Home স্মরণ চলে গেলেন বরণীয় কবি গীতিকার কে জি মোস্তফা -মতিন মাহমুদ

চলে গেলেন বরণীয় কবি গীতিকার কে জি মোস্তফা -মতিন মাহমুদ

তাঁর মনটা শিশুর মতো সরল। সহজেই মানুষকে আপন করে নিতেন। তিনি কে জি মোস্তফা। বাংলাদেশে গানের জগতের এক কিংবদন্তি ব্যক্তিত্ব। শিশুদের তিনি অনেক ভালোবাসতেন। তাদের জন্য লিখেছেন কয়েকটি বই। ৮ মে, ২৫ বৈশাখ তিনি পৃথিবীর মায়া কাটিয়ে চলে গেছেন। চলে গেছেন চিরদিনের জন্য। তোমাদের তার কথাই বলবো আজ।
ঐ যে বলছিলাম তিনি গানের জগতের কিংবদন্তি, সেটা দিয়েই শুরু করি। এক সময় পশ্চিমবঙ্গের হিন্দু গীতিকার আর কবিদের লেখা গানই শুনতো মানুষ। কবি নজরুল গানের জগতে আসার পর মুসলিম ধারার সূচনা হলো। এরপর অনেকেই লিখেছেন গান। সেগুলো গাওয়াও হচ্ছিল। এরই এক পর্যায়ে গানের ধারায় অসম্ভব নতুনত্ব এবং সুর ও বাণীর নতুন এক জাদু নিয়ে হাজির হলেন কে জি মোস্তফা। সেটা ১৯৬০ সালের কথা। তার সবচেয়ে জনপ্রিয় গানটি হলো ‘তোমারে লেগেছে এত যে ভালো চাঁদ বুঝি তা জানে’। অর্থাৎ গীতিকারের মনের কথা আকাশের ঐ চাঁদ জানে। গানটি দরদভরা কণ্ঠে গেয়েছিলেন সেই সময়ের বিখ্যাত শিল্পী তালাত মাহমুদ। আর এর চমৎকার সিম্ফনিযুক্ত সুর করেছিলেন সেই সময়কার বিখ্যাত সুরসাধক রবীন ঘোষ। আর মুহূর্তেই গানটি অসম্ভব জনপ্রিয়তা পায়। গানটি সেই সময়ের সিনেমার বিশিষ্ট পরিচালক এহতেশাম পরিচালিত ‘রাজধানীর বুকে’র জন্য লিখেছিলেন কে জি মোস্তফা। এই গানটির ব্যাপারে একটি মজার কথা বলি। কে জি মোস্তফা লিখেছেন- ‘তোমারে লেগেছে এতো যে ভালো…’ গানটি যদি (রবীন ঘোষ) জোর করে আমাকে দিয়ে না লেখাতেন তাহলে আজকের কে জি মোস্তফা হিসেবে আমাকে কেউ চিনতো না। এ জন্য আমি তার কাছে ঋণী। রবীন ঘোষের মৃত্যুতে এভাবেই নিজের অভিব্যক্তি প্রকাশ করেছিলেন বরেণ্য গীতিকার ও কবি কে জি মোস্তফা। তিনি আরো লেখেন, ‘আমার দেখা বিরল সুরকারদের মধ্যে তিনি অন্যতম। তিনি বুঝতে পারতেন কাকে দিয়ে কী গান লেখানো যায়। মনে পড়ে কয়েক দিন আমার পেছনে ঘুরে ঘুরে তিনি এই গানটা লিখিয়েছেন। তারপর সব ইতিহাস।’
এরপর আস্তে আস্তে মুসলমান গীতিকাররা জনপ্রিয়তা পেতে শুরু করলেন। তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের (যা আজকের বাংলাদেশ) গান এভাবে ভারতীয় বাংলা গানের সমকক্ষতা অর্জন করে, তার স্থান দখল করে। সেই সময়ে নাম করা আরেকটি গান হচ্ছে ‘আকাশের ঐ মিটি মিটি তারার সাথে কইবো কথা’। এ গানটা লিখেছিলেন আরেকজন বিখ্যাত গীতিকার মোসলেহউদ্দীন। শিল্পী ছিলেন সুকণ্ঠী শিল্পী নাহিদ নিয়াজী। আরো অনেক গীতিকার, শিল্পী, সুরকারের মাধ্যমে আধুনিক বাংলা গান ঢাকাকেন্দ্রিক হলো। ঢাকা বেতার এই অসাধ্য কাজের পেছনে ছিল মূল ভূমিকায়। আরো পরে ১৯৬৪ সালে প্রতিষ্ঠা লাভের পর ঢাকা টেলিভিশন কেন্দ্রও ঢাকাকেন্দ্রিক এই সঙ্গীতের ধারাকে এগিয়ে নেয়। এর পর আর কে জি মোস্তফাকে পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি।
‘আয়নাতে ওই মুখ দেখবে যখন’ তার আরেকটি অত্যন্ত জনপ্রিয় গান। নায়করাজ রাজ্জাক ও নায়িকা শবনম অভিনীত ‘নাচের পুতুল’ ছবির জন্য তিনি লেখেন এই গান। দুটো গানই এখনো অসম্ভব জনপ্রিয়। এ গানেরও সুরকার ছিলেন রবীন ঘোষ। রবীন ঘোষ ছিলেন শবনমের স্বামী। গানটি গেয়েছেন মাহমুদুন্নবী। রবীন ঘোষের ভাই অশোক ঘোষ পরিচালনা করেন ‘নাচের পুতুল’ সিনেমাটি।

