Home ঈদ প্রবন্ধ গ্রাম বাংলার ঐতিহ্যবাহী যত ঈদগাহ -মঈনুল হক চৌধুরী

গ্রাম বাংলার ঐতিহ্যবাহী যত ঈদগাহ -মঈনুল হক চৌধুরী

সারা বিশে^র মুসলিম সম্প্রদায়ের ঈদ উৎসবের সাথে ‘ঈদগাহ’ শব্দটি ওতপ্রোতভাবে জড়িত। কারণ মুসলমানদের দুটি প্রধান ধর্মীয় উৎসবের দিনের সূচনাই ঘটে ঈদগাহে একত্রিত হয়ে নামাজ আদায়ের মধ্য দিয়ে। তাই ঈদগাহ ইসলামী সংস্কৃতিতে ব্যবহৃত একটি শব্দ। যা দ্বারা খোলা আকাশের নিচে ঈদুল ফিতর এবং ঈদুল আযহার নামাজ আদায়ের জন্য সাধারণত শহরের বাইরে বা শহরতলিতে বড়ো ময়দানকে বোঝানো হয়। বিশাল ময়দানে ঈদের নামাজ আদায় করা ইসলামী সংস্কৃতিতে বিশেষ একটি ব্যাপার। অন্তত উপমহাদেশের মুসলমানদের মধ্যে ঈদগাহে ঈদের নামাজ আদায় করার ব্যাপারটি বেশ জনপ্রিয় ও মর্যাদার একটি ব্যাপার। ঈদের নামাজ কেবল জামাতেই আদায় করা যায়। মসজিদে ঈদের জামাত আদায় করা গেলেও ঈদগাহে নামাজ আদায় উপমহাদেশের মানুষের মধ্যে খুবই পছন্দনীয় একটি রীতি। তাই ঈদগাহের মাঠে জমায়েত হওয়ার মাধ্যমে সৌহার্দ্য, সম্প্রীতি ও ভ্রাতৃত্ববোধ বৃদ্ধি পায়। বিশ্বের বিভিন্ন মুসলিম দেশের মতো বাংলাদেশেও অনেক ঐতিহ্যবাহী ঈদগাহ রয়েছে। আলোচ্য নিবন্ধে গ্রামবাংলার ঐতিহ্যবাহী কয়েকটি ঈদগাহের তথ্য ও চিত্র তুলে ধরা হলো।

জাতীয় ঈদগাহ, ঢাকা

স্বাধীনতার আগে থেকেই হাইকোর্টের পাশের জায়গাটি ছিল ঝোপ জঙ্গলে পূর্ণ। সেই জায়গায় একটি পুকুরও ছিল। ১৯৮১-৮২ সালের দিকে ঝোপ-জঙ্গল কিছুটা পরিষ্কার করা হয়। হাইকোর্ট প্রাঙ্গণে রয়েছে একটি মাজার। সেই মাজারে ওরসের আয়োজন হতো ওই পুকুরপাড়ে। সেই সূত্রে জায়গাটি একটু পরিচিত হয়ে উঠলে সেখানে ছোটো পরিসরে শামিয়ানা টাঙিয়ে ঈদের নামাজ পড়ানো শুরু হয়। ১৯৮৫ সালের দিকে পুকুরটি ভরাট করে ফেলে কর্তৃপক্ষ। পরে ১৯৮৭-৮৮ সালের দিকে ওই ঈদগাহকে জাতীয় ঈদগাহ হিসেবে ঘোষণা করে সরকার। বর্তমানে বাংলাদেশ হাইকোর্টের অধীন ঈদগাহটি পরিচালিত হলেও তার দেখভাল করে গণপূর্ত বিভাগ। ২০০০ সালে দুই ঈদেই ঈদগাহ প্রস্তুতের দায়িত্ব পায় ঢাকা সিটি করপোরেশন। এখন সেই দায়িত্ব পালন করছে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন। চারদিকে লোহার প্রাচীর দেওয়া বিশাল মাঠটিতে রয়েছে একটি মূল ফটকসহ কয়েকটি ফটক। কেবলার দিকে রয়েছে একটি মেহরাব। মেহরাবটি মূলত পাঁচটি মিনারে তৈরি। জাতীয় ঈদগাহে একটি জামাতে অন্তত একলাখ মুসল্লি একসঙ্গে নামাজ আদায় করতে পারে। ঈদের দিন রাজধানী ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় বসবাসকারীরা এখানে নামাজ পড়তে আসেন।

