Home প্রচ্ছদ রচনা বাঘের মুখোমুখি -ফরিদী নুমান

বাঘের মুখোমুখি -ফরিদী নুমান

সুন্দরবনে বাঘের ছবি তোলা বন্যপ্রাণী বিষয়ক আলোকচিত্রীদের কাছে স্বপ্ন। ২০২২ সালের ৩১ মার্চ আমার সে স্বপ্ন প্রথমবারের মতো পূরণ হয়েছে। সবাই জানেন এবং বুঝতে পারেন, সুন্দরবনে বাঘের ছবি তোলা জীবনের ঝুঁকি নেওয়া একটি চরম চ্যালেঞ্জিং কাজ। বাঘের ছবি তুলতে গিয়ে আমার যে উপলব্ধি হয়েছে আজ সেটা বলতে চাচ্ছি। প্রথমেই বলে নেই, আমার মতে বাঘের ছবি তোলার জন্য ক্যামেরা-লেন্সের পাশাপাশি শরীর-মন এবং সাহসের জোরও থাকতে হয়। আবার সুপ্রসন্ন ভাগ্যও থাকতে হয়। আমি ২০০৪ সালে প্রথমবার সুন্দরবন গিয়েছিলাম। এরপর কোনো কোনো বছর ৮-১০ বারও গিয়েছি। সুন্দরবনের সুলভ-দুর্লভ নানারকম পাখি, নানারকম সাপ, সরীসৃপ, হরিণ, কুমির, ভোঁদড়, ডলফিনের ছবি তুলেছি। প্রতিবারই আশা করতাম যদি বেঙ্গল টাইগার বা বাংলা বাঘের ছবি তুলতে পারতাম। এজন্য সুন্দরবনগামী লঞ্চের সামনে বসে থেকে সারাক্ষণ বনের দিকে চেয়ে থাকতে থাকতে চোখ ক্লান্ত হয়ে গেছে। তবুও ভাবতাম- হয়তো গোলপাতা, সুন্দরী কিংবা কেওড়া বনের ফাঁকে বনের রাজাকে দেখা যাবে। যতদূর জেনেছি বেঙ্গল টাইগার আমাদেরকে ঠিকই দেখে, কিন্তু আমরা তাকে দেখতে পাই না। আমরা যতই ভাবি বাংলা বাঘ খুব হিংস্র প্রাণী, কিন্তু বাস্তবতা হলো- হিংস্রতা তার স্বভাবজাত হলেও, বাঘ খুব লাজুক প্রাণী। আড়ালে-আবডালে বসে তার রাজত্বে কে বা কারা আসা-যাওয়া করে সে তার দেখভাল ঠিকই করে। কাউকে বিপজ্জনক মনে করলেই শুধুমাত্র তার ওপর হামলা করে। সুন্দরবনের এই বাংলা বাঘ পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দরতম বাঘ। আফ্রিকান, চায়না বা সুমাত্রাসহ অন্যান্য যেসব বাঘ আছে, রং-রূপে আমাদের বাঘের চেয়ে সুন্দর না।

বেঙ্গল টাইগার নাকি রয়েল বেঙ্গল টাইগার
আমাদের প্রিয় বাংলা বাঘ নিয়ে এখানে একটা কথা বলতে চাচ্ছি। সুন্দরবনের বাংলা বাঘকে অনেকেই ‘রয়েল বেঙ্গল টাইগার’ বলে থাকেন। অথচ বাংলায় কখনো ‘রাজকীয় বাংলা বাঘ’ বলেন না। বিশ্বের প্রাণিবিজ্ঞানের সমস্ত নথি বা গবেষণাপত্রে পৃথিবীর সুন্দরতম এই বাঘকে ‘বেঙ্গল টাইগার’ বা ‘বাংলা বাঘ’ বলা হয়েছে। খেয়াল করুন, আদর করে আমাদের বাঘকে ‘বনের রাজা’ বলাই যায়। তবে তা হওয়া