Home বিজ্ঞান ও বিশ্ব শীতলতম মানব শহর -ফয়সাল অহমেদ

শীতলতম মানব শহর -ফয়সাল অহমেদ

শীতকালে তাপমাত্রা ১০-১২ ডিগ্রি হলেই জীবনধারণ কঠিন হয়ে পড়ে। সেখানে যদি তাপমাত্রা মাইনাস সত্তর ডিগ্রির নিচে হয় তাহলে কেমন হবে! অসম্ভব মনে হলেও পৃথিবীতে এমন শীতল স্থান রয়েছে এবং সেখানে মানুষ বসবাস করছে।
বলছিলাম অয়মিয়াকনের কথা। সেন্ট্রাল সাইবেরিয়ার এই ছোট্ট শহরে শীতে তাপমাত্রা নেমে যায় শূন্যের চেয়ে ৭০ ডিগ্রিরও বেশি নিচে। অর্থাৎ ডিপফ্রিজে যে তাপমাত্রা থাকে, তার তিন-চার গুণ তাপমাত্রা কম এখানে। যেন পৃথিবীর সবচেয়ে বড়ো ডিপফ্রিজে বাস করছেন সেখানকার মানুষ। সাধারণত ডিপ ফ্রিজের তাপমাত্রা থাকে মাইনাস ১৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস আর শীতকালে এই শহরের স্বাভাবিক তাপমাত্রা মাইনাস ৪৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস। এখানে চোখের পাতা জমে বরফ হয়ে যায় নিমিষে।
পৃথিবীর অদ্ভুত শহরগুলোর মধ্যে অন্যতম রাশিয়ার উত্তর-পূর্বে সাকা রিপাবলিকে অবস্থিত সেন্ট্রাল সাইবেরিয়ার ছোট্ট শহর অয়মিয়াকন যা মতভেদে পৃথিবীর শীতলতম শহর হিসেবে পরিচিত।
পৃথিবীর শীতলতম শহর হওয়ার পিছনে অনেক কারণ রয়েছে তার মধ্যে অন্যতম হলো এর ভূ-প্রকৃতির এক বিশেষ অবস্থা। অয়মিয়াকন সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ৭০০ মিটার উঁচুতে অবস্থিত। এর আশপাশে কোনো সমুদ্র না থাকার জন্য চরম ভাবাপন্ন শীতল তাপমাত্রা প্রশমিত হতে পারে না। তা ছাড়া এই বসতি এক উপত্যকার অত্যন্ত নিচের দিকে অবস্থিত।
দুটি পর্বত শ্রেণির মধ্যবর্তী অঞ্চলে অবস্থিত হওয়ায় এখানকার ঠান্ডা বাইরে যেতে পারে না। তাই একে বলা হয় পৃথিবীর সবচেয়ে শীতলতম শহর।
অয়মিয়াকন নদীর নামে এর নামকরণ করা হয়। সাইবেরিয়ান আঞ্চলিক ভাষায় অয়মিয়াকন অর্থ যে পানি কখনো জমে যায় না।
এই নদীর তলদেশে একটি প্রাকৃতিক উষ্ণ পানির প্রবাহ থাকায় নদীর উপরিভাগের পানি জমে বরফ হয়ে গেলেও নিচের যে উষ্ণ পানি তা সবসময় তরল হয়ে থাকে।
এটি অত্যন্ত দুর্গম এলাকা। অয়মিয়াকনের সবচেয়ে নিকটবর্তী শহর থেকে এখানে পৌঁছাতে সময় লাগে টানা দুই দিন দুই রাত।
সোভিয়েত আমলে জোসেফ স্ট্যালিন তৎকালীন জেলে বন্দী থাকা রাজনৈতিক বন্দীদেরকে শ্রমিক হিসেবে ব্যবহার করে এই রাস্তা তৈরি করেন।
চরম প্রতিকূল আবহাওয়ায় এই রাস্তা তৈরির সময় প্রায় ১০ লাখের বেশি মানুষ মারা গেছে। কাজ করতে করতে যারা মারা যেত তাদেরকে রাস্তার মধ্যেই সমাহিত করা হয়। এজন্য এই রাস্তাকে বলা হয় হাড় দিয়ে তৈরি রাস্তা।
অয়মিয়াকনের প্রধান আতঙ্ক ফ্রস্ট বাইট। প্রচণ্ড ঠান্ডায় শরীরের অনাবৃত অংশের রক্ত জমাট বেঁধে এই ফ্রস্ট বাইট হয়। আঙুলের মাথা, নাকের ডগা, কানের লতি- এসব ছোটো খোলা জায়গায় সাধারণত ফ্রস্ট বাইট হয়।
