Home স্বপ্নমুখর জীবন সফলতা এক দীর্ঘ লড়াইয়ের পথ -আমিনুল ইসলাম ফারুক

সফলতা এক দীর্ঘ লড়াইয়ের পথ -আমিনুল ইসলাম ফারুক

জীবনে সফলতা সবাই চায়। কিন্তু সেই সফলতার জন্য নিজের মাঝে কী কী গুণাগুণ থাকা উচিত; সে ব্যাপারটা অনেকেরই অজানা থাকে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট আব্রাহাম লিংকন প্রমাণ করেছেন, জীবনে দীর্ঘ লড়াইয়ের মাধ্যমেই সফলতা আসে। জীবন চলার পথে হারের পর হার থাকে। ২৩ বছর বয়সে চাকরি হারান এবং রাজনীতিতে পরাজিত হন। ২৪ বছর বয়সে ব্যবসায় ব্যাপক লস করেন। ২৬ বছর বয়সে প্রিয়তমাকে হারান। ২৭ বছর বয়সে নার্ভাস ব্রেক ডাউন হয়। ২৯ বছর বয়সে স্পিকার পদে পরাজিত হন। ৩৪ বছর বয়সে কংগ্রেস প্রার্থী নির্বাচনে হেরে যান। ৩৯ বছর বয়সে আবার কংগ্রেস প্রার্থী নির্বাচনে হেরে যান। ৪০ বছর বয়সে ভূমি অফিসার পদ হারান। ৪৫ বছর বয়সে সিনেট নির্বাচনে হেরে যান। ৪৭ বছর বয়সে ভাইস প্রেসিডেন্ট প্রার্থী নির্বাচনে হেরে যান। ৪৯ বছর বয়সে আবার সিনেট নির্বাচনে হেরে যান। কিন্তু এত হারের পরও ৫২ বছর বয়সে তিনি হলেন আমেরিকার প্রেসিডেন্ট। আশ্চর্যের বিষয় হলো, এত হার বা পরাজয়ের পরও তিনি কখনো ভাবেননি রাজনীতি তার জন্য নয়। তার অদম্য ইচ্ছাশক্তির বলেই তিনি হতে পেরেছিলেন আমেরিকার সর্বকালের ইতিহাসে সবচেয়ে আলোচিত প্রেসিডেন্টের একজন। আব্রাহাম লিংকন আমাদের শিখিয়েছেন কীভাবে ব্যর্থতাকে হারাতে হয়। ব্যর্থতা মানে নিচে পড়ে যাওয়া নয়, নিচে পড়ে যাওয়ার পরে উঠে দাঁড়ানোর চেষ্টা না করা হলো ব্যর্থতা।