উচিত ছিল- ‘কিং বেঙ্গল টাইগার’, যেমনটা সিংহকে বলা হয়- ‘কিং লায়ন’। ‘রয়েল’ বলতে তো ‘রাজা’ নয় ‘রাজকীয়’ বোঝায়। ধারণা করা হয়, এই অবাঞ্ছিত শব্দটি ব্রিটিশদের আরোপিত শব্দ। ব্রিটিশরা তাদের সব মূল্যবান জিনিসকে তাদের রাজা বা রাণীর সম্পত্তি হিসেবে ‘রাজকীয়’ বা ‘রয়েল’ শব্দ দিয়ে পরিচিত করে থাকে। মাঝে কিছুদিন বেঙ্গল টাইগারকে ‘ইন্ডিয়ান টাইগার’ বলে চালিয়ে দেওয়ার কাজটি করেছিলেন কিছু প্রাণিবিজ্ঞানী। তবে সে প্রয়াস ধোপে টেকেনি।

বাঘের খোঁজে বার বার সুন্দরবনে
সুন্দরবনে বাঘের ছবি তোলার জন্য যখনই ‘বাঘ দেখা গেছে’ এমন তথ্য পেয়েছি, সাথে সাথেই খুব দ্রুততার সাথে সেখানে গিয়ে হাজির হয়েছি, খুঁজেছি অনেক দিন, অনেক বছর। একবার মংলার এক ট্যুর অপারেটর এমন তথ্য জানালো যে, জামতলা টাওয়ার থেকে একজন বিদেশী পর্যটক সাইবার-শট ক্যামেরা দিয়ে ছবি এবং ভিডিও করেছে। পরদিনই স্বল্প প্রস্তুতি নিয়ে আমরা মংলা চলে গেলাম। এবং তারপর টানা দুইদিন সুন্দরবনের জামতলা টাওয়ার, খাল এবং সন্নিহিত বনে বাঘের অপেক্ষায় বসে থাকলাম। কিন্তু কোথায় বাঘ? আমরা যেসব এলাকায় তাকে খুঁজে ফিরছি একটু পরেই সেসব এলাকাতেই তার নতুন টাটকা পায়ের ছাপ দেখছিলাম। তার মানে বাঘ আমাদের সাথে ঠিকই লুকোচুরি খেলছিল। আরেকবার আমার দীর্ঘদিনের নিয়মিত সফরসঙ্গী ইমদাদুল ইসলাম বিটু ভাই আর আমি কটকার টাইগার টিলার কাছে বাঘের গর্জন শুনতে পেয়ে সেদিকে যাচ্ছিলাম, যদি মামাকে দেখা যায়। কিন্তু পেছন ফিরে দেখি আমাদের সঙ্গী-সাথীদের কেউই কাছে নেই, যে যার মতো পালিয়ে গেছে, আর আমাদের দায়িত্বে থাকা ফরেস্টগার্ড দূর থেকে চেঁচামেচি করছে আমাদের জন্য। আমার আরেক সফরসঙ্গী মুগনিউর রহমান মনির উদ্যোগে শেরপুরের একটা গ্রুপকে নিয়ে সুন্দরবন গিয়েছিলাম একবার। সুন্দরবনে পক্ষীর খালে বোট-ট্রিপের সময় একটা নীলকান মাছরাঙাকে দেখলাম কিন্তু গ্রুপের সদস্যরা এতবেশি দুষ্টুমি করছিল যে মাছরাঙাটির দেখা পাওয়াই কষ্টকর হয়ে যাচ্ছিল। শেষে বিরক্ত হয়ে গ্রুপের সবাইকে নাস্তা করানোর উছিলায় লঞ্চে নামিয়ে দিয়ে আমি আর মণি ফের পক্ষীর খালে ঢুকেছিলাম। আমাদের নৌকার মাঝি গাউস ভাই বললো, স্যার খালের ডানপাশের দিকে তাকান। তাকিয়ে দেখলাম খালের মুখেই বাঘের তরতাজা পায়ের ছাপ। অর্থাৎ আমাদের গ্রুপটিকে নৌকা থেকে লঞ্চে উঠানোর ৪-৫ মিনিটের মধ্যেই বাঘটি খাল পার হয়ে অন্য পাড়ে গেছে। যদি আমরা পেছন ফিরে তাকাতাম, হয়তো বাঘটিকে দেখতেও পেতাম। সম্ভবত বাঘটি খালের পাশের জঙ্গলে আমাদের নৌকার পাশাপাশিই ছিল।

