Home গল্প অনুবাদ গল্প রক্তের গন্ধ শামস ইরফান অনুবাদ : হোসেন মাহমুদ

রক্তের গন্ধ শামস ইরফান অনুবাদ : হোসেন মাহমুদ

২০১০ সাল।
শ্রীনগর থেকে উধাও হয়েছে শান্তি। গ্রাম এলাকাতেও একই অবস্থা। গোলমাল, অশান্তি, বিশৃঙ্খলা। ভারতীয় দালাল ও চরেরা নিরাপদ স্থানে গিয়ে আশ্রয় নিয়েছে। হিমালয়ের এ অংশে মানবতা বিলীন। উপত্যকার জনপদগুলোতে কোথাও স্বাভাবিক জীবন নেই। মানুষ খাদ্য সংগ্রহের চেষ্টা করছে। চাপিয়ে দেওয়া শান্তি ভঙ্গ করার শক্তি কার আছে? সবাই বলছে, শ্রীনগরের এ রকম ভূতুড়ে চেহারা কেউ কখনো দেখেনি।
মা ছেলেকে মিনতি করে বলছে- ‘বাবা! বাইরে যাসনা। ঘরে থাক।’ বোন ভাইকে বলছে- ‘ভাই! বাইরে যাসনা, ঘরে থাক।’ স্ত্রী স্বামীকে বলছে- ‘বাইরে যেও না, ঘরে থাকো।’ মনে হচ্ছে, সময়ও ষড়যন্ত্র করছে। নিয়তি শান দিচ্ছে বৈরী ছুরিতে। জীবনের সব গান থেমে যেতে চাইছে মৃত্যুর আঙিনায়। এই যে সংঘাত, এই যে জীবনের বলিদান, এই যে ভয়াবহ পরিবেশ- কেউতা স্থায়ী অবসানের চেষ্টা করছে না। টেলিভিশনে বেশি সময় জুড়ে চলে কথার বাণিজ্যিক বেসাতি, ক্ষমতার মালিকরা গায়ের জোরে অস্বীকার করে যাচ্ছে কাশ্মিরের মৌলিক অধিকার। পাহাড়ের বাইরে কাশ্মিরের সাথে প্রতারণার জাল বুনে চলেছে একশ্রেণির মানুষ। কাশ্মীরের মানুষের সম্মান ও দুর্দশাগ্রস্ত জীবন নিয়ে চলছে রসিকতা। কিন্তু আমাদের সাথে একি খেলা খেলছ তোমরা! প্রতিবাদী মানুষের এ বজ্র গর্জনের জবাব তোমরা দিয়ে চলেছ রক্তের স্রােতে।
গুলির জবাবে পাথরের টুকরো ছোড়ে বালক-কিশোরের দল। বিশ^ প্রতিবাদের এই নতুন রূপটি দেখে, কথা বলে না। খবরের কাগজগুলো শিরোনাম করে- ‘হিমালয়ের কোলে আবার সংঘাত’, ‘কাশ্মীর আবার ফিরে গেছে প্রস্তর যুগে’, ‘ভূস্বর্গে গ্রীষ্মের উত্তাপ’ ইত্যাদি। ভারতের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন জাতীয়তার জরাজীর্ণ বুলি শোনায়। কিন্তু কাশ্মীরের মানুষের অধিকারের কথা কেউ বলে না। নিরাপত্তা বাহিনী হুঙ্কার ছাড়ে- কোনো অনুপ্রবেশ বরদাস্ত করা হবে না। কোনো বিকল্প আলোচনা-বিশ্লেষণ নেই। অতীতের অপকর্ম ও কলঙ্ক ঢেকে রাখার বিরামহীন প্রয়াস। সেই চাণক্য কৌশল।
আপনারা কি নওহাট্টা চেনেন?
