Home গল্প তোমাদের গল্প স্বর্ণ চাষ -জুয়েল আশরাফ

স্বর্ণ চাষ -জুয়েল আশরাফ

কভুম্বর নামে এক রাজা। সে খুব কৃপণ। দান খয়রাত থেকে অনেক দূরে থাকে সে। মানুষের প্রয়োজন মেটাতে একটা টাকাও দেয় না। তার কাছে সোনা-রূপার বিশাল পাহাড়, কিন্তু কাউকে সাহায্যও করে না।
রাজার প্রাসাদ থেকে কিছু দূরে ঈদ্রিস নামে এক বৃদ্ধের ছোট্ট কুঁড়েঘর। ঈদ্রিসকে সবচেয়ে বুদ্ধিমান মানুষ হিসাবে জানে সবাই। সে রাজার স্বভাব নিয়ে বিরক্ত ছিল। তাই সে রাজাকে একটি শিক্ষা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিলো।
একদিন সে তার বন্ধুদের কাছ থেকে চারটি ক্ষুদ্র স্বর্ণ ধার করল। তারপর কাছাকাছি প্রবাহিত নদীর তীরে বসল। সে হলুদ চকচকে একটি বড়ো ছাঁকনিতে সেই সোনার টুকরাগুলো রাখল।
রাজা প্রতিদিন এই নদীতে গোসল করতে আসে। ঈদ্রিস দূর থেকে রাজাকে আসতে দেখল। সে এমনভাবে কাজ করতে শুরু করল যেন সে ছাঁকনি দিয়ে কিছু ছেঁকে নিচ্ছে। রাজা তার কাছে এসে জিজ্ঞেস করল, ঈদ্রিস, তুমি কী করছো? কেন এত সকালে বালি ছাঁকার দরকার হলো?
ঈদ্রিস বলল, রাজা সাহেব, আমি এই বালিতে লুকানো সোনা খুঁজছি।
রাজা কিছু বলার আগেই ঈদ্রিস বালির ছাঁকনি বের করে ছাঁকতে লাগল। চারটি ছোটো স্বর্ণের টুকরা ঝলমল করে উঠল ছাঁকনির ওপরে।
রাজা অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল, বালিতে স্বর্ণ! কীভাবে তুমি পেলে?
ঈদ্রিস বলল, রাজা সাহেব, আজ থেকে এক মাস আগে, আমি এই জায়গায় এক টুকরা সোনা লাগিয়েছি। দেখুন, চারটি টুকরা বেরিয়ে এসেছে। যদি আমি আরও পরিশ্রম করি, তাহলে আমি এখানে অনেক স্বর্ণের টুকরা পাব।
রাজা হতভম্ব হয়ে বলল, কী বলছো! সোনা কি চাষ করা যায়?
ঈদ্রিস বলল, রাজা সাহেব, কেন যাবে না? আপনি নিজেই দেখুন। আমি একজন গরিব মানুষ। এভাবেই আমি গত দশ বছর ধরে সোনা বপন করি এবং তুলছি। এই দিয়ে আমার সংসার চলে যায়।
রাজা রাগী স্বরে বলল, আমাকে আগে বলোনি কেন? আমার কাছে এক গাদা সোনা আছে। যদি আমি জানতাম, তাহলে আমি সমস্ত সোনা বপন করতাম। আমার প্রাসাদ সোনায় ভরা থাকে।
ঈদ্রিস বলল, রাজা সাহেব, খুব বেশি দেরি হয়নি। তুমি এখনও সোনার চাষ শুরু করতে পারো। ছয় মাস পরে দেখবে তোমার সোনার ফসল হবে।
রাজা ঈদ্রিসের কাঁধে হাত রেখে বলল, ঈদ্রিস দেখো, তুমি একজন জ্ঞানী মানুষ। তুমি আমার পক্ষ থেকে সোনা চাষ করো। তুমি এর জন্য যতটা সোনা প্রয়োজন নিতে পারো। আজ আমার সঙ্গে রাজপ্রাসাদে এসো। তুমি এই কাজের জন্য আমার চাকরদেরও সঙ্গে নিতে পারো।
