Home খেলার চমক বিশ্বকাপের স্টেডিয়াম -আবু আবদুল্লাহ

বিশ্বকাপের স্টেডিয়াম -আবু আবদুল্লাহ

এগিয়ে আসছে আরেকটি বিশ^কাপ। এবারের ফিফা ফুটবল বিশ্বকাপের আয়োজক হয়েছে মধ্যপ্রাচ্যের ছোট্ট দেশ কাতার। দেশটি বিশ্বকাপ উপলক্ষ্যে নির্মাণ করেছে কিছু অত্যাধুনিক স্টেডিয়াম। যেখানে বিশ্বকাপ শিরোপার জন্য ২১ নভেম্বর থেকে লড়াইয়ে নামবে ৩২টি দেশ। চলো জেনে আসি বিশ^কাপের ভেন্যুগুলো সম্পর্কে-

লুসাইল স্টেডিয়াম
বিশ্বকাপ উপলক্ষ্যে কাতারে নির্মিত সবচেয়ে বড়ো স্টেডিয়ামটির নাম লুসাইল স্টেডিয়াম। যেটির দর্শক ধারণক্ষমতা ৮০ হাজার। এই স্টেডিয়ামে ফাইনাল খেলা অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। এছাড়াও বিভিন্ন পর্বের আরো ৮টি ম্যাচ অনুষ্ঠিত হবে এখানে।
দৃষ্টিনন্দন এই স্থাপনাটির নকশা করেছে একটি বিখ্যাত ব্রিটিশ কোম্পানি। আরবের ঐতিহ্যবাহী ফ্যানার লণ্ঠনের আলো-ছায়ার খেলার কথা মাথায় রেখে এটির নকশা করা হয়েছে। দূর থেকে দেখলে মনে হবে স্টেডিয়ামটি শূন্যে ভাসছে।
রাজধানী দোহার কেন্দ্রস্থল থেকে ১০ মাইল উত্তর দিকে সমুদ্র উপকূলের শহর লুসাইলে নির্মিত হয়েছে স্টেডিয়ামটি। সাজানো গোছানো ছোটো শহর লুসাইল, তবে উন্নত বিশ্বের সব সুবিধাই সেখানে গড়ে তোলা হয়েছে। বিশ্বকাপ উপলক্ষ্যে লুসাইল শহরটিকে প্রস্তুত করতে ৩৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার খরচ করেছে কাতার সরকার।
বিশ^কাপের পর লুসাইল স্টেডিয়ামের বেশির ভাগ চেয়ার খুলে ফেলা হবে এবং সেগুলো বিভিন্ন অনুন্নত দেশের স্টেডিয়ামে উপহার হিসেবে দেওয়া হবে। কারণ আয়তনে ছোটো ও কম জনসংখ্যার দেশ কাতারে এত বেশি ধারণক্ষমতার স্টেডিয়াম জরুরি নয়।

আল বাইত স্টেডিয়াম
কাতারের আরেকটি বড়ো স্টেডিয়াম এটি। ৬০ হাজার দর্শকের এক সাথে খেলা দেখার ব্যবস্থা থাকবে আল বাইত স্টেডিয়ামে। স্টেডিয়ামের সাথেই আছে ফাইভ স্টার মানের হোটেল ও অত্যাধুনিক শপিং মল।
আল খোর শহরের দৃষ্টিনন্দন এই স্টেডিয়ামটি বানানো হয়েছে মরুভূমিতে যাযাবর গোষ্ঠীগুলোর তাঁবুর মতো নকশায়। দূর থেকে দেখলে মনে হবে, মরুর বুকে তাঁবু গেড়েছে কোন যাযাবর পরিবার। মরুভূমির মাঝে তৈরি হলেও স্টেডিয়ামটির চারপাশে কৃত্রিম লেক, সবুজ ঘাসের গালিচাসহ অনেক কিছু তৈরি করা হয়েছে।
বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্ব থেকে সেমিফাইনাল পর্যন্ত কয়েকটি ম্যাচ অনুষ্ঠিত হবে এই স্টেডিয়ামে। এছাড়া এই স্টেডিয়ামে আয়োজন করা হবে দৃষ্টিনন্দন উদ্বোধনী অনুষ্ঠান। ২১ নভেম্বর এখানে নিজেদের প্রথম ম্যাচ খেলবে স্বাগতিক কাতার।

