Home গল্প তোমাদের গল্প দামাল ছেলের দল -সরাফাত রহমান সাকিব

দামাল ছেলের দল -সরাফাত রহমান সাকিব

সিরাজ সাহেবের বাড়িতে চুরি হয়েছে আঠারো দিন আগে। অনেক চেষ্টা করেও তিনি চোর ধরতে পারেননি। পুলিশ, বড়ো বড়ো ডিটেক্টিভ টিম পর্যন্ত ব্যর্থ হয়েছে চোর বাবাজিকে হাতে নাতে ধরতে। এ খবর কানে গেল কিশোর গোয়েন্দা টিম ‘তরুলতা ডিটেক্টিভ টিম’ এর ডিরেক্টর মুহাম্মাদ হাসান রাইসির কাছে। গতকাল সে তার চাচাতো ভাই আহমাদ কাসিম রাইসির কাছে এ খবর শুনেছে। তৎক্ষণাৎ দলের সেক্রেটারি মাহবুব আলমকে ডেকে পরামর্শ শুরু করল হাসান। অতঃপর বাকি দুইজন সদস্য জাবির হুজাইফি ও আহমাদ সাদকেও ডাকা হলো।
পরামর্শ মতো তারা চারজন সিরাজ সাহেবের বাড়ি গিয়ে তার সাথে কথা বলল। সিরাজ সাহেব মূলত তাদেরকে পাত্তা দেননি। তার কাছে ব্যাপারটা যাকে বলে ‘হাতিঘোড়া গেল তল, ভেড়া বলে কত জল’ আর কী। অনেকটা জোর করে তার তাঁর কাছ থেকে ঘটনা শুনল।
স্কুলে চলছে বার্ষিক পরীক্ষা পরবর্তী ছুটি, অখণ্ড অবসর। তাই আর সময় নষ্ট না করে ‘টিম তরুলতা’ বেরিয়ে পড়লো অভিযানে।
সুবহে সাদিকের শেষ প্রায়। চারদিকে কেবল আলো ফুটতে শুরু করেছে। গ্রামের মসজিদ থেকে ফজর পড়েই বের হলো খুদে গোয়েন্দা বাহিনী, হাতে রয়েছে পাখি শিকার করার গুলতি; উদ্দেশ্য- পাশের গ্রামের গহিন দেবদারু বন। প্রত্যেকের চাহনি সতর্ক, ফিসফিস স্বরে কথা মিলিয়ে যাচ্ছে ভোরের উত্তুরে হিমেল বাতাসে। মানুষের অহেতুক সন্দেহ থেকে বাঁচার ক্ষুদ্র প্রয়াস আর কী।
হঠাৎ কুয়াশার বুক চিরে ভেসে এলো একটা গমগমে স্বর,
‘এই ছোকরা, সাত সকালে বনে-বাদাড়ে কী করোস?’
হতচকিত হাসান একটু হেসে উত্তর দিল, ‘কাকু, স্কুল বন্ধ তো। তাই গুলতি নিয়ে এলাম, হে হে।’
হাসানের এই সরল উত্তরে লোকটা ভ্রু কুঁচকে তাকালো। সাবধানি গলায় বললো,
এখানে পাখি থাকে না, জঙ্গলের ঐ দিকে শরাল পাখি আছে। যা ভাগ! ভোর না হতেই সাহেব আসছেন পাখি শিকারে!’
হাসানের সন্দেহ হলো। এই কুয়াশাচ্ছন্ন শীতের সকালে লেপের ওম ছেড়ে লোকটা বনে-জঙ্গলে কী করে বেড়াচ্ছে! বন্ধুদের নিয়ে একটু দূরে সরে ফিসফিস করে বললো,
‘লোকটিকে সন্দেহ হচ্ছে। কেমন চঞ্চল, উৎকণ্ঠিত দৃষ্টি, গলার স্বরও কাঁপছিল মনে হলো। তোরা মিছিমিছি গুলতি ছুড়তে থাক। ওদিকে একটা দেবদারু গাছ দেখেছি। আমি ওটাতে চড়ে লোকটির গতি বিধি লক্ষ করি।’
সাদ ও জাবির তাকে ঝুঁকি নিতে মানা করল। কিন্তু তরুলতা ডিটেক্টিভ টিমের ডিরেক্টর মুহাম্মাদ হাসান রাইসি কারো কথা শুনলোই না।
মাহবুব বললো,
‘তাহলে চল, আমিও সাথে যাই।’
হাসান তাকে নিরস্ত করলো। দুইজন গেলে লোকটি দেখে ফেলতে পারে। আরো কিছু প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দিয়ে আল্লাহর নাম নিয়ে হাসান রাইসি মিলিয়ে গেল কুয়াশার আড়ালে।
