Home গল্প সামিরা ও তার কাক বন্ধু পিকপিক -খাতুনে জান্নাত কণা

সামিরা ও তার কাক বন্ধু পিকপিক -খাতুনে জান্নাত কণা

সামিরা প্রতিদিন পশ্চিমের জানালার সামনে বসে থাকে। গল্প করে ওর প্রিয় বন্ধু কাক আর আমগাছটার সাথে। কাকের দুটো বাচ্চা হয়েছে। ওরাও এখন সামিরার বন্ধু। উড়ে এসে আমগাছটার ডালে বসে। সামিরা ওদেরকে নিজের ভাগের খাবার থেকে এটা ওটা খেতে দেয়। মা যখন ঠিক সাড়ে ৮টায় অফিসের উদ্দেশে বেরিয়ে যায়, সামিরা জানালার পর্দা সরিয়ে, মস্কিউটো নেট খুলে বসে পড়ে জানালার পাশের টেবিলটার ওপর। কত্তোরকম গল্প করে গাছ আর পাখিদের সাথে! বাবা খুব সকালে অফিসে চলে যান। মা তার একটু পরেই। এর মধ্যেই ওর ভাইয়া নাজাতও রেডি হয়ে স্কুলে চলে যায়। দাদী, চাচী আর চাচাতো ভাই-বোনরা যে যার মতো নিজেদের নিয়ে ব্যস্ত থাকে। কাজের মেয়েটা কিছুক্ষণ পর এসে ওকে খাইয়ে দেয়। সামিরা মন খুলে কাক আর আমগাছটার সাথে কথা বলে।
: জানো কাক, আমার আম্মু না অফিসে চলে গেছে। তোমরাও কি অফিসে যাও? যাও না? তাহলে বাবা, আম্মু, এরা যায় কেন? চলো, আম্মুর অফিসটা ভেঙে দিয়ে আসি। তুমি আর আমি একসাথে মুখোশ পরে যাবো। কেউ আমাদের চিনতেই পারবে না! এই গাছ, এত জোরে তোমার পাতা আর ডালগুলো বাতাসে নাড়াচ্ছো কেন? ভেঙে যাবে তো! ইস্! বাতাসে তোমার খুব কষ্ট হচ্ছে, তাই না? আমার মনেও অনেক কষ্ট। আম্মু শুধু আমাকে রেখে অফিসে চলে যায়। সামিরার কথা বলার ফাঁকে, কাজের মেয়েটা খাবার নিয়ে এসে হাজির হয়।
: সামিরা আপু আসো। তোমারে খাওয়ায়ে দেই।
: আমি এখন খাবো না। যাহ্।
: আসো না আপু, তোমারে সুন্দর একটা গল্প শুনামু।
: এই আন্না, বাতাসে গাছদের কষ্ট হয় না? ঐ যে এত বাতাস কেমন করে ডালগুলোকে নাড়াচ্ছে।
: হ্যাঁ- হয়। এহন বৃষ্টি আসবো। তাই জোরে বাতাস উঠছে। আসো, তোমার জন্য পরোটা আর গরম গরম চা নিয়ে আসছি। তুমি না পছন্দ করো?
: জানিস আন্না আমি একটা সুন্দর গল্প বানিয়েছি। শুনবি?
: শুনবো। আগে তুমি খাও।
: আচ্ছা, তুই তাহলে এখানে আয়। আচ্ছা আন্না আপু, তুমি আর আমি যদি গিয়ে আম্মুর অফিসটা ভেঙে দিয়ে আসি কেমন হবে?
: তোমার আম্মুরেতো তাইলে পুলিশে ধরবো।
: আমি আর তুমি মুখোশ পরে যাবো। দেখো, কেউ আমাদের চিনতেই পারবে না।
: কয়দিন পরে তুমি যহন সকালে স্কুলে যাবা, দেখবে তোমার আম্মুও তখন মন খারাপ করে বসে থাকবো। তুমিতো অনেক সকালে স্কুলে যাবা। আর তোমার আম্মু একটু পরে অফিসে যাবো।
: তখন আম্মু একা একা ভয় পেয়ে কাঁদবে, তাইনা? আমি যখন স্কুল থেকে ফিরবো, কাকরা কি আমার সাথে কথা বলবে?
