Home স্বপ্নমুখর জীবন মানুষ তার স্বপ্নের চেয়েও বড়ো -আমিনুল ইসলাম ফারুক

মানুষ তার স্বপ্নের চেয়েও বড়ো -আমিনুল ইসলাম ফারুক

[তৃতীয় পর্ব]

বাইবেলে এই কথাটা খুব সুন্দর করে লেখা আছে, টপ অব দ্য হিলে যেতে হয় একা। সেখানে পৌঁছতে কেউ কাউকে সহযোগিতা করে না। আসলেই তাই। যে মানুষ প্রতিকূলতা এড়িয়ে একাকী চলতে শুরু করে সে-ই পথ পেয়ে যায়, সে-ই এগিয়ে যায়। তার কথাই ইতিহাসে লেখা থাকে স্বর্ণাক্ষরে। মানুষের জীবন একটা বিশাল ব্যাপার। কোনো রকম যোগ্যতা ছাড়া, কষ্ট, পরীক্ষা ছাড়াই একটা আনন্দে ভরা, সৌন্দর্যে ভরা আলোয় ভরা জীবন পেয়ে গেলাম আমরা। আমরা মনে করি চাওয়া মানেই স্থূল, ভোগী হিসেবে নিজেকে মনে করি অথচ এটা ভাবি না যে, না পেলে আমি দেবো কী করে, পৃথিবীকে দেবো কী করে, সবকিছুকে সমৃদ্ধ করে তুলব কী করে।

একজন ভিক্ষুক কি আরেকজন ভিক্ষুককে কিছু দিতে পারে? দিতে পারে না বরং যার আছে সে-ই দিতে পারে। সুতরাং থাকার সাধনাই মানুষের সাধনা হওয়া উচিত। দেওয়ার মধ্য দিয়ে পেতে হবে, পাওয়ার মধ্য দিয়ে দিতে হবে। এ দুটোই যদি না থাকে তাহলে জীবন পরিপূর্ণ হয় না।

বাইবেলে এটাও আছে যে, He who liveth, he who beliveth, shall never die. যে বিশ্বাস করে সে-ই বেঁচে থাকে। এই বিশ্বাস এবং কাজের মধ্যে যে ডুবে যেতে পেরেছে তাকে কোনো দুঃখ, মালিন্য স্পর্শ করতে পারে না। কাজের নিজস্ব আনন্দ রয়েছে। কাজের মধ্যে ডুবে যেতে হলে স্বপ্নের প্রয়োজন।
আমরা অনেকেই মনে করি স্বপ্ন মানেই একটি নিছক কল্পনামাত্র। তা নয়, স্বপ্ন মানেই বাস্তব, স্বপ্ন মানেই গন্তব্য। আমি কোথায় যেতে চাই তার নাম স্বপ্ন। মানুষ তার স্বপ্নের চেয়েও বড়ো হতে পারে যদি সে তার ইচ্ছে ও পরিশ্রমকে এই পথে নিবেদিত করে।

যান্ত্রিক জীবন মানুষকে এতটাই ব্যস্ত করে তুলেছে যে, আমাদের কাছে স্বপ্ন দেখার মতোও সময় নেই। রাত দিন কীভাবে কেটে যায়, এক মাসের পর আরেক মাস চলে আসে, কেউই কিছুই জানতেই পারে না। স্বপ্নই মানুষকে জীবনযুদ্ধে লড়াই করার ক্ষমতা প্রদান করে। স্বপ্ন না থাকলে আজ পৃথিবীতে কোন আবিষ্কার হতো না। ঘুমের মধ্যে সবাই স্বপ্ন দেখে কিন্তু আমি খালি চোখে স্বপ্ন দেখার কথা বলছি, এ স্বপ্ন ঘুমের স্বপ্ন নয়-তা হলো আপনি কী পেতে চান, কোথায় যেতে চান, প্রত্যাশা এবং প্রাপ্তির স্বপ্ন।