আবারো বাঘের খবর
২০২২ সালের মার্চ মাসের শুরুতে বাংলাদেশ বার্ড ক্লাবের ড. নিয়াজ ভাই সুন্দরবনে একসাথে ৪টি বাঘের দেখা পাওয়ার ঘটনায় পুরনো ইচ্ছেটি আবার মাথার ব্রহ্মতালুতে বার বার হাতুড়ি মারছিল। আমরা তখন চট্টগ্রামের ফটিকছড়িতে হাজারিখিলে কাঠময়ূর খুঁজে বেড়াচ্ছি। ক’দিন পর আবার খবর এলো বন বিভাগের মফিজুর রহমান চৌধুরী ভাই সুন্দরবনে টহল দিতে গিয়ে আবার একসাথে ৩টি বাঘের দেখা পেয়েছেন। করোনা পেন্ডামিকের কারণে গত দু’বছর সুন্দরবনে খুব কম যাওয়া হচ্ছিল আমার। তাছাড়া পকেটের নিত্য টানাটানিতে সুন্দরবন যাওয়ার আগ্রহ থাকলেও সাহস পাচ্ছিলাম না। মার্চের ২২ কিংবা ২৩ তারিখের দিকে আমাদের টিমের আদনান স¤্রাট সুন্দরবনে প্রোগ্রাম নেওয়ার জন্য খুব পীড়াপীড়ি শুরু করলো। আমি বরাবরের মতো আমার অসুস্থ পকেটের কথা বললাম তাকে। সে নিজে থেকে বললো- আপনার সুন্দরবন ট্রিপের স্পন্সর আমি। আর এতেই আমি রাজি হয়ে গেলাম। এরপর আমি সুন্দরবন প্রোগ্রাম আয়োজন শুরু করি। মংলার ফেমাস ট্যুরস বিডি-ভ্রমণ বাংলার কর্ণধার তানজির এইচ রুবেল বছর দুই আগে গাংচিল লঞ্চটি কিনেছে।
১১ জনের ধারণক্ষমতা সম্পন্ন এই লঞ্চ কেনার পর থেকেই তার সাথে সুন্দরবনে যাওয়ার জন্য মাঝে-মধ্যেই বলে আসছিল। রুবেলের সাথে কথা বললাম। তাদের একটি নিয়মিত ট্রিপ ছিল যেটা ৩০ মার্চ সুন্দরবন যাবে। ৪ দিনের ট্রিপে ২ এপ্রিল সুন্দরবন থেকে ফিরবে। যেহেতু ২ এপ্রিল পবিত্র রমজান মাস শুরু হয়ে যেতে পারে সেজন্য একদিন পিছিয়ে ট্রিপটিকে ২৯ মার্চ থেকে করতে প্রস্তাব দিলে রুবেল সেটা মেনে নিলেন। এরপর সবাইকে সুন্দরবনের জন্য প্রস্তুতি নিতে বললাম। আমাদের এবারের দলে ৭ জন ছিলাম যারা অনেকদিন ধরেই ওয়াইল্ডলাইফ ফটোগ্রাফি করি। আমি, কিসমত ভাই, এমদাদুল ইসলাম বিটু ভাই, আদনান আজাদ, আদনান হোসেন স¤্রাট, ফরিদপুর থেকে অংশগ্রহণ করেন ডা. সাইফুল আলম, শেরপুর থেকে মুগনিউর রহমান মণি। এছাড়া হবিগঞ্জের চুনারুঘাট থেকে অংশ নিয়েছিলেন মোমিনুল হক এবং দেওয়ান ফরহাদ ভাই। মোমিন ভাই আগে একবার সুন্দরবন এলেও ফরহাদ ভাই জীবনে এবারই প্রথম সুন্দরবনে এসেছেন।