: হ্যাঁ বলবে।
: আচ্ছা, আমরা নাকি নতুন বাসায় যাবো? সেখানে কি আমার কাক বন্ধুটা যাবে?
: তোমার সাথে তো দেখা করতে যাবোই। বাহ্! তুমিতো ল²ী আপু! সব খাওয়া শেষ। আমি আসি।
আন্না এতক্ষণ কথা বলার ফাঁকে সামিরাকে খাইয়ে দিচ্ছিল। সামিরার যখন রাগ হয়, বড়োদের মতো করে সেও আন্নাকে নাম ধরে ডাকে। তুই বলে সম্বোধন করে বসে। আন্না বুঝতে পারে সামিরা এখন রেগে গেছে। তাই খুব শান্তভাবে ওর সাথে কথা বলে। কথা বলতে বলতে সামিরা নিজে থেকেই ওকে আবার আপু বলে সম্বোধন করতে শুরু করে। আন্না চলে যাওয়ার পর সামিরা আবার একা হয়ে যায়। নাজাতের ছুটি হওয়ার পর বাসায় ফিরতে প্রায় দুপুর হয়। দেয়াল ঘড়িতে তখন বারোটার ঘণ্টা বাজতে থাকে। “ভাইয়াটা থাকলেওতো খেলাধুলা করা যেত। কেন যে ভাইয়া চলে যায়! নাজাত ভাইয়া আর আমি যখন একসাথে স্কুলে যাবো, খুব মজা হবে। আম্মু তখন আমাদের জন্য সকালবেলা একা বসে বসে কাঁদবে”, ভাবে সামিরা। দুপুরে আম্মু এলে এই কথাগুলোই তার গলা জড়িয়ে ধরে বলে।
: আচ্ছা আম্মু তুমি খেয়েই আবার অফিসে যাও কেন? একদিন অফিসে না গেলে কী হয়?
: অনেক সমস্যা হয় আম্মু, বড়ো হও, বুঝতে পারবে সব। তুমি সকালে নাশতা করেছো তো?
: হ্যাঁ করেছি। জানো আমি কাকটার নাম দিয়েছি পিকপিক।
: তাই নাকি? কোন কাক?
: আমার একটা কাক বন্ধু আছে। জানালা দিয়ে ওর সাথে কথা বলি।
: বাহ্! তাই নাকি?
: হ্যাঁ।
: সামনের রবিবার থেকে তুমিও স্কুলে যাবে। তোমাকে ভর্তি করে দেব। আজ কথা বলে এসেছি। দাদার সাথে তুমি আর তোমার ভাইয়া একসাথে স্কুলে যাবে। ভীষণ মজা হবে তাইনা?
: হ্যাঁ, তখন তুমি সকালবেলা একা ভয় পেয়ে কাঁদবে।
: হ্যাঁ তাইতো? তুমি আর নাজাত না থাকলে আমারতো ভীষণ ভয় লাগবে।
: হিহিহি! কী মজা! আম্মু ভয় পেয়েছে। শুনো, তুমি ভয় পেয়ো না। আমার কাক বন্ধু পিকপিক আছে না? ওর সাথে কথা বললেই দেখবে সব ভয় কেটে যাবে।
: তাই? সব ভয় কেটে যাবে?
: হ্যাঁ। আমার ভয় লাগলেই তো আমি ওর সাথে কথা বলি।
পরের সপ্তাহ থেকেই সামিরা নিয়মিত স্কুলে যেতে শুরু করল। স্কুল থেকে ফিরে সে আগের মতোই গাছ আর কাকের সাথে কথা বলে।
: জানো কাক, মিস আমাদের আজ কী পড়িয়েছে? টেডিবিয়ার, টেডিবিয়ার, টার্ন অ্যারাউন্ড, টেডিবিয়ার টেডিবিয়ার টাচ দ্য গ্রাউন্ড- হ্যাঁ হাতটাকে এমন করে, এমন করতে হবে। তোমারতো আবার হাতই নেই, তুমি কেমন করে বলবে? শুনো, আমরা সামনের মাসেই নতুন বাড়ি যাচ্ছি। তুমি যাবে আমাদের সাথে? তোমাকে আমি নিয়ে যাবো আচ্ছা?
