অনিদ্রার সাগরেই হাবুডুবু খায়। আর সুনিদ্রা যেন সোনার হরিণের পিছে ছুটতেই থাকে।

SHARE

Leave a Reply