Home ফিচার মধুমাসের মধুফল আম -মুহাম্মদ নূরুল হুদা

মধুমাসের মধুফল আম -মুহাম্মদ নূরুল হুদা

আমগাছ বাংলাদেশের জাতীয় বৃক্ষ। ২০১০ সালের মন্ত্রিসভার বৈঠকে আমগাছকে জাতীয় বৃক্ষের মর্যাদা দেওয়া হয়। মূলত ফল হিসেবে আমের জনপ্রিয়তা, দেশের সর্বত্র আমগাছের সুপ্রাপ্যতা, গাছটির কাঠের উপযোগিতা, আমবাগানের ঐতিহাসিক প্রসঙ্গ (১৭৫৭ সালের পলাশীর আমবাগানের যুদ্ধ, ১৯৭১ সালের মুজিবনগর আমবাগানে মুক্তিযুদ্ধের শপথ, জাতীয় সঙ্গীতে আমবাগানের উল্লেখ) ইত্যাদি বিবেচনায় এনে আমগাছকে জাতীয় বৃক্ষ ঘোষণা করা হয়।
জ্যৈষ্ঠ মাসে পাকা আম, কাঁঠাল, লিচু, কলা, আনারস, কালো জাম, গোলাপ জাম, বেত ফল, গাব, জামরুল, আতাফল, কাউ, শরিফাসহ নানা ফল আসা শুরু হতে থাকে। মধুর স্বাদের হরেক ফল। মধু স্বাদের ফল পাওয়া যায় বলে কেউ কেউ এই মাসের নাম দিলেন ‘মধুমাস’। আমাদের ছোটোবেলায় এই সময়ে যেসব ফল খেতাম সেগুলোর বেশ কয়েকটি এখন বিলুপ্ত প্রায়।
বাংলাদেশের জাতীয় ফল কাঁঠাল যদি রথী হয়, ফলের রাজা আম হবে মহারথী, খুবই সহজ হিসাব, কিন্তু স্বাদ, প্রাপ্যতা, গুণাগুণ, নানা বিচারে কেউ কাঁঠালকে কেউবা আমকে এগিয়ে রাখে। তবে দুটোই যে আমাদের কাছে সমাদৃত তা বলার জন্য ঠেলাঠেলি করতে হয় না।
আম নিয়ে বলতে গেলে এক ইতিহাস হয়ে যাবে। আমের শেকড় অনেক গভীরে প্রোথিত আছে বলা যায়। কেউ কেউ বলে খ্রিস্টপূর্ব ৫০০ বছর আগে আমের জন্ম। গবেষকদের মতে বাংলাদেশে প্রথম আমের চাষ শুরু হয় পাহাড়ি অঞ্চলে, ধীরে ধীরে সারা বাংলাদেশে এর বিস্তার ঘটে। তবে আমের পিতৃভূমি বলতে রাজশাহী চাঁপাইনবাবগঞ্জকেই বলা চলে। আম ছাড়া জ্যৈষ্ঠ আর বৃষ্টি ছাড়া বর্ষাকাল যেন একইভাবে অনর্থক বলা চলে।
রাজশাহী ও চাঁপাইনবাবগঞ্জের আমবাগানগুলোতে কম করে হলেও খুঁজে পাওয়া যাবে পাঁচশো জাতের আম। ফজলি, ল্যাংড়া, হিমসাগরের বাইরে আরও যে কত শত নাম রয়েছে আমের, তার খোঁজ-খবর খুব একটা রাখা হয় না। অথচ এগুলো খেয়ে তৃপ্তির ঢেঁকুর তুলি আমরা। মধুফল আমের বর্ণনায় এর চমৎকার সুন্দর নামগুলোর উল্লেখ রয়েছে।
আম ফলের রাজা। সারা পৃথিবীতে রয়েছে এর প্রায় ৫০০ প্রজাতি। সব প্রজাতির আমই যে ভক্ষণযোগ্য, তা নয়। অনেক ফলই খাবারের অযোগ্য। এই ৫০০ প্রজাতির আমের রয়েছে প্রায় এক হাজার ৫০০ জাতের আম, কারো কারো ধারণা তালিকার বাইরে রয়ে গেছে আরো আট থেকে নয় হাজার জাতের আম। কোনো কোনো বিশেষ প্রজাতির আম থেকে একাধিক জাতের আমের উদ্ভাবন নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে ইদানীংকালে।
