Home স্বাস্থ্য কথা শিশু-কিশোরদের প্রতি নির্যাতন ও নিয়ন্ত্রণের উপায় -ডা. এহসানুল কবীর

শিশু-কিশোরদের প্রতি নির্যাতন ও নিয়ন্ত্রণের উপায় -ডা. এহসানুল কবীর

শিশুর প্রতি নির্যাতন ও সহিংসতা যেন দিন দিন বেড়েই চলেছে। করোনার ক্রান্তিকালে এটা আরো প্রকট আকার ধারণ করেছে। কারণ এ সময়ে শিশুরা ঘরে আবদ্ধ ছিল। স্বাভাবিকভাবেই তাদের স্বাভাবিক জীবনেই গতি ব্যাহত হচ্ছিল আর তাদের মন-মানসিকতা হয়ে পড়েছিল বেপরোয়া। যার অমোঘ পরিণতি ছিল শারীরিক ও মানসিক নিপীড়ন। এক সমীক্ষায় দেখা গেছে যে, ৭৪% শিশুই বিভিন্নভাবে নির্যাতনের শিকার হচ্ছে। তার মধ্যে শারীরিকভাবে নির্যাতিত ৪২%, যৌন হয়রানি ১৯%, মানসিকভাবে ৩৪% ও অবহেলা বা নিগৃহীত হয়েছে ৫২%। চিত্রটা খুবই ভয়াবহতার প্রমাণ দেয়।

শিশুদের প্রতি নির্যাতনের কারণগুলো কী কী?
১. বয়স ও লিঙ্গভেদে কারণগুলো ভিন্নতর হতে পারে।
২. নিম্নবিত্ত বা উচ্চবিত্তভেদে ভিন্নতরভাবে নির্যাতন করা হয়।
৩. এক ধরনের মানসিকবৈকল্য বা বিকৃতির কারণেও এটা হয়।
৪. মাদকাসক্ত হয়ে পড়া যা ক্রমশ দিনকে দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে শিশু-কিশোরদের মধ্যে।
৫. ইন্টারনেট আসক্তি। করোনার বিরূপ প্রভাবে এটা তাদের মধ্যে যেমন বৃদ্ধি পেয়েছে, তেমনি আবার তাদের ওপর নির্যাতনের মাত্রাও বৃদ্ধি পেয়েছে সমানুপাতিক হারে।
৬. দুর্বল পারিবারিক বন্ধন। একটা পরিবারে বাবা-মা যদি সচেতন না থাকে, সুশিক্ষা না থাকে অথবা ভঙ্গুর পরিবারের এসব অসহায় শিশু সদস্যরা সহজেই নির্যাতনের শিকার হয়।
৭. দুর্ধর্ষ ‘কিশোর গ্যাং’ সৃষ্টি। ইদানীং শিশু-কিশোররা বিভিন্ন অসামাজিক ও অনৈতিক কাজে জড়িত হওয়ার ফলে দিন দিন এসব অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে তারা। ফলে নির্যাতনের মাত্রা বাড়ছে এদের ওপর।
৯. বাল্যবিবাহ। এটাও শিশু নির্যাতনের একটা বড়ো কারণ বটে।
১০. কোনো কোনো স্কুল বা মাদ্রাসার নির্দয় শিক্ষকদের দ্বারা অমানুষিক নির্যাতনের শিকার হয় এসব অবুঝ শিশু-কিশোররা।
১১. দরিদ্রতা। বলা হয় অভাব যখন আসে, ভালোবাসা তখন জানালা দিয়ে পালায়। দরিদ্রতা মানে না কোনো নিয়ম। ফলে শিশু নির্যাতনের ঘটনাও কম হয় না এক্ষেত্রে।
১২. মাদক ও অস্ত্রের সহজলভ্যতা। অসাধু ব্যবসায়ীরা তাদের অনৈতিক ব্যবসার সুবিধার্থে অল্প বয়সী শিশু-কিশোরদের এসব অসামাজিক কাজে লিপ্ত করছে। এসব শিশু-কিশোররাও অল্প বয়সে এই কাজে জড়িয়ে পড়াসহ এগুলোর স্বাদ নিচ্ছে সহজেই। ফলে নিজেদের অজান্তেই বয়ে আনছে নিদারুণ নির্যাতন, এমনকি মৃত্যু পর্যন্ত।
১৩. যৌন হয়রানি। বিশেষ করে মেয়ে শিশু-কিশোরীরা এসবের শিকার হচ্ছে বেশি। জন্ম দিচ্ছে নির্যাতনের ভিন্ন ভিন্ন মাত্রা।
১৪. বৈষম্যতা। পারিবারিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বৈষম্যতাও এক্ষেত্রে একটা কারণ বটে।
১৫. আইনের দুর্বলতা। শিশু নির্যাতন প্রতিরোধের জন্য আইনেও অনেক ফাঁকফোকর রয়েছে। ফলে শিশু নির্যাতন বন্ধ করা বা নির্মূল করা সম্ভব হচ্ছে না।
১৬. মানবিক মূল্যবোধের অবক্ষয়। এটা আমাদের ঘুণেধরা সমাজের ভয়াবহ অবস্থার এক করুণ পরিণতি।

