Home ঈদ স্মৃতি ছোটো ও বড়ো বেলার ঈদ -জয়নুল আবেদীন আজাদ

ছোটো ও বড়ো বেলার ঈদ -জয়নুল আবেদীন আজাদ

ঘরে তো কেউ বন্দি থাকতে চায় না। ঘরের বাইরে পা ফেললেই আমরা পাই আঙিনা। আঙিনাকে বড়ো করে ভাবলে আমরা পাই প্রিয় পৃথিবী। এই পৃথিবীর কতো রূপ। সবুজ বনভূমি আছে, আছে মরুভূমি। আমাদের দেশে যেমন আছে বৃষ্টির শ্রাবণ, তেমনি শীতার্ত দেশগুলোতে আছে তুষার-বৃষ্টির কম্পন। কত বৈচিত্র্য আমাদের প্রিয় এই পৃথিবীতে। বৈচিত্র্যের মধ্যেও কিছু বিষয়ে ঐক্য লক্ষ করা যায়। সব দেশেই বিশেষ ঋতুতে বসন্ত আসে, ফুলও ফোটে। রঙে-রূপে-নামে পার্থক্য থাকলেও ফুল তো ফুলই। সুবাস তো সুবাসই। ফুলের সুবাসে আমরা মোহিত হই, আবার ক্ষুধায় চাই অন্ন। অন্নের কত রূপ। ভাত, রুটি, সবজি, স্যুপ, গোশত, ফল, আরো কত কিছু। মহান ¯্রষ্টা সৌন্দর্যের ক্ষুধা মিটাতে আমাদের সৌরভে সমৃদ্ধ পুষ্প দিয়েছেন, আবার পেটের ক্ষুধা মিটাতে দিয়েছেন ভিটামিন সমৃদ্ধ ফল ও ফসল। এমন উপহারের জন্য মহান ¯্রষ্টার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ না করলে মানুষ হিসেবে আমরা ছোটো হয়ে যাবো। তাই তো, আমাদের প্রাণবন্ত উচ্চারণ ‘আলহামদুলিল্লাহ’।

ফুল পেলাম, ফসল পেলাম, মন যে আরও কিছু চায়- ‘আনন্দ’ যার নাম। মহান ¯্রষ্টা সেই আয়োজনটাও করে রেখেছেন আমাদের জন্য। আমরা জানি আনন্দের সাথে জড়িয়ে থাকে কাজ, পরিশ্রম, সংযম এবং ত্যাগ। মহান ¯্রষ্টা ‘ঈদ-আনন্দে’ সেই বার্তাই দিয়েছেন আমাদের। একটু অনুসন্ধানী হয়ে ভাবলে আমরা রোজার ঈদে, কোরবানির ঈদে, আনন্দের সাথে পেয়ে যাবো অনেক মানবিক বার্তা।
আর একটি মজার বিষয় না বললেই নয়, সেটা হলো- ঈদ এমন একটা উৎসব, যাতে একই সাথে রয়েছে আনন্দ ও ইবাদাতের মহিমা। বিষয়টি আসলেই উপলব্ধি করার মতো। আনন্দ ও সওয়াব একই সাথে, ভাবা যায়!
জীবনের অনেকটা পথ পেরিয়ে এসেছি। শৈশব-কৈশোর, যৌবন শেষে এখন প্রবীণের চোখে জীবনকে দেখছি। এই দেখায় যেমন জ্ঞান-অভিজ্ঞান আছে, তেমনি আছে স্মৃতিময় অনেক সকাল-সন্ধ্যা। এই দেখায় আছে ঈদ-উৎসবও। আজকে শুধু রোজার ঈদের কথাই বলবো। রোজার ঈদতো একটাই, কিন্তু শৈশব-কৈশোরের ঈদ এবং এই প্রবীণ বয়সের ঈদ কি একরকম? জ্ঞান, উপলব্ধি, আশা-আকাক্সক্ষা এবং দায়িত্বের তারতম্যের কারণে ঈদের রঙে-রূপেও ঘটে গেছে কিছু পার্থক্য। শৈশবের ঈদে চাঁদ দেখার বিষয়টা আমাদের কাছে খুব গুরুত্বপূর্ণ ছিল। আকাশের নতুন চাঁদ আমাদের ঈদের বার্তা দিত। তাই সন্ধ্যায় সবার চোখ থাকতো পশ্চিম আকাশের দিকে। কেউ চলে যেত নদীর পাড়ে, কেউ খোলা মাঠে, কেউবা বাড়ির ছাদে। শাওয়ালের চিকন চাঁদটা দেখতে পেলে সে কী আনন্দ! একসাথে অনেকেই বলে উঠতাম ঈদ-মোবারক, ঈদ-মোবারক। তখনতো রেডিওর যুগ। কান পেতে আমরা রেডিওর ঈদ-ঘোষণা শুনতাম, ঈদ-জামাতের সময় জানতাম, আর মুগ্ধ হয়ে শুনতাম ঈদের গান। তবে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের গানটাই সবচেয়ে প্রিয় ছিল আমাদের কাছে।
ও মন রমজানের ঐ রোজার শেষে
এল খুশির ঈদ।
তুই আপনাকে আজ বিলিয়ে দে
শোন্ আস্মানী তাকিদ॥

