Home প্রচ্ছদ রচনা মুমিন জীবনের বসন্ত রমাদান সমাগত -এস.এম রুহুল আমীন

মুমিন জীবনের বসন্ত রমাদান সমাগত -এস.এম রুহুল আমীন

মহান আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালার অপার মহিমায় বছর ঘুরে রহমাত বারাকাত ও নাজাতের সাওগাত নিয়ে, আমাদের দরজায় আবার কড়া নাড়ছে মাহে রমাদান। তোমরা কি জানো? রমাদান শব্দের অর্থটা কী? হ্যাঁ, বলছি তাহলে শুনো! রমাদান শব্দের অর্থ হলো, জ্বালিয়ে দেওয়া, পুড়িয়ে দেওয়া। মানুষের মধ্যে মনুষ্যত্ব ছাড়া যে গুণ বা পশুত্ব থাকে তা জ্বালিয়ে পুড়িয়ে ধ্বংস করে দেয় রমাদান।

অর্থাৎ মানুষের জীবনে যত প্রকার পাপাচার রয়েছে, সে সমস্ত সীমালংঘনের মূল উৎস নফসের বাড়াবাড়ি। আর জানোইতো শয়তানের বড়ো এজেন্ট হচ্ছে ‘নাফসে আম্মারা’। একে বশীভূত করতে না পারলে, বিপর্যয়ের পর বিপর্যয় শুধু আমাদের জীবনকে গ্রাস করতেই থাকে। রমাদান খাদ্য পানীয় ও জৈবিক দাবি পূরণে বিরত থাকার লাগাম টেনে দিয়ে নাফসকে আল্লাহর নির্দেশের কাছে আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য করে। উপবাস ছাড়া আর কোনো কিছুই নাফসকে এমনভাবে বশীভূত করতে পারে না। লাগামহীন নাফসকে রমাদান লাগাম টেনে নিয়ন্ত্রণের খাঁচায় বন্দি করতে পারে বলেই এর নাম রমাদান।

আর সাওম শব্দ থেকেই এসেছে ‘সিয়াম’। সিয়াম শব্দের অর্থ বিরত থাকা। সুবহে সাদিক থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত পানাহার ও বৈধ জৈবিক প্রয়োজনও পূর্ণ করা থেকে বিরত থাকার নামই সিয়াম। ‘সিয়াম’ পালন কিন্তু একটি উদ্দেশ্যবিহীন ইবাদাত নয়। বরং তা একটি লক্ষ্যে পৌঁছার মাধ্যম মাত্র। আর লক্ষ্য হচ্ছে তাকওয়ার গুণ অর্জন। আমরা জানি, সিয়ামে রমাদান ইসলামের পাঁচটি বুনিয়াদের একটি। সিয়ামকে সে জন্যই মহান আল্লাহ তায়ালা অতীত সব জাতির ওপর ফরজ করেছিলেন। আখেরি রাসূলের আনীত কিতাবেও ফরজ করা হয়েছে সমানভাবে। যাতে মানুষ তথা আমরা তাকওয়ার গুণ অর্জন করতে পারি খুব সহজেই।

তাইতো কুরআনুল কারিমের সূরা আল বাকারার ১৮৩ নম্বর আয়াতে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়াতায়ালা বলেন, “হে মুমিনগণ! তোমাদের ওপর সাওমকে ফরজ করা হয়েছে, যেমন করা হয়েছিলো তোমাদের পূর্ববর্তী লোকদের ওপর। আশা করা যায় এর মাধ্যমে তোমরা আল্লাহভীতি বা তাকওয়ার গুণ অর্জন করবে, তথা মুত্তাকি হতে পারবে।”

