Home তোমাদের গল্প ঝড়ের ভেতর তাজিমের মা -আল আমিন মুহাম্মাদ

ঝড়ের ভেতর তাজিমের মা -আল আমিন মুহাম্মাদ

প্রচণ্ড গরম ও রৌদ্র পড়ার পর সূর্যটা মেঘের ভেতর লুকিয়ে গেল এই দুপুরবেলা। একটু-আধটু অন্ধকার এসে জায়গা করে নিলো পৃথিবীতে এই অসময়।
কিছুক্ষণ পরই, ঘন-কালো-গাঢ় মেঘ আকাশে ভেসে বেড়াচ্ছে। সেইসাথে উত্তর-পশ্চিম দিক থেকে বাতাসও কেমন বুনো ষাঁড়ের মত ক্ষেপে উঠেছে। পুরো আকাশটা এখন ভয়ঙ্কর কালমেঘের দখলে। এলোপাতাড়ি বাতাস রাস্তার ধুলোবালি উড়িয়ে ধোঁয়া-ধোঁয়া করে ফেলেছে চারিদিক!

মাঠ থেকে রাখাল গরু নিয়ে ছুটছে বাড়ির দিকে। চাষিরাও কাজ বন্ধ করে বাড়ির দিকে দৌড়াচ্ছে। হাট-বাজারের মানুষও ছোটাছুটি করছে এদিক-সেদিক। খেয়াঘাটের মাঝি, নৌকাটা ঘাটে বেঁধে জলদি করে বাড়ির দিকে ছুটেছে। উঠোনে মেলান পাকা ধান মা-চাচীরা তাড়াতাড়ি বারান্দায় উঠাচ্ছে।
সবাই ভাবছে, আল্লাহ পাকই জানে আজ কী আছে কার কপালে!
এমন ভয়ঙ্কর সময়ে তাজিম বাড়িতে নেই। পাড়ায় খেলতে গেছে সেই কখন! এখনও এলো না। তাজিমের মার খুব চিন্তা হচ্ছে। কী যে করি! এই বলে ঝড়ের ভেতরেই তাকে খুঁজতে বের হলো। বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে। মেঘ ডাকছে গুড়ুম গুড়ুম। সাদাসাদা শিলাও পড়ছে। সাথে হালকা বৃষ্টি। কিন্তু বাতাস খুব ভয়ঙ্কর! গাছের ডালপালা সব মড়াৎ মড়াৎ করে ভেঙে ফেলছে। গাছের একটি ডাল তাজিমের মার একেবারে পায়ের কাছে এসে পড়লো। একটুর জন্য রক্ষে। তাজিমের মা চমকে উঠলো। কেঁদে কেঁদে বলল- হে আল্লাহ! আমার তাজিমের কী হবে! তুমি তাকে দেখো মালিক।
এই বলছে আর দোয়া-দরুদ পড়ছে। পড়তে পড়তে বাড়ি থেকে একটু দূরে প্রাইমারি স্কুলমাঠে এসে পড়লো। দেখে কেউ নেই সেখানে। তাজিমের মা আরও ভয় পেয়ে গেল। আমার তাজিম যে কোথায় গেল! ভাবতে ভাবতে এক ভয়ঙ্কর বজ্রপাত ঘটে গেল একটু দূরে। তাজিমের মা ভয়ে দৌড়ে গিয়ে স্কুলের বারান্দায় উঠল। ঝড়ের গতি আরো প্রচণ্ড রূপে বেড়ে গেল। তাজিমের মা হাউ-মাউ করে কান্না আরম্ভ করল। আর আল্লাহ পাকের কাছে দোয়া করতে লাগল- হে আল্লাহ! আমার তাজিমকে দেখ। আমার তাজিমের যেন কোন ক্ষতি না হয়।
কিন্তু ঝড় আর থামে না। ক্রমে বেড়েই চলছে।
স্কুলমাঠের একটা নারিকেল গাছ হঠাৎ ভেঙে পড়ল। কার যেন টিনের চালা উড়ে এসে পড়ল স্কুলের পুকুরে। পাশের বাগানের ডালপালা-পাখির বাসা উড়ে এসে পড়ছে এই স্কুলমাঠে। এসব দেখে তাজিমের মায়ের আর সহ্য হলো না। এমন ভয়ঙ্কর ঝড়ের মধ্যেই তাজিম! তাজিম! বলে বের হয়ে গেল তাকে খুঁজতে।
চলে গেল মোল্লাদের আমবাগানে দৌড়াতে দৌড়াতে। বন্ধুদের সাথে আম কুড়াতে হয়তো সেখানে যেতে পারে তাজিম। গিয়ে দেখে সেখানেও তাজিম নেই, গাছের তলায় ডালপালা আর কাঁচাপাকা অসংখ্য আম পড়ে আছে। সেখান থেকে আবার দৌড়ে চলে গেল তাজিমের বন্ধু রাতুলদের বাড়ি। সেখানেও তাজিমকে পেলো না। আর পরাণে সহ্য হচ্ছে না তাজিমের মায়ের। সন্তানের চিন্তায় সে কালবৈশাখীর মত ঝড়কেও মালুম করল না। কেঁদে-কেঁদে প্রচণ্ড ঝড়ের ভেতরেই নিরুপায় হয়ে ফিরে এলো বাড়ি; যদিও রাতুলরা তাকে আসতে অনেক নিষেধ করেছিল। বাড়ি এসে দেখে ঘরের এককোণে কেমন জড়সড় হয়ে কাঁপছে তার ছেলেটি। তাকে খুঁজতে বের হওয়ার পরপরই সে দৌড়ে বাড়িতে এসে পড়েছিল। ছেলেটিকে দেখেই পরম আদরে বুকে জড়িয়ে নিলো তাজিমের মা। ঝড়ের ভেতর তুই কোথায় ছিলি বাজান!- এ কথা বলে অনেকক্ষণ ধরে তাজিমকে বুকে জড়িয়ে রাখল তার মা।

SHARE

Leave a Reply