মোগল ঈদগাহ, ধানমন্ডি

১৬১০ সালে সুবে বাংলার রাজধানী হয় ঢাকা। সুবেদারের বাসস্থান এবং অন্য রাজ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কার্যালয়ও ছিল এখানে। যুক্তিযুক্তভাবেই ঢাকায় তখন মোগলদের সংখ্যাও বৃদ্ধি পেয়েছিল বেশ। সেই সময় তাদের জন্য বাংলাদেশের প্রাচীন ঈদগাহটি তৈরি হয়েছিল ঢাকার ধানমন্ডি আবাসিক এলাকার সাত মসজিদ রোডে। বাংলার সুবেদার শাহ সুজার প্রধান অমাত্য মীর আবুল কাসেম ১৬৪০ সালে এটি তৈরি করেন। সেই আমলে ঈদের দিন এই ঈদগাহটিতে শুধু মোগলরাই যেতেন। সাধারণ মানুষের স্থান সেখানে হতো না। সুবেদার, নাজিম ও অন্য মোগল কর্মকর্তারা নামাজ পড়তেন এখানে। ইংরেজ আমলে জরাজীর্ণ ও জঙ্গলাকীর্ণ অবস্থায় ছিল ঈদগাহটি। মুনশী তায়েশের বর্ণনা থেকে জানা যায়, উনিশ শতকের শেষের দিকে শহরের মুসলমানরা এখানে ঈদের নামাজ পড়ত, সেই সঙ্গে আয়োজন করা হতো মেলা। এই ঈদগাহটিতেও বাংলাদেশের অন্য মোগল স্থাপত্যগুলোর মতো পোড়ামাটির ইট ব্যবহার করা হয়েছে। বন্যা বা বৃষ্টি থেকে রক্ষার জন্য চার ফুট ভূমি উঁচু করে ঈদগাহটি নির্মাণ করা হয়েছিল। যেখানে রয়েছে মিহরাব ও মিম্বর। এই অংশটিই মোগল আমলের। বাংলাদেশের প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ ১৯৮৮ সালে সংস্কারের সময় অন্য তিন দিকের প্রাচীর নতুন করে তৈরি করেছে। চার কোণে রয়েছে অষ্টভুজাকৃতির বুরুজ। পশ্চিম প্রাচীরের মাঝ বরাবর প্রধান মেহরাব। আরো দুটি ছোট আকারের মেহরাব আছে এর দুই পাশে। প্রধান মেহরাবটি অষ্টকোনাকৃতির। ভেতরের দিকে খানিকটা ঢালু খিলান আকৃতির। মেহরাবগুলো দেয়ালের আয়তাকার ফ্রেমের ভেতরে অবস্থিত।

কেন্দ্রীয় ঈদগাহ মাঠ, সাভার

এ ঈদগাহ মাঠে প্রায় কয়েক হাজার মুসল্লি একসাথে ঈদের জামাতে অংশ নিতে পারেন। প্রতি বছরই সাভারে ঈদের প্রধান জামাত ভাগলপুর এলাকায় অবস্থিত কেন্দ্রীয় ঈদগাহ মাঠে অনুষ্ঠিত হয়। ঈদগাহ প্রাঙ্গণে পুরুষদের পাশাপাশি নারীদেরও নামাজ আদায়ের ব্যবস্থা করা হয়েছে। বৈরী আবহাওয়ার কারণে বৃষ্টিপাতের আশঙ্কা থাকলে ঈদগাহ মাঠে ত্রিপলের ব্যবস্থা করা হয়। এই জামাতে পৌর এলাকার প্রায় ৮ থেকে ১০ হাজার মুসল্লি অংশ নিয়ে থাকেন। এই ময়দানে একটি জামাত অনুষ্ঠিত হয়। এই ঈদগাহ মাঠ ছাড়াও সাভার অধরচন্দ্র স্কুলমাঠ প্রাঙ্গণ ও বিভিন্ন মসজিদ-মাদ্রাসায় কয়েক দফায় ঈদের নামাজ আদায় করতে পারেন মুসল্লিরা। ঢাকার অদূরের এই ঈদগাহটি বৃহত্তর ঈদের জামাত অনুষ্ঠানস্থল হিসেবে ইতোমধ্যে বেশ পরিচিতি লাভ করেছে।
শোলাকিয়া ঈদগাহ, কিশোরগঞ্জ