সিয়াম কীভাবে পালন করতে হবে আমাদের। যাতে আমাদের সমস্ত গুনাহ মাফ হয়ে যাবে। আমরা হয়ে যাবো নিষ্পাপ। তাও বাতলিয়ে দিয়েছেন আমাদের প্রিয় নবী আবদুল্লাহ ইবনে মুহাম্মাদ সা.। হযরত আবু হুরাইরা রা. থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবীয়ে কারিম সা. বলেছেন, যে ব্যক্তি ঈমান ও ইহতিসাবের সাথে রমাদানে ‘সিয়ামুন্নাহার’ পালন করবে তার অতীত অপরাধসমূহ ক্ষমা করে দেওয়া হবে। আর যে ব্যক্তি ঈমান ও ইহতিসাবের সাথে রমাদানে ‘কিয়ামুল্লাইল’ পালন করবে তারও অতীত জীবনের গোনাহসমূহ মার্জনা করে দেওয়া হবে। অনুরূপভাবে যে ব্যক্তি কদরের রাতে দ-ায়মান থাকবে তারও পূর্ববর্তী সমস্ত গুনাহ মার্জনা করা হবে।” (বুখারি ও মুসলিম)

নবীজি সা. এও বলেছেন, এমন কিছু সিয়াম পালনকারী আছে, যারা সিয়ামের নামে শুধু উপবাসের কষ্টই পায়। অর্থাৎ তারা সাওম রাখে ঠিকই কিন্তু মিথ্যা কথা বা কাজ ছাড়ে না।
প্রিয় বন্ধুরা! রমজানের প্রতিটি মুহূর্তই অতি মূল্যবান। এ প্রশিক্ষণ চলতে থাকে প্রতি মুহূর্তে। আবার গোটা বিশ্বের প্রতিটি জনপদে, মুসলমানদের জীবনে এ তারবিয়াত চলে একই সাথে। সে একটি ভিন্ন রকম জান্নাতি আবহে। এ আবহ চারদিকে যেন বহমান, সমানে সমান। লক্ষ্য করলে আমরা দেখবো। রমাদানে ইফতারি, তারাবিহ ও সাহরির জন্য রাত জাগরণের গুরুত্ব অপরিসীম
এমনিতেই রাতের শেষে জাগরণ ও তাহাজ্জুদের বিষয় বিশুদ্ধ হাদিসের কিতাবে বর্ণিত হয়েছে- “প্রতি রাতের শেষাংশে অর্থাৎ সাহরির সময়ে আল্লাহ তায়ালা পৃথিবীর নিকটতর আসমান থেকে জমিনের দিকে ঘোষণা দেন, হে আমার বান্দাগণ! তোমাদের মধ্যে কোনো কিছু প্রার্থনা করার কেউ আছে কি? আমি তোমার আবেদন মঞ্জুর করবো। তোমাদের মধ্যে গুনাহ মাফ চাওয়ার কেউ আছে নাকি? আমি গুনাহসমূহ ক্ষমা করে দিবো। আমার কাছে তোমাদের কারো কিছু চাওয়ার আছে নাকি? আমি তা তোমাদেরকে দান করবো।” (বুখারি)

মজার বিষয় কি তোমরা জানো? আর রমাদান মাসের সে আসল কথাটা, খুলে বলবো এখনই তোমাদের কাছে। আর তা হলো, এ রমাদান মাসেই নাযিল হয়েছে আমাদের হিদায়াতের আলোর মশাল। বিশ্বমানবতার চলার পথের পাথেয়। সত্য মিথ্যার মধ্যে পার্থক্যকারী উম্মুল কিতাব বা Mother Book, সকল জ্ঞান বিজ্ঞানের উৎস বা Knowledge House আল কুরআনুল কারিম। মহান আল্লাহ তায়ালা সে কথা বলেছেন সূরা আল বাকারার ১৮৫ নম্বর আয়াতে। মহান আল্লাহ বলেন, “রমাদান মাস; এ মাসেই নাযিল করা হয়েছে আল কুরআন। মানুষের হিদায়াত বা সঠিক পথ দেখায় মুক্তির জন্য। আর পার্থক্য দেখানোর জন্য সত্য ও মিথ্যার মধ্যে।” সুতরাং আমরা সত্য-মিথ্যার মধ্যে পার্থক্য জানতে চাইলে, হিদায়াতের পথে চলতে চাইলে আমাদেরকে কুরআনের কাছে যেতে হবে। কুরআন পড়তে হবে, কুরআন বুঝতে হবে।