পুলিশ আর আধাসামরিক বাহিনীর সদস্যরা ছাড়া একটি মানুষও চোখে পড়বে না। রাস্তাগুলো দেখুন। সব জায়গায় ইট, পাথরের টুকরো আর টিয়ার গ্যাসের ক্যানিস্টার ছড়িয়ে আছে। প্রতিটি বাড়ির বন্ধ জানালাগুলো আনমনা চেয়ে আছে শূন্য রাস্তার শান্তিরক্ষাকারীদের প্রতি। তাদের মুখে ক্রোধের অভিব্যক্তি। মাঝে মেেধ্যই রাস্তায় বিক্ষোভকারীদের মোকাবেলা করতে হয় তাদের। সৈন্যদের কেউ দোকানের সামনে চুপ করে বসে বিশ্রাম নেয়, কেউ হাই তোলে, কেউ কপাল ডলে চাপটা কমাতে চায়। তারাও স্বস্তিতে নেই। প্রাণহীন এই শহরে তারা সম্পূর্ণ অনাকাক্সিক্ষত।
নওহাট্টায় বহু পুরনো একটি বাড়ি আছে। কেউ কেউ মনে করেন, বাড়িটির বয়স ৩শ বছরের কম নয়। বাড়িটার সারা গায়ে ক্ষতচিহ্ন। জানালার কাচ ভেঙে গেছে। দরজাগুলোর কব্জা খুলে গিয়ে একদিকে ঝুলে আছে, দেয়ালগুলোতে দগদগে ঘা সৃষ্টি করেছে গুলির চিহ্ন। বাড়িটাকে দেখলে মনে হয় কুঁচকানো। বিক্ষোভকারী ও পুলিশের মধ্যে মাঝে মধ্যে সংঘর্ষ ঘটে আর তখন গুলির আঘাতে কিছু কিছু ছাল-বাকল ওঠে বাড়িগুলোর। পুরনো এ বাড়িটায় বাস করে চারজন মানুষ। স্বামী-স্ত্রী আর তাদের দু সন্তান-ছেলে আসিফ ও  মেয়ে মেহবিশ।
শুক্রবার এলে একদল তরুণ তাদের বাড়ির কাছাকাছি রাস্তা দিয়ে মিছিল করে যায়। আসিফ তাদের দেখে অস্বস্তি বোধ করে। সেও তো তাদের মত কাশ্মীরের স্বাধীনতা চায়। তবে তাদের সাথে যোগ দিচ্ছে না কেন? তরুণ বয়সের আবেগ তাকে অস্থির করে তোলে। ভালো করে কিছু না ভেবেই পরের শুক্রবার মিছিলে যোগ দেয় সে।
২০১০-এর জুলাই। ক্ষোভে-অসন্তোষে টগবগ করে ফুটছে কাশ্মীর। ভারতীয় কর্তৃপক্ষ খুব ভালো করেই জানে কী করে তা থামাতে হয়। ইংরেজদের কাছ থেকে শিখেছে তারা। শুরু হয় নির্মম দমন অভিযান। অসংখ্য তরুণকে আটক করে তারা। আটকদের তালিকায় আসিফও আছে। থানার পুলিশরা পেরেশান বাবা-মাকে জানায় যে রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে লড়াই শুরু করায় আরপিসি-র ১২৫ ধারায় আসিফকে আটক করা হয়েছে। পুলিশদের আচরণ ও মুখের ভাষা দুটি অসহায় মানুষের করুণ দৃষ্টিকে হতাশার কালো চাদরে ঢেকে দেয়। তারা পুলিশকে বলার কিছু না পেয়ে ধুঁকতে ধুঁকতে বাড়ি ফেরেন।
নিতান্ত প্রয়োজনে পুরনো বাড়িটার মেঝেতে তিনজন মানুষের পা পড়ে, কিন্তু কোনো শব্দ ওঠে না। ছেলে নেই। তার অনুপস্থিতি দুটি মানুষের মুখের ভাষা কেড়ে নিয়েছে। এদিকে মেহবিশও ভালো নেই। তার বুকের ভেতরে ভাইয়ের জন্য গুমরে উঠছে কান্না। কিন্তু বাবা-মার অবস্থা দেখে সে তা প্রকাশ করতে পারে না।