যাত্রা হলো শুরু
২৮ মার্চ সন্ধ্যায় ঢাকার গাবতলী থেকে সরাসরি মংলার কোচে চেপে আমাদের যাত্রা শুরু হলো। পথে ফরিদপুর থেকে মধ্যরাতে আমাদের সাথে যুক্ত হলেন ডা. সাইফুল আলম। আর আদনান আজাদ আগে থেকে মংলা ছিলেন। রাত সাড়ে তিনটে নাগাদ আমরা মংলা ঘাটে পৌঁছেই আমাদের জন্য নির্ধারিত লঞ্চ গাংচিলে উঠে গেলাম। ২৯ মার্চ সূর্য ওঠার আগেই মংলা থেকে আমাদের চূড়ান্ত যাত্রা শুরু হলো সুন্দরবনের পথে। পথে দেখা হলো বাওয়ালিদের গোলপাতা নৌকার বিশাল বহর। জেলেরা খালের পাড়ে পাটা জাল দিয়ে মাছ ধরার আয়োজন করছে। এখন সুন্দরবনে মধু সংগ্রহের সিজন শুরু হলেও এদিকটায় মাওয়ালদের তৎপরতা চোখে পড়লো না। বিশেষ অনুমতি নিয়ে আমরা হারবাড়িয়া খাল দিয়ে কচিখালীর পথে এগিয়ে চললাম। এই খালটিকে সাম্প্রতিককালে পর্যটকদের জন্য নিষিদ্ধ করেছে বন বিভাগ। মার্চ মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহ থেকে শুরু করে এমাসে বেশ কয়েকটি স্থানে বাঘ দেখা গিয়েছিল সেসব স্থান দিয়ে খুব ধীরগতিতে বা থেমে থেমে আমরা বাঘ খুঁজতে থাকি, কিন্তু কোথাও বাঘের টিকিটির দেখাও পেলাম না। দ্বিতীয় দিনও ঠিক এভাবেই বাঘের খোঁজে সময় পার হলো। এদিন একটি কোম্পানির সুন্দরবন ভ্রমণের জন্য একসাথে ১০-১২টি বড়ো বড়ো লঞ্চের বিশাল বহর দেখে আমরা হতাশ হলাম। আমাদের অভিজ্ঞতা বলে সুন্দরবনে এত বড়ো লঞ্চের বহর থাকলে বাঘ দেখার আশা দুরাশা মাত্র। অবশ্য তখন তারা একসাথে সবগুলো লঞ্চ নিয়ে ফিরে যাচ্ছিল। আশার কথা হলো- রাতে আমরা যখন কটকার কাছাকাছি নোঙর করি তখন সুন্দরবনের এই অঞ্চলে আমাদের লঞ্চ ছাড়া আর কেউ ছিল না। দুই দিনে কয়েকটি পাখি, ভোঁদড়, হরিণ ছাড়া আমাদের ক্যামেরায় আর কিছু পেলাম না।
তৃতীয় দিন সূর্য ওঠার সাথে সাথে একটি সিন্ধু-ঈগল আমাদেরকে স্বাগত জানালো। আমাদের খুব কাছে খানিক ওড়াউড়ি করে ক্যামেরার শার্টার গরম করলো। এরপর জামতলা খালে ঢুকে একে একে তিনটে গোখরা সাপ ছাড়া রামগুই, ঝুটিয়াল শিকারি ঈগল, সুন্দরবনের অতি পরিচিত খয়রাপাখ মাছরাঙা, কালাটুপি মাছরাঙা, ছোটো সাহেলিসহ আরো কিছু পাখি বা প্রাণীর সাথে দেখা হলো। জামতলা জেটিতে