Home গল্প তোমাদের গল্প ম্যাজিক -মাসুদ রানা আশিক

ম্যাজিক -মাসুদ রানা আশিক

হুলবুলিয়া বন বেশ বড়ো। সেই বনের রাজা হলো সিংহ ভায়া। হঠাৎ করেই সেই জঙ্গলে আগমন একটা দৈত্যের। বিরাট সেই দৈত্য। অনেক লম্বা। প্রায় তালগাছের মতো। ইয়া মোটা। জঙ্গলে তো ওজন করার কোনো যন্ত্র নেই। দৈত্যটার ওজন প্রায় ২০০ কেজি। দৈত্যটা যখন হাঁটে তখন বনের মাটি কেঁপে কেঁপে ওঠে। ইয়া বড়ো বড়ো দাঁত তার। মাথার চুলগুলোও অনেক বড়ো। দৈত্যকে দেখে তো বনের সবার চক্ষু চড়কগাছ। এ কোন আপদ এলো হুলবুলিয়া বনে। বনের সব পশু-পাখি ভয় পেয়ে গেল। সবাই বলতে লাগল, ‘পালাও পালাও। বনে দৈত্য এসেছে। সবাইকে খেয়ে ফেলবে। পুরো বনটা ছারখার করে দেবে। বনটা ধ্বংস করে দেবে।’ সে এক হুলুস্থুল ব্যাপার। দৈত্য শুধু তাকিয়ে দেখে এসব। আর বলে, ‘অবশ্যই খাবো। এই বনে খেতেই তো আমি এসেছি। অনেক দিনের ক্ষুধা আমার। পেটটা চোঁ চোঁ করছে। তবে তোমাদের কারও ক্ষতি করে নয়।’ বনের সবাই বলল, ‘একি বলে দৈত্য! অনেক ক্ষুধা তার। কিন্তু কারও ক্ষতি করবে না। এটা কোনো কথা হলো। যে শরীর দৈত্যের। পুরো বনের সব পশু-পাখিকে খেয়ে ফেলতে দুইদিন সময় লাগবে না।’

বনের রাজা সিংহ মহাশয় দৈত্যকে হত্যা করার জন্য বন রক্ষা বাহিনীকে খবর দিল। কিন্তু কী আশ্চর্য! দৈত্যকে মারতে গিয়ে বাহিনীর সদস্যরা বশ হয়ে ফিরে এলো। বরং বন রক্ষা বাহিনীরা রাজার কাছে এসে বলে, ‘ওটা তো দৈত্য নয়। ম্যাজিশিয়ান। বনের সবাইকে ম্যাজিক দেখাতে এসেছে। ওকে মেরে কী করবেন? নিরীহ একটা দৈত্য। কিছুই খায় না। মাংসের আশপাশে তো যাই-ই না। তবে বলল, সময় হলে নাকি সে খাবে। পেটে নাকি ক্ষুধা আছে।’
বন রক্ষা বাহিনীর কথা শুনে অতিশয় আশ্চর্যে রাজার মুখটা দেখার মতো হয়েছিল। একটা দৈত্য কি না ম্যাজিক দেখাতে বনে এসেছে! এ কেমন কথা! এত বড়ো একটা শরীর। কিছু নাকি খায়ও না! বাঁচে কীভাবে কে জানে। দৈত্যটা বনের একেবারে শেষ মাথায় একটা ফাঁকা জায়গা আছে সেখানে ঘুমিয়ে থাকত। যখন অবসর থাকত তখন শুধু ঘুরতো। এখানে-ওখানে, বিভিন্ন জায়গায়। বনের পশু-পাখিদের সাথে কথা বলত সে। একটা সময় সেই দৈত্যটা হয়ে গেল বনের সকল পশু-পাখির অফুরন্ত আনন্দের ভান্ডার। অনেক সুন্দর গল্প বলতে পারত দৈত্যটা। বনের শিশু পশু-পাখিদের শিক্ষণীয় গল্প বলে আনন্দ দিত। আনন্দ-ফুর্তি করত দৈত্যটা। কয়েক দিনের মধ্যেই বিরাট দৈত্যটা বনের সবার মন জয় করে নিলো। দৈত্যটা নাচে, গায়, খেলে। ক্রিকেট, ফুটবল হাডুডু এমন কোনো খেলা নেই যে সে খেলতে পারত না। দৈত্যটা সবাইকে বলে, ‘জানো আমি ম্যাজিক জানি। মুহূর্তের মধ্যে ম্যাজিকের মাধ্যমে সব কিছু পরিবর্তন হয়ে যাবে।’
দৈত্যর কথা শুনে অন্যরা বলত, ‘আমরা তো কখনও ম্যাজিক দেখিনি। আমাদের ম্যাজিক দেখাবে তুমি? আহা কী আনন্দ। শুনেছি মনুষ্য সমাজে ম্যাজিকের প্রচলন আছে।’