গত মাসেই সামিরাদের বাসা বদলানো হয়। খিলগাঁ থেকে ক্যান্টনমেন্টে চলে আসে ওরা। এখানে এসে সামিরা খুব খুশি। নিচে খেলার মাঠ আছে। তিন তলা বাসার বারান্দায় দাঁড়ালেই পাখি দেখা যায়। এখানে বেশ কয়েকটা গাছও আছে। অল্প ক’দিনেই গাছগুলোর সাথে ওর বন্ধুত্ব হয়ে যায়। এ ছাড়া তিনটি চড়–ই পাখি আর দুটো দোয়েল ওর খুব ভালো বন্ধু। প্রতিদিন ওর হাতে খাবার খেয়ে যায়। কিন্তু, মাঝে মাঝে কাক বন্ধুটার জন্য ওর খুব মন খারাপ হয়। ইস্! যদি ওর কাক বন্ধুটা এখানে চলে আসতো! খুব মজা হতো।
সেদিন স্কুল থেকে ফিরে, ড্রেস চেঞ্জ করে, সামিরা জানালার পাশে বসে, আন্নার কাছে পরোটা খাচ্ছিল। এমন সময় কাকের ডাক শুনে চমকে উঠল।
: আন্না আপু দেখো আমার পিকপিক বন্ধু।
: অমা তাইতো!
: পিকপিক বন্ধুকে কিছু খেতে দাওতো। জানো পিকপিক বন্ধু, আমি তোমার কথা অনেক মনে করেছি। অমা, তুমি তোমার বাচ্চা দুটোকেও সাথে এনেছো তাই না? ওরাওতো বড়ো হয়ে গেছে। দেখো আন্না আপু, দেখো-
: তাইতো! যাই দাদীরে খবরডা দিয়ে আসতাছি।
: পিকপিক তুমি কেমন আছো? ওমা মাথা নাড়ছো? ভালো তাই না? আমরাও ভালো আছি। আমি এখন স্কুলে যাই। পড়াশুনা করি। ভাইয়া ড্রইংরুমে টিভি দেখছে আর খাচ্ছে। দাঁড়াও ডাকছি। ভাইয়া-ভাইয়া-।
নাজাত আর ওর দাদী একসাথে এসে হাজির হলো। সামিরার চাচাতো ভাই-বোনরাও এসেছে। সবাই অবাক বিস্ময়ে দেখল খিলগাঁর সেই কাকটিই, তার বাচ্চা দুটোকে নিয়ে জানালার সামনে বসে আছে। দাদী বললেন,
: ওমা, একি কাণ্ড? সামিরা বুবু তোমার বন্ধু দেখি সত্যিই চলে এসেছে!
নাজাত বলল,
: দেখো দাদী ওর গলার দাগটাওতো ওমনি আছে। অবাক কাণ্ড!
: হ্যাঁ, তোমরা জানো না ও আমার খুব ভালো বন্ধু? আমাকে খুব ভালোবাসে। তাই চলে এসেছে। আন্না আপু ওকে কিছু ভাত দাও।
: হ্যাঁ হ্যাঁ কাকটাকে কিছু খেতে দে।
দাদীও সামিরার কথায় সায় দিলেন। কাকটা যখন তার বাচ্চাদের নিয়ে খেতে শুরু করল, সামিরা আর ওর ভাই-বোনরা সব আনন্দে হাততালি দিয়ে উঠল। সবার মুখে হাসি দেখে সামিরার খুব ভালো লাগছিল। আজ সত্যিই এক মজার আর আনন্দের দিন। ইস্! আম্মু যে কখন অফিস থেকে ফিরবে! আম্মুকে কথাগুলো না বলা পর্যন্ত সামিরার কোনো স্বস্তি নেই।

SHARE

Leave a Reply