এত বছর পরে এই প্রবীণ বয়সেও কাজী নজরুল ইসলামের ঈদের গানটাই আমাদের কাছে সবচেয়ে প্রিয় গান। এই গানটি বাজলেই মনে হয় ঈদ এসেছে। ঈদ-আনন্দের আর একটি বিষয় ছিল নতুন জামাকাপড়। তবে আমাদের শৈশবে আমরা অল্পেই তুষ্ট থাকতাম। একটা জামা পেলেই বেশ খুশি হতাম। এখানে অবশ্য একটা বিষয় ছিল- ঈদের আগে জামাটা যেন কেউ দেখে না ফেলে। দুষ্টু ছেলেরা জামা দেখার চেষ্টা চালিয়ে যেত। সবাই নতুন জামা লুকিয়ে রাখতো, যেন কেউ দেখে না ফেলে। তবে দেখার কাজে কেউ সফল হলে জামার বর্ণনা দিয়ে চিৎকার করে বলতো, তোমার জামা পুরনো হয়ে গেছে। বেচারার তখন সে কি কান্না। মা কত করে বোঝান, কেউ দেখলে জামা পুরনো হয় না, পরলে পুরনো হয়। কিন্তু যুক্তির কথা কে শোনে।
শৈশবে আতর মেখে নতুন জামা পরে ঈদের মাঠে নামাজ পড়তে যাওয়ার বিষয়টি আমাদের কাছে ছিল মহা আনন্দের। ইমাম সাহেব গম্ভীর কণ্ঠে আরবিতে খুতবা পড়তেন। কিছু না বুঝলেও মনোযোগ দিয়ে শুনতাম। বিশ্বাস করতাম অনেক ভালো কথা বলা হচ্ছে, না বুঝলেও সওয়াব তো পাবো। আর আল্লাহ তো সব দেখছেন। নামাজ ও খুতবা শেষে  চলতো কোলাকুলির পালা। কত যে কোলাকুলি, কত যে আনন্দ। কোলাকুলির আতিশয্যে অনেক সময় মাথার টুপি পড়ে যেত মাটিতে। তাতে কী, টুপি পরে আবার কোলাকুলি। এরপর বাড়ি বাড়ি ঘুরে ঈদের দাওয়াত খাওয়া। ঈদের দিনে সবাই কেমন উদার। সবার মুখে হাসি, কণ্ঠে আমন্ত্রণ। কবি কাজী নজরুল কী সুন্দর করে বিষয়টা লিখে গেছেন-
আজ ভুলে গিয়ে দোস্ত-দুশমন
হাত মিলাও হাতে,
তোর প্রেম দিয়ে কর বিশ্ব নিখিল
ইসলামে মুরীদ।

