Home প্রচ্ছদ রচনা বাংলাদেশের নদ-নদী -মঈনুল হক চৌধুরী

বাংলাদেশের নদ-নদী -মঈনুল হক চৌধুরী

বাংলাদেশের নদ-নদী বাংলাদেশের এক অপরিহার্য অংশ। নদ-নদীগুলোই বাংলাদেশের প্রাণ। আমাদের সভ্যতা, কৃষিব্যবস্থা এবং যোগাযোগ ও পণ্য পরিবহনের মৌলিক মাধ্যমই হচ্ছে নদ-নদী। বাংলাদেশ একটি নদীমাতৃক দেশ। এ দেশের বুক চিরে বয়ে গেছে প্রায় ৮০০ নদ-নদী। দেশের প্রায় ২৪ হাজার ১৪০ কিলোমিটার এলাকা দখল করে রেখেছে নদ-নদীগুলো। বাংলাদেশের ঐতিহ্য, সংস্কৃতি, রাজনীতি, অর্থনীতির সঙ্গে এসব নদীর রয়েছে অবিচ্ছেদ্য সম্পর্ক। বাংলাদেশের অধিকাংশ এলাকাই শত শত নদীর মাধ্যমে বয়ে আসা পলিমাটি জমে তৈরি হয়েছে। আলোচ্য নিবন্ধে বাংলাদেশের প্রধান নদ-নদীগুলোর কথাই তুলে ধরা হলো।

পদ্মা নদী

পদ্মা বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান নদী। এর সীমানা আসলেই বিশাল। এর অপার জলরাশি আমাদের সবসময় মুগ্ধ করে। এটি ভারতের হিমালয়ে উৎপন্ন ভারতের গঙ্গা নদীর প্রধান শাখা নদী এবং বাংলাদেশের দ্বিতীয় দীর্ঘতম নদী। এর দৈর্ঘ্য ৩৬৬ কিলোমিটার। এই নদীর ইলিশ মাছ পৃথিবী বিখ্যাত। এত সুস্বাদু ইলিশ আর কোথাও পাওয়া যায় না। পদ্মার ইলিশের স্বাদ যে একবার পেয়েছে তা সে কোনোদিন ভুলতে পারবে না। পদ্মা নদীর ওপর নির্ভর করে অনেক মানুষ তাদের জীবন জীবিকা নির্বাহ করে। পদ্মার নৈসর্গিক সৌন্দর্য মানব হৃদয়কে মোহিত করে। শরতের আকাশের সাথে যখন নদীর কিনার মিশে যায় সে দৃশ্য এক অন্যরকম মোদিরা সৃষ্টি করে। পদ্মা নদীকে নিয়ে তাই অনেক উপন্যাস, কবিতা, গান সৃষ্টি হয়েছে। সেগুলো বরাবরই আমাদের মন কেড়ে নেয়। যদিও উত্তাল পদ্মা নদীর বুকে সুবিশাল পদ্মা সেতু গড়ে উঠেছে, তথাপি পদ্মার ঢেউ, নৌকা, লঞ্চ ও স্রােতের গর্জন এখনো আছে। ঢাকার সঙ্গে দেশের দক্ষিণাঞ্চলের মানুষের চলাচলের পথ এই প্রমত্তা পদ্মা। হাজার হাজার মানুষ রোজ এই নদীপথে চলাচল করে। মানুষের এই চলাচলকে কেন্দ্র করে নদীর দুই পাড়ে শিমুলিয়া-কাঁঠালবাড়ি ঘাট বা কাওরাকান্দিতে গড়ে উঠেছে ছোটো ছোটো ব্যাবসাকেন্দ্র। লঞ্চে বা সেতুপথে পাড়ি দেওয়ার সময় চোখে পড়বে মনোরম নানা দৃশ্য… এখন চলছে শরৎকাল, আবহাওয়াটা যেমন সুন্দর তেমন সুন্দর শরতের আকাশ। সাদা সাদা মেঘ আকাশের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে ছুটে বেড়াচ্ছে। আর নদীর পাড়ের আকাশের দৃশ্য এক অপূর্ব আবহ সৃষ্টি করেছে। পদ্মার আকাশেও এখন সাদা মেঘের লুকোচুরি খেলা। বন্ধুরা, তাই সময় সুযোগ করে পদ্মা নদীর পাড়ে বেড়িয়ে আসতে পারো একদিন।