আহমদ বিন আলী স্টেডিয়াম
৪০ হাজার দর্শক ধারণক্ষমতা সম্পন্ন আহমদ বিন আলী স্টেডিয়াম। গ্রুপ পর্ব থেকে কোয়ার্টার ফাইনাল পর্যন্ত ৭টি খেলা অনুষ্ঠিত হবে এই স্টেডিয়ামে।
দোহা থেকে ১৪ মাইল দূরে আল রাইয়ান এলাকার এই স্টেডিয়ামটি নির্মাণ করা হয়েছে মরুভূমিতে। যে কারণে এর চারপাশের সব কিছুই নতুন করে বানানো হয়েছে। স্টেডিয়ামের চারপাশ ঘিরে গড়ে তোলা হয়েছে সবুজ ঘাসের চত্বর। আল রাইয়ান নামে একটি পুরনো স্টেডিয়াম ভেঙে নতুন স্থাপনা তৈরি করা হয়েছে বিশ্বকাপ উপলক্ষ্যে।
এডুকেশন সিটি স্টেডিয়াম
কাতারের রাজধানী দোহার বাইরে কাতার ফাউন্ডেশনের গড়ে তোলা এডুকেশন সিটির ভেতর তৈরি করা হয়েছে এই স্টেডিয়াম। অনেকগুলো বিশ্ববিদ্যালয়, শিক্ষাবিষয়ক অনেক প্রতিষ্ঠান এবং ৮টি আন্তর্জাতিক বিশ্ববিদ্যালয়ের স্যাটেলাইট ক্যাম্পাস রয়েছে এডুকেশন সিটিতে। অর্থাৎ পূর্ণাঙ্গ একটি শিক্ষা নগরী হিসেবে গড়ে তোলা হয়েছে জায়গাটিকে। সেখানেই বিশ্বকাপের জন্য গড়া হয়েছে একটি স্টেডিয়াম।
এই স্টেডিয়ামে কোয়ার্টার ফাইনালসহ এবারের বিশ্বকাপের মোট ৮টি খেলা অনুষ্ঠিত হবে। বিশ্বকাপের পর এই স্টেডিয়ামটিকে কাতারের নারী ফুটবল দলের হোম ভেন্যু হিসেবে বরাদ্দ করা হবে। এই স্টেডিয়ামের ধারণক্ষমতা ৪০ হাজার।
মরুভূমিক হীরা নামে পরিচিত এই স্টেডিয়ামটির আকার অনেকটা হীরার মতো। যা দিনের বেলায় সূর্যের আলোতে চিকচিক করবে, আর রাতে রঙিন বাতির আলোয় ছড়াবে নান্দনিক আভা। স্টেডিয়ামের চারপাশে কৃত্রিম লেকসহ সৌন্দর্য বর্ধনকারী অনেক স্থাপনা তৈরি করা হয়েছে।
এই স্টেডিয়ামটিতে ২০২১ সালে ফিফা ক্লাব কাপ ফুটবলের ফাইনাল অনুষ্ঠিত হয়েছিল।

আল জানুব স্টেডিয়াম
৪০ হাজার দর্শক ধারণক্ষমতা সম্পন্ন আল জানুব স্টেডিয়াম। যেখানে গ্রুপ পর্ব ও দ্বিতীয় রাউন্ডের মোট ৭টি খেলা অনুষ্ঠিত হবে। স্টেডিয়ামটির আগে নাম ছিল আল ওয়াখরাহ। সেটিকে ভেঙে নতুন করে বিশ্বকাপ উপলক্ষ্যে নির্মাণ করা হয়েছে আবার।
আরব অঞ্চলের ঐতিহ্যবাহী এক ধরনের নৌকার পাল থেকে এই স্টেডিয়ামের নকশাটি করার উৎসাহ পেয়েছেন ইরাকি বংশোদ্ভূত ব্রিটিশ স্থপতি জাহা হাদিদ। নির্মাণকাজ শেষ হওয়ার আগেই ২০১৬ সালে ৬৫ বছর বয়সে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন এই নারী স্থপতি।
এই স্টেডিয়ামের ছাদ প্রয়োজনে খোলা বা বন্ধ করা যায়। এটির শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত ব্যবস্থা এমন যে এতে সারা বছরই খেলা আয়োজন করা যাবে। মরুর প্রচণ্ড গরমময় গ্রীষ্মেও এই স্টেডিয়ামের দর্শকরা শীতল পরিবেশে খেলা দেখতে পারবেন।
কাতারের বিশ্বকাপ স্টেডিয়ামগুলোর মধ্যে এটির কাজ সবার আগে শেষ হয়েছে। ২০১৯ সালে উদ্বোধন করা হয় স্টেডিয়ামটি। বিশ্বকাপ শেষে এই স্টেডিয়াম থেকেও ২০ হাজার আসন সরিয়ে ফেলা হবে। উপহার দেওয়া হবে কোনো স্বল্পোন্নত দেশকে।

