Home ঈদ প্রবন্ধ লুবনার জিজ্ঞাসা -হেলাল আনওয়ার

লুবনার জিজ্ঞাসা -হেলাল আনওয়ার

এখন বেশ রাত হয়ে গেছে। তবু লুবনার চোখে ঘুম নেই। সাধারণত ও এতক্ষণে ঘুমিয়ে পড়ে। কিন্তু আজ না ঘুমিয়ে বালিশে মাথা রেখে কেবল এপাশ ওপাশা করতে থাকে। আম্মু যথারীতি মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে থাকেন। লুবনা ভাবছে আর ভাবছে।
লুবনাকে ঘুম পাড়াতে গিয়ে আম্মু নিজেই ঘুমিয়ে পড়েছেন। কী ভেবে লুবনা আম্মুকে ডাকতে থাকে। আম্মুর ঘুম ভেঙে যায়।
– কী ব্যাপার এখনো ঘুমাওনি?
– না আম্মু। ঘুম আসছে না।
– কেন? তাড়াতাড়ি ঘুমিয়ে পড়। কাল থেকে না তোমার স্কুলে যেতে হবে? সকাল সকাল ঘুম থেকে জাগতে না পারলে স্কুলে যেতে দেরি হয়ে যাবে। বুঝলে?
লুবনাও জানে কাল থেকে স্কুলে যেতে হবে। সে জন্য তাকে দ্রুত ঘুমাতে হবে। তবু কেন যেন তার ঘুম আসে না।
আম্মু কিছুটা রাগের সাথে বলেন- নাও ঘুমাও তো।
লুবনা কিছু একটা আম্মুকে বলতে চাইলো। কিন্তু আম্মু ওর কথা শোনার আগেই আবার ধমক দিয়ে বলেন- এখন আর কোনো কথা নয়। যা বলার কাল বলবে। এখন ঘুমাও দেখি।
লুবনা চুপ করে শুয়ে থাকে। তাকিয়ে থাকে ওপরের দিকে। আম্মু মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বলেন- চোখ বুজে থাক তাহলে ঘুম এসে যাবে।
আম্মুর সোহাগী কোমল হাতের স্পর্শে লুবনা খুব সুখ অনুভব করে। মাঝে মাঝে আম্মু গুন গুন করে গান গাইতে থাকেন।
লুবনা আবারো মাথা উঁচু করে মাকে কী যেন বলতে চেষ্টা করলো। এবার মা বিরক্তির সাথে বললেন- কাল তোমার সব কথা শুনবো এখন ঘুমিয়ে পড়।
মার কর্কশ ভাষা লুবনাকে বেশ আহত করে। মন খারাপ হয়ে যায়। কেননা, কখনো সে আব্বু-আম্মুর কাচ থেকে এমন ব্যবহার পায়নি। সে জন্যে তার চোখে পানি চলে আসে। লুবনা ভাবতেও পারেনি যে আম্মুর কাছ থেকে।
এতক্ষণে আব্বু বাড়িতে ছিলেন না। এশার নামাজ শেষ করে মসজিদে বসে তিনি মুসল্লিদের কোরআন হাদিস থেকে বয়ান করে শোনান। এ জন্য মসজিদ থেকে ফিরতে তাঁর একটু বিলম্ব হয় প্রতিদিন।
হঠাৎ কলিংবেল বেজে উঠলো। লুবনা ভেতরে ভেতরে বেশ খুশি হয়। আব্বুকে এবার সে তার মনের কথাগুলো বলতে পারবে। নিশ্চয় আব্বু তাকে ধমক দেবেন না।
লবুনা তার আম্মুর চাইতে আব্বুকে একটু বেশি ভালোবাসে। কখনো কোনো কাজে আব্বু বাধা দেয় না। বাজার থেকে খাবার এনে দেন। তার সাথে সময় পেলেই খেলা করেন। গল্প করেন। নবীদের কিসসা বলেন। আরো কত কি? এক কথায় লুবনা আব্বুকে তার একান্ত বন্ধু মনে করে।
কলিংবেল বাজার সাথে সাথেই লুবনা উঠে বসে পড়ে।
– আম্মু অবাক হয়ে যান। সেকি তুমি এখনো ঘুমাওনি?
– না আম্মু। মনে হয় আব্বু এসেছেন।
– ঠিক আছে। আমি যাচ্ছি। তোমাকে আর ঘুমাতে হবে না। এবার আব্বুর সাথে মন খুলে গল্প করতে পারবে। তারপর আম্মু রাগে গরগর করতে করতে গেট খুলে দিলেন।

দুই.

