Home খেলার চমক গতি তারকার আগমনি -আবু আবদুল্লাহ

গতি তারকার আগমনি -আবু আবদুল্লাহ

উমরান মালিক। ভারত নিয়ন্ত্রিত কাশ্মিরের জম্মু শহরের এক ফল বিক্রেতার ছেলে। বয়স ২২ বছর। ভারতীয় ক্রিকেটের সবচেয়ে সম্ভাবনাময় ফাস্ট বোলার হিসেবে ইতোমধ্যেই তাকে দেখতে শুরু করেছেন ক্রিকেট বিশ্লেষকরা।
এ বছর মে মাসের ৫ তারিখে দিল্লি ক্যাপিটালসের বিপক্ষে এই ডান হাতি ফাস্ট বোলারের হাত থেকে বেরিয়েছে ২০২২ আইপিএলের দ্রুততম ডেলিভারিটি। স্পিডমিটারে যা ছিল প্রতি ঘণ্টায় ১৫৭ কিলোমিটার। এছাড়াও এবারের টুর্নামেন্টে দ্বিতীয়, তৃতীয় ও চতুর্থ সেরা ডেলিভারিগুলোও দিয়েছেন উমরান এবং এর প্রতিটিই ঘণ্টায় ১৫৪ কিলোমিটারের ওপরে।
ক্রিকেট ইতিহাসের সর্বোচ্চ গতির বলটি করেছিলেন পাকিস্তানের ফাস্ট বোলার শোয়েব আখতার। সেই বিশ্বরেকর্ড গড়া ডেলিভারির গতি ছিল ঘণ্টায় ১৬০ কিলোমিটার। উমরানের গতির ঝড় দেখে উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করেছেন শোয়েব আখতার। বলেছেন, উমরান আমার রেকর্ড ভাঙতে পারলে খুশি হবো। এছাড়াও গ্লেন ম্যাকগ্রা, ডেল স্টেইনসহ ক্রিকেট বিশে^র আরো অনেক সাবেক তারকা উমরানের ভূয়সী প্রশংসা করেছেন।
শুধু যে গতির ঝড় তুলেছেন তাই নয়। এবারের আইপিএলে উমরানের পারফরম্যান্সও ছিল নজরকাড়া। লিগ পর্বের প্রথম ১৩ ম্যাচ খেলে নিয়েছেন ২১ উইকেট। এর মধ্যে গুজরাট টাইটানসের বিপক্ষে এক ম্যাচে ২৫ রানে নিয়েছেন ৫ উইকেট, যার মধ্যে চারটিই ছিল সরাসরি বোল্ড আউট।
এই পারফরম্যান্সের কারণে উমরানের জন্য ভারতের জাতীয় দলের ডাক আসার আলোচনা শুরু হয়ে যায় আইপিএল চলাকালেই। আগামী দিনের গতিতারকা হিসেবে অনেকেই তাকে ভারতীয় দলে দেখতে শুরু করেন। সাবেক কোচ রবি শাস্ত্রি তো তখনই তাকে ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ডের চুক্তির আওতায় আনার দাবি করেন।
অথচ উমরান মালিকের আইপিএলে আসা ছিল অনেকটা ভাগ্যগুণে। ২০২১ সালের আইপিএলে তাকে নেট বোলার হিসেবে দলের সাথে রেখেছিল সানরাইজার্স হায়দরাবাদ। এর আগে জম্মু ও কাশ্মির প্রাদেশিক দলের হয়ে একটি মাত্র লিস্ট ‘এ’ ম্যাচ (ঘরোয়া ক্রিকেটের ৫০ ওভারের ম্যাচ) এবং একটি ঘরোয়া টি-টোয়েন্টি ম্যাচ খেলেছেন; কিন্তু এটুকু অভিজ্ঞতা নিয়েই তার সামনে খুলে যায় আইপিএলের দরজা। এ যেন স্বপ্ন এসে হাতে ধরা দেওয়া!