রোজ বাড়ির দ্বিতীয় তলায় ভাঙা জানালার পাশে গিয়ে বসে মেহবিশ। তাকিয়ে থাকে পাশের রাস্তার দিকে। যেদিন কার্ফ্যু থাকে না সেদিন রাস্তায় মোতায়েন পুলিশ ও সৈন্যদের পাথর ছোড়ে মুখোশধারী তরুণরা। জবাবে পুলিশ ও সৈন্যরা গুলি ছোড়ে, নয় টিয়ার গ্যাস। কখনো দুটোই চলে এক সাথে। এ সব দৃশ্য তাকে মূক ও স্থবির করে দেয়। তার মাত্র চৌদ্দ বছর বয়সী কচিমনের ওপর এই নিষ্ঠুরতা, এই মৃত্যু বড়ো বেশি চাপ সৃষ্টি করে। মেহবিশের মনে হয়, তার মনটা এই কঠিন চাপে দুমড়ে মুচড়ে এক অনুভূতিহীন বস্তুতে পরিণত হচ্ছে।
মেহবিশ আসলেই আর এত চাপ সহ্য করতে পারছে না। তার ভাইয়া আটক, কার্ফ্যুর কারণে তার স্কুল বন্ধ, রাস্তায় তাকালে সহিংসতার দৃশ্য। এদিকে ভাইয়ের জন্য চিন্তায় মা-বাবার পাগলপারা অবস্থা। কত জনের হাতে-পায়ে ধরছেন তারা ছেলেকে ছাড়িয়ে আনার জন্য। সত্যি বলতে কি, তাদের পরিবারের অস্তিত্ব নিয়েই সঙ্কট দেখা দিয়েছে। বাড়িতে বহু কষ্টে খাবারের যে মজুত গড়ে তোলা হয়েছিল তা দ্রুত ফুরিয়ে আসছে। তাদের হতাশা ভরা মুখের দিকে তাকানো যায় না। নিজের ঘরে এসে বিছানায় আছড়ে পড়ে সে। কী করবে সে? কী করার আছে তার এ অবস্থায়? প্রায়ই কিছু না খেয়েই সে রাত কাটিয়ে দেয়। কী যে বিশ্রি অবস্থা! কে তাদের সাহায্য করবে? এক আল্লাহ ছাড়া সাহায্য করার কেউ নেই।
নিজের ভেতর একটা পরিবর্তনের স্রােত টের পায় মেহবিশ। প্রায়ই তার রাত কেটে যায় না খেয়ে। কিন্তু এতে তার শরীর দুর্বল হলেও মনের মধ্যে কঠিন এক জিদের অস্তিত্ব টের পায় সে। এই যে বিক্ষোভ, স্লোগান, পাথর ছোড়া, সংঘর্ষ, মৃত্যু- এসব নিয়ে সে ভীষণভাবে চিন্তা করে। তার মনে হয়, তার বয়সী আর কেউই তার মতো এত চিন্তা করে না। এই ভয় ও আতংকের মধ্যে সে হারিয়েছে তার শৈশবকে, এখনো আটকা পড়ে আছে খাঁচার মধ্যে। এ চিন্তা তাকে উত্তেজিত করে তোলে। সে তার ক্ষোভের কথা বলতে চায়, সে তার মনের কথা বলতে চায়, সে তার নিজের ও অন্যদের অধিকারের জন্য লড়তে চায়। সে চায়–
কিন্তু মেহবিশ দেখে তার হাতে-পায়ে শিকল বাঁধা, সে অসহায়, সে দুর্বল। এই অনুভূতি তার হতাশাকে আরো বাড়িয়ে দেয়। এ এক পরিহাস! নিজেই নিজেকে বলে সে- এই শ^াসরুদ্ধকর অবস্থা আমাকে খেপিয়ে তুলেছে অথচ আমার ক্রোধ প্রকাশ করার অনুমতি নেই।
