Home খেলার চমক নতুন আফ্রিদি

নতুন আফ্রিদি

দীর্ঘদিন পুরো বিশ্ব ক্রিকেটকে মাতিয়ে রেখেছেন শহীদ আফ্রিদি। ব্যাট হাতে ক্রিজে নামলেই চার-ছক্কার ঝড় তুলতেন, আবার বল হাতে নিতেন একের পর এক উইকেট। তার উদযাপনেও ছিল অন্যদের চেয়ে ভিন্নতা। সব কিছু মিলে তাই শহীদ আফ্রিদি দুই যুগ মাতিয়ে রেখেছিলেন ক্রিকেট দর্শকদের; কিন্তু সবাইকেই এক সময় থামতে হয়। শহীদ আফ্রিদিও আন্তর্জাতিক ক্রিকেটকে বিদায় বলেছেন কয়েক বছর আগে।

তবে এরই মধ্যে পাকিস্তান ক্রিকেট পেয়ে গেছে আরেক আফ্রিদিকে। তিনি অবশ্য ব্যাট হাতে নন, পিচে ঝড় তুলছেন বল হাতে। বলছি বামহাতি ফাস্ট বোলার শাহিন শাহ আফ্রিদির কথা। অভিষেকের পর কয়েক বছরের মধ্যেই যার হাতে উঠেছে আইসিসির বর্ষসেরা ক্রিকেটারের পুরস্কার। ২০০৪ সাল থেকে বর্ষসেরা ক্রিকেটারকে দেওয়া হচ্ছে স্যার গ্যারিফিল্ড সোবার্স ট্রফি। ২০২১ সালে সেটি উঠেছে শাহিন আফ্রিদির হাতে।

বছর জুড়ে চমৎকার ক্রিকেট খেলার পুরস্কার শাহিন পেয়েছেন এর মাধ্যমে। সারাক্ষণ মুখে শিশুসুলভ হাসি লেগে থাকলেও বল হাতে হয়ে ওঠেন ভয়ঙ্কর। পাঠান জাতির মানুষরা এমনিতেই সাহসী আর আক্রমণাত্মক স্বভাবের হয়। শাহিনও তার ব্যতিক্রম নন। মাঠে বাউন্স, গতি আর সুইংয়ে দিশেহারা করে তোলেন ব্যাটসম্যানদের। দিতে পারেন নিখুঁত ইয়র্কার।

২০২১ সালে ৩৬টি আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলে তার ঝুলিতে গেছে ৭৮ উইকেট। গত টি-টোয়েন্টি বিশ^কাপে ছয় ম্যাচে নিয়েছেন ৭ উইকেট। তবে আলোচিত পারফরম্যান্স ছিল ভারতের বিপক্ষে ম্যাচে রোহিত শর্মা, লোকেশ রাহুল আর বিরাট কোহলির উইকেট। বছরটিতে মাত্র ৯টি টেস্ট ম্যাচ খেলে নিয়েছেন ৪৭ উইকেট। যার ফলে অল্প দিনেই পাকিস্তান ক্রিকেট থেকে বিশ^ ক্রিকেটের তারকায় পরিণত হয়েছেন।

লেখাটা শুরু করেছিলাম শহীদ আফ্রিদির প্রসঙ্গ দিয়ে। সেখানেই আবার ফিরে যাই। নামের মিল থাকার কারণে শাহিন আফ্রিদি আন্তর্জাতিক ক্রিকেট খেলতে শুরু করার পর দু’জনের মাঝে কী সম্পর্ক সেই প্রশ্ন ভক্তদের মনে জাগতে থাকে। দু’জনেই পশতুন বা পাঠান জাতির আফ্রিদি উপজাতির লোক, দুজনেরই বাড়ি পাকিস্তানের খাইবার পাখতুনখোয়া এলাকায়। আচরণেও আছে মিল- দুজনেই আক্রমনাত্মক ক্রিকেট খেলেন। আবার উইকেট নেওয়ার পর উদযাপনও করেন প্রায় একই স্টাইলে। দু’জনেরই জার্সি নম্বর দশ। এতসব কারণে অতি উৎসাহী অনেকে শাহিনকে শহীদ আফ্রিদির ছেলে, কখনো বা ছোটো ভাই বানিয়ে দিয়েছে। শাহিন আফ্রিদিকেও অনেক বার বিদেশী সাংবাদিকদের কাছ থেকে এই প্রশ্ন শুনতে হয়েছে। তিনি প্রতিবারই বলেছেন, দু’জনের মাঝে কোনো আত্মীয়তার সম্পর্ক নেই।

গত বছর মে মাসে একটা টেলিভিশন অনুষ্ঠানে এ সম্পর্কে শহীদ আফ্রিদি বলেন, ‘আমাদের আফ্রিদিদের মধ্যে আটটা গোত্র আছে। শাহিন আর আমরা দুটি ভিন্ন গোত্র থেকে এসেছি।’ অর্থাৎ দুজনের মাঝে কোন রক্তের সম্পর্ক নেই। তবে সেই অনুষ্ঠানেই শহীদ আফ্রিদি জানান, সব ঠিক থাকলে তার মেয়ের সঙ্গে শাহিন আফ্রিদির বিয়ে হবে। তিনি বলেন, ‘শাহিনের পরিবার থেকে আমার বড়ো মেয়ের জন্য প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে। আমরা দুই পরিবারই যোগাযোগের মধ্যে আছি। জুটি তৈরি হয় বেহেশতে।’
তারও দুই মাস আগে অবশ্য এক টুইটার পোস্টে এমন কিছু আভাস দিয়েছিলেন বুমবুম আফ্রিদি। আফ্রিদির বড় মেয়ে আকসা বর্তমানে ডাক্তারি পড়ছেন। যে কোনো দিন হয়তো তার সাথে শাহিন আফ্রিদির বিয়ে হবে। আত্মীয়তার সম্পর্কে বাধা পড়বে দুই আফ্রিদি পরিবার।