দৈত্য হ্যাঁ সূচক মাথা নাড়ায়। কিন্তু ম্যাজিক দেখায় না। বনের সবার অনেক উৎসাহ ম্যাজিক দেখার জন্য। একদিন বনের এক প্রান্তে বসে খেলছিল একটা খরগোশ ছানা। দৈত্যটা তার কাছে গিয়ে বলল, ‘কী ব্যাপার খরগোশ বাবু। এখন তো খেলার সময় নয়। খেলবে বিকাল বেলা। এখন তোমার স্কুলে যাওয়ার কথা। ক্লাস করার কথা। শিক্ষকদের কথা গুরুত্ব সহকারে শোনার কথা। এভাবে অসময়ে খেললে তো পড়াশোনায় পিছিয়ে পড়বে। পড়াশোনায় পিছিয়ে পড়ার মানে নিজের ক্ষতি। নিজ বনের ক্ষতি।’ দৈত্যের কথা শুনে খরগোশ ছানা বেশ চিন্তিত হয়ে পড়ল। তখন সে বেশ বানিয়ে বানিয়ে বলল, ‘জানো দৈত্য ভাই। আমার বাবা আজ খুব অসুস্থ। তাই স্কুলে যেতে ইচ্ছা করছে না। বাবাকে নিয়ে খুবই চিন্তায় আছি। তাই এখানে বসে চিন্তা করছিলাম।’ খরগোশের কথা শুনে দৈত্য মুচকি হাসে। সে বুঝতে পেরেছে খরগোশ ছানা মিথ্যা বলছে। তখন দৈত্য বিরাট এক হাঁ করল। খরগোশ ছানা মনে করল তাকে নিশ্চয়ই দৈত্যটা খেয়ে ফেলবে। খরগোশ চোখ দুটো বন্ধ করে মাথায় হাত দিয়ে বসে পড়ল। কিন্তু না। দৈত্য হাঁ করে মিথ্যা খেয়ে ফেলল। দৈত্য তখন বলল, ‘অনেক দিন পর খেয়ে পেটটা শান্ত লাগছে।’ মিথ্যা খেয়ে ফেলার পর কেমন যেন হয়ে গেল সব।

খরগোশ ছানা বলল, ‘আমার ভুল হয়ে গেছে। আমি মিথ্যা বলেছিলাম। আমি আর কোনোদিন মিথ্যা বলব না। মিথ্যা বলব না। মিথ্যা বলব না।’ কথাটা বলতে বলতে সে চলে গেল স্কুলে। হাসতে লাগল দৈত্য। হুলবুলিয়া বনের সকল মিথ্যা একসাথে খেয়ে ফেলল দৈত্য। এভাবে আরও কিছুদিন পর বনের একটা অফিস থেকে কান্নার আওয়াজ পেল দৈত্য। তখন সে সেখানে গেল। গিয়ে দেখল কচ্ছপের কাছ থেকে ঘুষ নিয়ে কাজ করছে কর্মকর্তা শিয়াল পণ্ডিত। কচ্ছপ তার নিজের সহায় সম্পত্তি বিক্রি করে টাকাগুলো সংগ্রহ করেছিল। তাই সে কাঁদছিল। কচ্ছপ দৈত্যকে সব খুলে বলে। তখন দৈত্য অফিসরুমে গিয়ে শিয়ালকে বলল, ‘দুর্নীতি করছেন কেন আপনি? এই বনটা তো আপনারই। এই বনেই আপনি জন্মগ্রহণ করেছেন। এখানেই বসবাস করছেন। নিজ বনের ক্ষতি কেন করছেন আপনি। নিজ বনের ক্ষতি করা মানে নিজের ক্ষতি করা।’ কথা বলে বড়ো একটা হাঁ করল দৈত্য। মুহূর্তের মধ্যে সে খেয়ে ফেলল ঘুষ-দুর্নীতি। শিয়াল কর্মকর্তার মনে তখন কিছু একটা হলো। সে রুম থেকে বের হয়ে কচ্ছপকে ডাকল।