উপমহাদেশের বিখ্যাত শোলাকিয়া ঈদগাহটি নির্মাণ করেছিলেন সুফি সৈয়দ আহমেদ। ইসলামের ঐশী বাণী প্রচারের জন্য সুদূর ইয়েমেন থেকে আগত সুফি সৈয়দ আহমেদ তার নিজস্ব তালুকে ১৮২৮ সালে নরসুন্দা নদীর তীরে ঈদের জামাতের আয়োজন করেন। ওই জামাতে তিনি নিজেই ইমামতি করেছিলেন। অনেকের মতে, সেদিনের জামাতে প্রায় সোয়া লাখ লোকের জমায়েত হয়। ফলে এর নাম হয় ‘সোয়া লাখি’। পরে উচ্চারণের বিবর্তনে শোলাকিয়া নামটি প্রচলিত হয়ে যায়। ১৯৫০ সালে স্থানীয় দেওয়ান মান্নান দাদ খাঁ এই ময়দানকে অতিরিক্ত ৪.৩৫ একর জমি দান করেন। কিশোরগঞ্জ জেলা শহরের পূর্ব প্রান্তে নরসুন্দর নদীর তীরে এ ঈদগাহ ময়দানটি অবস্থিত। এই ঈদগাহটি আজ বাংলাদেশেরই একটি গৌরব ও ঐতিহ্যে পরিণত হয়েছে। প্রতি বছর দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে অসংখ্য মানুষ ছুটে যান এখানে শুধু একসঙ্গে বৃহৎ একটি জামাতে অংশ নিতে।
বর্তমানে এখানে একসঙ্গে তিন লক্ষাধিক মুসল্লি জামাতে নামাজ আদায় করতে পারেন। এই ঈদগাহ মাঠটি চারপাশে উঁচু দেওয়াল ঘেরা হলেও মাঝে মধ্যেই ফাঁকা রাখা হয়েছে যেন মানুষ মাঠে প্রবেশ ও বের হতে পারে। এর পশ্চিম সীমারেখা উত্তর-দক্ষিণে ৩৩৫ ফুট এবং পূর্ব সীমারেখা উত্তর-দক্ষিণে ৩১৪ ফুট এবং উত্তর সীমারেখা পূর্ব-পশ্চিমে ৭৮৮ ফুট ও দক্ষিণ সীমারেখা পূর্ব-পশ্চিমে ৯৪১ ফুট দীর্ঘ। মিনার সংস্কার, মাঠে প্রবেশের প্রধান তোরণ নির্মাণ, ৪৫টি ওজুখানা, ১৫টি প্রস্রাবখানা ও পাঁচটি টয়লেট নির্মাণ এবং মাঠের মিম্বরটি সংস্কার করা হয়।

জমিয়তুল ফালাহ ঈদগাহ ময়দান, চট্টগ্রাম

জমিয়তুল ফালাহ জাতীয় ঈদগাহ ময়দান চট্টগ্রাম মহানগরীর ওয়াসা মোড় এলাকায় অবস্থিত। এই ঈদগাহের সামনে রয়েছে সংশ্লিষ্ট মসজিদ। এই মাঠেই দুই ঈদের জামাত অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে। চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন প্রতি বছর দুই ঈদের সময় চট্টগ্রামজুড়ে কোন মসজিদ বা মাঠে কখন ঈদ জামাত হবে এমন একটি তালিকা প্রকাশ করে। সেই তালিকায় জমিয়তুল ফালাহ ঈদগাহ মাঠের সময়সূচি থাকে সবার আগে। কয়েক যুগ ধরে চট্টগ্রামের সবচেয়ে বড়ো ঈদ জামাত এই মাঠেই হয়ে থাকে। ঈদের দিন এই ময়দানে চট্টগ্রামের আপামর জনতার মিলনমেলা বসে। চারপাশে সীমানাপ্রাচীর রয়েছে ঈদগাহজুড়ে। এই ঈদগাহটি ২০১৩ সালে ঢালাই করে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন। বিগত চার-পাঁচ বছর আগেও বিশালাকৃতির এই মাঠজুড়ে ঈদের নামাজ অনুষ্ঠিত হতো। কিন্তু পরবর্তী সময়ে মাঠের অর্ধেকাংশজুড়ে নির্মাণসামগ্রীর স্তূপ করা হয়েছে। টিন দিয়ে বাকি অর্ধেক মাঠ ঘিরে রাখা হয়েছে। এসবের মধ্যেই এখন ঈদ জামাত অনুষ্ঠিত হয়।