শাহিন আফ্রিদির জন্ম ২০০০ সালের ৬ এপ্রিল। পাকিস্তানের খাইবার পাখতুনখোয়া প্রদেশের আফগান সীমান্তের কাছাকাছি একটি ছোট্ট শহরে বেড়ে ওঠা ছেলেটা একটা সময় স্থানীয়ভাবে টেনিস বলের ক্রিকেটে খুব নাম করেছিলেন। সাত ভাইয়ের মধ্যে সবার ছোটো শাহিন। তার বড়ো ভাই রিয়াজ আফ্রিদিও ছিলেন ফাস্ট বোলার। পাকিস্তানের হয়ে একটি টেস্ট ম্যাচ খেলেছেন। ২০০৪ সালে বাংলাদেশে অনুষ্ঠিত অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপে পাকিস্তানের হয়ে খেলেছেন রিয়াজ। তার মাধ্যমেই ক্রিকেট বলে হাতেখড়ি শাহিনের। বড়ো ভাইকে নিজের প্রথম কোচ হিসেবেও পরিচয় দেন শাহিন।

বড়ো ভাইয়ের উৎসাহে ২০১৫ সালে আঞ্চলিক অনূর্ধ্ব-১৬ দলে ট্রায়াল দিয়ে টিকে যান। কিছুদিন পরে পাকিস্তান অনূর্ধ্ব-১৬ দলের হয়ে অস্ট্রেলিয়া সফরও করেন। কয়েকদিন পর খেলেন অনূর্ধ্ব-১৯ দলের হয়ে। ২০১৭ সালে তাকে ঢাকায় আনে বিপিএলের দল ঢাকা ডায়নামাইটস। একই বছর প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে অভিষেক ম্যাচে এক ইনিংসে নেন ৮ উইকেট। ২০১৮ সালে অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ^কাপে পাকিস্তানের পক্ষে সর্বোচ্চ ১২ উইকেট নেন। এরপর জাতীয় দলের নির্বাচকদের নজর পড়ে তার ওপর। পিএসএলসহ ঘরোয়া ক্রিকেটেও ভালো করতে থাকেন। আর সব কিছুর পুরস্কার স্বরূপ ২০১৮ সালের এপ্রিলে করাচিতে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে টি-টোয়েন্টি ম্যাচ দিয়ে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে অভিষেক। একই বছর পা পড়ে টেস্ট ও ওয়ানডের জগতে।

সুযোগ পেয়েই নিজের জাত চিনিয়েছেন ৬ ফুট ৬ ইঞ্চি উচ্চতার শাহিন। সুইং আর গতির সাথে বৈচিত্র্যও আছে তার বোলিংয়ে। অনেকেই তার মাঝে ওয়াসিম আকরাম কিংবা মোহাম্মাদ আমিরের যোগ্য উত্তরসূরি হয়ে ওঠার সম্ভাবনা দেখতে পাচ্ছেন। আকরাম, আমিরের চেয়ে সুইং দক্ষতায় পিছিয়ে থাকলেও গতি আর বাউন্স-এ এগিয়ে আছেন শাহিন। ২১ বছর বয়সেই আইসিসির বর্ষসেরা ক্রিকেটার হওয়ার কারণে সেই সম্ভাবনা এখন অনেকটাই উজ্জ্বল। ইতোমধ্যেই তিন ফরম্যাটে দলের অটোমেটিক চয়েস হয়ে উঠেছেন এই পাঠান তরুণ।
২০১৯ বিশ^কাপে বাংলাদেশের বিপক্ষে ৩৫ রানে ৬ উইকেট নেওয়ার দিন সবচেয়ে কম বয়সী বোলার হিসেবে বিশ^কাপে ৫ উইকেট নেওয়ার রেকর্ড গড়েন। বিশ^কাপে তাকে উদীয়মান তারকা হিসেবে ঘোষণা করে আইসিসি। সব মিলে ২১ টেস্টে ৮৬ উইকেট, ২৮ ওয়ানডেতে ৫৩ উইকেট এবং ৩৯ আন্তর্জাতিক টি- টোয়েন্টিতে নিয়েছেন ৪৫ উইকেট।

এখন বয়স ২১ বছর। ফর্ম আর ফিটনেস ঠিক থাকলে আরো অন্তত ১০ বছর আন্তর্জাতিক ক্রিকেট খেলার সুযোগ থাকবে। যে কারণে ক্রিকেট বিশেষজ্ঞরা শাহিন আফ্রিদির মাঝেও দেখছেন আরেকজন কিংবদন্তি বোলার হয়ে ওঠার সম্ভাবনা।

SHARE

Leave a Reply