প্রাচীনকালে আমের গুরুত্ব বুঝতে পেরে সংস্কৃত ভাষায় এর এ নামটি রাখা হয়। ভারতীয় উপমহাদেশের ললিতকলা ও ভাস্কর্যে আম ও আমগাছের ব্যবহার রয়েছে। খ্রিস্টপূর্ব ১৫০ অব্দ পুরনো খাঁচি স্তূপের স্থাপত্যকর্মে আমগাছ আমকে দারুণভাবে চিত্রিত করা হয়েছে। সম্রাট আকবরের জীবনকথা নিয়ে রচিত গ্রন্থ ‘আইন-ই-আকবরী’তে ভারতবর্ষের বিভিন্ন প্রজাতির উল্লেখযোগ্য সংখ্যক আমের উল্লেখ রয়েছে।
মোগলরা ছিল আমের ভীষণ ভক্ত। পৃথিবীর বিভিন্ন স্থানে বিভিন্ন প্রজাতি ও জাতের আমগাছ এনে তারা বাগানে তা রোপণ করতো। তাদের সেই আমপ্রীতির কল্যাণেই ভারতীয় উপমহাদেশেই রয়েছে এক হাজার ৫০০ জাতের আম। আমাদের দেশেও দীর্ঘকাল ধরে আমের ফলন চলে আসছে। রাজশাহী, দিনাজপুর, কুষ্টিয়া, খুলনা ও যশোরের কিছু বাণিজ্যিক বাগানে আমের বেশ ফলন হয়। চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও রাজশাহী অঞ্চলের আমের বাগানগুলো দেশজুড়ে আমের খোরাক জোগায়। এর মধ্যে শুধু চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ উপজেলায় সবচেয়ে বেশি জাতের উন্নত আমের দেখা মেলে। ল্যাংড়া, হিমসাগর, খিরসাপাত, আমরুপালি, বড়ভুলানি, মেসো, পছন্দ, ক্ষীরমন, গোপালভোগসহ বেশকিছু জাতের আমের জন্য এসব এলাকা সুবিখ্যাত। এছাড়া দেশের আমবাগানগুলো কিংবা বসতবাড়ির আনাচে-কানাচে যেসব আমের চাষ হয় সেগুলো একেকটির নাম ভোলার নয় মোটেও।
অনুপম সুন্দর এক একটি আমের নাম। সিন্দুরী, কালোমেঘ, বনখসা, দেশি গুটি, চম্পা, অরুনা, সূর্যপুরী, জিলাপি কাড়া, কাঁচামিঠা, লতা, বারোমাসি, কলামোচা, মল্লিকা, মিশ্রীকান্ত, শীতলপাটি, নাম ডক মাই, জামাই পছন্দ, লক্ষণভোগ, গোলাপবাস, বিশ্বনাথ চ্যাটার্জি, বাগান বিলাস, ভারতী, নাক ফজলি, চিনি মিশ্রী, জগৎমোহিনী, রাখাল ভোগ, গোবিন্দ ভোগ, ম্যাট্রাস, তোতাপুরী, জালিবান্দা, মিক্সড স্পেশাল, মৌচাক, চৌরসা, রাঙ্গাগুড়ি, ভূতো বোম্বাই, আলমশাহী, বাতাসা, রানীভোগ, পাহাড়িয়া, মালদা, শেরীধন, শামসুল সামার, বাদশা, রস কি গুলিস্তান, কন্দমুকাররার, ক্যালেন্ডা, রুবি, খাসা, পারিজা, গুলাপজামুন, দাদাভোগ, শরবতি ব্রাউন, লাড্ডু, সান্দিলা, বোম্বে গ্রীন, তোহফা, তৈমুরিয়া, জাহাঙ্গীর, কাওয়াশজি প্যাটেল, ভেজপুরি, ইয়াকুতিয়া, আলীবাগ, কলম সুন্দরী, হুসনে আরা, সফেদা লাখনোও, হিমাউদ্দিন, মিছরিদানা, চৌষা, জহুরী, সফেদা, আনোয়ার রাতাউল, মালদইসহ অসংখ্য এমন নাম রয়েছে।