তার বয়সী একটি বালিকার জন্য এ এক মারাত্মক চিন্তা। তার বয়সকে ছাপিয়ে যায় চিন্তার বিশালতা। ক্রোধের এই উত্তাল প্রবাহ তার অনভূতির তরঙ্গে তরঙ্গে তোলে ঘূর্ণিপাক। এই বয়সে এই প্রচণ্ড উথাল-পাথাল হৃদয়াবেগকে সে রুখবে কী করে, বুঝতে পারে না। এ সময় সে উপলব্ধি করে যে সে একা নয়- তার মতো আরো অনেকে আছে। ধীরে ধীরে নিজেকে নিজের মধ্যে স্থিত করে মেহবিশ।
মেহবিশ এখন তার দুঃখ কাটিয়ে ওঠার জন্য বিকল্প কিছুর সন্ধান করতে থাকে। হঠাৎ করেই সে তার ডায়েরি ও কলম তুলে নেয় হাতে। তারপর তার ব্যথা নীল ভাবনাগুলোর রক্তক্ষরণ ঘটে চলে কাগজের বুকে। কলমের প্রতিটি আঁচড় তার ভারাক্রান্ত হৃদয় থেকে উৎসারিত শব্দগুলো অক্ষর রূপে রেখায়িত করে চলে। মন অনেকটাই শান্ত হয়ে আসে। সে কিছুক্ষণ লিখে ভাবতে শুরু করে। কলম ও কাগজের ধৈর্য মানুষের চেয়ে অনেক বেশি। জন মিল্টন তার কবিতার ভেতর দিয়ে ¯্রষ্টার কাছে তার চিন্তা-ভাবনার প্রকাশ ঘটাতেন। মেহবিশ তার কবিতার মধ্য দিয়ে নিজের বেদনা ও দুঃখময় অনুভূতিগুলো প্রকাশ করতে চাইল।
কলম ও ডায়েরি নিয়ে ভাঙা জানালার কাছে বসেছিল মেহবিশ। তার এক একটি কবিতায় একেক রকম বিষয় আসছিল। সে কখনো তার ভাইকে মুক্ত দেখতে চাইছিল, কখনো দেখতে চাইছিল যে তার বাবার ভাঙা মন ভালো হয়ে গেছে ও  নিজের কাজ শুরু করেছে, কখনো চাইছিল ভাগ্যকে শাপ-শাপান্ত করে তার মায়ের করুণ কান্না বন্ধ হোক। আবার কখনো তার মন চাইছিল জানালার বাইরে আগের মতো সুন্দর দৃশ্য বিরাজ করুক।
ইহুদি বালিকা অ্যানফ্রাংকের কথা মনে পড়ে তার। নিজের ডায়েরি ছাড়া পৃথিবীর কাউকে সে বিশ^াস করত না। মেহবিশ খানিকটা অ্যানের মতই। তার ডায়েরির পাতায় সে লিখেছে, আর তার সে লেখাগুলো হচ্ছে তার হৃদয়ের রক্তক্ষরণ।
এই পৃথিবীতে কিছু কুঁড়ি কেন তাদের জাগতিক বেদনা অন্যদের সাথে শেয়ার করতে চায়? কেন তারা এটাকে দায়িত্ব বলে মনে করে? মেহবিশের মতো হাজার হাজার বালিকা বড়ো হয়ে উঠছে। তারা বেড়ে উঠছে। এটাই হয়। এ রকমই ঘটে।
মেহবিশের মনে দুশ্চিন্তা আবার ফিরে আসে। কার্ফ্যু যদি অব্যাহত থাকে তাহলে কী হবে? আমরা তখন কীভাবে বাঁচব? তারা যদি আসিফকে না ছাড়ে তাহলে কী হবে? ইতোমধ্যেই তারা ওয়ামিক, তুফায়েল, সমীরকে খুন করেছে। তারা যদি আসিফেরও সে অবস্থা করে, তাহলে?