ঈদ্রিস এই সুযোগের অপেক্ষায় ছিল। সে সঙ্গে সঙ্গে রাজি হয়ে গেল। সে প্রাসাদে গিয়ে অনেক সোনার টুকরা নিয়ে এলো। রাজা তার দশজন চাকরকে ঈদ্রিসের সাহায্যের জন্য দিলো।
শিগগিরই নদীর তীরে খননকাজ শুরু হলো। ঈদ্রিসের নির্দেশ মতো চাকররা সেখানে বীজের মতো সোনা বপন করল। ওপরে বালি দিয়ে ঢেকে রাখল। ঈদ্রিস রাজাকে আশ্বস্ত করল যে, ছয় মাস পর সে স্বর্ণবীজের তিনগুণ সোনা পাবে।
এদিকে, ঈদ্রিস প্রতিদিন রাতে নদীর তীরে যাওয়া শুরু করল। সেখানে সে প্রতিদিন একটু অংশ খনন করে আর সেখানে রাখা স্বর্ণটি তার ব্যাগে রাখে। পরেরদিন সকালে সে সমস্ত স্বর্ণ দরিদ্রদের মধ্যে বিতরণ করে। ধীরে ধীরে মানুষের দারিদ্র্য দূর হতে থাকে।
রাজা অপেক্ষা করছিল কখন ছয় মাস শেষ হবে। আর তিনগুণ সোনা পাবে। ধীরে ধীরে ছয় মাসও কেটে গেল। রাজা ঈদ্রিসকে রাজপ্রাসাদে ডেকে পাঠাল। তাকে সমস্ত সোনা খনন করার আদেশ দিলো।
ঈদ্রিস কিছু চাকরকে এই কাজের জন্য বলল। এবার রাজা তার সঙ্গে বিশ জন চাকর নিলো। চাকররা জায়গাটিকে খনন করল। বালি ছাঁকতে লাগল, কিন্তু প্রত্যেকেই অবাক হয়ে দেখল যে এর মধ্যে দুই-চারটি সোনা ছাড়া আর কিছুই নেই।
ঈদ্রিস দৌড়ে গেল রাজার কাছে। কাঁদতে কাঁদতে বলল, রাজামহাশয়, তোমার ভাগ্য খারাপ। দুই-চারটি শুকনো সোনার টুকরো ছাড়া মাটিতে কিছুই বের হয়নি।
রাজা অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল, শুকনো টুকরা! তুমি কী বোঝাতে চাচ্ছো?
ঈদ্রিস বলল, হ্যাঁ রাজা সাহেব, এবার সব সোনা শুকিয়ে গেছে। তুমি জানো, এবার মোটেও বৃষ্টি হয়নি। পুরা ফসল শুকিয়ে গেছে। এবার তুমি সব স্বর্ণ হারিয়েছ।
রাজা ধমক দিয়ে জিজ্ঞেস করল, সোনা কীভাবে শুকিয়ে যাবে? এটি একটি কঠিন জিনিস।
ঈদ্রিস মুচকি হেসে বলল, রাজা সাহেব, তুমি বিশ্বাস করেছো যে সোনা বপন করা যায়, সোনা চাষ করা যায়। তাহলে তুমি কেন এটা বিশ্বাস করো না যে সোনা শুকিয়ে গেছে?
রাজা হতভম্ব হয়ে গেল। মন্ত্রীদের সঙ্গে পরামর্শ করল। মন্ত্রীরা বলল, ঈদ্রিস ঠিক বলেছে। প্রকৃতপক্ষে, যদি সোনা বপন করা যায়, তা শুকিয়েও যেতে পারে।
রাজা আর কিছু বলতে পারল না। মাথা চেপে ধরে বসে থাকল। ঈদ্রিস কৃপণ রাজাকে একটি ভালো শিক্ষা দিয়েছে।

SHARE

Leave a Reply