Home স্বাস্থ্য কথা কৈশোরের চুলপড়া রোগ -ডা. এহসানুল কবীর

কৈশোরের চুলপড়া রোগ -ডা. এহসানুল কবীর

সব বয়সেই কমবেশি চুল পড়ে এবং স্বাভাবিক নিয়মেই তা পূরণ হয়ে যায়। মেডিক্যালের ভাষায় চুলপড়াকে ‘এলোপেসিয়া’ বলে। আমাদের চুল সাধারণত ১ হাজার ১শত ১০ দিন বাঁচে। তারপর মারা যায় অর্থাৎ ঝরে পড়ে। প্রতিদিন ১০০ থেকে ১৫০টা চুল ঝরে পড়ে আবার প্রতিদিন ১০০ থেকে ১৫০টা চুল নতুন করে গজায়। এটাই স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। তবে এর বেশি চুল পড়লেই সমস্যা। কিন্তু কৈশোরে চুল পড়তে থাকলে সেটাতো হয় আরেক ঝামেলার ব্যাপার। তবে আশার বিষয় হলো, কিশোর বয়সে চুল পড়লে খুব একটা চিন্তার কিছু নেই। কারণ এটা সাময়িক এবং প্রাকৃতিক ব্যাপার মাত্র। যথাযথ যতেœর মাধ্যমে কিছু সময়ের ব্যবধানে তাদের চুলপড়া বন্ধ হয়ে যায়।

কিশোর বয়সে চুলপড়ার কারণ কী?
চুলের কোষের নির্দিষ্ট একটা জীবনচক্র আছে। সেটা হলো-বৃদ্ধি পর্ব, স্থায়িত্ব ও পরবর্তীতে ঝরে যাওয়া। কিন্তু কখনো কখনো সেই জীবনচক্র বিঘিœত হয় বিভিন্ন কারণে। একেক বয়সে সেটা হয় একেক কারণে। তেমনি কৈশোরে চুলপড়ার কারণগুলোও একটু ভিন্ন ও বিচিত্র প্রকৃতির। যেমন-
১. হরমোনাল কারণ : কিশোর বয়সে শারীরিকভাবে অনেক রকমের হরমোনের আধিক্য ও পরিবর্তন সাধিত হয়, যার প্রভাবে সাময়িকভাবে চুল পড়তে পারে। তবে কিছু সময়ের ব্যবধানে এই সমস্যা আর থাকে না।
২. অতিরিক্ত মানসিক চাপ : এই আবেগী বয়সটাতে অকারণে মাথায় অতিরিক্ত টেনশন চেপে বসে। ফলে অনিদ্রা, ক্ষুধামন্দা ইত্যাদির কারণে মাথার ত্বকে অক্সিজেন সরবরাহ কমে গিয়ে রক্ত চলাচল কমে যায়। চুলের গোড়ায় পুষ্টি কমে গিয়ে তখন চুলপড়া শুরু হয়।
৩. ওষুধের কারণে : এই বয়সে কিছু ওষুধ গ্রহণের ফলেও চুল পড়তে পারে। বিশেষ করে কৈশোরে জেগে ওঠা ব্রণের চিকিৎসায় গৃহীত ওষুধের পার্শ্ব-প্রতিক্রিয়ার কারণেও সাময়িকভাবে চুল পড়তে পারে।
৪. পুষ্টির অভাবে : এই বয়সে পুষ্টির চাহিদা বেশি থাকে। বিশেষ করে প্রোটিন, আইরন, ভিটামিন-ডি, ভিটামিন-বি-১২, ম্যাগনেশিয়ামের ঘাটতি দেখা দেয়। যার ফলে চুলের গোড়া ঢিলা হয়ে চুলপড়া শুরু হয়।
৫. বেশি হেয়ার স্টাইলিং : জীবনের এই সময়টাতে চুলের বেশি বেশি স্টাইলিং ও ফ্যাশন করার প্রবণতা থাকে। হেয়ার জেল, বিভিন্ন রকমের তেল, হেয়ার কালার ইত্যাদি চুলের স্টাইলিংয়ের জন্য ব্যবহার করে। এছাড়া মাথায় গরম তাপ দিয়ে চুল সোজা বা কোঁকড়ানো করা যা চুলের স্থায়ী ক্ষতি করতে পারে। তা ছাড়াও বিভিন্ন স্টাইলে চুল কাটার ফলে অকালে চুল ঝরে পড়তে পারে।
৬. ধূমপান বা মাদকাসক্তি : এটাও একটা কারণ বটে। এই বয়সে অনেক কিশোর খারাপ পরিবেশের কারণে মাদক বা ধূমপানে আসক্ত হয়ে পড়ে এবং অকালে তাদের চুল পড়তে থাকে। কারণ ধূমপানে রক্তনালী সরু বা ব্লক হয়ে যায় এবং লোমকূপগুলো পুষ্টি পায় না এবং চুল পড়তে শুরু করে।
৭. খুশকির কারণে : কৈশোরে মাথার চুলে খুশকির উপদ্রব বেশি হয় বিধায় চুল বেশি ঝরতে থাকে।
৮. এন্ড্রোজেনেটিক বা বংশগত কারণ : বিভিন্ন জরিপে দেখা যায় যে, চুলপড়া রোগীদের প্রতি পাঁচজনের মধ্যে একজনের পারিবারিকভাবে চুলপড়ার রোগ রয়েছে।
৯. অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস : শহুরে ছেলেরা ফাস্টফুডে বেশি অভ্যস্ত হওয়ায় অকালে তাদের চুল ঝরে পড়ছে। কারণ ফাস্টফুডে ফ্যাট ও কার্বোহাইড্রেট বেশি থাকে যা চুলপড়াকে ত্বরান্বিত করে।
১০. পানির সমস্যা : বিশেষ করে শহরের সাপ্লাইয়ের পানিতে ক্লোরিনের মাত্রা বেশি থাকে যার ফলে অকালে চুল পড়তে থাকে।
১১. দীর্ঘ কোনো রোগ ভোগের কারণেও চুল পড়তে পারে। যেমন- অ্যাজমা, যক্ষ্মা, ক্যান্সার, টাইফয়েড ইত্যাদি।