তারপর বলল, ‘কচ্ছপ ভাই। আমার খুব ভুল হয়ে গেছে। আমি আপনার ক্ষতি করেছি। আমি বনের ক্ষতি করেছি। আমাকে ক্ষমা করে দিন। এই নিন আপনার টাকা। আমি টাকা নিয়ে কোনো কাজ করব না। এই যে নাক কানে মাটি।’ শিয়াল পণ্ডিত বনের মাটি নিয়ে নাক এবং কানে ঘষে দিলো। নিজের বনের প্রতি দায়িত্ব থেকে নিজ থেকেই সব কাজ করে দিলো। কচ্ছপ হাসি মুখে খুবই আস্তে আস্তে হেঁটে হেঁটে চলে গেল। দৈত্য নিজ মনে বনে ঘুরতে লাগল। আর হাসতে হাসতে বলল, ‘আমি ম্যাজিক জানি। আমি ম্যাজিক জানি।’ ম্যাজিক দেখার জন্য দৈত্যর পেছনে ঘুরতে লাগল বনের পশু-পাখিরা। বনের রাজাও তাদের সাথে শামিল হলো। দৈত্য দেখল বনে মারামারি-হানাহানি চলছে। দৈত্য মারামারি-হানাহানি খেয়ে ফেলল। বাল্যবিবাহ খেয়ে ফেলল। নারী পশুদের ওপর অত্যাচার খেয়ে ফেলল। সকল মাদক খেয়ে ফেলল। বনের সকল হিংসা-বিদ্বেষ খেয়ে ফেলল। সকল অন্যায়-অত্যাচার খেয়ে ফেলল। পরনিন্দা খেয়ে ফেলল। সে খেয়ে ফেলল বনের সকল বনাবিক অবক্ষয়। বনের সকল পশু-পাখি দেখল, দৈত্যটা বড়ো একটা হাঁ করে। সেই হাঁ করা বড়ো মুখে সব নিমিষে চলে যাচ্ছে। বনের সকলে ভাবল, বাহ দৈত্যটা তো এসব খেয়েই বেঁচে আছে। ওতো ভাত মাছ কিছুই খায় না। কিন্তু দৈত্য যে বলল, সে ম্যাজিক জানে। কোথায় ম্যাজিক? দৈত্যকে প্রশ্ন করে বনের সকলে। দৈত্য কিছু বলে না। শুধু হাসতেই থাকে। মুচকি হাসি। সেই হাসিতে আছে রহস্য। এর কিছুদিন পর হঠাৎ করে দৈত্যটা কোথায় যেন চলে গেল। আর খুঁজে পাওয়া গেল না তাকে। এবং সবাই অবাক হয়ে খেয়াল করল বনটা ম্যাজিকের মতো পরিবর্তন হয়ে গেছে। বনে কোনো অন্যায় অত্যাচার নেই। দুর্নীতি নেই। মিথ্যা নেই। হিংসা নেই। কোনো বিদ্বেষ নেই। মাদকের আখড়া নেই। এককথায় সকল খারাপ মুহূর্তেই মধ্যেই সব উধাও। সবাই তখন ভাবল, আসলেই তো ম্যাজিক। দৈত্যটা তো ভালো ম্যাজিক জানত।

SHARE

Leave a Reply