স্বাদ আর পুষ্টিগুণে আজও আম অনন্ত যৌবনা। আম শুধু সুস্বাদু ফল তা নয়, আছে প্রচুর পুষ্টিগুণ। একটি কাঁচা আমে ৮৪ শতাংশ পানি, ১৫ শতাংশ কার্বোহাইড্রেট, ১ শতাংশ প্রোটিন এবং নগণ্য ফ্যাট (টেবিল) থাকে। এছাড়া প্রতি ১০০ গ্রাম পাকা আমে খাদ্যশক্তি আছে ৯০ কিলো ক্যালরি, আমিষ ১ গ্রাম, শর্করা ২০ গ্রাম, ক্যালসিয়াম ১৬ গ্রাম, ১.৩ মিলিগ্রাম আয়রন আর পর্যাপ্ত ভিটামিন মিলে আম আসলেই ফলের রাজা। বিজ্ঞানীরা বলেন আমের আছে ক্যান্সার প্রতিরোধ ক্ষমতা। রাতকানা ও অন্ধত্ব প্রতিরোধে পাকা আম এমনকি কাঁচা আম মহৌষধ। কচি পাতার রস দাঁতের উপশমকারী। আমের শুকনো মুকুল পাতলা পায়খানা, পুরনো আমাশয় এবং প্রস্রাবের জ্বালা যন্ত্রণা উপশম করে। জ্বর, বুকের ব্যথা, বহুমূত্র রোগের জন্য আমের পাতার চূর্ণ ব্যবহৃত হয়।
আম সাধারণত মিষ্টি, যদিও স্বাদ এবং গড়ন বিভিন্ন জাতের বিভিন্ন রকম। যেমন আলফানসো আম নরম, কোমল, সরস অনেকটা অতিপক্ব বরইয়ের মত, অন্যদিকে টমি অ্যাটকিনস (আমের একটি জাত) শক্ত কতকটা ফুটি বা এভোকাডোর মত আঁশযুক্ত। ফল হিসাবে খাওয়ার পাশাপাশি আম থেকে চাটনি, আচার, আমসত্ত্ব, মোরব্বা জ্যাম, জেলি ও জুস তৈরি হয়। তবে কাঁচা অবস্থায়, আচার বানিয়ে বা রান্না করে খেলে সংবেদনশীল মানুষদের ঠোঁট, মাড়ি বা জিহ্বায় ডার্মাটাইটিস (চর্মরোগ) রোগ হবার সম্ভাবনা রয়েছে।
আম রান্নায় বহুল ব্যবহৃত একটি ফল। টক, কাঁচা আমের চাটনি ও আচার বানানো হয়। ডাল এবং বাঙালি রন্ধনশৈলীতে অন্যান্য খাবারে ব্যবহার করা হয়, অথবা লবণ, মরিচ বা সয়া সসের সাথে কাঁচা খাওয়া যেতে পারে। আমের পানা নামে গ্রীষ্মকালীন এক ধরনের পানীয় আম থেকেই তৈরি হয়। আমের পাল্প থেকে জেলি তৈরি করে বা লাল রঙা ডাল এবং কাঁচামরিচ দিয়ে রান্না করে ভাতের সাথে পরিবেশন করা হয়। আমের লাচ্ছি দক্ষিণ এশিয়া জুড়ে বেশ জনপ্রিয়, পাকা আম বা আমের পাল্পের সাথে মাখন/ দুধ ও চিনির সাথে মিশ্রিত করে তৈরি করা হয়। পাকা আম তরকারিতেও ব্যবহৃত হয়। আমরস চিনি বা দুধের সাথে আম দিয়ে তৈরি একটি জনপ্রিয় পানীয়, যা চাপাতি বা পুরির সাথে খাওয়া হয়।
আম মোরব্বা (ফল সংরক্ষণ পদ্ধতি), মুরাম্বা (মিষ্টি, পাকা আমের তৈরি খাবার), আমচুর (শুকনো এবং চূর্ণ কাঁচা আম) এবং আচার (একটি মসলাযুক্ত সরিষার তেল মিশ্রিত খাবার) তৈরি করতে ব্যবহার করা হয়।
কাঁচা আম ব্যাঙ্গু রং (বিশেষত ফিলিপাইনে), মাছের সস ভিনেগার সয়া সস, লবণ মসলা মিশিয়ে দিয়ে খাওয়া যেতে পারে। মিষ্টি, পাকা আমের টুকরোগুলো শুকনো করে (কখনও কখনও বীজহীন তেঁতুলের সাথে মিলিয়ে ম্যাংগোরাইনড তৈরি করে) খাওয়াও জনপ্রিয়। আম দিয়ে আমের মধু বানানো যায় এবং আইসক্রিম এবং শরবতের প্রধান উপাদান হিসেবে ব্যবহার করা যায়। আমের টুকরার ভর্তা করা হয়। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অন্যান্য অঞ্চলে আমের ফিস সস এবং রাইস ভিনেগার সহকারে আচার বানানো হয়। আমের সালাদে ফিস সস এবং শুকনো চিংড়ি সহযোগে কাঁচাআম ব্যবহার করা যেতে পারে। কনডেন্সড মিল্কসহ আমকে বরফের চূড়া হিসেবেও ব্যবহার করা যেতে পারে।
