Home সায়েন্স ফিকশন রোবট মানব -আহমেদ বায়েজীদ

রোবট মানব -আহমেদ বায়েজীদ

বিশাল ল্যাবরেটরির এক কোণে নিজের ডেস্কে মনোযোগ দিয়ে কাজ করছেন ডক্টর ইকবাল হায়দার। কম্পিউটারের দিকে চোখ তার। হাতের আঙুলগুলো ঘুরছে কন্ট্রোল প্যানেলের ওপর। দুই হাত দিয়ে একেকবার একেকটি বাটনে চাপ দিচ্ছেন। এর সাথে সাথে প্রতিক্রিয়া হচ্ছে তার চেহারায়। কখনো মুখে হাসি ফুটছে, কখনো বা গম্ভীর হয়ে হাতের কাজ করে যাচ্ছেন। তবে প্রতিক্রিয়া যাই হোক, কম্পিউটার মনিটর থেকে চোখ সরছে না মুহূর্তের জন্যও। মাঝে মধ্যেই তাকে এই কাজটাই করতে দেখা যায়।
কম্পিউটার মনিটরে অ্যানিমেশন সফটওয়ারের মতো কিছু একটা রয়েছে। সেখানে মাঝে মাঝে কিছু চরিত্রও দেখা যাচ্ছে। চরিত্রগুলোকে হাতের কাজের মাধ্যমে এদিক সেদিক করানোর চেষ্টা করছেন ডক্টর ইকবাল। দেখলে মনে হবে ভিডিও গেম খেলছেন। আসলে কী করছেন নিজেই জানেন। ল্যাবে তার জুনিয়র কর্মীরা পাশ দিয়ে আসা যাওয়ার সময় আড়চোখে বসের কম্পিউটার মনিটরের দিকে তাকিয়ে কিছু না বুঝেই দৃষ্টি ঘুরিয়ে নিচ্ছে। ভীষণ গম্ভীর আর কড়া স্বভাবের মানুষ তিনি। যে কারণে জুনিয়র স্টাফরা কেউ কোনদিন জিজ্ঞেস করার সাহস করেনি। কেউ ভেবেছে তাদের স্যার কাজের ক্লান্তি কাটাতে কম্পিউটার গেম খেলছেন। কেউবা ভেবেছে স্যার হয়তো নতুন কোনো ভিডিও গেম ডেভেলপ করছেন।
বিশাল ল্যাবরেটরিতে সবাই যার যার কাজ নিয়ে ব্যস্ত। কাজের বাইরে কারো সাথে কথা বলা পছন্দ করেন না ডক্টর ইকবাল। সবাইকে যার যার কাজ ভাগ করে দিয়ে দিন শেষে শুধু ফলাফল শোনার অপেক্ষায় থাকেন তিনি। এই ল্যাবরেটরির তিনিই প্রধান। যে কারণে তার সব মেজাজ মর্জি সবাইকে হজম করতে হয়। একে তো লোভনীয় বেতন, দ্বিতীয়ত তার সাথে কাজ করাটা সম্মানজনক- বিধায় কেউ চাকরিটা হারাতে চায় না।