আমরা এও জানি এ মাসে যেমন কুরআন নাযিল হয়েছে, তেমন অবাক হওয়ার বিষয় আল্লাহর সমস্ত আসমানি কিতাবও এ মাসেই নাযিল হয়েছে বলে হাদিসের সমর্থন রয়েছে। এ মাসের এত মর্যাদার কারণও যেন কিতাব নাযিলের জন্য। কুরআন নাযিলের রজনী হলো হাজার মাসের চেয়ে শ্রেষ্ঠতর। সন্দেহের কোনো অবকাশ নেই তাতে। ভাবনার বিষয় হলো, আমরা জীবনের অনেক বসন্ত পেরিয়ে এসেছি। কিন্তু আল্লাহর অবতীর্ণ মহামূল্যবান অমর এ কিতাবটি আজও পড়া হলো না, জানা হলো না এর ভেতরের রহস্যাবলি। মানা হলো না এর হালাল হারামের বিধান। তাহলে আর নয়, এবারের রমাদানে আল কুরআন ও কাগজ কলম নিয়ে বসে যাই, শুরু করি গভীর অধ্যয়ন। গ্রহণ করি আল কুরআনের শিক্ষা, জীবন করি আলোকিত।
প্রিয় পাঠক! রহমাত, মাগফিরাত ও নাজাতের সওগাত নিয়ে, মাহে রমাদান আমাদের মাথার ওপর ছায়া বিস্তার করে আছে। আমরা একটু সিদ্ধান্ত নিই। অবগাহন করি রহমাতের অতল সমুদ্রে। যেখানে আছে আল্লাহর নাফরমানি, পাপাচার ও গুনাহের বাড়াবাড়ি, সেখান থেকে ফিরে যাই মাহে রমাদানের মাগফিরাতের অফুরন্ত সুযোগের সন্ধানে। সাহরি, তাহাজ্জুদ, তারাবিহ, ইফতার ও কুরআনের সাথে কাটাই মূল্যবান সময়। যেখানে আছে ক্ষমা ও নাজাতের সুসংবাদ, এসেছে মহান আল্লাহর কিতাব ও মহানবী সা.-এর বিশুদ্ধতম হাদিসে। মা সন্তানকে যেভাবে নিষ্পাপ অবস্থায় জন্ম দেয় রাসূল সা. বলেন, সিয়াম সেভাবে নিষ্পাপ করে দেয় সিয়াম পালনকারীকে। রমাদান ছাড়া কোনো মাসে পাপ মার্জনার এ দুর্লভ সুযোগ আর নেই।

শুধু অপুষ্টিতে অসংখ্য শিশু অন্ধ হয়ে জন্ম নিচ্ছে না। রয়েছে করোনা মহামারীসহ হাজারো সমস্যায় জর্জরিত, আজকের শিশু আগামীর প্রজন্ম। অর্থাৎ ভবিষ্যতের বাংলাদেশ। অভাবী এসব বনি আদমের দিকে সাহায্যের হাত বাড়াতে সিয়াম আমাদের শিক্ষা দিচ্ছে। আমাদের সাদাকাহ ও জাকাত তাদেরকে সুন্দর জীবন গঠনে ও দারিদ্র্য বিমোচনে বড়ো অবদান রাখতে পারে। তাই বলতে চাই, আত্মগঠনে ও মহানবীর দেখানো সুন্দর সমাজ বিনির্মাণে, মানবিকতার বিকাশ ঘটাই আমাদের জীবনে। এ সাওয়াবের মওসুম এবং মুমিন জীবনের বসন্তকাল ধন্য করতে আসুক বারবার। আহলান ওয়া সাহলান মাহে রমাদান। সুস্বাগতম হে মাহে রমাদান।

SHARE

Leave a Reply