নেমে বনের মধ্যে বেশখানিক পথে বেঙ্গল টাইগারের খোঁজ করলাম। চৈত্র মাসের শরীর পোড়ানো গরম, মাথার ওপর জ্বলন্ত সূর্য আর পায়ের নিচে তপ্ত মাটি- সবমিলে সবার অবস্থা কাহিল। খুব ভোরে বেরোনোর কারণে কারো নাস্তাও হয়নি, সাথে থাকা পানির বোতলগুলোও খালি হয়ে গেছে এর মধ্যে। জামতলা হেঁটে তেমন কিছু না পেলেও উপমহাদেশের দুর্লভ বড়োঠোঁট নলফুটকি পাখিটিকে পেয়েছিলাম। চৈত্রের তপ্ত-তাওয়ায় ভাজা হতে হতে আর সমুদ্রের মোহনায় সুপতি গাংয়ে বিশাল বিশাল ঢেউয়ের নাগরদোলায় চড়ে বেলা প্রায় সাড়ে বারোটা নাগাদ আমরা লঞ্চে ফিরে আসি। লঞ্চে ফিরেই হাপুস-হুপুস নাস্তা সারলাম সবাই। আর এরপরই প্রায় সবার শরীরেই ক্লান্তি ভর করলো। দু’একজন ছাড়া প্রায় সবাই লঞ্চের কেবিনে কিংবা চিপা-চাপায় যে যেখানে পারলো ঘুমিয়ে পড়লো। সাইফুল ভাই তার কেবিনে ঢুকতে ঢুকতে আমাকে বলেই ফেললেন, বিকেলে অফিস পাড়ায় যাওয়ার জন্য তাকে যেন ডাকা না হয়। এমনিতেই কিসমত ভাইয়ের পায়ে রিং পরানো, তিনি কিছু না বললেও বুঝলাম তার অবস্থাও কাহিল।
একটু পর সমুদ্র থেকে উত্তাল তরঙ্গ সুপতি নদীতে ভেসে থাকা আমাদের ছোট্ট লঞ্চ গাংচিলকে দুলিয়ে দুলিয়ে খেলতে শুরু করেছে। আমাদের তরুণ সারেং এনামুল লঞ্চটিকে ভাটির দিকে নিয়ে চলতে লাগলো উত্তাল ঢেউয়ের কাছ থেকে রক্ষা পেতে। অন্তত ১৫ কিলোমিটার যাওয়ার পর একটা বড়ো খালের মাঝে সে নোঙর ফেললো। কটকার অফিস পাড়ায় বিকেলের পরিকল্পনা বাতিল করে আমরা যেখানে নোঙর করেছি সেখানকার আশপাশে ইঞ্জিন নৌকায় ঘোরাঘুরির পরিকল্পনা নিলাম। তাতে অতি ক্লান্তজনরাও আমাদের সাথে যেতে পারবে।
বিকেল তিনটার পর আমরা সবাই ইঞ্জিন নৌকায় চেপে বসলাম। লঞ্চে আমরা যত হই-চই করি না কেন, নৌকায় বসলে সবাই একেবারে চুপচাপ। ওয়াইল্ডলাইফ ফটোগ্রাফির জন্য আমরা যে নিয়মগুলো মেনে চলি তার মধ্যে অন্যতম ‘চুপ থাকা’। কোনোকিছু নজরে এলে ইশারায় কথা বলতে হয়। কিছুদূর যাওয়ার পর হাতের বামে একটি শাখা খালে ঢুকলাম আমরা। এবার নৌকার ইঞ্জিনও বন্ধ করে দিতে হলো। মাঝি হাতের বৈঠা দিয়ে নৌকা বাইছে। তখন বৈঠার ছপ ছপ শব্দ, কিছু পাখির কূজন আর আমাদের ক্যামেরার শার্টারের শব্দ ছাড়া মনে হলো পৃথিবীতে আর কোনো শব্দ নেই। এই শাখা খালে আমরা কয়েকটি পাখি পেলাম বটে, সেগুলো আমাদের কাছে নতুন কিছু না। তাই সেখান থেকে ফিরে চললাম। বড়ো খালে এসে ফের নৌকার ইঞ্জিন স্টার্ট দেওয়া হলো। কিছুদূর যাওয়ার পর হাতের বামে আরো একটি খাল দেখলাম। কিন্তু খালটি বেশি সরু আর পানি কম মনে হওয়ায় খালটিতে আর ঢোকা হলো না।