শুধু তার বাবা-মাই নয়, বিদ্যমান অবস্থায় সেও ভীষণভাবে বিপর্যস্ত। কার্ফ্যু শুরু হওয়ার কয়েক দিন আগে সে কিছু বিক্ষোভকারীর কাছে কয়েকটি ব্যানার দেখেছিল। একটিতে বলা হয়েছিল- আমি মুসলমান। আমাকে হত্যা কর, জেলে পাঠাও। বল যে নিরাপত্তা ব্যবস্থার জন্যই এটা করা হয়েছে। আরেকটিতে বলা হয়েছিল- আমাদের জনগণকে গণনির্বাসনে পাঠাও। বল যে মধ্যপ্রাচ্যে এ রকমই করা হয়। আরেকটি ব্যানারে বলা হয়েছিল- আমার যা কিছু আছে কেড়ে নাও, তারপর আমার মাতৃভূমি দখল কর।
মেহবিশের কলম ডায়েরির পাতায় আঁচড় কেটে চলে –
নিরাশাবাদী ডুব দিতে পারে না চির আনন্দের সাগরে
পুণ্যের জোয়ারের মুখে ভেঙে পড়ে ঘোরির সা¤্রাজ্য।
সময় এগিয়ে চলে। উপত্যকার পরিস্থিতির মতো মেহবিশের বাড়িতেও প্রাণের সাড়া নেই বললেই চলে। অবস্থা ক্রমেই খারাপ হচ্ছে। এক আশাহীন অন্ধকারে যেন ঢাকা পড়েছে সব কিছু। এর মধ্যেও মেহবিশ লিখে যায়। তার বুকের ভেতরে জমাট বেঁধে আছে কতকালের ক্ষোভ। হৃদয়ের দুঃখ, বেদনাগুলোকে শব্দের মালায় গেঁথে চলে সে।
জুলাইয়ের সে রাতটিতে ভীষণ গরমে ঘামছিল মেহবিশ। বিছানা ছাড়ে সে। ডাইরি ও কলম হাতে গিয়ে বসে জানালার কাছে। চলতে থাকে তার কলম:
বিদ্রোহীদের কণ্ঠস্বর বন্ধ করা থামাও, ফারাও
মূসা এখনো জীবিত; ক্রোধের সমুদ্র এখনো বিদ্যমান
ভয় কর সে আসমানি স্ফুলিঙ্গকে যা জ¦ালাতে পারে অগ্নিশিখা।
সকল জবরদস্তি ব্যবস্থাকে আঁকড়ে ধরে আছ প্রিয় বস্তুর মতো
তুমি কেড়ে নিয়েছ অসংখ্য মায়ের কাছ থেকে তাদের মাতৃত্ব
তোমার এখন শুধু বলার আছে- ‘আমার সব ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে!’
এখন শোন! সকলের সম্মিলিত অভিশাপ ধেয়ে যাচ্ছে তোমার দিকে
ততক্ষণ পর্যন্ত প্রাণভরে উপভোগ কর শক্তি ও ক্ষমতার স্বাদ…
আর লিখতে পারে না মেহবিশ। ভাঙা মন নিয়ে ডায়েরিটা বন্ধ করে সে। এক মুহূর্তের জন্য জানালা দিয়ে বাইরের দিকে তাকায় সে। সব কিছু স্তব্ধ হয়ে আছে।
ঘুমহীন চোখে স্বপ্ন দেখছিল সে- স্বপ্ন মানে তো বাস্তবতা থেকে পলায়ন আর কি। সে একটি সুন্দর ঘাসে ঢাকা মাঠে দৌড়াচ্ছিল। হাসছিল প্রাণভরে। মেয়েকে এত খুশি দেখে তার বাবা-মাও খুশিতে হাসছিলেন। ভাইটিও ছিল তার পাশে। এত সুন্দর ছিল জায়গাটা। এ রকম একটি জীবনই চেয়েছিল মেহবিশ। মধুর স্বপ্ন দৃশ্যের মাঝে নিজেকে হারিয়ে ফেলেছিল সে। বোকার মতই হাসছিল অলীক আনন্দে। এই অন্ধকারের মধ্যে তার চোখ যে সব দৃশ্য দেখছিল তা ক্ষণিকের জন্য হলেও ম্গ্ধু করেছিল তাকে। কিন্তু হায়! ভালো জিনিস কি দীর্ঘস্থায়ী হয়? হঠাই সে চমকে ওঠে। আশপাশেই কোথাও কেউ চিৎকার করে কাঁদছে। কী ব্যাপার? সময় দেখে সে- রাত ১টা ৩৬ মিনিট। কিন্তু এত রাতে বাইরে গিয়ে কান্নার উৎস সন্ধান করতে ইচ্ছে করে না তার। ফলে তা জানাও হল না। ভেঙে পড়া মন নিয়ে শুয়ে পড়ে সে।
আরেকটা সকাল আসে। সেই একই রকম। রান্নাঘরে মায়ের উপস্থিতি টের পায় সে, কিন্তু ভালো করেই জানে নাশতা তৈরি করার মতো কিছু তাদের ঘরে নেই। মা কি কোনো ব্যবস্থা করেছে? তখনি তার রাতের চিৎকারের কথা মনে পড়ো। মায়ের কাছে গিয়ে দাঁড়ায় সে-
: আচ্ছা মা! রাতে কী হয়েছিল জানো।
তার মা প্রথমে বিষয়টি এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করলেন। মেহবিশ বুঝল যে মা জানে, কিন্তু বলতে চাইছে না। তাকে চেপে ধরে সে-
: বল না মা, কী হয়েছে?