মেঘনা নদী

মেঘনা নদী বাংলাদেশের একটি অন্যতম প্রধান নদী। পূর্ব ভারতের পাহাড় থেকে উদ্ভূত মেঘনা নদী সিলেট অঞ্চল দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করে চাঁদপুরের কাছে পদ্মা নদীর সাথে মিলিত হয়ে মেঘনা নামে বঙ্গোপসাগরে প্রবাহিত হয়েছে। মেঘনা নদীর বিস্তৃতি ১১ কিলোমিটার। এর দৈর্ঘ্য ১৬০ কিলোমিটার। উল্লেখ্য, মেঘনার তীরে বৃহৎ শিল্প-কারখানা গড়ে উঠার কারণে (যেমন- পাওয়ারপ্লান্ট, সার কারখানা) এখানে যেমন ব্যাপক মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে, তেমনি প্রাকৃতিক কারণে দেশ-বিদেশের পর্যটকদের আগ্রহ ও আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু হয়েছে। গড়ে উঠেছে নামি-দামি হোটেল-মোটেল, রেস্টহাউজ ও রেস্টুরেন্ট। আর. জে টাওয়ার, উযান-ভাটি, প্রভৃতি এর প্রকৃষ্ট প্রমাণ। মেঘনার দু’তীরে গড়ে উঠা এতসব অট্টালিকা মনে করিয়ে দেয় এখানকার শিল্প ও ভ্রমণ উপযোগী পরিবেশ ও এর গুরুত্ব। আর সবেচেয়ে বড়ো কথা সৈয়দ নজরুল ইসলাম সেতুটি চালু হওয়ার পর ভৈরব এবং আশুগঞ্জের আমূল পরিবর্তন ঘটেছে। ফলে এর রূপই পাল্টে গেছে। তাই একটি সেতু যে কত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে, এটি তার নিদর্শন। যাতায়াতের অবাধ সুযোগ এবং সময়ের স্বল্পতা দু’তীরের মানুষকে যেমন ঘনিষ্ঠ করেছে, করেছে কর্মচঞ্চল, তেমনি ঘটেছে ব্যাবসা-বাণিজ্যের দ্রুত সম্প্রসারণ। বেড়েছে এর ব্যাপক পরিচিতি এবং সুযোগ-সুবিধাও। ঢাকা-সিলেট যাওয়ার পথে এখন যাত্রা বিরতির উত্তম স্থান এই জায়গা। দৃষ্টি প্রসারিত করলে মেঘনার সব রূপ-বৈচিত্র্য, সংগ্রামী মানুষের জীবন-জীবিকা, গন্তব্যে ছুটে চলার উপায়-অবলম্বন দেখা ও বোঝা যায়। কত বিচিত্র পেশার মানুষ বেঁচে আছেন এই নদীটির ওপর নির্ভর করে। কত মানুষ স্বপ্ন বোনে এই নদীকে অবলম্বন করে। আবার কত স্বপ্ন-ভবিষ্যৎ বিলীন হয়ে যায় এর ভাঙনে। তবুও মেঘনা নদী জীবন চলার সাথী, বেঁচে থাকার প্রেরণা। মানুষের প্রাত্যহিক জীবনের উপযোগী বন্ধু। তবে প্রমত্তা মেঘনা এখন একেবারে শান্ত। বন্ধুরা, তাই সময় সুযোগ করে মেঘনা নদীর পাড়ে বেড়িয়ে আসতে পারো একদিন।

