Home গল্প তোমাদের গল্প প্রকৃত ঈদ -রবিউল হাসান রাশেদ

প্রকৃত ঈদ -রবিউল হাসান রাশেদ

হাসি। সুন্দর মুচকি হাসি, এ যেন তার ঠোঁটের অলংকার। চেহারার সৌন্দর্যের এ হাসি সাহেদের মুখে সব সময় লেগে থাকত। তখন সে সপ্তম শ্রেণিতে পড়তো। তার স্বপ্ন ছিল বড়ো হয়ে ডাক্তার হবে, মানুষের সেবা করবে। তার পরিবারের আর্থিক অবস্থা খুব সচ্ছল ছিল। তাদের কোনো কিছুর ঘাটতি ছিল না।
সে তার বাবা-মা এবং দুই ভাই-বোনের সাথে খুব ভালো দিন কাটাতো। তার আদরের ছোট্ট ভাইটি মাত্র পাঁচ বছরে পা দিয়েছে। তারা বাঁকখালী নদীর তীরে বাস করতো। তার বাবার অনেক জমিজমা ছিল। তারা কৃষি-কাজের মাধ্যমে জীবিকা নির্বাহ করতো।
কিন্তু হঠাৎ এক নদী ভাঙন তাদের সবকিছু কেড়ে নিয়েছে। তাদের জমিজমা বসতবাড়ি সব বিলীন হয়ে গেছে। নেমে আসলো তাদের পরিবারে এক ভয়ানক ঝড়। কিন্তু তারা আশ্রয়ের জন্য রোকেয়া কলোনি নামে এক বস্তিতে বাস করতে শুরু করে। শেষ হয়ে গেল সাহেদের পড়ালেখা। শেষ হয়ে গেল তার সেই স্বপ্ন।
আর কত দিন মানুষ ত্রাণ দিবে। ত্রাণ না হওয়ার তাদের অনেক দিন না খেয়ে থাকতে হয়। সাহেদের বাবা ছোট্ট ছেলে-মেয়েদের কান্না সহ্য করতে না পেরে এদিক ওদিক কাজ খুঁজতে শুরু করে। অনেকদিন ঘুরাঘুরির পরও কোনো কাজের সন্ধান পেলো না।
কাজ খুঁজতে খুঁজতে তার বাবা হঠাৎ একদিন এক ভয়ানক দুর্ঘটনার সম্মুখীন হয়। দুর্ঘটনায় তার বাবা প্রাণে বেঁচে গেলেও চিরতরে পঙ্গু হয়ে যায়। একদিকে বাবার ঔষধ খরচ আরেক দিকে পরিবারের আর্থিক অসচ্ছলতা সাহেদকে চিন্তিত করে তোলে। কিছু করতে না পেরে সাহেদ কাজের সন্ধানে বেরিয়ে পড়ে। কিন্তু কোনো কাজের সন্ধান খুঁজে না পেয়ে রাস্তায় ফুল বিক্রি করা শুরু করে। কিন্তু কী হবে এ সামান্য টাকা দিয়ে? সামনে যে ঈদ! বাবার ঔষধ আর ঘরের ডাল-ভাত কিনতে সব টাকা ফুরিয়ে যায়। কিন্তু তার ছোটো ভাই বোন বায়না ধরছে ঈদে নতুন জামা কিনতে। একদিন ফুল বিক্রির সময় এক ভদ্রলোকের সাথে দেখা হয়।
ফুল নিবেন স্যার? খুব সস্তা, আপনার প্রিয় মানুষকে দিতে পারবেন। হঠাৎ এ কথা শুনে ফরহাদ সাহেব ফিরে তাকালেন। দেখলেন যে সুন্দর ফুটফুটে একটি শিশু ফুল বিক্রি করছে- কত টাকা? দশ টাকা দিয়েন স্যার খুব সস্তা, ফরহাদ সাহেব তাকে দেখে তার এ ফুল বিক্রির গল্প শুনতে চাইলেন। সাথে সাথে সাহেদ কান্নায় ভেঙে পড়লো, ফরহাদ সাহেব তাকে সান্ত¡না দিয়ে তার কষ্টের কথা শুনতে চাইলেন। সে তার পরিবারের বর্তমান অবস্থা ফরহাদ সাহেবকে শুনালেন। ফরহাদ সাহেব সাহেদের কথা শুনে অশ্রু ধরে রাখতে পারলেন না। তিনি সাহেদকে একটি মার্কেটে নিয়ে ঈদের বাজার এবং সবার জন্য জামা কাপড় কিনে দিলেন। কিনে সাহেদকে বস্তি বাড়ির দিকে এগিয়ে দিলেন এবং তার বাবার দেখাশুনা করে চিকিৎসার সব খরচ বহন করবে বলে ও পরিবারের আর্থিক অসচ্ছলতা মুক্তির আশ্বাস দিলেন।
সাহেদ চলে যাওয়ার পর ফরহাদ সাহেব মনে মনে আনন্দিত হলেন। এক অসহায় পরিবারকে সাহায্য করতে পেরে অনেক আনন্দ পেলেন।
এটা যেমন তেমন আনন্দ না এ যেন ঈদের আনন্দ।
বাসায় কাপড় নিয়ে যাওয়ার পর ছোট্ট ভাই-বোন খুব খুশি হলো। সাহেদকে এসে বলছে ভাইয়া এটাতে আমাকে কেমন লাগছে? খুব সুন্দর লাগছে তাই না? সাথে সাথে সাহেদের কান্না চলে এলো।
এ কান্না কষ্টের না, এ কান্না সুখের কান্না। ঈদের দিন ফরহাদ সাহেব সাহেদের বাসায় আসলেন।
সবার সাথে হাসি-মুখে কথা বললেন। সবার খোঁজ খবর নিলেন। এসব দেখে বস্তির সবাই অবাক হয়ে গেলেন কিন্তু ফরহাদ সাহেবের কাছে মনে হলো এটাই প্রকৃত ঈদ।

SHARE

Leave a Reply