যে স্বপ্নের জন্য আপনি মরতেও রাজি এমন স্বপ্ন। যদি স্বপ্ন থাকে তবে আপনি তা নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা করবেন, নাকি তা কখনো পূরণ হবে না ভেবে নিয়েছেন? নিজের স্বপ্নকে কখনও আড়াল করবেন না, দৃশ্যপটে ভাসিয়ে রাখবেন। স্বপ্ন না থাকলে আপনি কখনও উন্নতি করতে পারবেন না, নিজের কাজে ফোকাস করতে পারবেন না কারণ স্বপ্নই জীবনের জ্বালানি। তাই নিজের চোখ বন্ধ করে একটি সুন্দর স্বপ্ন দেখে নিন। তারপর তা পূরণের প্রতিজ্ঞা করুন এবং কাজে লেগে পড়–ন। এই স্বপ্ন পূরণের জন্য দৃষ্টিপাত করুন, সমস্ত ঝুঁকি গ্রহণ করুন সাহসের সাথে। এই স্বপ্নটাকে লিখে ফেলুন এবং সেটাকে লাগিয়ে দিন বাসায় যেখানে আপনি বেশি সময় অতিবাহিত করেন, সেখানে যাতে যতক্ষণ না আপনি তা পূরণ করতে পারছেন ততক্ষণ যেনও তা আপনাকে ধরে নাড়াতে পারে।

আপনি কোথায় আছেন সেটা গুরুত্বপূর্ণ নয়, আসলে আপনি কোথায় যেতে চান সেটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
মানুষের প্রতিটি অগ্রগতি বাস্তব হওয়ার পূর্বে তা কল্পনায় গড়ে উঠেছিল। ছোটো-বড়ো আবিষ্কার, চিকিৎসার নতুন খোঁজ, ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে বিজয়, ব্যবসায় সফলতা সবই সত্যি হয়ে উঠার পূর্বে তা ছিল স্বপ্ন মাত্র। মানুষ স্বপ্ন দেখতে না পারলে কিছু তৈরি করতে পারত না।

তাই বিজ্ঞানী আইনস্টাইন বলেছেন, “Imagination is more important than knowledge” অর্থাৎ “জ্ঞানের চেয়েও কল্পনা (স্বপ্ন) অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ।”
লক্ষ্য অর্থাৎ (স্বপ্ন) অভীষ্ট উদ্দেশ্য। লক্ষ্য শুধুই অলীক স্বপ্ন নয়-এটা তেমন স্বপ্ন যা বাস্তবায়িত করা হয়। লক্ষ্য “যদি আমি পারতাম” এর আবছা অস্পষ্ট ধারণার চেয়ে অনেক বড়ো। লক্ষ্য অর্থাৎ “যার জন্য আমি তৎপর হয়ে কাজ করি।” লক্ষ্য স্থির না হওয়া পর্যন্ত কিছুই করা সম্ভব নয়, প্রথম পদক্ষেপটি পর্যন্ত নেওয়া অসম্ভব।
লক্ষ্যহীন মানুষ বিভ্রান্ত, জীবন নদীতে সে হয় মাঝিহীন নৌকার মতো, নদীতে নৌকা যেমন এদিক সেদিক ঘুরাঘুরি করে কিন্তু তীরে ভিড়তে পারে না তেমনি মানুষও হোঁচট খেতে খেতে এগোয় বটে তবে যেহেতু তার কোনো গন্তব্য জানা নেই তাই কোথাও পৌঁছাতে পারে না।

জীবনের জন্য যেমন বায়ুর প্রয়োজন, তেমনি জীবনে বড়ো হওয়ার জন্য প্রয়োজন স্বপ্নের। স্বপ্ন ছাড়া কেউই হঠাৎ সফল হয় না। হাওয়া যেমন বেঁচে থাকার জন্য প্রয়োজন তেমনি আপনি বা আমি কোথায় পৌঁছতে চাই সে সম্বন্ধে সুস্পষ্ট ধারণা থাকা চাই। শুরু করার আগে কোথায় যাব তা স্থির করা দরকার।
মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানির মতো আগে থেকে পরিকল্পনা তৈরি করুন। আমি, আপনি, আমরা নিজেরাও তো বটে একটি ব্যবসায় প্রতিষ্ঠান। আপনার, আমার দক্ষতা, প্রতিভা ও ক্ষমতা আপনার, আমার “পণ্য”। আপনি নিজের পণ্য বিকশিত করতে চান, কারণ আপনি চান তার প্রাপ্য সর্বাধিক মূল্য।
ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা করতে আপনাকে এই ধারণাটি সহায়তা দিতে পারে। তা হলো- নিজের ভবিষ্যৎকে তিনটি ভাগে ভাগ করা। ১. কর্মক্ষেত্র ; ২. পারিবারিক; ৩. সামাজিক।