যমুনা নদী

যমুনা বাংলাদেশের প্রধান তিনটি নদীর একটি। এটি ব্রহ্মপুত্র নদের প্রধান শাখা, যা গোয়ালন্দের কাছে পদ্মা নদীর সাথে মিলেছে। ১৭৮৭ সালে আরেকটি বড়ো বন্যায় তিস্তা নদীর একটি বড়ো স্রােত যমুনায় যোগ দেয়। ফলে, তিস্তা, ব্রহ্মপুত্র, জোনাই খাল সবগুলোর স্রোত মিলে সুবিশাল নদী হিসেবে যমুনার আবির্ভাব ঘটে। উৎপত্তিস্থল থেকে এর দৈর্ঘ্য ২৪০ কিলোমিটার। তিস্তা, ধরলা, করতোয়া, আত্রাই, যমুনার প্রধান উপনদী। ভারতের আসাম থেকে ব্রহ্মপুত্র নদ বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে কুড়িগ্রাম জেলার নাগেশ্বরী থানার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়ে। এরপর তা যমুনা নাম ধারণ করে আরিচার কাছে পদ্মা নদীতে মিশেছে। উল্লেখ্য, ভূমিকম্পের ফলে সৃষ্টি হয়েছিল যমুনা নদী এবং বাংলাদেশের নদীগুলোর মধ্যে চরের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি আমাদের এই যমুনায়। আগস্ট মাসে প্রায়ই ব্যাপক বিস্তৃত বন্যা সংঘটিত হয়ে থাকে। গঙ্গার তুলনায় ব্রহ্মপুত্র-যমুনা নদীর প্রবাহ অধিকতর গতিসম্পন্ন। বর্ষা ঋতুতে যমুনা নদী দৈনিক প্রায় ১২ লক্ষ টন পলি বহন করে আনে এবং বাহাদুরাবাদে পরিমাপকৃত যমুনার বার্ষিক পলিবহন ক্ষমতা প্রায় ৭৩৫ মিলিয়ন টন। পাশাপাশি দুই রঙের পানির স্রােত পাওয়া যায় এই নদীতেই। সাম্প্রতিক বছরগুলিতে যমুনা নদীতে মানুষের কর্মকাণ্ড বৃদ্ধি পাচ্ছে। প্রচণ্ড গরম আর কাঠফাটা রোদের উত্তাপে দিনের কর্মঘণ্টা শেষ হওয়ার পর বিকেল হলেই প্রকৃতির একরাশ স্নিগ্ধ বাতাস পেতে উদগ্রীব হয়ে পড়ে এখানকার মানুষ। তাইতো সূর্য পশ্চিমে হেলে পড়লেই শহরের কোলাহল ছেড়ে হাজারও মানুষ ছুটে আসেন প্রকৃতির ‘সুন্দরী কন্যা’ যমুনা নদীর পাড়ে। যমুনাও তার বুকের স্নিগ্ধ বাতাস ঢেলে কর্মক্লান্ত মানুষের ক্লান্তি দূর করার পাশাপাশি প্রাণ জুড়িয়ে দেয় প্রকৃতিপ্রেমীদের। যমুনা নদীবেষ্টিত শহর সিরাজগঞ্জ। হিংস্র যমুনা এক সময় এ জনপদের মানুষের কাছে ছিল অভিশাপ। সেই অভিশপ্ত প্রকৃতি কন্যাই এখন বিনোদনপ্রিয় মানুষের জন্য আশীর্বাদ বয়ে আনছে। বিনোদনপিয়াসী মানুষের কাছে তাই জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে যমুনার পাড়। বন্ধুরা, তাই সময় সুযোগ করে যমুনা নদীর পাড়ে বেড়িয়ে আসতে পারো একদিন।

কর্ণফুলি নদী

কর্ণফুলি নদী। দশ হাজার বছরের পুরনো ঐতিহাসিক নদী। মধ্যযুগীয় পুঁথিতে নদীটিকে কাঁইচা খাল লেখা হয়েছে, মার্মা উপজাতিদের কাছে নদীটির নাম কান্সা খিওং এবং মিজোরামে কর্ণফুলির নাম খাওৎলাং তুইপুই। আর প্রাচীন চট্টগ্রামের ঐতিহ্যবাহী নদীর নাম কর্ণফুলি। হাজার হাজার বছরের ইতিহাসের অমর সাক্ষী এই নদী। পূর্ব পাহাড় থেকে শুরু হয়ে বিস্তীর্ণ পশ্চিম পাশে গড়িয়ে গড়িয়ে বঙ্গোপসাগরের সাথে মিলে গেছে এই নদী।