ইকবাল সাহেব চিরাচরিত অভ্যাস মাফিক সালাম দিয়ে ফারিহাকে বলেন- মা মণি কই? সে কি তুমি ঘুমাওনি?
– না, ঘুমায়নি। এতবড়ো দস্যি মেয়ে এখনই ঘুমাবে?
– কেন, আমার মেয়ে আবার তোমার কী করলো?
– কিছু না। আসেন। দ্রুত খেয়ে নিন।
– হাসতে হাসতে ইকবাল সাহেব বলেন- তাহলে এতো গরম কেন?
– আপনি জানেন, ওকে স্কুলে ভর্তি করেছি। আগামীকাল থেকে ওকে স্কুলে যেতে হবে। ক্লাস হবে। তাড়াতাড়ি না ঘুমালে ও সকালে জাগতে পারবে না। সে জন্যে স্কুলে যেতে দেরি হয়ে যাবে।
– আরে ওসব নিয়ে ভেবোনাতো। ও নিশ্চয় পারবে। আমার মেয়েকে নিয়ে তোমার কোনো টেনশন করতে হবে না। হাঃ হাঃ হাঃ
লুবনা পাশ থেকে আব্বু আম্মুর সব কথা চুপে চুপে শুনছিল।
আম্মু-আম্মু-, ইকবাল সাহেব মেয়েকে ডাকতে থাকেন।
লুবনা আস্তে আস্তে আব্বুর ডাকের উত্তর নেয়। জি আব্বু।
এদিকে আসোতো আম্মু।
আব্বুর ডাকের সাথে অসম্ভব ভালোবাসা মেশানো থাকে। কোনো রকম কৃত্রিমতা তার ভেতর নেই। নেই ধমকের কোনো গন্ধ। লুবনা ধীরে ধীরে আব্বুর কোলে এসে বসে পড়ে। তার মুখটা ভার হয়ে আছে।
ইকবাল সাহেব বুঝতে পারেন কিছু একটা ঘটেছে। ফারিহা হয়তো বকাঝকা করেছে। মিষ্টি সুরে তিনি জিজ্ঞেস করেন-কী হয়েছে মা মণি? আম্মু বকা দিয়েছেন?
– লুবনা ফুঁপিয়ে উঠে।
– কী হয়েছে মা-?
– আম্মু বকা দিয়েছেন।
– কেন?
– জানি না। আমি শুধু আম্মুকে একটা কথা বলতে চেয়েছিলাম। আম্মু আমার কথা না শুনেই-।
– ও আচ্ছা- তাই?
– হ্যাঁ, আব্বু।
– ঠিক আছে আমি আম্মুকে বকে দেবো। কিন্তু তোমাকেও মনে রাখতে হবে, আম্মুর কথা শুনতে হবে। মানতে হবে।
– আমিতো সব সময় আম্মুর কথা শুনি আব্বু-।
– আসলে তোমার আম্মুতো তোমাকে কোনো সময় বকা দেন না। কিন্তু কালতো তোমার স্কুল। তাই হয়তো তোমাকে তাড়াতাড়ি ঘুমাতে যাবার কথা বলেছেন। আর যদি ঘুমাতে দেরি করো তবে সকালে জাগতে সমস্যা হবে। তাতে স্কুলেও দেরি হয়ে যাবে। বুঝেছ মা-।
হ্যাঁ বুঝলাম। কিন্তু আমার কথাটাওতো বলা জরুরি আব্বু।
– ঠিকতো। তবে খুব জরুরি?- জি আব্বু।
– তাহলে আমাকে বলো।
– কিন্তু আম্মুকেও শুনতে হবে।
– ঠিক আছে। তাহলে তোমার আম্মুকেও থাকতে বলি।
লুবনা আব্বুর কথায় ভারি খুশি হয়। মনে মনে আব্বুকে সে ধন্যবাদ জানায়।

তিন.

