Home স্বাস্থ্য কথা শিশু-কিশোরদের খাবারে অরুচি ও করণীয় -ডা. এহসানুল কবীর

শিশু-কিশোরদের খাবারে অরুচি ও করণীয় -ডা. এহসানুল কবীর

প্রায় প্রত্যেক অভিভাবকের এই একই অভিযোগ থাকে যে, আমার সন্তানটি ঠিকমতো খাওয়া-দাওয়া করছে না। কিশোর বয়সে তো এগুলো আরো মারাত্মক আকার ধারণ করে খাবারে অরুচির ব্যাপারে। বাজারের চটকদার ভিন্ন স্বাদের, ভিন্ন পদের খাবারের ভিড়ে ঘরে তৈরি খাবারে দিন দিন আগ্রহ হারিয়ে ফেলছে সব শিশু-কিশোররা। এটা শুধু বাংলাদেশের সমস্যাই নয়, সারা বিশ্বব্যাপী একই সমস্যা দৃশ্যমান হচ্ছে। তাহলে করণীয় কী? আর কীভাবে এদেরকে খাবারের রুচিতে ফিরিয়ে আনা যায়, সেটা নিয়েই আজকের লেখা।

ক) খাবারে অরুচির কারণ কী?
১. একই খাবার বারবার খাওয়ানো।
২. খাবার নিয়ে জোরাজুরি করা।
৩. পেটভরা অবস্থায় খাওয়ানোর চেষ্টা।
৪. শারীরিক অসুস্থতা থাকা অর্থাৎ যে কোনো ইনফেকশন বা বদহজম থাকা।

খ) বাইরের খাবারের প্রতি বাচ্চাদের এতো আকর্ষণ কেন?
১. ঘুরতে যাওয়ার একটা চান্স নেওয়া।
২. স্বাভাবিকভাবে বাইরের খাবারগুলো হয় মুখরোচক, চটকদার ও কালারফুল যাতে বাচ্চারা সহজেই আকৃষ্ট হয়।
৩. বিভিন্ন ডিজাইনের খাবার প্রস্তুত করা হয়। এতে বাচ্চাদের আকর্ষণ বৃদ্ধি পায়।

গ) বাইরের খাবার খেলে কী কী সমস্যা হতে পারে?
১. স্থূলতা : এটা এখনকার সময়ে সবচেয়ে বড়ো একটা সমস্যা। ইউরোপে ২০৩০ সালের মধ্যে এটা ঠেকানোর প্ল্যান করছে তারা।
২. অল্প বয়সেই শিশুদের টাইপ-২ ডায়াবেটিস মেলাইটাস, ক্যান্সার ইত্যাদির ঝুঁকি বেড়ে যেতে পারে।
৩. ডায়রিয়া, বদহজম, বমি, পেটে ব্যথা, কৃমি, গ্যাস্ট্রিক, অ্যাসিডিটি ইত্যাদি হবার সম্ভাবনা রয়েছে।
৪. এছাড়া জন্ডিস, রক্তস্বল্পতা ইত্যাদি হবার সম্ভাবনাও রয়েছে।

ঘ) অভিভাবকগণ সাধারণত কী ভুল কাজটা করে থাকেন?
১. খাবার খাওয়ানো নিয়ে অযথা দুশ্চিন্তা করেন।
২. অন্য বাচ্চাদের সাথে তুলনা করেন।
৩. খাবার সম্বন্ধে অজ্ঞতা থাকে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই। অর্থাৎ সুষম খাবার বা ব্যালান্স ডায়েট না দেওয়া।
৪. একই খাবার বারবার খাওয়ানো।
৫. বাইরের খাবারের প্রতি আকৃষ্ট করা।
৬. দামি খাবার খাওয়ানোর প্রচেষ্টা। মাছ, মাংস, ডিম, দুধ, আঙ্গুর কমলা ইত্যাদি দামি খাবার খাওয়ানোর কোশেশ করেন। অথচ কম দামি খাবার ও দেশীয় মৌসুমি ফলেও যথেষ্ট পুষ্টি ও শক্তি রয়েছে।
৭. কিছু কুসংস্কার : মাছ খেলে কৃমি রোগ হবে, মাংস খেলে কিডনি নষ্ট হবে, অমুক খাবার খাওয়া যাবে না, অমুক খাবার নিষিদ্ধ, নির্দিষ্ট একটা সময়ে নির্দিষ্ট কিছু খাবারে ক্ষতিকর প্রভাব রয়েছে ইত্যাদি ভুল ধারণা আছে কারো কারো।
৮. কোনো খাবারে এলার্জি হচ্ছে কি না তা ঠিকমত বুঝতে না পারা।
৯. জোর জবরদস্তি করে খাওয়ানোর প্রচেষ্টা।
১০. পর্যাপ্ত পানি বা পানীয় পান না করানো। শুধু ভাতের ওপর জোর না দিয়ে দুধ, ডাল, স্যুপ, গ্লুকোজ, ফলের রস ইত্যাদি অল্টারনেটিভ করে পান করানো উচিত।
১১. খাওয়ানোর সময় টিভি, স্মার্ট ফোন ইত্যাদি চালিয়ে খাওয়ানো। অর্থাৎ শিশুর খেলা হলো ফোনে, আর মায়ের খেলা হলো শিশুকে খাওয়ানো।
১২. শিশুটি কী খাচ্ছে বা কেন খাচ্ছে বুঝতে না পারা। খাবারে মজাটাও অনুধাবন করতে পারছে না। শুধুই গিলছে মাত্র।
১৩. বাচ্চাকে নিজ হাতে না খাওয়ানোর অভ্যাস তৈরি করা।
১৪. মায়ের আত্মতুষ্টি না হওয়া : মা এত কষ্ট করে খাবার তৈরি করছেন, বাচ্চারা সবটুকু খাচ্ছে না, নষ্ট হচ্ছে। মেজাজটা খারাপ হচ্ছে। ফলে করা হচ্ছে বকাঝকা, মারধর।
১৫. বাবা-মা শিশুকে পর্যাপ্ত সময় না দেওয়া। এক্ষেত্রে অনেক বাবাই মনে করেন বাচ্চাদের খাওয়ানোর ব্যাপারটা শুধুমাত্র যেন মায়েদের কাজ। এটা ভুল ধারণা।