এভাবে জীবনটাকে ভাগ করতে পারেন। আবার ইচ্ছে করলে আরো বেশি ভাগে ভাগ করতে পারেন। জীবনের সম্পূর্ণ চিত্রটা দেখতে পারবেন। জীবনের কাছ থেকে কী পেতে চান? কীভাবে নিজেকে সন্তুষ্ট করা যায় তা জানতে পারবেন এবং আপনার স্বপ্নের প্রতি বিশ্বাস দৃঢ় হবে। জীবনের তিনটি বিভাগই একে অপরের সাথে যুক্ত। প্রত্যেকটি বিভাগকে যে বিভাগটি সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত করে তা হলো আপনার কাজ।

আদিম যুগে মানুষ যখন গুহায় বসবাস করত তখন তাদের মধ্যে যে সবচেয়ে সুদক্ষ শিকারি হতো তাকে সবাই শ্রদ্ধা করত, তার পারিবারিক জীবন ছিল সবচেয়ে সুখময়। সাধারণভাবে আজও সেই নিয়মগুলো কিন্তু সমানভাবে প্রযোজ্য। কর্মক্ষেত্রে আমাদের সাফল্যের ওপর পারিবারিক জীবনের গুণমান ও সামাজিক জীবনের সম্মান নির্ভরশীল।
আমাদের সকলের আশা থাকে যে আমরা সবাই সফল হবো, মনের মতো কাজ করার স্বপ্ন থাকে। তবে মাত্র কয়েকজন সেই স্বপ্নের অনুগামী হই। আমরা আমাদের স্বপ্নকে সফল করার বদলে তা প্রাণে মেরে ফেলি।

স্বপ্ন হত্যা করার এই অস্ত্রগুলো ছুড়ে ফেলে দিন। লক্ষ্য করলে দেখতে পাবেন যারা সফল ব্যক্তি হিসেবে পরিচিত হয়েছেন। তাদের জীবনধারার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে একটি স্বপ্ন। স্বপ্নের কাছে আত্মসমর্পণ করুন। সত্যিকার শর্তহীন সমর্পণ। সেই স্বপ্নই যেন আপনার জীবনের ধ্যান, জ্ঞান, ব্রত হয়ে ওঠে, স্বপ্নের বাস্তবায়ন সময়ের ব্যাপার মাত্র। কখনও কখনও মনে হতে পারে যে, কেউ কেউ বুঝি একেবারেই রাতারাতিই সফল হয়ে যায় কিন্তু আপাতদৃষ্টিতে “হঠাৎ-সফল” মানুষের জীবনের ইতিহাস পর্যবেক্ষণ করলে দেখতে পাবেন, স্বপ্নের জন্য তাদের প্রচুর পরিশ্রমের বুনিয়াদ।

সুন্দর বাড়ি তুলতে যেমন পাথরের টুকরোগুলোর প্রয়োজন। সেগুলোর আলাদা হয়ত তেমন মূল্য নেই, সেই রকমভাবে টুকরো টুকরো করে সফল জীবন গড়ে তুলতে হয়।
সৃষ্টিকর্তার কাছে সব মানুষ সমান। তাই তিনি সবাইকে বড়ো হওয়ার জন্য, জীবনে বড়ো কিছু অর্জন করার জন্য স্বপ্ন দেন। যারা তাঁর স্বপ্নটা দেখা মাত্র চিনতে পারেন এবং স্বপ্ন পূরণের জন্য যা কিছু করা প্রয়োজন তা করেন, তাদের জীবনেই স্বপ্ন পূরণ হয়।

SHARE

Leave a Reply