বড় ঈদগাহ ময়দান, কক্সবাজার

কক্সবাজার জেলার প্রধান ঈদের নামাজের জামাত অনুষ্ঠিত হয় কক্সবাজার কেন্দ্রীয় ঈদগাহ মাঠে। এই ঈদগাহ ময়দানে একসঙ্গে ঈদের নামাজ আদায় করে প্রায় ২০ হাজার মানুষ। প্রতি বছরই এই ঈদগাহ জামাতের আয়োজন করে কক্সবাজার পৌরসভা। প্রায় ২০ হাজার মানুষের ধারণক্ষমতা বিবেচনা করে প্রায় ৫৫ হাজার বর্গফুটের এই ময়দানটির পুরো অংশ নামাজের জন্য প্রস্তুত করা হয়। পুরো ময়দানকে শামিয়ানা দিয়ে প্যান্ডেল আকারে ঢেকে দেওয়া হয়। শামিয়ানার কাপড়ের ওপর বৃষ্টি নিরোধক ত্রিপলও টাঙানো হয়। কক্সবাজারবাসীর দীর্ঘদিনের ইচ্ছা আর দাবি ছিল একটি বড়ো ঈদগাহ ময়দানের। যেখানে হবে পর্যটন জেলার বৃহত্তর ঈদ জামাত। সেই দাবির পরিপ্রেক্ষিতে ২০১২ সালে ঈদগাহ ময়দানের কাজ শুরু হয়। মেহরাব নির্মাণের মধ্য দিয়ে এই কাজের উদ্বোধন করা হয়।

শাহ মখদুম ঈদগাহ ময়দান, রাজশাহী

রাজশাহী শহরের দরগাহপাড়ায় অবস্থিত হজরত শাহ মখদুম (রহ.)-এর মাজার শরিফ থেকে কয়েক শ’ গজ পশ্চিমে গড়ে উঠেছে এই ঈদগাহ ময়দান। দরগাহ এস্টেট কার্যালয়ের তথ্যমতে, ১৯৪৭ সালে দেশ ভাগের পরপরই রাজশাহীর তৎকালীন ম্যাজিস্ট্রেট আবদুল মজিদ সিএসপি, সাব ডেপুটি কালেক্টর আবদুল করিম চৌধুরী, রাজশাহী জেলা পরিষদের প্রকৌশলী মো. হাবিবুর রহমান প্রমুখের উদ্যোগে রাজশাহী নগরীর কেন্দ্রস্থল পদ্মার তীর ঘেঁষে রাজশাহী হজরত শাহ মখদুম (রহ.) কেন্দ্রীয় ঈদগাহ ময়দানটি প্রতিষ্ঠিত হয়।
প্রাথমিকভাবে এই ঈদগাহ ময়দানটি চার ফুট উঁচু প্রাচীর দিয়ে ঘেরা ছিল। পরে তা ভেঙে ফেলে সাত ফুট উঁচু একটি নতুন বেষ্টনী প্রাচীর তৈরি করা হয়। ১৯৯৭-৯৮ সালের দিকে রাজশাহী সিটি করপোরেশনের উদ্যোগে ঈদগাহ ময়দানের ভূমি উঁচু ও সমতল করা হয়। এরপর আধুনিক স্থাপত্যের পাঁচ ফুট উঁচু বেষ্টনী প্রাচীর নির্মাণ করা হয়, যা আজো বিদ্যমান। ইট, বালু, সিমেন্ট আর রড দিয়ে নান্দনিকভাবে তৈরি ঈদগাহ মাঠের এই বেষ্টনী প্রাচীরে অসংখ্য ছোটো পিলার রয়েছে। ঈদগাহ ময়দানের চারদিকে রয়েছে ছোটো-বড়ো প্রায় ছয়টি প্রবেশপথ। ঈদগাহ ময়দানটির দক্ষিণ-পশ্চিম কর্নারে আধুনিক কারুকার্যে নির্মিত হয়েছে ছোট্ট একটি মসজিদ। পাশেই রয়েছে অজুখানা। ২০১৩ সালে রাজশাহী সিটি করপোরেশনের উদ্যোগে পদ্মা নদীর শহররক্ষা বাঁধকে সোজা করে এই ঈদগাহ মাঠের আয়তন দ্বিগুণ করা হয়। এখন এটির আয়তন দৈর্ঘ্যে ৪০০ ফুট এবং প্রস্থে ৪০০ ফুট। ওই বছরই মাঠে নতুন একটি মেহরাব তৈরি করা হয়। সেখানেই বর্তমানে ঈদের জামাত পড়ানো হয়।