সতর্ক পায়ে এগিয়ে চলছে হাসান। পায়ের নিচের শুকনো পাতা মচমচ মড়মড় শব্দে ভাঙছে। চকিতে লোকটা পিছু ফিরলো। ত্বরিত গতিতে গাছের আড়ালে নিজেকে লুকিয়ে ফেললো হাসান। লোকটার নজর এড়িয়ে তরতর করে উঠে পড়লো ঝোপালো দেবদারু গাছটায়। লোকটার ইতিউতি চাহনি সন্দেহের মাত্রা বাড়িয়ে দিচ্ছে হাসানের। কেটে গেল বেশ কিছু মুহূর্ত। হঠাৎ করেই কানে এলো শুকনো পাতার মর্মর আওয়াজ। কেউ একজন আসছে। তুমুল উত্তেজনায় শ্বাস বন্ধ করে অপেক্ষা করতে থাকলো কী ঘটে দেখবার। কিছু সময় পর দৃশ্যমান হলো জনা পাঁচেক ষণ্ডামার্কা লোক, হাতে বেশ বড়সড় একটা বস্তা, মুখ ঢাকা রুমালে।
ওস্তাদ! সিরাজ বেচারির বাড়ির সোনাদানা বেচা টাকা। দুই লাখ হইছে। হুনছি, কামাল ব্যাপারি দুডো হালের বলদ বেইচতে গঞ্জে গেছে। সামনের সোমবার রাইত্তেতে আবার আসুমনে।
আরো কিছু সময়ের শ্বাসরুদ্ধকর অপেক্ষা! লোকগুলো নিরাপদ দূরত্বে সরে গেছে বুঝতে পেরেই দ্রুত নেমে এলো হাসান। ছুটে গেল বন্ধুদের কাছে। আল্লাহর ইচ্ছায় প্রথম বারই মিলে গেল কেস।
সোমবার রাত ১টা। কামাল ব্যাপারির বাড়ি। ঘুটঘুটে আঁধারের সাথে মিশে আছে চার কিশোর গোয়েন্দা। পূর্বপরিকল্পনা অনুসারে ইশা পড়েই বাড়ি থেকে চুপিচুপি বেরিয়ে পড়েছে তারা। প্রত্যেকের হাতে ক্রিকেট ব্যাট। অমাবস্যার রাত। চারদিকে ঝিঁঝিপোকার চিৎকার আর মশার গুণগুণ ধ্বনিতে সময় যেন থমকে আছে। আচমকা কারোর সাবধানি পদধ্বনি কানে এলো। সতর্ক হয়ে উঠলো কিশোর গোয়েন্দা দল। অন্ধকারের মাঝেই চোখেচোখে আলোচনা হয়ে গেল করণীয়। তখনো শাগরেদগুলো এসে পারেনি। বিড়ালের মতো নিঃশব্দ পদক্ষেপে সহসা লোকটির পেছন থেকে গামছা চেপে ধরলো হাসান। লোকটা কিছু বুঝে ওঠার আগেই মাহবুব, জাবির ও সাদ লোকটির ওপর ঝাঁপিয়ে পড়লো ত্বরিত বেগে। বেশ কিছুক্ষণ ধস্তাধস্তির পরে লোকটিকে একটি গাছে বেঁধে রাখতে সক্ষম হলো তারা। ইতোমধ্যে চিৎকার চেঁচামেচিতে পড়শিরা জেগে উঠেছে ঘুম থেকে। ঘটনা কী বুঝতেই কাসিম ভাই ফোন দিলেন নিকটস্থ থানায়। আধাঘণ্টার মধ্যেই এস.আই. তারিক মাহমুদি জনা চারেক কনস্টেবল নিয়ে হাজির হলেন। লোকটির শাগরেদগুলো এসে এ অবস্থা দেখে আর পা বাড়াল না। তার ত্বরিত পদক্ষেপে লোকটির পলায়নরত শাগরেদরাও আটক হলো দ্রুত। এস.আই. সাহেব মুগ্ধ হলেন কিশোরদের সাহস আর দূরদর্শিতা দেখে মুগ্ধ এলাকাবাসীও। পরদিন দৈনিক পত্রিকায় বড়ো হরফে প্রকাশিত সবচাইতে চমৎকার খবরের প্রথমাংশ হলো : ‘খুদে গোয়েন্দা দল তরুলতার দুঃসাহসিক অভিযান। কুখ্যাত চোর মজনু বিড়লা তার দলসহ গ্রেফতার।
শ্রীঘরে কিছু উত্তমমধ্যম দেওয়ার পর মজনু বিড়লা লুক্কায়িত অর্থ বের করার স্বীকারোক্তি দিলো। চুরি হওয়া সম্পদ ফিরে না পেলেও সিরাজ সাহেবকে উদ্ধারকৃত দুই লাখ টাকা হস্তান্তর করা হলো। ‘তরুলতা ডিটেক্টিভ টিম’ এর সাহসিকতার পুরস্কারস্বরূপ থানা থেকে দশ হাজার টাকা সম্মানী দেওয়া হলো। তরুলতা ডিটেক্টিভ টিম তা নিতে অস্বীকার করলেও সিরাজ সাহেব গোয়েন্দা টিমের উন্নতিকল্পে ও নৈতিক কাজে লাগাতে একপ্রকার জোর করেই হাসানকে নিতে বাধ্য করলেন। টিম মেম্বারদের দিকে চেয়ে প্রশান্তির হাসি হাসল হাসান। সহপাঠী কামালের চিকিৎসার ব্যবস্থাটা বোধ হয় আল্লাহ করেই দিলেন।

SHARE

Leave a Reply