জাহিন। বয়স দশ বারো হবে।
লুবনাদের পাশের গ্রামে ওর বাড়ি। হাঁটতে পারে না। দুই পা অচল। হুইল চেয়ারে করে স্কুলে আসে। ওর বড় ভাই মাহিন হুইল চেয়ার ঠেলে প্রতিদিন ওকে নিয়ে আসে।
ওরা দুই ভাই।
মাহিন বড়ো আর জাহিন ছোটো।
মাহিন ক্লাস ফাইভে আর জাহিন ক্লাস টুতে পড়ে।
প্রতিদিন জাহিনকে চেয়ারে তুলে তারপর দুভাই গল্প করতে করতে স্কুলে আসে। কী মিল ওদের। দুই ভাই যেন অন্তরঙ্গ বন্ধু। স্কুলের অন্য শিশুরা যখন নানান খেলা ধুলায় ব্যস্ত জাহিন তখন একা বসে বসে বই পড়ে। মাহিনও ওকে পড়তে সাহায্য করে।
ছোট্ট লুবনা জাহিনকে দেখে অবাক হয়ে যায়। কষ্ট পেল তার চেয়েও বেশি। সেই দেখার পর থেকে সে যেন অস্থির হয়ে আছে। মার কাছেও সে কয়েকবার এইটা নিয়ে শেয়ার করতে চেয়েছে। কিন্তু সময় পায়নি। তারপর থেকে সে ভাবছে আর ভাবছে। কোনো রকম ভুলতে পারছে না ঐ ছেলেটির কথা। কেন সে হাঁটতে পারে না? কী হয়ছে ওর?
ইকবাল সাহেব জরুরিভাবে ফারিহাকে ডাকলেন। ফারিহা ওড়নার আঁচলে হাত মুছতে মুছতে এগিয়ে এসে জিজ্ঞেস করলেন- কী হলো আবার? এত জরুরি তলব?
– তুমি কি আমার আম্মুকে বকা দিয়েছ?
– হাসতে হাসতে বলেন- তাই আবার আব্বুকে নালিশ করেছে?
– ঠিক নালিশ না। হতে পারে এটা অভিযোগ মাত্র।
– বলুন কীসের অভিযোগ?
– আসলে আম্মু, তোমাকে কিছু একটা বলতে চায়। অথচ তুমি ওর কথা না শুনে আরো বকা দিয়েছ? তুমি কিন্তু খুব অন্যায় করেছ। তোমার উচিত ছিল ওর কথাকে গুরুত্বের সাথে শোনা।
– ফারিহা হাসতে হাসতে বললেন- তা ঠিক। আমার ভুল হয়ে গেছে। কিন্তু ওকেতো সকালে স্কুলে যেতে হবে। যদি দ্রুত না ঘুমায় তাহলে কী হবে? আবার স্কুলে দেরিও করা যাবে না। তাহলে।
– তোমার কথারও যুক্তি আছে। তবুও ওর কথাটা শোনা তোমার জন্য জরুরি ছিল।
– ঠিক আছে মা। এবার বলো।
– লুবনা ভীষণ খুশি হলো। আব্বুকে আর আম্মুকে ধন্যবাদ জানালো।
– তাড়াতাড়ি বলো। আম্মু কাল স্কুলে যে ছেলেটা হুইল চেয়ারে করে আসছিল ওর কী হয়েছে?
– ওতো প্রতিবন্ধি মা।
– প্রতিবন্ধি মানে! মানে-?
– মানে ওর দুটো পা নেই। তাই সে হাঁটতে পারে না।
– ওর পা নেই কেন আব্বু?
– ইকবাল সাহেব কিছুটা অপ্রস্তুত হয়ে যান। তারপর বলেন, এটা আল্লাহর ইচ্ছা। তিনি বান্দার জন্য যেটা কল্যাণকর বলে মনে করেন তাই তিনি করেন।
– বুঝলাম। কিন্তু ওর পা না থাকার মাঝে আবার কী কল্যাণ থাকতে পারে?
