Home চিত্র-বিচিত্র জীবন্ত ফসিল -সাইদুল ইসলাম

জীবন্ত ফসিল -সাইদুল ইসলাম

প্রাণী বৈচিত্র্যের কিছু প্রজাতি কোটি কোটি বছর ধরে পৃথিবীর বুকে সফলভাবে টিকে আছে। এদের মধ্যে নাল কাঁকড়া বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। পৃথিবীর প্রথমদিকের জীবগুলোর মাঝে নাল কাঁকড়া অন্যতম।
এরা খুবই নিরীহ প্রাণী। উত্তর আমেরিকা মহাদেশের আটলান্টিক উপক‚লে এবং দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন উপক‚লে প্রচুর নাল কাঁকড়া দেখা যায়।
নাল কাঁকড়া আর্থ্রোপডা পর্বের অন্তর্গত অমেরুদণ্ডী প্রাণী, সারা পৃথিবীতে এদের চারটি প্রজাতি আছে। এদের প্রধান প্রজাতির আবাসস্থল উত্তর আমেরিকা মহাদেশ থেকে মেক্সিকো পর্যন্ত বিস্তৃত। বাকি তিন প্রজাতির কাঁকড়ার সন্ধান রয়েছে এশিয়ার দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে।
এত দীর্ঘ সময় পৃথিবীর বুকে বসবাস করার পরেও পূর্বপুরুষদের সাথে এদের শারীরিক গঠনে খুব কম পরিবর্তন সাধিত হয়েছে। এর কারণ হিসেবে বিজ্ঞানীরা জানান, এদের বিরূপ পরিবেশে বেঁচে থাকার ক্ষমতা অনেক বেশি। তাই তেমন কোনো বিবর্তন হয়নি।
নামে কাঁকড়া হলেও সমুদ্রের লবণাক্ত পানিতে এদের বসবাস। বসন্তের শেষ দিকে প্রজনন মওসুমে এরা দলে দলে উপক‚লে উঠে আসে।
বিজ্ঞানীরা বলেন, নাল কাঁকড়া প্রজাতিগত দিক থেকে কাঁকড়ার চেয়ে ভিন্ন। এরা বিভিন্ন মাকড়সা এবং বৃশ্চিকের সাথে বেশি সম্পর্কযুক্ত। কিন্তু দেখতে সামুদ্রিক কাঁকড়ার সাথে অনেকটাই সাদৃশ্যপূর্ণ।
এদের সারা দেহ শক্ত আবরণে ঢাকা। এদের ৫ জোড়া পা ও একটি লেজ আছে। নাল কাঁকড়ার মাথা দেখতে অনেকটা সৈনিকদের হেলমেটের মতো। নাল কাঁকড়ার সব মিলিয়ে ৯টি চোখ রয়েছে। এগুলোর মধ্যে প্রধান দুটো পুঞ্জাক্ষী রয়েছে। পুঞ্জাক্ষীগুলো মাথার সামনের দিকে থাকে। বাকিগুলো দেহের বিভিন্ন অংশে ছড়িয়ে থাকে। এগুলো মূলত আলোর উৎস বুঝতে সাহায্য করে।
এক একটা নাল কাঁকড়া স্বাভাবিক পরিবেশে গড়ে প্রায় ২০ বছর বাঁচে। স্ত্রী নাল কাঁকড়া আকারে পুরুষ নাল কাঁকড়ার চেয়ে প্রায় ২০ থেকে ৩০ শতাংশ বড়ো হয়। এদের দৈর্ঘ্য ৮০ সেন্টিমিটার পর্যন্ত হয়ে থাকে। এদের ওজন ৪ কেজি পর্যন্ত হতে পারে।
বসন্তের শেষ দিকে পুরুষ কাঁকড়ারা সমুদ্রের গভীর থেকে উঠে এসে সৈকতে অবস্থান করে। এরপর স্ত্রী কাঁকড়ার আগমনের অপেক্ষা। এরা বসন্তের শেষদিকে সৈকতের বালিতে ডিম পাড়ে। সেখান থেকে জন্ম নেয় নতুন কাঁকড়া।
এরা সাধারণত সৈকতের বালিতে ছোটো বাসা বানিয়ে ডিম পাড়ে এবং তা সংরক্ষণ করে। একটি স্ত্রী কাঁকড়া প্রায় দশ হাজার পর্যন্ত ডিম পাড়তে পারে। নানা রকম শামুক ও কৃমি নাল কাঁকড়ার প্রধান খাদ্য। এ ছাড়া এরা ছোটো ছোটো মাছ ও কাঁকড়াও খেয়ে থাকে। পৃথিবীর বুকে কোটি কোটি বছর অপরিবর্তিত রূপে টিকে থাকায় নাল কাঁকড়াকে জীবন্ত জীবাশ্ম হিসেবে গণ্য করা হয়।