দুই.
ফাইলগুলো বন্ধ করে চেয়ারে হেলান দিলেন মারুফ কামাল। ইনভেস্টিগেশন এজেন্সির সিনিয়র ইন্সপেক্টর তিনি। আজ ক’দিন ধরেই তিনটা কেসের ফাইল তাকে ভীষণ যন্ত্রণা দিচ্ছে। তিনটাই অপরাধের ঘটনা। একটার সাথে আরেকটার কোনো সম্পর্ক নেই। স্থানীয় পুলিশের প্রাথমিক তদন্তে তিন ঘটনায় তিনজন সন্দেহভাজনের বিরুদ্ধে প্রমাণ পাওয়া গেছে; কিন্তু তারপরও এই কেসগুলোকে ব্যতিক্রম মনে হয়েছে ওপরের কর্তাদের। যে কারণে ফাইলগুলো পাঠানো হয়েছে মারুফ কামালের কাছে।
খুব ব্রিলিয়ান্ট অফিসার মারুফ। বয়স চল্লিশের কোঠায়। ইতোমধ্যেই বহু বড়ো বড়ো রহস্য সমাধান করে রাষ্ট্রীয় পর্যায় থেকে একাধিক মেডেল পেয়েছেন। জাঁদরেল অফিসার হিসেবে নাম কামিয়েছেন। কোনো কেস নিয়ে তদন্ত শুরু করলে তার শেষ দেখে ছাড়েন।
ফাইল তিনটা হাতে পাওয়ার পর প্রথমে কিছুটা অবাক হয়েছিলেন মারুফ। এমন ছোটখাটো কেসগুলো তার কাছে পাঠানোর কী দরকার! একজন ব্যাংকার তার ব্যাংকের এক ক্লায়েন্টের অ্যাকাউন্টের টাকা অন্য বিদেশী ব্যাংকে ট্রান্সফার করে দিয়েছেন, ক্লায়েন্টের অনুমতি ছাড়াই। অর্থাৎ আর্থিক অনিয়মের মামলা। আরেকজন বিশ^দ্যিালয়ের শিক্ষক তার বিশ^বিদ্যালয়ের ওয়েবসাইটে ঢুকে রেজাল্ট সেকশনটা নষ্ট করে ফেলেছেন। পুরো বিশ^বিদ্যালয়ের বর্তমান শিক্ষার্থীদের এবং অতীতের প্রায় ২০ বছরের সবার রেজাল্ট সেখান থেকে হারিয়ে গেছে। এ দুটো ঘটনায় সফটওয়ার ইঞ্জিনিয়াররা ওই দুজনের সংশ্লিষ্টতার প্রমাণ খুঁজে বের করেছেন। যদিও তারা অপরাধ স্বীকার করেননি।
তৃতীয় কেসটা কিছুটা জটিল। এখানে এক ব্যক্তি নিজের বেশ কিছু সম্পত্তি একজনকে দলিল করে দিয়েছেন; কিন্তু এখন অস্বীকার করছেন। তার পরিবারের লোকরাও বলেছে এ ব্যাপারে তারা কিছু জানে না। যার নামে দেওয়া হয়েছে তিনি বলছেন, পুরনো ঋণ শোধ করতে না পেরে স্বেচ্ছায়ই দলিল করে দিয়েছেন।
ইনভেস্টিগেশন এজেন্সিতে সাধারণত বড়ো বড়ো অপরাধ বা রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ ফাইলগুলো পাঠানো হয়; কিন্তু এই সাদামাটা কেসগুলো কেন এসেছে সেটা বুঝে উঠতে পারেননি মারুফ। তবে ওপরের নির্দেশ যেহেতু, কাজ শুরু করে দিয়েছেন। এবং প্রথম দিনেই ফাইলগুলো পড়েই বুঝতে পেরেছেন- তিনটি কেসের মধ্যে একটি মিল রয়েছে, তা হলো তিন অপরাধীর কারোরই আগে কখনো পুলিশের খাতায় নাম ওঠেনি। কারো কোন ক্রিমিনাল রেকর্ড নেই। সমাজে সবার বেশ সম্মানজনক অবস্থানও রয়েছে।
আর এই সূত্রটাকে ধরেই প্রাথমিক খোঁজখবর নিতে মাঠে নেমেছেন মারুফ। তিন সন্দেহভাজনের অফিস, বাসা আর বন্ধু-বান্ধবদের সাক্ষাৎকার নিয়েছেন। একজনের পরিবারের সদস্যরা জানিয়েছেন, মাঝে মাঝে তাকে অন্যমনস্ক লাগতো। মনে হতো গভীরভাবে কিছু একটা ভাবছেন। কারো ডাকে সাড়া দিতেন না। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে দিনের একটা নির্দিষ্ট সময়ে এটা হতো।
যেহেতু তিনটা ফাইল একই সময়ে এসেছে- তাই মারুফেরও সন্দেহ আসতে শুরু করে যে, তিনটি ঘটনার মাঝে কোনো সংযোগ আছে কি না! এরকম অনেক কেস আগেও এসেছে। দেখলে মনে হবে আলাদা ঘটনা; কিন্তু পরে দেখা যায় সব ঘটনারই শেকড় এক জায়গায়। এমন ধারণার ওপরই তিনটি কেসে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ করতে শুরু করেন মারুফ। টানা কয়েকদিন পরিশ্রম করার পর তিনটি বিন্দুর মাঝে একটি সরল রেখা টানতে সক্ষম হন তিনি। আর তাতেই ঘটনা অন্য দিকে মোড় নিতে শুরু করে।
তিনিট কেসের অভিযুক্তদের মাঝে একটি মিল পাওয়া যায়, আর তা হলো তিনজনই শহরের একজন নিউরো সার্জনের কাছে চিকিৎসা করিয়েছেন। শহরের নামকরা চিকিৎসকের কাছে অনেকেই যেতে পারেন, এটি একটি স্বাভাবিক ঘটনা। তবুও যেহেতু আর কোনো সূত্র হাতে নেই, তখন এই সূত্রটাকেই কাজে লাগান মারুফ। ¯œায়ুর জটিলতা নিয়ে তিন ব্যক্তিই এক চিকিৎসকের কাছে গিয়েছেন। তাদের তিনজনেরই অপারেশন হয়েছে কয়েক সপ্তাহের ব্যবধানে। পরিবারের লোকদের সাথে কথা বলে জানা গেল, অপারেশনের পর থেকে তারা মাঝে মধ্যে অস্বাভাবিক আচরণ করতেন। অন্যমনস্ক হয়ে কাজকর্ম করতেন।
অন্ধকারে ঢিল ছোড়ার মতোই ওই সার্জনের ওপর নজর রাখা শুরু করেন মারুফ। দ্রুতই জানা যায়, ওই চিকিৎসকের ঘনিষ্ঠ বন্ধু নিউরো সায়েন্টিস্ট ডক্টর ইকবাল হায়দার। এবার নতুন সন্দেহ দানাবাঁধে মারুফ কামালের মনে। এই তিনটি কেস চিকিৎসাবিজ্ঞানের কোনো জটিল ধাঁধার অংশ বলে মনে হতে থাকে তার। ফাইলগুলো পাঠিয়ে শীর্ষ পর্যায়ের চিকিৎসাবিজ্ঞানীদের সহযোগিতা চান তিনি। এরপর দ্রুতই একটির পর একটি প্যাঁচ খুলতে থাকে এই ধাঁধার। চিকিৎসাবিজ্ঞানীরা ওই তিন ব্যক্তির মস্তিষ্কে বিশেষ ধরনের একটি মাইক্রোচিপের উপস্থিতি পান। যেটি অপারেশনের সময় বসানো হয়েছে রোগীর অজান্তেই। আর এই চিপটি এমনভাবে তৈরি করা হয়েছে, যাতে এর মাধ্যমে কম্পিউটারের সাহায্যে তাদের গতিবিধি নিয়ন্ত্রণ করা যায়। মানুষের আচরণের ওপর ব্রেইনের প্রভাব নিয়ন্ত্রণ করাই ছিল এই প্রোগ্রামের মূল লক্ষ্য।