ফ্রস্ট বাইট হলে আক্রান্ত প্রত্যঙ্গের কোষগুলো পচে গিয়ে ধীরে ধীরে শরীর থেকে খসে পড়ে। ঠিক সময়ে খসে না পড়লে পচন বাড়তে থাকে সারা শরীরে।
পর্বতারোহীরা অতি উঁচু বরফের পাহাড়ে প্রায়ই এই ফ্রস্ট বাইটে আক্রান্ত হন। এখানকার মানুষগুলোর এই বিপদ নিত্যসঙ্গী। তাই তাপমাত্রা মাইনাস ৫৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে নেমে গেলে বাড়ির বাইরে বের হওয়াটা অনিরাপদ মনে করা হয়।
বিগত প্রায় শত বছর ধরে অয়মিয়াকন এর বাসিন্দারা প্রায় একই রকম জীবনযাপন অতিবাহিত করছে। শীতকালে এখানে খাবার পানির কষ্ট সবচেয়ে বেশি। এখানে সরাসরি খাবার পানির সরবরাহ নেই। পাইপের ভেতর পানি প্রবাহিত হাওয়ার আগেই তা জমে বরফ হয়ে যায়।
ঘর গরম করার জন্য যে কাঠ পোড়ানো হয় সেখানে পাত্রে বরফের টুকরো রাখা হয় যা গলে গেলে খাবার পানি হিসেবে ব্যবহার করা হয়।
এখানকার তাপমাত্রা এতই ঠান্ডা যে, খাবার বা ফলমূল জমে শক্ত হয়ে তা আর খাবার উপযোগী থাকে না।
গ্রীষ্মকালে অয়মিয়াকনের দিনের দৈর্ঘ্য হয় প্রায় ২১ ঘণ্টা আর শীতকালে এখানকার দিনের দৈর্ঘ্য হয় মাত্র ৩ ঘণ্টা। তাপমাত্রা অনেক কমে গেলে অয়মিয়াকনের একমাত্র স্কুলটি ছুটি দেওয়া হয়।
অয়মিয়াকনের তাপমাত্রা এতই ঠান্ডা যে, ফুটন্ত গরম পানি শূন্যে ছুড়ে দিলে তা মাটিতে পড়ার আগেই বরফে পরিণত হয়। অয়মিয়াকনে শীতকালে কাপড় কাচার কথা ভাবাও যায় না। কারণ ফুটন্ত গরম পানি দিয়ে কাপড় ধুয়ে দিলেও তা সাথে সাথে এতই শক্ত হয়ে যায় যে তা আর ব্যবহার উপযোগী থাকে না।
এখানকার জেলেরা বলগা হরিণের টানা গাড়িতে চড়ে স্থানীয় নদীতে মাছ ধরতে যায়। নদীর উপরিভাগ বরফে ঢাকা থাকলেও মাছ ধরতে একটুও বেগ পেতে হয় না জেলেদের। কারণ মাছের সন্ধানে ঈগল পাখি আগেই গর্ত করে রাখে। জেলেরা শুধু সেসব গর্ত খুঁড়ে জাল বিছিয়ে সহজেই প্রচুর মাছ সংগ্রহ করতে পারে।
ইতিহাস অনুযায়ী, একশো বছরেরও বেশি সময় ধরে অমিয়াকনে থাকছেন মানুষ। প্রচণ্ড ঠান্ডা এবং দুর্গম এলাকা হবার কারণে অয়মিয়াকনে জীবনযাপন খুবই কষ্টের। বিগত কয়েক দশকে অয়মিয়াকনে জনসংখ্যা কমে গেছে ব্যাপক হারে। বর্তমানে এই ছোট্ট শহরে প্রায় ৫০০ থেকে ৯০০ জন লোক বাস করে।
এখানে কোনো লম্বা মানুষ নেই। বরং এখানে যারা নিয়মিত বসবাস করে তারা দিন দিন আরো খাটো হয়ে যাচ্ছে। এর জন্য একাধিক শারীরবৃত্তীয় কারণ দায়ী। শরীরের তাপমাত্রা সরাসরি বেরিয়ে যেতে না পারা তার মধ্যে অন্যতম।
১৯২০ সালে এখানে তাপমাত্রা সবচেয়ে নিচে নেমেছিল বলে রেকর্ড রয়েছে। মাইনাস ৭২ ডিগ্রি। স্থায়ী জনবসতি আছে, এমন কোনও এলাকায় রেকর্ড করা তাপমাত্রার মধ্যে এটিই পৃথিবীর সর্বনিম্ন। তাই অয়মিয়াকনকে পৃথিবীর সবচেয়ে শীতলতম মানব শহর বলা হয়।

SHARE

Leave a Reply