টুর্নামেন্টের মাঝপথে সানরাইজার্স হায়দরাবাদের এক পেসার করোনায় আক্রান্ত হয়। তার বিকল্প হিসেবে প্র্যাকটিসে উমরানের বোলিং দেখে মনে ধরে কোচের। কলকাতা নাইট রাইডার্সের বিপক্ষে আইপিএলে অভিষেক হয় তার। অভিষেক আসরে মাত্র তিনটি ম্যাচ খেলেছেন। তবে তাতেই নজর কেড়েছেন পিচে গতির ঝড় তুলে।
ওই বছর আইপিএলে সবচেয়ে গতিসম্পন্ন বোলার ছিলেন উমরান। প্রথম ম্যাচে কলকাতার বিপক্ষে তার একটি বলের গতি ছিল ঘণ্টায় ১৫১.০৩ কিলোমিটার। দ্বিতীয় ম্যাচেই নিজেকে ছাড়িয়ে যান উমরান। ব্যাঙ্গালুরুর বিপক্ষে একটি বল করেন ঘণ্টায় ১৫৩ কিলোমিটার গতিতে। যেটি ছিল ওই বছর আইপিএলের সবচেয়ে দ্রুতগতির ডেলিভারি।
একজন নতুন বোলারের জন্য যা অবশ্যই অনেক বড়ো অর্জন। যার ফলে ভারতীয় ক্রিকেটে আলোচনায় আসেন কাশ্মিরের এই তরুণ। ভারতের বাইরেও তার প্রশংসা শুরু হয়। ওয়েস্ট ইন্ডিজের সাবেক ফাস্ট বোলার ইয়ন বিশপ উমরানকে ‘বোলিংয়ের শক্তিশালী অস্ত্র’ হিসেবে আখ্যায়িত করেন।
এক সময় কাশ্মিরের বিভিন্ন জেলায় ঘুরে ঘুরে টেনিস বলের টুর্নামেন্ট খেলতেন উমরান। ক্রিকেটের এই নেশার কারণে মাধ্যমিকের পর আর পড়াশোনাও আগায়নি। তার আগ্রহ দেখে পরিবারও আর বাধা দেয়নি খেলতে। যে কারণে ক্রিকেটার হওয়ার সুযোগ পেয়েছেন।
২০১৮ সালে জম্মু ও কাশ্মির প্রাদেশিক অনূর্ধ্ব-১৯ দলে সুযোগ পাওয়ার মধ্য দিয়ে মূলধারার ক্রিকেটে পা রাখেন। এরপর কাশ্মির সিনিয়র দলের হয়ে সৈয়দ মুশতাক আলী টি-টোয়েন্টি ট্রফিতে খেলার সুযোগ আসে। সেখান থেকেই শুরু উমরানের মূল ধারার ক্রিকেটে যাত্রা। এরপর হায়দরাবাদ দলের নেটে বোলিং করতে এসেই পাল্টে যায় তার ক্যারিয়ার।
এখন উমরানের মাঝে একজন গতিতারকার সম্ভাবনা দেখতে শুরু করেছেন সমর্থকরা। ভারতীয় দলে পেস বোলিংয়ের যে দুর্বলতা ছিল কয়েক দশক ধরে সেটি কাটলেও শোয়েব আখতার, ব্রেটলির মতো গতির ঝড় তোলা কেউ আসেনি ভারতে। এবার কাশ্মিরের এই তরুণের মাঝে সেই সম্ভাবনা দেখতে শুরু করেছে দেশটি।
শৈশব থেকেই উমরান ক্রিকেটকে ভালোবেসেছেন। আর জাতীয় দলের জার্সি গায়ে খেলার স্বপ্ন দেখে বড়ো হয়েছেন। তার বাবা রশিদ মালিক বলেছেন, ছোটোবেলা থেকেই ক্রিকেট ছিল ওর নেশা। একমাত্র ক্রিকেটই ছিল ভালোবাসা। সব সময় বলতো, আমি একদিন ভারতের হয়ে খেলবো।
সেই স্বপ্ন আর পরিশ্রম উমরানকে এই পর্যায়ে আসতে সাহায্য করেছে।

SHARE

Leave a Reply