ভারতের মিজোরামের মমিত জেলার শৈতা গ্রাম (লুসাই পাহাড়) থেকে নেমে সুদীর্ঘ ৩২০ কিলোমিটার পথ বয়ে কর্ণফুলি নদী মিশেছে বঙ্গোপসাগরে। বাংলাদেশের অংশের প্রায় ১৬১ কিলোমিটার। উল্লেখ্য, কর্ণফুলি নদীর নামকরণ নিয়ে নানা মুনির নানা মত। তবে সবচেয়ে প্রসিদ্ধ গল্পটা চমকপ্রদ। কথিত আছে জনৈক আরাকান রাজার মেয়ে পছন্দ করে এক পাহাড়ি রাজপুত্রকে। কোনো এক রূপালি পূর্ণিমা রাতে তারা বের হয় নৌকাভ্রমণে। ঢেউয়ের সঙ্গে জোছনার জলকেলি রাজকন্যাকে আপ্লুত করে দেয়। ঘোরের মাঝে অসাবধানতাবশত হঠাৎ রাজকন্যার কান থেকে কানফুল খুলে নদীতে পড়ে যায়। এই কানফুলটি তাদের পরস্পরের ভালো লাগার নিদর্শন হিসেবে এত দিন যত্নআত্তিতে রেখেছিল রাজকন্যা। বলাই বাহুল্য কানফুলটি তাকে দিয়েছিল রাজপুত্র। কানফুল পড়ার সঙ্গে সঙ্গে রাজকন্যা ধরতে চায়, কিন্তু পারে না। তারপর ঝাঁপ দেয় নদীর প্রবল স্রােতে। কানফুলটি তো নিতে পারেই না, বরং সে তলিয়ে যেতে থাকে প্রবল স্রােতের মাঝে। নিজের প্রিয় সাথীকে তলিয়ে যেতে দেখে রাজপুত্রও ঝাঁপ দেয় নদীতে। কিন্তু তার চেষ্টাকে বৃথা করে দিয়ে হারিয়ে যায় রাজকন্যা। প্রিয় সাথীকে হারানোর বেদনা সহ্য করতে না পেরে রাজপুত্রও স্রােতের মাঝে নিজেকে সঁপে দেয়। এই ট্র্যাজেডির পর থেকেই নাকি এ নদীর নাম কর্ণফুলি। কর্ণফুলির দুই তীরের প্রাকৃতিক দৃশ্য এক কথায় অসাধারণ। যে কারও চোখ জুড়াবেই। কর্ণফুলির ওপরে গড়ে উঠেছে বাংলাদেশের একমাত্র জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র। কর্ণফুলির তীরে গড়ে উঠেছে বারো আউলিয়ার পুণ্যভূমি, প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি চট্টগ্রাম। চট্টগ্রামের এই সৌন্দর্যের অন্যতম প্রধান কারণ হলো কর্ণফুলি নদী। প্রাক-ইসলামিক যুগে আরব বণিকেরা ভারতীয় দ্বীপপুঞ্জের সাথে ব্যাবসা বাণিজ্যের প্রধান কেন্দ্র হিসেবে যে বন্দর ব্যবহার করত, তা ছিল কর্ণফুলি নদীর মোহনার চট্টগ্রাম বন্দর। সেদিক থেকে বলা যায়, কর্ণফুলি নদী বাংলাদেশের অর্থনীতির জীবনরেখা। ফলে অন্য যেকোনো নদীর চেয়ে এটির গুরুত্ব আলাদা। বন্ধুরা, তাই সময় সুযোগ করে কর্ণফুলি নদীর পাড়ে বেড়িয়ে আসতে পারো একদিন।

উল্লেখ্য, বাংলাদেশের নানা প্রান্তে ছড়িয়ে রয়েছে আরো অসংখ্য নদ-নদী। সেগুলো হলো- আত্রাই নদী, আড়িয়াল খাঁ নদী, কপোতাক্ষ নদ, করতোয়া নদী, কাঁকন নদী, কীর্তনখোলা নদী, কুশিয়ারা নদী, খোয়াই নদী, গড়াই নদী, চিত্রা নদী, জলঢাকা নদী, ডাকাতিয়া নদী, তিতাস নদী, তিস্তা নদী, তুরাগ নদ, ধলেশ্বরী নদী, ধানসিঁড়ি নদী, নাফ নদী, পশুর নদী, পাহাড়িয়া নদী, পুণর্ভবা নদী, ফেনী নদী, বড়াল নদী, ব্রহ্মপুত্র নদ, বাঙালি নদী, বালু নদী, বিরিশিরি নদী, বুড়িগঙ্গা নদী, ভৈরব নদী, মধুমতী নদী, মনু নদী, মহানন্দা নদী, ময়ূূর নদী, মাতামুহুরী নদী, মুহুরী নদী, রূপসা নদী, শঙ্খ নদী, শিবসা নদী, শীতলক্ষ্যা নদী, সাঙ্গু নদী, সুরমা নদী, হালদা নদীসহ উল্লেখযোগ্য নদ-নদী। বন্ধুরা, তোমরা যদি একটু ভালো করে লক্ষ করো তাহলে দেখবে বাংলাদেশের নদ-নদীগুলোর নাম ভারি সুন্দর। ভৌগোলিক অঞ্চলভেদে ছোটো নদীকে বিভিন্ন নামে ডাকা হয়। এসব নদ-নদী বাংলাদেশের জন্য আল্লাহর রহমতস্বরুপ। মূলত বাংলাদেশের নদ-নদীর ঐতিহ্য ও গুরুত্বের কথা বলে বা লিখে শেষ করা যাবে না।

SHARE

Leave a Reply