অবশেষে ব্যাপারটা তাকে জানাতে বাধ্য হলেন মা- পাশের বাসার মুশতাকের ছেলেকে রাতে হত্যা করেছে ভারতীয় সৈন্যরা।
স্তÍব্ধ হয়ে বসে থাকে দুজন। যুগ-যুগান্তের নীরবতা ঘিরে ধরে তাদের। এক সময় মেহবিশ বলে-
: আচ্ছা মা, আমি যদি একজন শহিদের মতো মারা যাই তাহলে কেমন হবে?
তার কথা শুনে কাঁদতে থাকেন মা।
কিছু সময় পর নিজের ঘরে চলে আসে মেহবিশ। তার শরীরে শক্তির কোনো সাড়া পায় না। অবসন্ন মানুষের মতো শুয়ে পড়ে বিছানায়।
আরেকটি কিশোর প্রাণ ঝরে গেল। তার নাম ছিল আবিদ। তার সহপাঠী, একই বয়সী ছিল তারা। কার্ফ্যু শুরুর আগের দিন শেষ দেখা হয়েছিল তাদের। ভীষণ ভদ্র কিন্তু বেশ স্মার্ট ছিল আবিদ।
আবিদের স্মৃতিগুলো তার মন জুড়ে ভাসতে থাকে। এর আগেও অনেক ছেলে রাস্তায় গুলি খেয়ে শহিদ হয়েছে। তাদের জন্যও তার মনে ছিল অনেক মায়া। সে তাদের মৃত্যুতেও কেঁদেছে। কিন্তু আবিদের জন্য তার কান্না আগের সব কান্নাকে ছাড়িয়ে যায়। আবিদের সাথে দুপুরের খাবার ভাগ করে খেয়েছে সে, তার সাথে নোট বিনিময় করেছে। এ রকম বন্ধু কি আর পাবে সে? তার চেয়েও বড়ো কথা কাশ্মীরের মুক্তির জন্য প্রাণ দিল আবিদ। কিন্তু তার কি প্রাণ দেওয়ার সময় হয়েছিল? প্রাণ কি এতই ঠুনকো! এ প্রশ্নের সে জবাব খুঁজে পায় না। কেঁদেই চলে মেহবিশ।
কাঁদতে কাঁদকে এক সময় ঘুমিয়ে পড়ে মেহবিশ। সে জেগে ওঠে বিকেল বেলায়, তার জানালা দিয়ে ঘরে ঢুকে পড়া রাস্তায় গোলমালের আওয়াজে। চোখে তখনো ঘুমের রেশ। সে অবস্থায়ই সে জানালা দিয়ে বাইরে চোখ রাখে। তরুণরা কার্ফ্যু ভেঙে নেমে এসেছে রাস্তায়। সৈন্যদের সাথে সংঘর্ষ শুরু হয়েছে। উদ্বেগে ছেয়ে যায় তার মন। সংঘর্ষ মানেই তাজা প্রাণ ঝরে পড়ার আশঙ্কা। সে মুহূর্তে একটি গুলির শব্দ হয়, টলে ওঠে মেহবিশ।
একটি বিক্ষিপ্ত গুলি জানালা দিয়ে ঢুকেছে, সোজা লেগেছে মেহবিশের বুকে। মুহূর্তেই মৃত্যু হয়েছে তার। তার কচি দেহটি লুটিয়ে পড়েছে নিচে। রক্তের ধারা বইছিল মেঝেতে। সেই মুহূর্তে ন্যায়বিচার দাবি করে একটি মিছিল জানালার সামনের রাস্তা অতিক্রম করতে থাকে।
মেহবিশ তার মনের কষ্ট ও দুঃখগুলো কবিতায় তুলে ধরতে চেয়েছিল। তা করছিলও সে। কিন্তু কার্ফ্যুর কারণে স্কুল এবং বাইরে যাওয়াও বন্ধ হলে কাউকে তা জানাতে পারেনি সে।
