Home তোমাদের গল্প তিনু, বনফুল ও মেঘপরী -রফিকুল নাজিম

তিনু, বনফুল ও মেঘপরী -রফিকুল নাজিম

গ্রামের নাম মনতলা। গ্রামের উত্তর দিকে আছে খোলা ফসলের মাঠ। চলতি বছরের খরায় মনতলার মাঠঘাট চৌচির হয়ে গেছে। ফসলগুলো রোদে পুড়ে ধূসর হয়ে গেছে। গ্রামের ঘরে ঘরে এখন খাবারের জন্য হাহাকার। কোনো বাড়ির পাশ দিয়ে গেলে ক্ষুধার্ত শিশুর কান্না শোনা যায়। অথচ একসময় মনতলা গ্রামের মাঝখান দিয়ে নদী বয়ে গিয়েছিল। নদীর দু’পাশে ছিল সবুজ ফসলের মাঠ। নতুন ধান ঘরে তুলে তখন পাড়ায় পাড়ায় উৎসব হতো। গেরস্থ বাড়ির উঠানে বসতো গল্পের আসর। অগ্রহায়ণ মাসে গ্রামে গ্রামে বসতো গাজী কালুর পালা। পিঠাপুলির নিমন্ত্রণে আসতো নাইওর। তখন গোলা ভরা ধান ছিল। নদীনালা ও পুকুর ভরা ছিল রূপালি মাছ। এসব এখন তোমাদের কাছে রূপকথার কেচ্ছার মতোই আশ্চর্যজনক মনে হবে!

মনতলার লোভী মানুষ তিলে তিলে সেই নদীকে খুন করলো। নদী তার স্রোত হারিয়ে মুমূর্ষু নালার রূপ নিয়ে বেঁচে আছে। নদীর সাথে সাথে লোভী মানুষেরা বড়ো বড়ো গাছপালা কেটে ফেললো। ভরা বাদলেও মনতলায় বৃষ্টি হয় না। পানির অভাবে খড়খড়ে হয়ে গেল ফসলি জমিন। গ্রামে সবুজের কোনো ছোঁয়া নেই। চারিদিকে কেবলই ধূসর এক ছবি।

তিনুদের বাড়িতে দু’দিন ধরে চুলায় আগুন জ্বলে না। ঘরে চাল নেই। তিনুর বাবার শত আকুতি শুনেও রহিম মহাজনের মন গলেনি। এক সের চালও সে কর্জ দিতে রাজি হয়নি। তিনুর ক্ষুধা পেয়েছে। দশ বছর বয়সী তিনু তার মায়ের আঁচল ধরে ঘুরঘুর করছে। খাবারের জন্য। তিনুর মা হঠাৎ বিরক্ত হয়ে তার গালে কষে থাপ্পড় মারে। তিনু কাঁদতে কাঁদতে বাড়ি থেকে বের হয়ে মরা নদীর দিকে যায়। একে তো তার পেটে দানবীয় ক্ষুধা, অন্যদিকে সে মায়ের হাতের থাপ্পড়…। সবকিছু মিলিয়ে তিনুর মনটা ভীষণ খারাপ।

তিনুর পাশে মিটমিট করে হাসছিল নাম না জানা বনফুল। যেমন তার রূপ-লাবণ্য, তেমনি তার মোহনীয় ঘ্রাণ। ফুলটার চারপাশে প্রজাপতি উড়ছে। এসব দেখে তিনুর কান্না থামলেও মনটা তার ভীষণ খারাপ। তিনুর দিকে ঝুঁকে ফুলটা চুপিচুপি জিজ্ঞেস করলো- ‘বন্ধু, তোমার মন খারাপ কেন? কী হয়েছে তোমার?’ তিনু ফুলকে কথা বলতে দেখে অবাক হয়ে যায়। আচানক ব্যাপার! ফুলও যে কথা বলতে পারে- এমনটা তিনুর জানা ছিল না। তিনু ফুলের কাছে সব খুলে বলে। তিনুর ক্ষুধার কথা শুনে ফুলের ভীষণ কষ্ট হয়। ফুল তিনুকে বললো, ‘বন্ধু, আমার এক বন্ধু আছে। সে আকাশের অনেক উঁচুতে থাকে। সেখানে গিয়ে তুমি যা চাইবে, তাই সে এনে দিতে পারবে। তার নাম মেঘপরী।’ ফুলের কাছে মেঘপরী সম্পর্কে শুনে তিনুর আর তর সইছে না। মেঘপরীকে কাছ থেকে দেখার জন্য ব্যাকুল হয়ে আছে সে। তিনুর অবস্থা দেখে ফুল ‘মেঘপরী’ ‘মেঘপরী’ নাম ধরে ডাকলো। হঠাৎ উত্তরের হাওয়ায় চেপে সোঁ সোঁ শব্দে একখণ্ড মেঘ এসে দাঁড়ায় ফুলের সামনে।