বাঘের মুখোমুখি
সময় তখন বিকেল চারটা বেজে চুয়াল্লিশ মিনিট। বড়ো খালটির পশ্চিম পাশ ধরেই আমাদের ইঞ্জিন নৌকাটি চলছিল। হঠাৎ কেওড়া গাছের পাতার ফাঁকে বাঘের মতো হলুদ রঙের বড়ো কিছু একটা দেখতে পেলাম। ওটা কি বাঘ? নাকি বাঘের মতো কেউ? ব্যাপার বুঝতে কয়েক সেকেন্ড সময় নিচ্ছিলাম। প্রায় একই সময়ে আমাদের এই ট্রিপের আয়োজক রুবেল অস্ফুট চিৎকার করে উঠল… বাঘ বাঘ বাঘ। হঠাৎ নৌকার মধ্যে তীব্র বিদ্যুৎধারা বয়ে গেল। মুহূর্তের মধ্যে সবাই চমকে উঠলো। কিন্তু কোথায় বাঘ? যারা তখনো বাঘটিকে দেখেনি, তারা মাটিতে কিংবা পানিতে বাঘ খুঁজতে লাগলো। যে ছেলেটা বোট চালাচ্ছিল সেও তখনো বাঘটিকে দেখেনি। বাঘটি ছিল কেওড়া গাছের ঝোপের মাঝে পানিতে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা একটি সোমত্ত বাইন গাছের ওপর বসা। আমাদের নৌকাটি সেই বাইন গাছের নিচে চলে গিয়েছিল প্রায়, আর বাঘটিও বসা থেকে উঠে দাঁড়িয়ে পড়লো। জোরে লেজ নেড়ে সেও আমাদেরকে সতর্ক করছিল। রুবেল চিৎকার করে বোট চালককে যখন সতর্ক করলো, নৌকাটিকে হঠাৎ ঘুরিয়ে নেওয়ার পর বাকি সবাই দেখলো সামনে মাথার ওপরে আমাদের অনেক দিনের প্রত্যাশিত বেঙ্গল টাইগার। বাঘের কারণে যদি কোনো বিপদ হয় সেজন্য সতর্কতার জন্য আমাদের সাথে থাকা বনরক্ষী মোস্তাফিজ ভাই তার হাতের রাইফেল উঁচু করে ফাঁকা গুলি করার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। এটা অবশ্য তার দায়িত্বের মধ্যে পড়ে। আমরা তাকে নিবৃত্ত করলাম এবং খুব বেশি বিপদে না পড়লে গুলি করতে মানা করলাম। সাথে আসা নতুন টিম মেম্বাররাও আত্মরক্ষার জন্য নৌকার মধ্যে থাকা লাঠি-বৈঠা হাতে নিলেন। ভাবটা এমন যে, বাঘ আক্রমণ করলে পিটিয়ে লাল করে দেওয়া হবে।