মেহবিশ নেই, কিন্তু সন্ধ্যা পর্যন্ত কেউ জানতে পারল না তা। এ সময় তার বাবা ডাক দিলেন-
: মেহবিশ, আমার জান, নিচে আয় মা। তোর মা নুন-চা বানিয়েছে। জলদি আয়।
কয়েকবার ডাকলেন তিনি, কিন্তু মেহবিশের সাড়া মেলে না।
স্ত্রীকে জিজ্ঞেস করেন তিনি-
: মেহবিশ দুপুরে খেয়েছে।
: না। জবাব দেন মা, তারপর বলেন, সকাল বেলাতেই তার মন খুব খারাপ দেখেছি। জিজ্ঞেস করায় সে আমাকে বলল- আচ্ছা মা! আমি যদি একজন শহিদ হিসেবে মারা যাই তাহলে কেমন হবে?
মেহবিশের বাবা করুণ চোখে চাইলেন স্ত্রীর দিকে। কিছুটা সময় পরস্পরের দিকে চেয়ে রইলেন তারা। তারপর দু’জনেই উঠে ছুটলেন দোতলায় মেহবিশের ঘরের দিকে। বাবা আগে, পিছনে মা। ভেজানো দরজা ঠেলা দিতেই খুলে যায়। একটি পা ভেতরে রেখেই পাথরের মতো জমে গেলেন তিনি। মেহবিশ পড়ে আছে মেঝেতে। তার দেহ থেকে বেরিয়ে আসা রক্ত গড়িয়ে দরজার পাল্লার নিচে জমেছিল। পায়ে সে রক্তের স্পর্শ লাগতেই সারা দেহ কেঁপে ওঠে তার। আত্মজার রক্ত। কাঁপতেই থাকে তার শরীর। চোখ থেকে নেমে আসে অশ্রুর বন্যা। এদিকে মেহবিশের মা রক্ত দেখেই জ্ঞান হারিয়ে পড়ে যান নিচে। মেহবিশের বাবা তা টের পেলেন না।
মেহবিশ মারা গেছে। কাচভাঙা জানালাটি তার দর্শককে হারিয়েছে, চিরকালের জন্য। তা কোনো সমস্যা নয়, সমস্যা দাঁড়াল অন্যখানে। সারা কাশ্মীরে কার্ফ্যু চলছে। কাউকে খবর দেওয়া, এই রাতের বেলা কোনো গোরস্তানে তার জন্য একটি কবরের ব্যবস্থা করা তার বাবার জন্য ভীষণ কঠিন ব্যাপার হয়ে দাঁড়াল। প্রাণহীন মেহবিশের মুখ দেখে মনে হচ্ছিল, গভীর শান্তিতে ঘুমিয়ে আছে সে। তার কবর হবে কি হবে না, তা নিয়ে তার কোনো চিন্তা নেই।
অবশেষে কাছের মালখা গোরস্তানে মেয়ের জন্য একটা কবরের ব্যবস্থা করতে পারলেন তার বাবা। শান্তি বিঘিœত হতে পারে, তাই শব্দ করে কাঁদতেও পারলেন না তার বাবা।
চার মাস পর মুক্তি পেয়ে কারাগারের গেট দিয়ে বাইরে বেরিয়ে আসে আসিফ। বোনের মৃত্যুর কথা জানে না সে। জানে না তাদের পরিবারের সদস্য সংখ্যা কমে এখন তিনজনে দাঁড়িয়েছে। বাড়িতে ঢোকে। বাবা-মাকে একে একে খানিকটা সময় জড়িয়ে ধরে থাকে সে। তার চোখ খুঁজে ফিরছিল মেহবিশকে। কিন্তু তার দেখা নেই। শেষে মাকে জিজ্ঞেস করে-
: মেহবিশ কই, মা?