ঙ) তাহলে এর প্রতিকার কী?
১. ঘরের খাবারের প্রতি আগ্রহ বাড়ানো।
২. পরিবারের সবাই একসাথে, একই জায়গায় বসে খাওয়ার অভ্যাস তৈরি করা।
৩. খাবারের স্বাদে, রেসিপিতে বৈচিত্র্য আনতে হবে।
৪. মিষ্টিজাতীয় খাবার নিয়ন্ত্রণ করা।
৫. মাঝে মাঝে তিতা খাবার দেবার চেষ্টা চালানো উচিত।
৬. টকজাতীয় খাবারটাও তাই। তবে এটা নয় মাস বয়সের আগে নয়। আর ছয় মাস বয়স থেকে হালকা লবণ মিশ্রিত খাবার দেওয়া যেতে পারে।
৭. নিয়মিত মৌসুমি ফল খাওয়ার প্রতি আগ্রহ সৃষ্টি করা।
৮. সুষম খাবারের বিকল্প নেই। তাই সবরকমের খাবার খাওয়ানো উচিত।
৯. শিশুকে নিজ হাতে খাবার খাওয়ার অভ্যাস তৈরি করা যাতে সে স্বাবলম্বী হয়ে উঠতে পারে। তবে এই অভ্যাস একদিনে তৈরি হবে না। দীর্ঘদিন ধরে প্র্যাক্টিস করাতে হবে।
১০. শিশু খেতে না চাইলে অযথা জোরাজুরি না করাই ভালো। পরে ক্ষুধা লাগলে ঠিকই খাবে।
১১. নির্দিষ্ট সময় অন্তর খাওয়ানোর অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। তাতে হজমশক্তি বৃদ্ধি পাবে, বদহজম হবে না।
১২. নিয়মিত খেলাধুলা বা ব্যায়াম করার অভ্যেস গড়ে তোলা উচিত।
১৩. তাদের পর্যাপ্ত ঘুমের ব্যবস্থা করা।
১৪. শিশুদেরকে মানসিক চাপে না রাখা। তাতে খাবারের প্রতি ভীতি তৈরি হতে পারে।
১৫. খাবার সময় টিভি মোবাইল ফোন না চালালেই ভালো।
১৭. স্কুলের টিফিনে মিষ্টিজাতীয় খাবার না দেওয়াই ভালো।
১৮. শিশুদের খাবার খাওয়ানোর পাশাপাশি ওই সময়ে তাদের সাথে কথা বলা, গল্প করা, মজা করা উচিত।
১৯. দুই বছরের নিচের শিশুদের খাবারটা নরম থকথকে হওয়া উচিত। যেন খাবারটা না গড়িয়ে পড়ে বা চিবুক বেয়ে না নামে।
২০. এক খাবার বারবার না দিয়ে ভিন্ন ভিন্ন খাবার দেওয়া। তবে একই খাবার আটবার পর্যন্ত দিয়ে দেখা যেতে পারে। এরপর না খেলে অন্য খাবার ট্রাই করতে হবে।
২১. খাবারটা বেশি মসলাযুক্ত ও অতিরিক্ত পরিমাণে যেন না হয় সেদিকেও খেয়াল রাখা উচিত।
২২. শিশুকে খাবারের গুণগত মান ও প্রয়োজনীয়তা সম্বন্ধে সম্যক ধারণা দেওয়া উচিত।
২৩. তাদেরকে তিন-চার মাস অন্তর কৃমির ওষুধ খাওয়ানো উচিত।
২৪. তাদেরকে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন পরিবেশে খাওয়ানো উচিত।
২৫. প্রতি তিন-চার মাস অন্তর শিশুর ওজন ও উচ্চতা মেপে দেখা উচিত।
২৬. এক্ষেত্রে প্রয়োজনে শিশুরোগ বিশেষজ্ঞের মাধ্যমেও প্রয়োজনীয় পরামর্শ নেওয়া যেতে পারে।

SHARE

Leave a Reply