বিজ্ঞানীদের মতে, প্রতিটি জীবের যেমন জন্ম ও মৃত্যু আছে তেমনই প্রতিটি প্রজাতির আছে আবির্ভাব ও বিলুপ্তি। বিবর্তনের পথ ধরে পুরনো প্রজাতির একাংশ থেকে নতুন প্রজাতির উদয় হয়। আবার প্রাকৃতিক ঘটনার অভিঘাতে অনেক প্রজাতির বিলুপ্তিও ঘটে।
যে প্রজাতিগুলো প্রকৃতির সাথে মানিয়ে নিতে দক্ষ তারাই কেবল কোটি কোটি বছর ধরে অপরিবর্তিত রূপে পৃথিবীর বুকে টিকে থাকতে পারে। ভ‚তাত্তি¡ক সময়ের বিচারে এই প্রজাতিগুলোকে সফল বলে ধরা যায়। নাল কাঁকড়া এমনই এক সফল প্রজাতি।
নাল কাঁকড়া ও অন্যান্য সুপ্রাচীন প্রজাতিগুলোর এতো দীর্ঘ সময় ধরে পৃথিবীতে টিকে থাকার রহস্য কী তা বিজ্ঞানীরা বিশ্লেষণ করে দেখেছেন।
পৃথিবীর প্রাচীনতম উদ্ভিদ প্রজাতি জিংকগো বিলোবা বৃক্ষের প্রাচীনতম যে ফসিল পাওয়া গেছে তার বয়স প্রায় ২৭ কোটি বছর। বিজ্ঞানীরা দেখেছেন, এই গাছটার কাঠের রয়েছে ক্ষতিকর পোকামাকড় প্রতিরোধ করার আশ্চর্য ক্ষমতা। এই ক্ষমতাই জিংকগোকে কোটি কোটি বছর ধরে পৃথিবীতে টিকে থাকতে সাহায্য করছে।
নাল কাঁকড়ার ব্যাপারটাও অনেকটা এরকম। প্রায় ৪৪৫ মিলিয়ন বছর ধরে বংশ পরম্পরায় পৃথিবীর বুকে টিকে থাকার জন্য নাল কাঁকড়ার নীল রক্ত গুরুত্বপূর্ণ ভ‚মিকা পালন করছে।
হিমোসায়ানিন নামের কপার-যুক্ত যৌগ থাকায় নাল কাঁকড়ার রক্তের রঙ নীল। এদের রক্তে থাকে অ্যামিবোসাইট নামক এক ধরনের অতি-শক্তিশালী রক্ষী কোষ। এ ছাড়াও নাল কাঁকড়ার রক্তে এমন কিছু দুর্লভ প্রোটিন রয়েছে যা যে কোনো আক্রমণকারী জীবাণুকে নিমেষের মধ্যে ঘিরে ফেলে নিকেশ করে দিতে পারে।
এই রক্তের অসাধারণ ক্ষমতাবলে নাল কাঁকড়ারা যেকোনো ধরনের ব্যাকটেরিয়া এবং বিষাক্ত পদার্থ থেকে নিজেদের রক্ষা করতে পারে। বিজ্ঞানীরা জানান, মেরুদণ্ডী প্রাণীরা সাধারণত হিমোগ্লোবিনে লৌহের উপস্থিতিকে কাজে লাগিয়ে রক্তে অক্সিজেন পরিবহন করে থাকে। কিন্তু এদের ক্ষেত্রে ব্যাপারটি সম্পূর্ণ আলাদা।
নাল কাঁকড়ার রক্তের এই অসাধারণ গুণের জন্য মানুষ প্রতি বছর প্রায় ৫০ হাজার নাল কাঁকড়া ধরে তাদের রক্ত বের করে নেয় এবং তা থেকে জীবাণু চিহ্নিতকরণের কাজে ব্যবহৃত লিমুলাস অ্যামিবোসাইট লাইসেট নামক পদার্থ তৈরি করে।
কোটি কোটি বছর ধরে পৃথিবীতে সফলভাবে টিকে থাকার পর বর্তমানে মানুষের এমন নির্মম কাজে নাল কাঁকড়ার মতো চমৎকার প্রাণী বিপদগ্রস্ত হয়ে পড়েছে। বিজ্ঞানীরা আশঙ্কা করছেন, খুব দ্রুত এই পদ্ধতির বিকল্প ব্যবস্থা আবিষ্কৃত না হলে হয়তো অদূর ভবিষ্যতে চরম বিপদের মুখোমুখি হতে হবে।

SHARE

Leave a Reply