শিশুদের প্রতি কী কী ধরনের নির্যাতন করা হয়?
১. শারীরিকভাবে : আগেই উল্লেখ করেছি শারীরিক সহিংসতার নানান ফিরিস্তি। আসলে এরূপ নির্যাতনের ধরাবাঁধা কোনো নিয়ম নেই।
২. মানসিকভাবে : এক্ষেত্রে শারীরিক করা লাগে না, মানসিকভাবে হেয় করাই মুখ্য। অবজ্ঞা, অবহেলা, কটুকথা, গালমন্দ ইত্যাদির মাধ্যমে নির্যাতন করার পন্থা এটা।
৩. সামাজিকভাবে : সামাজিকভাবে হেয়প্রতিপন্ন করা, দুর্বল ভাবা অথবা সোস্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে হ্যাকিং, কিডন্যাপিং ইত্যাদি সাইবার বুলিং বা সাইবার ক্রাইম করা হচ্ছে। মূলত শিশু নির্যাতনের এটা এক মডার্ন টেকনিক।

শিশুদের শারীরিক নির্যাতন কীভাবে করা হয়?
১. চড়-থাপ্পড়, কিল-ঘুষি, শক্ত কোনো বস্তু বা অস্ত্র দ্বারা আঘাত।
২. শারীরিকভাবে রক্তাক্ত করা, অঙ্গহানি করা।
৩. গরম কিছু দিয়ে ঝলসানো বা পোড়ানো।
৪. বিভিন্ন উপায়ে শ্বাসরোধ করে হত্যার চেষ্টা।

শিশুরা কাদের দ্বারা নির্যাতিত হয়?
১. পিতা-মাতা বা সৎ পিতা-মাতা বা
আত্মীয়-স্বজন দ্বারা।
২. সমবয়সী বা সহপাঠী বন্ধুদের দ্বারা।
৩. কাজের বুয়া বা গৃহকর্মী কর্তৃক শিশু নির্যাতনের ঘটনাও কম ঘটছে না সমাজে।
৪. এক শ্রেণির অসৎ, নির্দয় শিক্ষক দ্বারাও এ ঘটনা ঘটে।
৫. অপরাধী চক্র বা গ্যাংস্টার দ্বারা অসৎ উদ্দেশ্যে শিশুরা নির্যাতিত হচ্ছে।
৬. সামাজিক গণমাধ্যমের দ্বারা হ্যাকার বা কিডন্যাপার দ্বারা অনেক সময় এই গর্হিত কাজ হয়ে থাকে।

কোথায় নির্যাতন বেশি হয়?
১. বাসাবাড়িতে
২. হোস্টেল, বোর্ডিং বা মেসে
৩. স্কুল, কলেজ, মাদরাসায়
৪. খেলার মাঠে
৫. কারাগারে
৬. রিফিউজি ক্যাম্পে

শিশু সহিংসতার পরিণতি কী হচ্ছে?
১. শারীরিক অসুস্থতা
২. মানসিক বিপর্যস্ততা
৩. লেখাপড়ায় ক্ষতি : পরীক্ষায় অকৃতকার্যতা বা স্কুল থেকে ঝরে পড়ার ঘটনা পরিলক্ষিত হচ্ছে।
৪. মৃত্যুঝুঁকি : আত্মহত্যা বা আত্মহত্যায় প্ররোচনার মতো ঘটনাও ঘটছে।
৫. মাদকাসক্ত হয়ে পড়ছে।
৬. যৌনরোগসহ নানান রোগব্যাধি সৃষ্টি হওয়া অসম্ভব কিছু না।
৭. শরীরের ক্ষতচিহ্ন বা স্থায়ী দাগ হওয়ার ঘটনা ঘটছে।
৮. হাড় ভেঙে যাওয়া বা অঙ্গহানি হওয়ার মতো ঘটনাও অহরহ হচ্ছে। অর্থাৎ নাক, চোখ, কান ইত্যাদি ক্ষতিগ্রস্ত বা নষ্ট হয়ে যাওয়াটাও অসম্ভব কিছু নয়।
৯. স্বাস্থ্যহানি ও অপুষ্টিতে ভোগা খুবই স্বাভাবিক ঘটনা এক্ষেত্রে।
১০. অসামাজিক হয়ে যাওয়া। এটার ফলে পারিবারিক বা সামাজিক অশান্তি সৃষ্টি হচ্ছে।

তাহলে প্রতিরোধের উপায় কী?
১. মনিটরিং : সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণে রাখার চেষ্টা করতে হবে তাদেরকে। বাসা, স্কুল, খেলার মাঠ, বন্ধু-বান্ধব সবখানে সবসময়।
২. সন্দেহজনক কোনো কিছু দেখলেই তাৎক্ষণিক সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া উচিত।
৩. আইনের যথাযথ প্রয়োগ ঘটানোর চেষ্টা করা উচিত। কোনো অঘটন ঘটলে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে রিপোর্ট করা উচিত।
৪. পারিবারিক ও সামাজিক নিরাপত্তা রক্ষার প্রচেষ্টা চালানো দরকার।
৫. মাদকদ্রব্য বা শিশুদের ইন্টারনেট ব্যবহারে নিয়ন্ত্রণ আনা উচিত।
৬. ধর্মীয় অনুশাসন ও নৈতিক শিক্ষা প্রদান ও তা যথাযথভাবে মেনে চলাটা খুবই জরুরি।
৭. পারিবারিক বন্ধন সুদৃঢ় করা ও এ ব্যাপারে ক্রমাগত মোটিভেশন চালানো দরকার।
৮. শিশুর মন-মানসিকতা বোঝার চেষ্টা করা। কারণ শিশু-কিশোরদের মনোজাগতিক পরিবেশটা একটু ভিন্নতর ও জটিল বটে।
৯. শিক্ষিতের হার বাড়ানো। শিক্ষিত জাতি হলে এসব সামাজিক অনাচার দূর করা সম্ভব।
১০. বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ করা জরুরি।
১১. এক্ষেত্রে সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধিতে সমাজের নেতৃস্থানীয়দের ভূমিকা কম নয়।
১২. সাইবার আইন জোরদার করা উচিত।

SHARE

Leave a Reply