 

২.
কে জি মোস্তফার জন্ম ১৯৩৭ সালের ১ জুলাই নোয়াখালীর বেগমগঞ্জে। তাঁর প্রকৃত নাম খন্দকার গোলাম মোস্তফা। কিন্তু কে জি মোস্তফা নামেই তিনি পরিচিত ছিলেন। আরেকজন সাংবাদিক ছিলেন একই নামের। তবে তিনি সম্পাদক হিসেবেই বেশি পরিচিত ছিলেন। গীতিকার কে জি মোস্তফাও মূলত সাংবাদিক ছিলেন। তিনি খ্যাতিমান কবিও ছিলেন। তাঁর এসব পরিচিতি গীতিকার পরিচয়ের আড়ালে চাপা পড়েছে। তিনি ১৯৬০ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন। দৈনিক ইত্তেহাদে ১৯৫৮ সালে শিক্ষানবিস হিসেবে সাংবাদিকতায় যোগ দেন তিনি। আরো কয়েকটি পত্রিকায় কাজ করেন। ১৯৭৬ সালে তিনি বিসিএস (তথ্য) ক্যাডারভুক্ত হন এবং চলচ্চিত্র ও প্রকাশনা অধিদফতরের সহকারী সম্পাদক পদে যোগ দেন। তিনি সচিত্র বাংলাদেশ ও নবারুণসহ উক্ত বিভাগের কয়েকটি পত্রিকার সম্পাদক ছিলেন। ১৯৯৬ সালে সিনিয়র সম্পাদক (যুগ্মসচিব পদমর্যাদা) হিসেবে অবসর নেন। বেশ কিছু সিনেমার সহকারী পরিচালক হিসেবেও কাজ করেছেন তিনি। রয়েছে বেশকিছু কাব্যগ্রন্থ, ছড়ার বই, গানের বই, গদ্যগ্রন্থ, গানের সিডি, ক্যাসেটও। কে জি মোস্তফার দুই ছেলে। এক ছেলে বর্তমানে কানাডায় বসবাস করেন। এক ছেলের নাম মাহমুদুল হাসান। তার এক পালিত কন্যাও আছে। তার স্বামীর নাম মকবুল হোসেন। তিনি এই গীতিকারের মৃত্যুর খবর সংবাদপত্রসমূহকে জানান। কে জি মোস্তফা বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি পদক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সঙ্গীত বিভাগ কর্তৃক ‘দেশবরেণ্য গীতিকার’ পদক, কিশোরকণ্ঠ সাহিত্য পুরস্কারসহ আরো বহু পদকে ভূষিত হয়েছেন। কিন্তু অনেকের আক্ষেপ প্রকৃত কদর ও জাতীয় বা সরকারী পুরস্কার তিনি পান‍নি। বিশিষ্ট সাংবাদিক ও জনপ্রিয় ‍নিউজ পোর্টাল ‘ঢাকা মেইলে’র হেড অফ নিউজ হারুন জামিল লিখেছেন : “কে জি মোস্তফা’র মতো একজন গীতিকার তৈরি হওয়া যে কোনো জাতির জন্য বিশাল ব্যাপার। কিন্তু আমরা তো আবেগ ও হুজুগে অভ্যস্ত। কতজন তার গানের সিডি কিনেছেন জিজ্ঞেস করলেই বোঝা যাবে! তিনি যদি পশ্চিমবঙ্গের হতেন তাহলে ভিন্ন কিছু দেখা যেতো। অমায়িক, নিরহঙ্কার, সদা বিনয়ী এই মানুষটিকে আমরা কতটাই বা সম্মান দিতে পেরেছি? তার লেখা গানগুলোর মতো আর হয়তো কোনো বাংলা গান রচিত হবে না।”