মা কোনো জবাব দেন না। দু বার, তিনবার। মা আর পারেন না-
: শহিদ হয়েছে সে বাবা। ডুকরে কেঁদে ওঠেন তিনি।
মেহবিশের মৃত্যুর পর তার জন্য কাঁদতে পারেননি তার বাবা-মা। আজ বাড়িতে তার জন্য শোকের মাতম ওঠে।
ধীরে ধীরে পা ফেলে ওপরে ওঠে আসিফ। বোনের ঘরে ঢোকে। বদ্ধ ঘরে এখনো রক্তের গন্ধ। সেই জানালার কাছে রাখা মেহবিশের ডায়েরি ও কলম। আসিফ ডায়েরিটা হাতে তুলে নেয়। বুকের সাথে জড়িয়ে ধরে শক্ত করে। যেন ছোটো বোনটিকে আলিঙ্গন করছে।
কত সময় কেটেছে, আসিফ জানে না। এক সময় একটু শান্ত হয় মন। ডায়েরিটা খোলে সে। পাতার পর পাতা ভরা কবিতা। কী লিখেছে সে? পড়তে শুরু করে আসিফ। কষ্ট, দুঃখ, ক্রোধ, বেদনা প্রতিবাদী করে তুলেছে মেহবিশকে। সে রাস্তায় বিক্ষোভে যোগ না দিয়েও তাদেরই একজন হয়ে উঠেছে। কাশ্মিরীদের হৃদয়ের সাথে মিশে গেছে তার হৃদয়। নিজের দুঃখ নয়, কাশ্মীরী জনগণের দুঃখই হয়ে উঠেছে তার দুঃখ।
ডায়েরির পিছন দিকে লেখা একটি কথা চোখে পড়ে তার- ‘লেখা কোনো ব্যক্তিকে অমর করে তুলতে পারে। আর কলম বস্তুতপক্ষে একটি পরশমণি।’

শামস ইরফান
*লেখক ও লেখা : শামস ইরফান শ্রীনগর থেকে প্রকাশিত ইংরেজি সাপ্তাহিক পত্রিকা ‘কাশ্মীর লাইফ’-এর সহযোগী সম্পাদক। তিনি উত্তরপ্রদেশের অধিবাসী। আলিগড় বিশ^বিদ্যালয় থেকে সাংবাদিকতায় এমএ। সাত বছরেরও বেশি সময় ধরে কাশ্মীরে কাজ করছেন। তার লেখা এ গল্পটি ‘পেন, অ্যান এলিক্সার’ নামে ইংরেজিতে অনুবাদ করেছেন সায়মা রশিদ। ২০১৪ সালের ২৪ ডিসেম্বর ‘কাশ্মীর লাইফ’-এ গল্পটি প্রকাশিত হয়। ইন্টারনেট থেকে সংগৃহীত।

মূল গল্পের প্রচ্ছদ
*সুলেখক, অনুবাদক ও সাংবাদিক হোসেন মাহমুদ সাহিত্য জগতে খুব সুপরিচিত নাম। তিনি ‘কিশোরকণ্ঠে’ নিয়মিত লিখতেন। এই লেখাটি তিনি দিয়েছিলেন তাঁর ইন্তিকালের পূর্বে, ১৬.৯.২০১৯ সালে। আমাদের সংগ্রহ থেকে সেই লেখাটি এ সংখ্যায় দেওয়া। আমরা এই সুসাহিত্যিকের রুহের মাগফিরাত কামনা করছি- সম্পাদক।

SHARE

Leave a Reply