মধুমাসে আমের প্রাধান্য বেশি। যদিও এই সময়ে অন্যান্য কয়েকটি ফলের সমাহার থাকে তবে আমের তুলনায় তা কিছুটা গৌণ হয়ে থাকে। আমের সেকাল নিয়ে বলতে গেলে অনেক স্মৃতিবিজড়িত ঘটনা রয়েছে। অনেকটা বলতে গেলে বৈশাখ, জ্যৈষ্ঠ ও আষাঢ় এই তিন মাসেই আমের নানা রকমের ব্যবহার দেখা যায়। প্রথমত বলা যায়, কালবৈশাখী ঝড়ে অনেক কাঁচা আম ঝরে পড়ে। সেই কাঁচা আমের ভর্তা এবং আচার বানানোর চর্চা ছিল একসময়, এমনকি নিকটবর্তী আত্মীয়ের বাড়িতে কাঁচা আম পাঠাতে দেখা গেছে। এত আম ঝরে পড়ার পরও অনেক আমগাছে থেকে যেত। বৈশাখ মাসেই গ্রামগঞ্জে পাড়া-মহল্লায় যুবকরা ছোটো চাকু দিয়ে আম কেটে খেত। কালক্রমে জ্যৈষ্ঠ এসে গেলে আমের অন্য রকম ব্যবহার শুরু হতো। জ্যৈষ্ঠ মানেই সকালের নাস্তা মুড়ি দিয়ে আম খাওয়া, রাতে খাবার শেষে আম দুধ খাওয়ার রেওয়াজ ছিল। এমনকি হুজুর খাওয়ানো অর্থাৎ দোয়া নেওয়ার জন্য হুজুরকে আম দুধ খাওয়ানো হতো। আবার পাকা আম আত্মীয়-স্বজনের বাড়িতে পাঠানো হতো অথবা যিনি পাঠাতেন তার বাড়িতে ও আত্মীয়স্বজনের বাড়ি থেকে আমের ঝুরি আসতো। কিশোরদেরকে আম কুড়াতে দেখা যেত এবং সেগুলো সে নিজে সংরক্ষণ করতো। দিনের সময় অসময়ে আম খাওয়া হতো নিজের ইচ্ছে মত। এতে করে বাড়ির যত্রতত্র আমের আঁটি ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকতো। একসময় আষাঢ়-শ্রাবণের দিকে আমের আঁটি থেকে চারা গজিয়ে উঠতো। আষাঢ় মাস বলতে গেলে ফজলি আম বা মালদই আমের পালা থাকতো। এটা ছিল শেষ ধাপ অর্থাৎ আমের মৌসুম বলতে পুরোপুরি জ্যৈষ্ঠকেই বলা হতো। এই জ্যৈষ্ঠ মাসের গরমে রাতে অনেক আম বাড়ির টিনের ছাদে শব্দ করে পড়তো। জ্যৈষ্ঠ মাসেই আমের অনেক মজাদার ঘটনা রয়েছে।
বর্তমান প্রেক্ষাপটে আমের সেই অবস্থা গ্রামেগঞ্জে অনেকটাই নেই। কিছু কিছু ক্ষেত্রে থাকলেও তার অনেক পরিবর্তন ঘটেছে। তখনকার দিনে আম বলি কাঁঠাল বলি বিভিন্ন ফলের মানুষের সাথে সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্কের একটা ক্ষেত্র তৈরি হতো। গাছের নতুন ফল পাড়া প্রতিবেশীর সাথে লেনদেন হতো। মানুষ মানুষকে খাইয়ে বিশেষ আনন্দ পেত এবং মানুষের প্রতি মানুষের একটা ভালোবাসা ছিল। এখন আমের চর্চাটা অনেকটাই বাণিজ্যিক হয়ে গেছে। মানুষ বাণিজ্যিক দৃষ্টিকোণ থেকে আম কেনা-বেচা করে এবং এই সময়ের জন্য অপেক্ষা করে। বিশেষ করে মধুমাস কখন আসবে। কিন্তু তারপরও ঐতিহ্যবাহী মধুমাস আমে ভরপুর হয়ে যায়। মানুষ বিশেষ করে শহর-বন্দর গ্রামের লোকজন এই সময়ের জন্য অপেক্ষায় থাকে।

SHARE

Leave a Reply