শাহি ঈদগাহ, সিলেট

সিলেট শহরের ব্যস্ততম আম্বরখানা পয়েন্ট থেকে টিলাগড়মুখী সড়কের মাঝামাঝি এই স্থাপনার অবস্থান। স্থাপনার নামানুসারে পুরো এলাকাই এখন শাহি ঈদগাহ এলাকা নামে পরিচিত। সপ্তদশ শতাব্দীতে দিল্লির মসনদে বসেন সম্রাট আওরঙ্গজেব। তার শাসনামলে (১৬৫৯-১৭০৭) সিলেটে মোগল ফৌজদার হিসেবে নিয়োগ পান ফরহাদ খাঁ। এই ঈদগাহ নির্মাণে তিনি উদ্যোগী হন। সরাসরি তার তত্ত্বাবধানে মোগল স্থাপত্যরীতিতে এই ঈদগাহের নির্মাণকাজ সম্পন্ন হয়। ছোটো একটি টিলার ওপর ঈদগাহের মূল অংশের অবস্থান। সবুজে ঘেরা বিশাল ঈদগাহ প্রাঙ্গণের চারদিক সীমানাপ্রাচীর দিয়ে ঘেরা। অভ্যন্তর প্রবেশের জন্য প্রাচীরের চারদিকে সব মিলিয়ে রয়েছে তিনটি বিশালাকার তোরণ এবং আটটি ছোট প্রবেশপথ। ভেতরেই রয়েছে দৃষ্টিনন্দন শানবাঁধানো পুকুর, নানা জাতের গাছপালা। ঈদগাহের বিশাল ময়দান থেকে মূল অংশে যেতে বিশাল আকারের ২২টি সিঁড়ির ধাপ অতিক্রম করতে হয়। তারপর দেখা মিলবে পশ্চিম প্রাচীরের মধ্যবর্তী স্থানে অবস্থিত কেন্দ্রীয় মেহরাবের। মেহরাবটি অর্ধ গম্বুজের আকৃতিতে নির্মিত। প্রধান মিহরাবকে কেন্দ্র করে দুই পাশে আরো ১৪টি সহকারী মেহরাব রয়েছে। মেহরাবগুলো অষ্টভুজাকৃতির বুরুজের ওপর ছত্রী দ্বারা আচ্ছাদিত। স্থাপনার পুরোটাই নকশাখচিত। পরবর্তী সময়ে মোগল স্থাপত্যের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আধুনিক স্থাপত্যও। ২০০২ সালে ঈদগাহের তিন দিকে তিনটি বিশাল তোরণ নির্মাণ করা হয়। মোগল স্থাপত্যকলাকে ভাবনায় রেখে তোরণগুলোর নকশা করা হয়। এরপর ২০১৩ সালে ঈদগাহের পশ্চিম-উত্তর প্রান্তে সুউচ্চ মিনার নির্মাণের কাজ শুরু হয়। ২০০ ফুট উচ্চতার এই সুদৃশ্য মিনারে মোগল আমল আর চলমান সময়ের স্থাপত্যকলাকে এক সূত্রে গাঁথার চেষ্টা করা হয়েছে। তিন ধাপে তৈরি মিনারটি এক হাজার ৬০ বর্গফুট ভূমিজুড়ে অবস্থিত।

গোর-এ-শহীদ বড়ো ময়দানের ঈদগাহ, দিনাজপুর

বাংলাদেশের সবচেয়ে বড়ো ঈদগাহটি দিনাজপুরের গোর-এ-শহীদ বড় ময়দানের ঈদগাহ। এর নির্মাণকাজ শুরু হয়েছিল ২০১৫ সালে। ঈদগাহটি তৈরি করা হয়েছে মোগল স্থাপত্যরীতিতে। মেহরাবের উচ্চতা ৫৫ ফুট। ৫২ গম্বুজবিশিষ্ট এই ঈদগাহে রয়েছে দুটি মিনার, যাদের প্রতিটির উচ্চতা ৬০ ফুট। মাঝের গেট দুটি ৪৭ ফুট করে চওড়া। এতে খিলান আছে ৩২টি। ঈদগাহ তৈরিতে রড, সিমেন্ট, বালু ছাড়াও সিরামিক টাইলস ব্যবহার করা হয়েছে। প্রতিটি গম্বুজে আছে বৈদ্যুতিক সংযোগ। সন্ধ্যার পর থেকেই মিনারে আলো ঝলমল করে ওঠে।