৩.
কে জি মোস্তফা ছিলেন মূলত কবি ও সাংবাদিক। তার লেখা উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থ হচ্ছে : ১. কাছে থাকো ছুঁয়ে থাকো ২. উড়ন্ত রুমাল ৩. চক্ষুহীন প্রজাপতি ৪. সাতনরী প্রাণ ৫. আয়নাতে ঐ মুখ দেখবে যখন ৬. এক মুঠো ভালোবাসা ৭. প্রেম শোনে না মানা ৮. মন চায় উড়ে যেতে। গদ্যগ্রন্থ ১. কোথায় চলেছি আমি (সরস আত্মকাহিনী) ২. কবিতার প্রাণ-মন-দেহ। এসব গ্রন্থে তিনি দেশ, মাটি মানুষের কথা বলেছেন। তাদের মনের কথা প্রকাশ করতে চেয়েছেন।
শিশুদের জন্য ‍তিনি কয়েকটি বই লিখেছেন। এগুলো সবই ছড়ার বই- ১. শিশু তুমি যিশু ২. কন্যা তুমি অনন্যা ৩. মজার ছড়া শিশুর পড়া। এগুলোতে তিনি শিশুর মনের কথা বলার চেষ্টা করেছেন। তাদের মজার জগতে নিয়ে যেতে চেয়েছেন।
তার গানের বেশ কয়েকটি রেকর্ড, একক ক্যাসেট ও সিডি বা অ্যালবাম প্রকাশিত হয়েছে। এগুলো জনপ্রিয়তাও পেয়েছে।

৪.
তাঁর সঙ্গে আমার অজ¯্র স্মৃতি। নবারুণ ও সচিত্র বাংলাদেশে আমি নিয়মিত লিখতাম। তিনি চেয়ে চেয়ে আমার কাছ থেকে লেখা নিতেন। নিয়মিত বিলও পেতাম। মাঝে মাঝে গল্প করতাম। একটা স্মৃতি মনে পড়ছে। ১৯৭৯ বা ৮০ সাল হবে। আমি তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। বাংলা বিভাগ, কে জি ভাইও সেই বিভাগেরই ছাত্র ছিলেন। সলিমুল্লাহ হলের বার্ষিকী করার দায়িত্ব পড়লো আমার ওপর। হল সংসদের নির্বাচিত সাহিত্য সম্পাদক ছিল আমার ক্লাসমেট আলীনূর হাজারী। প্রকাশনা বিষয়ে তার অভিজ্ঞতা ছিল না বলে সেই আমাকে ঠেলে দিয়েছিল সামনে। আমি তখন দুয়েকটি পত্রিকার প্রকাশনার সাথে যুক্ত। আর বিগত ৩৩ বছর হলের বার্ষিকী প্রকাশ হয়নি। এর আগে হয়েছে। লেখা সংগ্রহ হলো। এবার ছাপার পালা। ভালো ছবি পাচ্ছি না। হলের কোনো পুরনো ছবি আছে কি না খবর নিতে চলচ্চিত্র ও প্রকাশনা বিভাগের কাকরাইলের অফিসে কে জি ভাইয়ের কাছে গেলাম। তিনি নিরাশ করেননি, ঘেঁটে ঘুটে দিয়েছিলেন ছবি। সেগুলো প্রকাশ হয়েছিল বার্ষিকীতে।
আমরা ভাগ্যবান, আমাদের চোখের সামনে একজন লিজেন্ডারি ব্যক্তিত্ব ছিলেন। তাঁর মূল্য মনে হয় আমরা দিতে পারিনি। পরে তাকে কাছে পাই প্রেস ক্লাবে। প্রেস ক্লাবে দেখা হলেই বলতেন, কেমন আছেন। তিনি আমাকে আপনি করেই বলতেন, যদিও মানা করতাম। জবাবে পাল্টা প্র্রশ্ন করতাম আপনি কেমন আছেন কে জি ভাই? শুনে হেসে বলতেন, এই চলে যাচ্ছে আর কি? এত নামকরা একজন দেশবরেণ্য গীতিকার, কিন্তু তার মনে কোনো অহঙ্কার দেখিনি, না পাওয়ার কোনো আক্ষেপও ছিল না। তিনি কারো কাছে কিছু প্রত্যাশাও করতেন না বলে মনে হতো। তিনি ছিলেন একজন হোমিওপ্যাথিক ডাক্তার। অবসর জীবনে এর মাধ্যমে মানুষের সেবা দিয়েছেন। তিনি জাতীয় প্রেস ক্লাবের সদস্য ছিলেন। প্রেস ক্লাব কর্তৃপক্ষ তাকে সেখানে গেটের বাম পাশে একটি চেম্বার করে দিয়েছিলেন। সেখানে বসেই তিনি রোগী দেখতেন। সাংবাদিকরা তার কাছে সেবা নিতেন। সাধারণ মানুষও ওষুধের জন্য তার কাছে আসতেন। তিনি নেই, কিন্তু তার গান ও কবিতা আছে। এরই মাঝে তিনি বেঁচে থাকবেন। তাঁর রুহের মাগফিরাত কামনা করছি।

SHARE

Leave a Reply