আল থুমামা স্টেডিয়াম
আরব বিশ্বের মানুষদের ব্যবহৃত ঐতিহ্যবাহী পাগড়ির আদলে এই স্টেডিয়ামটির নকশা করেছেন কাতারি স্থপতি ইব্রাহিম আল জাইদাহ। আকাশ থেকে দেখলে মনে হবে কেউ যেন একটি পাগড়িকে গোল করে রেখে দিয়েছে মাটিতে। ৪০ হাজার দর্শক এক সাথে খেলা দেখতে পারে এখানে। এবারের বিশ^কাপে কোয়ার্টার ফাইনালসহ ৮টি ম্যাচ অনুষ্ঠিত হবে এই ভেন্যুতে।
স্টেডিয়ামটিতে একবার ব্যবহৃত পানি রিসাইকেল হয়ে আবার বিশুদ্ধ আকারে ফিরে আসবে। যার ফলে অন্য যে কোন স্টেডিয়ামের চেয়ে পানি খরচ হবে ৪০ শতাংশ কম। মরুভূমিতে পানির সঙ্কটের কথা মাথায় রেখে এই ব্যবস্থা করা হয়েছে।
স্টেডিয়াম সংলগ্ন একটি মসজিদ ও হোটেলও নির্মিত হয়েছে দর্শকদের সুবিধার কথা মাথায় রেখে। বিশ্বকাপের পর আল থুমামা স্টেডিয়ামের অর্ধেক আসন উপহার হিসেবে দেয়া হবে অনুন্নত কোন দেশের ফুটবল স্টেডিয়ামে।

স্টেডিয়াম ৯৭৪
গ্রুপ পর্ব ও দ্বিতীয় রাউন্ডের মোট ৭টি ম্যাচ আয়োজন করবে এই স্টেডিয়াম। এখানে একসাথে খেলা দেখতে পারবে ৪০ হাজার দর্শক।
৯৭৪টি মালবাহী কনটেইনার ব্যবহার করে এই স্টেডিয়ামটি বানানো হয়েছে। বিশ^কাপের পর আবার এই কনটেইনারগুলো জাহাজে মালামাল বহনের জন্য ফিরিয়ে নেওয়া হবে। এছাড়া স্টেডিয়াম নির্মাণে ব্যবহৃত অন্যান্য সামগ্রীও বিশ^কাপের পর অন্য কাজে ব্যবহৃত হবে। অর্থাৎ এবারের বিশ^কাপের পর আর থাকবে না এই স্টেডিয়ামটি।

খলিফা ইন্টারন্যাশনাল স্টেডিয়াম
কাতার বিশ্বকাপে আরেকটি দৃষ্টিনন্দন ভেন্যু এটি। এখানে এক সাথে খেলা দেখতে পারেন ৪৫ হাজার ৪১৬ জন দর্শক। গ্রুপ পর্ব, দ্বিতীয় রাউন্ড, কোয়ার্টার ফাইনাল ছাড়াও তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচ হবে এই ভেন্যুতে।
এটি কাতারের একটি পুরনো স্টেডিয়াম। ১৯৭৬ সালে এই স্টেডিয়ামটি নির্মিত হয়। নির্মাণের পর থেকে এটি কাতারের জাতীয় স্টেডিয়াম হিসেবে পরিচিত ছিল। গত বছর মে মাসে আমির কাপ ফুটবলের ফাইনাল দেখতে এই মাঠে উপস্থিত ছিলেন ৪০ হাজার দর্শক। এছাড়া বিভিন্ন সময় এশিয়ান গেমস, গালফ কাপ, এএফসি এশিয়ান কাপ এবং অ্যাথলেটিকস চ্যাম্পিয়নশিপ আয়োজন করেছে এই স্টেডিয়ামটি।
২০১৯ সালে এই মাঠেই ফিফা ক্লাব বিশ্বকাপের ফাইনাল জিতেছে লিভারপুল এফসি। ২০০৯ সালে এখানে আন্তর্জাতিক প্রীতি ম্যাচ খেলেছে ব্রাজিল-ইংল্যান্ড।
তবে বিশ^কাপ উপলক্ষ্যে স্টেডিয়ামটিতে অনেক সংস্কারকাজ চালানো হয়েছে।

SHARE

Leave a Reply