ইসলামী ভাবগাম্ভীর্যে সমৃদ্ধ ইরাকের মসজিদে নববি, কুয়েত, ভারত, ইন্দোনেশিয়াসহ বিভিন্ন দেশের স্থাপনার আদলে এর আকৃতি দেওয়া হয়েছে। এই ঈদগাহে প্রায় ৭ লাখ মুসল্লি একসঙ্গে ঈদের নামাজ পড়তে পারবেন। ২০১৭ সালে গোর-ই শহীদ ময়দানে ঈদের প্রথম জামাতে প্রায় চার লাখ লোকের সমাগম হয়। কিশোরগঞ্জের শোলাকিয়ার ঈদগাহে একসঙ্গে নামাজ পড়তে পারেন দেড় লাখ থেকে দুই লাখ মুসল্লি। তবে এখন মাঠের বাইরে রাস্তাঘাটে, বাড়িঘরের উঠানেও জামাত হয়। তাতে তিন লাখ পর্যন্ত লোকসমাগম হয়। শোলাকিয়া ঈদগাহের আয়তন সাত একর। অন্যদিকে দিনাজপুর গোর-ই শহীদ বড় ময়দানের আয়তন সাড়ে ১৪ একর, প্রায় দ্বিগুণ। সে হিসাবে এটি অবশ্যই দেশের সবচেয়ে বড়ো ঈদগাহ। এ ঈদগাহের এক পাশে রয়েছে তেভাগা আন্দোলনের কৃষক নেতা হাজী মোহাম্মদ দানেশের সমাধিস্থল।

গুঠিয়া মসজিদ ঈদগাহ মাঠ, বরিশাল

২০০৬ সালে এশিয়ার অন্যতম বৃহত্তম জামে মসজিদ বাইতুল আমান বা গুঠিয়া মসজিদ প্রাঙ্গণে ঈদগাহের নির্মাণকাজ শুরু হয়। বরিশালের গুঠিয়া মসজিদ ঈদগাহ মাঠে একসঙ্গে প্রায় ২০ হাজার মানুষ ঈদের নামাজ পড়তে পারেন। বরিশাল শহর থেকে প্রায় ১১ কিলোমিটার দূরে উজিরপুর থানার গুটিয়া ইউনিয়নের চাংগুরিয়া গ্রামে এই ঈদগাহ অবস্থিত। ২০০৩ সালে ১৪ একর জমির ওপর প্রতিষ্ঠিত গুঠিয়া মসজিদের বিশাল একটি অংশে ওই ঈদগাহটি নির্মাণ করা হয়। মসজিদ কমপ্লেক্সের ভেতরে একটি বৃহৎ মসজিদ-মিনার, ২০ হাজার অধিক ধারণক্ষমতা সম্পন্ন ঈদগাহ ময়দান, এতিমখানা, একটি ডাকবাংলো, গাড়ি পার্কিং ব্যবস্থা, লেক-পুকুরসহ বিভিন্ন প্রজাতির ফুলের বাগান রয়েছে। কমপ্লেক্সের মূল প্রবেশপথের ডানে বড়ো পুকুর। পুকুরের পশ্চিম দিকে মসজিদ, একসঙ্গে প্রায় দেড় হাজার মুসল্লি নামাজ পড়তে পারে এখানে। মসজিদ লাগোয়া মিনারটির উচ্চতা ১৯৩ ফুট। ঈদগার প্রবেশপথের দুই ধারে দুটি ফোয়ারা আছে। প্রতিদিন হাজারো দর্শনার্থী গুঠিয়া মসজিদ দেখতে এবং নামাজ পড়তে যান। এখানে জমজম কূপের পানিসহ কাবা শরিফ, আরাফাত ময়দান, জাবালে নূর, জাবালে রহমত, নবীজির জন্মস্থান, মা হাওয়ার কবরস্থান, খলিফাদের স্থান, মসজিদে রহমতসহ বিখ্যাত মসজিদ এবং বিখ্যাত জায়গাসমূহের মাটি সংরক্ষণ করা আছে।

SHARE

Leave a Reply