কয়েক মিনিটের মধ্যেই সুন্দরবনের আদরের রাজপুত্তুর বেঙ্গল টাইগার শান্ত হয়ে বাইন গাছের একটি বাঁকানো ডালকে সিথান বানিয়ে সেখানে মাথা রেখে আমাদেরকে দেখছিল, আর অনবরত তার লম্বা লেজটিকে দুলিয়ে যাচ্ছিল। অসম্ভব আদুরে চেহারার এক আহ্লাদি ভঙ্গিমা তার। মনে হচ্ছিল বাড়ির পোষা বিড়াল। তার শরীর পরিষ্কার ঝকঝকে, একটুও কাদা নেই। মনে হচ্ছিল সাবান-শ্যাম্পু মেখে গোসল করে আমাদের ক্যামেরার সামনে দাঁড়াবে বলে সেজে-গুজে এসেছে। তার অভিব্যক্তিতে আমাদের কারোর মনে একটুও ভয় কাজ করেনি।
সুন্দরবনে প্রথমবারের মতো বাঘের মুখোমুখি হয়ে কী অনুভূতি হয়েছিল তা লিখে প্রকাশ করা সম্ভব না। তবে প্রচণ্ড উত্তেজনা সবার মধ্যে ভর করেছে এটা নিশ্চিত বলা যায়। আমার ক্যামেরার সেটিংস ঠিক ছিল কি না তা দেখা হয়নি, অনবরত মেশিনগানের মতো কন্টিনিউয়াস মুডে শার্টার চেপে চলেছি। যখন ক্যামেরা সেটিংসের কথা মনে পড়লো ততক্ষণে অন্তত দু’তিনশো শার্টার চেপে ফেলেছি। দেখলাম ছবিগুলো মনোপূত হয়নি। বাঘটি যেখানে ছিল সেখানে আলো স্বল্পতাও ছিল। ফলে ক্যামেরার আইএসও ৮০০০-এ উঠাতে হলো। এরপরও শার্টার স্পিড ১০০-এর বেশি পাওয়া যাচ্ছিল না। স¤্রাটই বললো- লেন্সের এক্সটেন্ডর খুলে ফেলতে। এক্সটেন্ডর খুলে এবং ক্যামেরা সেটিংস ঠিক করে আবার ছবি তোলা শুরু করলাম। নৌকা চালককে ইঞ্জিন বন্ধ করতে মানা করে শুধু বাঘটিকে কেন্দ্র করে যাওয়া-আসা করতে বলা হয়েছে। বাঘের চোখে চোখ রেখে ক্লোজ বা বিগ ক্লোজ অথবা লং-শটে ছবি তুলেছে সবাই। প্রায় এক ঘণ্টা ধরে কমপক্ষে এক হাজার থেকে তিন হাজার ছবি তুলেছি প্রত্যেকে। একজনের তো ক্যামেরার কার্ড ভরে গেছে, আরেকজন পুরনো একটি কার্ড বার বার ফরম্যাট দিচ্ছে, কিন্তু ক্যামেরা ফরম্যাট নিচ্ছে না। কেউ কেউ ভিডিও করেছে। কেউ মোবাইলে ছবি তুলেছে। বাঘের সাথে সেলফি তোলার দুর্লভ সুযোগও নিয়েছেন কেউ। ইতোমধ্যে সূর্য জঙ্গলের মধ্যে ঢুকে গিয়ে একটু আগে-ভাগেই সাঁঝের আঁধারের কাছে দিনকে সমর্পণ করেছে। জঙ্গলে এই সমস্যা সূর্য ডোবার আগেই সন্ধ্যা হয়ে যায়। অন্ধকার ঘনিয়ে আসায় আলো স্বল্পতায় আমাদের ক্যামেরার শার্টারের স্পিড স্লো হয়ে গেছে। ভালো ছবি হবে না বিধায় আমরা আমাদের লঞ্চে ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলাম। ইঞ্জিন নৌকায় বাঘের দেখা পাওয়ার দারুণ উত্তেজনাকর অনুভূতিকে মনের মধ্যে ধারণ করে আমরা ফিরে যাচ্ছি, পেছনে তখনো বসে থাকলো আমাদের আদরের প্রিয় বেঙ্গল টাইগার, বাংলা বাঘ।

বাঘটির লোকেশন বলছি না কেন?