– পারে মা মণি। যেটা হয়তো আমরা কেউ জানি না। এটা শুধুমাত্র তিনিই জানেন। হয়তো এর মাধ্যমে- আল্লাহ পাক কোনো পরীক্ষা নিচ্ছেন।
পরীক্ষা! লুবনা অবাক হয়ে যায়। আল্লাহ আবার মানুষকে পরীক্ষা নেন? এটা আবার কেমন কথা!
তুমিতো বলো। আল্লাহ রাব্বুল আলামিন রহমানুর রহিম। বান্দার প্রতি তাঁর দয়ার কোনো সীমা পরিসীমা নেই। তাহলে তিনি মানুষকে কষ্ট দিয়ে পরীক্ষা নিবেন কেন?
ঠিক বলেছ মা। তাহলে শোনো। তুমিতো স্কুলে ভর্তি হয়েছো তাই না?
– জি আব্বু।
– তারপর এ বছর গেলে তুমি কোন ক্লাসে পড়বে?
– দ্বিতীয় শ্রেণিতে
– কীভাবে উঠবে বলোতো?
– বছর শেষে পরীক্ষা হবে। তাতে পাস করলে ক্লাসে তুলবে।
– আর যদি পাস না করো?
– তাহলে স্যার ক্লাসে তুলবেন না।
– আবার পাস করলে তুমি ভালো রেজাল্ট করে তখন কী হবে?
– ভালো রেজাল্ট করলে স্যার পুরস্কার দিবেন। আবার মন্দ রেজাল্ট হলে তিরস্কার করবেন।
– একদম ঠিক বলেছ মা। আমারও প্রশ্ন হলো, তুমি সারা বছর কষ্ট করে পড়লে। স্কুলে গেলে। তাহলে তোমাকে আবার পরীক্ষা দিতে হবে কেন? তোমাকে এমনিতেই তো ক্লাসে তুলতে পারেন।
মূলত পরীক্ষা নেওয়া হয় ভালো মন্দ যাচাই করার জন্য। তেমনি আমাদের মাঝে কার ঈমান কেমন তা যাচাইয়ের জন্য এমন পরীক্ষা মাত্র।
ইকবাল সাহেব বলেন, শোনো মা মণি, মহান রাব্বুল আলামিন পবিত্র আল কোরআনের মাঝে বলেছেন- “আর আমি অবশ্যই অবশ্যই তোমাদেরকে পরীক্ষা নেব কিছু জিনিস দিয়ে। তন্মধ্যে ভয়, ক্ষুধা, সম্পদ কম দিয়ে, জীবন নিয়ে, ফলফলাদি কম দিয়ে। আর যারা ধৈর্য ধারণ করে তাদের জন্য সুসংবাদ। যাদের কাছ কখনো কোনো মুসিবত আসলে তখন তারা বলে- ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজেউন।”
– জি আব্বু। তাহলে এটা আমাদের জন্য পরীক্ষা?
– হ্যাঁ মা।
– তাহলে এমন পরীক্ষা থেকে পাস করতে হলে আমাদের কী করা উচিত আব্বু?
– আমাদের তখন ধৈর্য ধারণ করা উচিত। সেই সাথে বিপদগ্রস্ত মানুষকে সাধ্যমতো সাহায্য করা উচিত। কখনো ওদের সাথে ঠাট্টা বিদ্রƒপ করা উচিত নয়। বরং ওদের পাশে থেকে সহযোগিতা করা উচিত। কেননা ওরা অসহায়। ওরা খুশি হলে সেই সাথে মহান রাব্বুল আলামিনও খুশি হবেন। আর আল্লাহ যদি খুশি হন তাহলে তিনি আমাদেরকে পুরস্কার দিবেন- ইনশাআল্লাহ।
আব্বুর কথা শুনে লুবনা বেশ খুশি হয়। এত চমৎকার করে আগে কোনো দিন তাকে বোঝায়নি। সে আব্বুকে ধন্যবাদ জানিয়ে ফারিহাকে বলে- চলুন আম্মু এবার ঘুমাতে যাই।

SHARE

Leave a Reply