ঈদ তো মানুষে-মানুষে ভালোবাসার শিক্ষা দেয়, আনন্দকে ভাগ করে নেওয়ার দীক্ষা দেয়। শৈশবে তত্ত্বকথা আমরা তেমন বুঝতাম না, তবে ঈদের পরিবেশ আমাদের অনেক কিছু শিখিয়েছে। ধনী-গরিব সবাইকে আপন করে নিতে হয়, মনোমালিন্য ভুলে যেতে হয়, আত্মীয়-স্বজন ও পাড়া-প্রতিবেশীদের খোঁজ নিতে হয়, অভাবীর অভাব দূর করতে হয়, দান-সাদকা করতে হয়, মিলে-মিশে থাকতে হয়, ¯্রষ্টার আদেশ মানতে হয়- ঈদের পরিবেশ থেকে এই বিষয়গুলো আমরা জানতে পেরেছি শৈশবেই। পরিবেশ যে কত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, একটি উদাহরণ থেকে তা স্পষ্টভাবে উপলব্ধি করা যাবে। রোজার কারণেই তো ঈদ। এই তত্ত্বকথাতো ছোট্ট শিশুর বোঝার কথা নয়। কিন্তু সে দেখছে, রমজান মাসটি আসার পর বাসার সবকিছু কেমন অন্যরকম হয়ে গেল। সারাদিন কেউ কিছু খাচ্ছে না, আবার যখন খাওয়ার কথা নয়, সেই শেষরাতে টুংটাং আওয়াজ তুলে সবাই খাচ্ছে। সবাই কথা বলছে ফিসফিস করে, যেন ছোটোরা উঠে না যায়। অন্য সময়ের চাইতে এ মাসে সবাই কুরআন বেশি পড়ছে, তারাবি পড়ছে, ইবাদাত বেশি করছে। কিন্তু কেন? অবাক চোখে শিশুরা দেখছে আর ভাবছে। ভাবতে গিয়ে তারা বুঝলো, বড়োদের এই বিষয়গুলো থেকে তাদের দূরে রাখা হচ্ছে। মনে প্রশ্ন জাগলো, তাহলে আমরা কি ওদের আপন নই? এমন দুঃখবোধ থেকে শিশুমনে দেখা দিলো ক্ষোভ। বললো, আমিও রোজা রাখবো, শেষরাতে ডেকে দিও। ইতোমধ্যে ওরা জেনে গেছে, রোজা রাখতে হলে শেষরাতে উঠে  সাহরি খেতে হবে। মা কত করে বোঝান, শিশুদের জন্য রোজা নয়, বড়ো হয়ে রেখো। শিশুর জবাব, আমি বড়ো হয়ে গেছি।  কান্নাকাটির তোড়ে মা কৌশল অবলম্বন করেন। বলেন, তোমরা রোজা রাখতে পারো, তবে সেটা হবে ‘কলসি রোজা’। ছোট্ট শিশু সাহরিতে আর কতটা খেতে পারে? সকাল দশটা বাজতেই শিশুর ঠোঁট শুকিয়ে গেল। তৃষ্ণা পেলেও শিশু কিছু মুখে নেবে না, সে যে রোজা রেখেছে। মা তখন বললেন, শিশুদের রোজা হলো ‘কলসি রোজা’। ক্ষুধা পেলে, তৃষ্ণা পেলে রোজাটা মুখ থেকে মুঠোতে পুরে কলসিতে রাখতে হবে, খেয়েদেয়ে আবার কলসি থেকে রোজাটা মুখে পুরে নিতে হবে। আমরা জানি যে, শিশুর ওপর রোজা ফরজ নয়, রোজার তাৎপর্যও তার বোঝার কথা নয়। তবুও শিশু রোজা রাখতে চায়। এটা  পরিবেশের  প্রভাব। মন থেকে রোজাকে সে গ্রহণ করে ফেলেছে। তাই কলসি রোজা রাখতে পেরেও সে খুশি। কোনো কোনো পরিবারে শিশুদের রোজা রাখার এই যে চিত্র, তা আমাদের কী বার্তা দেয়? বার্তাটি হলো, শিশুদের সঠিকভাবে গড়তে হলে ওদের জন্য সঠিক পরিবেশ আমাদের নিশ্চিত করতে হবে। এ কাজটি বড়োদের, অভিভাবকদের।
শিশুদের রোজা ও ঈদের একটি চিত্র আমরা পেলাম। আমরা যারা প্রবীণ, তাদের রোজা এবং ঈদের চিত্রটা কেমন? প্রবীণদের অনেকে ছোটোবেলা থেকেই রোজা থাকতে অভ্যস্ত। ধর্মীয় কর্তব্য হিসেবে তারা রোজা পালন করে থাকেন। আবার প্রবীণদের অনেকে পবিত্র কুরআনের মর্মবাণীর আলোকে রোজাকে পালন করতে চান। রাসূল সা. এবং সাহাবিদের আচরণের আলোকে রোজার শিক্ষাকে সমাজে ছড়িয়ে দিতে চান। তারা উপলব্ধি করেছেন, ‘তাকওয়া’ তথা জীবনের সব কাজে ¯্রষ্টার কাছে জবাবদিহিতার চেতনাই রোজার আসল লক্ষ্য। ফলে তাদের ঈদ উদযাপনেও লক্ষ করা যায় তাকওয়ার চেতনা। ভোগের চাইতে ত্যাগের চেতনাই তাদের মধ্যে প্রবল। সংযম, ধৈর্য, ক্ষমা ও কোমলতা তাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। তারাও ভালো থাকতে চান, তবে আখেরাতের বিনিময়ে নয়। সুখ তাদেরও প্রিয় বিষয়, তবে অন্যকে কষ্ট দিয়ে নয়। প্রবীণদের এমন ভাবনাকে আমি সম্মান করি। ফলে এখন ঈদে আমার নতুন পোশাক না হলেও চলে। ভালো খাবারগুলো অন্যকে খাওয়াতে পারলে বেশি ভালো লাগে। তবে এখনও ঈদে শিশুদের নতুন পোশাক দিতে আনন্দ পাই। ওদের বায়না মিটাতে ধৈর্যের পরীক্ষা দিতে চাই। ঈদে এবং ঈদের পরেও সমাজের সব মানুষকে নিয়ে ভালো থাকতে চাই। এমনটি হলেই খুঁজে পাবো ঈদের প্রকৃত আনন্দ।

SHARE

Leave a Reply