এখানে একটি বিষয় বলে রাখি, খুব সচেতনভাবেই বিকেলে আমরা যে অঞ্চলে ঘোরাঘুরি করছি এবং বাঘের ছবি তুলেছি, সেই লোকেশনের কথা খোলাখুলি বা পরিষ্কার করে বলছি না। এই নির্দেশনা আমাদের টিমের সমস্ত সদস্যকেই দেওয়া হয়েছে। এর দু’টি কারণ। প্রথমত: লোকেশনটি প্রকাশ পেলে এখানে পর্যটকসহ নানা ধরনের মানুষ হুমড়ি খেয়ে পড়বে, এতে বাঘটির ওপর একরকম উপদ্রব হতে পারে। দ্বিতীয় কারণটি আরো ভয়াবহ। সুন্দরবনে নানা ধরনের চোরা শিকারি আছে, তারাও তৎপর হয়ে উঠতে পারে। এতে বাঘটি নিরাপত্তা হুমকিতে পড়তে পারে।

ফেরার পথে
পরদিন অর্থাৎ পহেলা এপ্রিল ছিল সুন্দরবন থেকে আমাদের ফেরার দিন। এদিনও কিছু ছবি তোলার পরিকল্পনা ছিল, কিন্তু বাঘের ছবি তোলার তীব্র উচ্ছ্বাসের পর অন্যসব বিষয় নিয়ে ছবি তোলার প্রতি আগ্রহ তেমন ছিল না কারো। লঞ্চের আড্ডায় কে কেমন ছবি তুলতে পেরেছে কিংবা বাঘ বিষয়ে নানান গল্প করেই বেশি সময় কাটলো। ইতোমধ্যে ছবি ল্যাপটপে প্রসেস করে দুর্বল নেটওয়ার্কের মাধ্যমে হলেও কোনোমতে সোশ্যাল মিডিয়া ফেসবুকে একটি ছবি ছেড়ে দিলাম। সেটা খুব দ্রুত নানাভাবে ভাইরাল হয়ে গেল। চেনা-অচেনা অনেক মানুষ সেই ছবিটি শেয়ার করলো। লাইক-কমেন্টে ভরে গেল আমার ফেসবুক ওয়াল। কয়েকটি জাতীয় দৈনিক ছাড়াও অনেকগুলো অনলাইন নিউজপোর্টালে সেটা প্রকাশ পেলো।

ছবি বিশ্লেষণ
আমাদের তোলা বাঘটিকে নিয়ে নানাজনের সাথে কথা হয়েছে এবং মতবিনিময় হয়েছে। বাঘ বিশেষজ্ঞদের মতে এটি একটি সাব-এডাল্ট বা কিশোর পুরুষ বাঘ। বয়স আনুমানিক আড়াই বা তিন বছর হতে পারে।
রমজান মাস শুরু হওয়া ছাড়া কিছু ব্যস্ততার কারণে গত কয়েক সপ্তাহ ছবিগুলোকে ভালো করে দেখা হয়নি। দীর্ঘদিন পরে যখন ছবিগুলো খুলে গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছিলাম। ছবিগুলো দেখে আমার মনে হচ্ছে, বাঘটি জোয়ারের সময় সাঁতরে এসে বাইন গাছটিতে চড়ে বসেছিল। এরপর ভাটা শুরু হওয়ায় পানি নেমে যাওয়ার পরও সেখানে সে নিশ্চিন্ত মনেই বিশ্রাম নিচ্ছিল। সরাসরি পানি থেকে গাছে ওঠার কারণে বাঘটির শরীরে তো বটেই পায়েও কোনোরকম কাদার চিহ্ন দেখা যায়নি। বাঘটি নিজে শিকার করেছে কি না বলা মুশকিল, তবে তার পেট দেখে মনে হচ্ছিলো- ভরপেট খেয়ে এসেছে। বাইন গাছে বসে সে বার বার ঘুমানোর চেষ্টা করছিল। আমাদের উপস্থিতি টের পেয়েই মাঝে মধ্যে অলসভাবে চোখ খুলে তাকানোর চেষ্টা করছিল। তার চোখে-মুখে কিংবা তার আচরণে কোনো হিংস্র ভাব দেখা যায়নি।
বাংলাদেশের সুন্দরবনে বাঘের যতগুলো ছবি আছে, আমি নিশ্চিত আমাদের তোলা ছবিগুলো তার মধ্যে সুন্দরতম ছবি।
আমরা ছবি তোলার পাশাপাশি বন্যপ্রাণী এবং তার পরিবেশ ও প্রতিবেশ সংরক্ষণে দায়বদ্ধ। এই দায়বদ্ধতার দায়ে সবাইকে সচেতন করতে চাই। ভালো থাকুক আমাদের সবগুলো বন এবং বনের প্রাণী।
ফরিদী নুমান : চিত্রশিল্পী, সাংবাদিক ও বন্যপ্রাণী বিষয়ক আলোকচিত্রী

SHARE

Leave a Reply