বিজনেস ইনসাইডারে প্রকাশিত বিবৃতিতে প্রযুক্তি দুনিয়ার অন্যতম পথিকৃৎ স্টিভ জবস বলেছেন, ৪০ পেরোনোর আগেই সফল উদ্যোক্তা হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করুন। প্রিয়তমার প্রতি প্রেম এবং কাজের প্রতি ভালোবাসার মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই বলেই মনে করতেন স্টিভ। জানা গেছে, বয়স ৪০ পেরোনোর আগেই স্টিভ বেশ কিছু নিয়ম মেনে চলতেন। জবসের মতে, বিশ্বাস এবং ভালোবাসা ছাড়া কাজ করলে কখনো সফল হওয়া যায় না। মনের মতো একটি কাজ বেছে নিন। তা হলে কাজের প্রতি ভালোবাসা আসবে।
দেখুন, স্টিভ জবস বিশ্বাস করতেন ছোটো ছোটো জিনিসও বহুমূল্য রাখে। নতুন নতুন আইডিয়া দারুণ একটা বিষয়। কিন্তু এর নিয়মতান্ত্রিক বাস্তবায়ন এবং ভিন্ন বিষয় একতাবদ্ধকরণ ছাড়া সফলতা সম্ভব নয়। স্মার্টফোনে কলম ব্যবহারের জন্য স্টাইলাস এখন কে চান? কেউই তা আর ব্যবহার করতে চান না। কিন্তু এমন একটি জিনিসকে সরিয়ে দিলে তা হারিয়ে যাবে। খুব সাধারণ একটি যন্ত্র। কিন্তু বহু কাজকে সহজ করে দিয়েছে একটি স্টাইলাস। কাজকে সহজ করতে একটি সাধারণ উপাদানও বহু প্রয়োজনীয়। ক্রেতার চাহিদা তাৎক্ষণিক তৃপ্তি দেয়। বহু প্রযুক্তির মিশেলে একটি প্রতিষ্ঠান দাঁড় করাতে চাইলে প্রয়োজন নিয়মশৃঙ্খলা। কারণ এটি ছাড়া বছরের পর বছর উদ্ভাবনী শক্তিকে কাজে লাগানো যাবে না বলেই মনে করতেন স্টিভ।
যেকোনো দু’টি ধারাকে এক করতে যারা চান, তারাই সফল হতে পারেন। স্টিভের তিন বছর লেগেছে নেক্স কম্পিউটার বানাতে। কিন্তু ক্রেতারা তা চাননি। তারা এমন জিনিস চেয়েছিলেন, যা এক বছর হয়তো ব্যবহার করতে ভালো লাগত। কিন্তু তারপর আর চাহিদা থাকত না। তাই ক্রেতার চাহিদা সব সময় ঠিক হয় না। ব্যবসায়ের এই মূলমন্ত্র ধারণ করতেন স্টিভ। ক্রেতার চাহিদাকে নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা করতে হবে। ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে এবং ক্রেতার দীর্ঘদিনের তৃপ্তির কথা বিবেচনা করে এগোতে হবে আপনাকে। নয়তো দীর্ঘমেয়াদে সফলতা ধরে রাখতে পারবেন না। জবস ঠিকই মনে করতেন, প্রযুক্তি এগিয়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আমাদের শিক্ষার ধরনও পাল্টে গেছে। মানুষের প্রতি আপনার বিশ্বাস থাকতে হবে। কারণ একমাত্র মানুষই স্মার্ট এবং বুদ্ধিমান। তাদের হাতে প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি তুলে দিলে তারা যেন বিস্ময়কর সব কাজ করে দেখাতে পারে। এ ধারণায় বিশ্বাসী ছিলেন স্টিভ। সত্যিকার অর্থেই আজকের প্রযুক্তিগত উন্নয়ন মানুষ ছাড়া সম্ভব হতো না। তাই বিনিয়োগকারী, কর্মী বাহিনী এবং ক্রেতার প্রতি বিশ্বাস রাখতে হবে।
সফলতার যদি কোনো গোপন রহস্য থেকে থাকে তবে সে সম্পর্কে হেনরি ফোর্ড বলেছেন, অন্যের দৃষ্টিভঙ্গিকে বুঝতে পারা এবং তার সমস্যাগুলো তার চোখ দিয়ে তার মতো করেই দেখতে পারা যেমনটা আমরা নিজের সমস্যাকে দেখতে পাই; সেটাই সফলতার গোপন মন্ত্র।
কার্নেগির মতে, সফল মানুষ অন্য মানুষকে ভুল পথ দেখিয়ে ভ্রান্ত করে না; বরং সঠিক পথ দেখিয়ে তার উপকার করে। ১৯৩৬ সালে ডেল কার্নেগির ‘How to win friends and influence people’ নামক বইটি প্রকাশিত হয়। মানুষের মনস্তত্ত¡ বুঝতে হলে এই বইটির জুড়ি নেই বলে আজও ধারণা করা হয়। বইতে কার্নেগি লিখেছেন, সফল হওয়ার জন্য প্রথমে একজন ভালো বন্ধু হোন আপনার আশপাশের সবার। আপনার জনপ্রিয়তা ক্যারিয়ারেও আপনাকে সফলতা এনে দেবে।
ডেল কার্নেগির মতে, মানুষকে প্রভাবিত করার সবচেয়ে ফলপ্রসূ উপায় হলো তাদের জীবনের না পাওয়াগুলো নিয়ে কথা বলা এবং তাদের সঠিক পথ দেখানো।
আপনার চারপাশের মানুষকে আপনি যত বুঝতে পারবেন; তত তাদের প্রয়োজন কী, চাহিদা কী, এই বিষয়গুলো আপনার নখদর্পণে চলে আসবে।
কার্নেগির মতে, যার আত্মনিয়ন্ত্রণ সম্পন্ন ব্যক্তিত্ব রয়েছে; সে অন্যকে বোঝার এবং ক্ষমা করার মানসিকতা রাখে। অপরপক্ষে বোকারাই সমালোচনা, অভিযোগ আর নিন্দা করে সময় নষ্ট করে। কার্যক্ষেত্রে আপনার সহকর্মী বা নি¤œপদস্থদের চাহিদা বুঝে আপনি এগিয়ে যেতে পারবেন। আপনি যদি সমালোচনার পথ বেছে নেন; তা হলে অন্যের ভুলগুলো আরো বেশি চোখে পড়বে। আপনার প্রতিযোগী থাকবেই। নিন্দা না করে বরং ভালো সম্পর্ক গড়ে তুলুন তাদের সঙ্গে। যেকোনো প্রতিষ্ঠানে মূল কাজ তুলে আনেন কর্মীরা। তাদের কাজের সঠিক প্রশংসা করুন। তবে অবশ্যই একজনকে ছোটো করে আরেকজনের প্রশংসা করবেন না। আপনার এই অভ্যাস আপনার কর্মীদের মধ্যে আন্তরিকতা বজায় রাখার পাশাপাশি আপনার প্রতিটি প্রজেক্টে কাজের গতি বাড়িয়ে এনে দেবে সফলতা। সফল মানুষ তাদের কর্মীদের ভালো কাজের প্রশংসা করেন মন খুলে। তাদের যোগ্যতার মূল্যায়ন করেন, দেন প্রাপ্য সম্মান এবং সম্মানী। কার্নেগি দেখেছেন, যোগ্যতার মূল্যায়ন মানুষের কর্মক্ষমতা বাড়িয়ে দেয়। একই সঙ্গে অনবরত সমালোচনা একটা মানুষের স্বপ্নকে ধ্বংস করে দিতে যথেষ্ট। উপযুক্ত সম্মান মানুষের বিশ্বস্ততা বাড়ায়, আনুগত্য বাড়ায়। (চলবে)

SHARE

Leave a Reply