– বন্ধু ফুল, কী মনে করে আমাকে ডেকেছো?
– মেঘপরী, এই যে আমার সাথে যাকে দেখছো- সে আমার নতুন বন্ধু- তিনু। তার কাছে তোমার গল্প করছিলাম। তিনু তোমাকে দেখতে চাইলো। তাই তোমাকে ডেকেছি।
– তাই! বন্ধুরা, আমার সাথে মেঘের রাজ্যে চলো।
ফুল ও তিনুকে পিঠে করে মেঘপরী বাতাসে ভাসতে ভাসতে চলে গেল দক্ষিণ দিকে। মেঘেদের রাজ্য ও রাজপ্রাসাদ দেখে তিনু থ বনে গেল। এত্তো বড়ো রাজপ্রাসাদ! উজির নাজির সব আছে এখানে। থরে থরে সাজানো আছে ফুলের বাগান। এখানে সেখানে সাজিয়ে রাখা আছে অনেক রকমের খাবার ও ফলমূল। মেঘপরী তিনুকে তার ইচ্ছেমত সবকিছু খেতে বললো। কিছু খাবার খাওয়ার পর হঠাৎ তার মনে পড়ে গেল মা বাবার কথা। খাবারের জন্য ধুঁকতে থাকা মনতলা গ্রামের কথা। মেঘপরী ও ফুল তিনুর মন খারাপ দেখে চিন্তিত হয়ে গেল এবং জিজ্ঞেস করলো, ‘বন্ধু তিনু, হঠাৎ তুমি চুপসে গেলে কেন?’ তিনু মেঘপরীকে সবকিছু বলে। তার মা বাবার কথা, খটখটে মনতলা গ্রামের কথা, ধূসর মাঠের কথা। মেঘপরী খুব চিন্তায় পড়ে গেল। তিনুর জন্য কিছু একটা করতেই হবে। কিন্তু মেঘের রাজ্য থেকে কোনো খাবার রাজ্যের বাইরে নিয়ে যাওয়া নিষেধ। এসব শুনে তিনু বুদ্ধি করে বললো, ‘বন্ধু মেঘপরী, তুমি যদি কিছু মেঘ এনে জড়ো করতে। বৃষ্টি হলেই মাঠ ঘাট আবার জলে ভিজতো। সবুজ ফসল ফলতো মাঠে ঘাটে।’ মেঘপরী মনোযোগ দিয়ে কথাগুলো শুনলো। কিন্তু মেঘ নিরুপায়। যেখানে গাছপালা নেই সেখানে মেঘেরা উড়ে বেড়ায় না। একসাথে জড়ো হয় না। তাই আগে গ্রামের মানুষকে বেশি করে গাছপালা রোপণ করতে বলো। তবেই মনতলা গ্রামে নিয়মিত বৃষ্টি হবে। নদী-নালায় নতুন পানি আসবে। তিনুর আকুতি মিনতি শুনে মেঘপরীর মায়া হয়। তাই সে মেঘরাজ্যের নিয়ম ভেঙে উত্তর দিক থেকে কিছু মেঘকে টেনে এনে জড়ো করলো। মেঘপরী তিনু ও ফুলকে মনতলায় পৌঁছে দিলো। তিনুকে গ্রামে ঢুকতে দেখেই গ্রামবাসী তাকে ঘিরে ধরলো। কোথায় সে চলে গিয়েছিল? সবার মুখে মুখে একই প্রশ্ন। তিনু সবকিছু বললো। বৃক্ষরোপণের গুরুত্বের কথা সবার কাছে বললো। তিনু দেখে মনতলার আকাশে মেঘেরা লুকোচুরি খেলছে। ঝুম বৃষ্টির অপেক্ষায় সবাই আকাশের দিকে তাকিয়ে আছে।

SHARE

Leave a Reply