তিন.
একযোগে সেই নিউরো সার্জনের ক্লিনিক ও ডক্টর ইকবালের ল্যাবে অভিযান চালায় গোয়েন্দারা। গোপন গবেষণা ও রোগীদের ব্রেইনে কম্পিউটার চিপ বসানোর বিভিন্ন প্রমাণ খুঁজে পাওয়া যায়। জিজ্ঞাসাবাদে দুজনেই স্বীকার করেন অন্যায় কাজের কথা। সার্জন বন্ধুকে দিয়ে কম্পিউটার চিপটি তিন ব্যক্তির ব্রেইনে স্থাপন করার পর নিজের ল্যাবে বসে কম্পিউটারের সাহায্যে ওই তিন ব্যক্তিকে নিয়ন্ত্রণ করতেন ইকবাল। প্রোগ্রামটি তৈরি করেছেন নিজেই, আর সব কিছুতে তাকে সহযোগিতা করেছেন সার্জন বন্ধুটি।
প্রোগ্রামটি সচল হলেই নিজেদের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলতেন ওই তিন ব্যক্তি। অবচেতনে কম্পিউটারের দেওয়া নির্দেশে চলতে হতো তাদের। সে সময়ই তাদের তিনজনকে দিয়ে অপরাধ করিয়েছেন ইকবাল।
কম্পিউটারের সাহায্যে মানুষের মস্তিষ্কের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার এক মহাপরিকল্পনা নিয়েছিলেন তিনি; এই তিনটি কেস ছিল পরীক্ষামূলক। সফল হলে আরো বড়ো পরিকল্পনা ছিল তার। উদ্দেশ্য ছিল কম্পিউটার নিয়ন্ত্রিত মানব তৈরি করা, যারা সারাক্ষণ চলবে কম্পিউটারের নির্দেশে। নির্দেশদাতা যে কোনো কাজ করাতে পারবে তাকে দিয়ে। ধরা পড়ে গেছেন শুরুতেই। নইলে হয়তো বিজ্ঞানের মস্তবড়ো এক অপব্যবহারের ফাঁদে পড়তো মানবজাতি।

SHARE

Leave a Reply