করণীয় কী?
চুলপড়া চিকিৎসার জন্য প্রথমেই এর কারণটা খুঁজে বের করে সে অনুযায়ী চিকিৎসা করতে হবে। তবে কৈশোরের চুলপড়ার চিকিৎসার জন্য তেমন কিছু করা লাগে না। একটা সময়ের ব্যবধানে এমনিতেই চুলপড়া বন্ধ হয়ে যাবে। মূলত শরীরে হরমোনের অত্যধিক কার্যকারিতা কমে আসলে চুলপড়াটাও ক্রমশ বন্ধ হয়ে যায় বৈকি। তবে কিছু কিছু ক্ষেত্রে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়ার দরকার হয় এবং এর জন্য কিছু টেস্ট করাও লাগতে পারে। প্রয়োজনে খাদ্যাভ্যাসটাও চেঞ্জ করা লাগতে পারে। কারণ অস্বাস্থ্যকর খাদ্যের প্রভাব হরমোনের ওপর গিয়ে পড়ে। তাই খাবারটা যেন স্বাস্থ্যসম্মত ও সুষম খাবার হয় সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। চুলের অতিরিক্ত স্টাইলিং কমাতে হবে। যদি ধূমপায়ী বা মাদকাসক্ত হয়ে থাকে তাহলে সেটাও পরিত্যাগ করতে হবে। দৈনিক নিয়মিত ৪০ মিনিট শরীরচর্চা করা দরকার। কিশোরবেলায় ঘাম বেশি হয় এবং শরীর বেশি পানিশূন্য হয়ে পড়ে বিধায় চুল পড়তে পারে। তাই দৈনিক ৮-১০ গ্লাস পানি পান করা উচিত। সপ্তাহে ১-২ বার চুলে শ্যাম্পু করে চুল ও মাথার ত্বক পরিষ্কার রাখা উচিত। তাই বলে অতিরিক্ত শ্যাম্পু করা ঠিক নয়। কারণ চুল হচ্ছে প্রোটিন আর শ্যাম্পু হচ্ছে অ্যালকালিক বা ক্ষার। প্রোটিন আর ক্ষারের বিক্রিয়ায় চুলের প্রোটিন ভেঙে যায় এবং অকালে চুল ঝরে পড়ে। স্যালুনে গিয়ে মাথা ম্যাসাজ বা স্পার মত ভারী কাজগুলো পরিত্যাগ করতে হবে। উল্লেখ্য, নতুন চুল গজানোর জন্য মাইনক্সিডিল লোশন রোজ রাতে আঙুলের ডগায় নিয়ে চুলের গোড়ায় মালিশ করা যেতে পারে। এতে ভালো ফল পাওয়া যেতে পারে। এ ছাড়া ভিটামিন-ই ক্যাপসুলের তরলটা চুলের গোড়ায় মালিশ করলে সেখানে রক্ত চলাচল বৃদ্ধি পায় এবং চুলপড়া রোধ হয়। উল্লেখ্য, ভেজাচুল বা তৈলাক্ত চুল চিরুনি দিয়ে আঁচড়ানো উচিত নয়। কারণ এই সময়ে চুলের গোড়া ভেজা ও নরম থাকে বিধায় চুলপড়ার সম্ভাবনা থাকে বেশি। মনে রাখতে হবে যে, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই চুলপড়া রোগের স্থায়ী বা দ্রুত কোনো সমাধান নেই। কাজেই সবরই শ্রেষ্ঠ সমাধান আর বেশি কিছু আশা করা ভুল

SHARE

Leave a Reply