Home স্বপ্নমুখর জীবন ব্যর্থতাই সফলতার আসল রহস্য -আমিনুল ইসলাম ফারুক

ব্যর্থতাই সফলতার আসল রহস্য -আমিনুল ইসলাম ফারুক

আমরা বড়ো বড়ো মানুষের সাফল্যই শুধু দেখি কিন্তু তারা যে সাময়িক কত ব্যর্থতার মুখোমুখি হয়েছিলেন সে বিষয়গুলো এড়িয়ে যাই। তুমি কাজ করার পরও যখন ব্যর্থ হবে তখন বুঝে নিতে হবে তোমার পরিকল্পনা সুষ্ঠু না হওয়ায় এটি একটি সঙ্কেত। তখন নতুন করে আবার পরিকল্পনা শুরু করে ঈপ্সিত লক্ষ্যের দিকে আবার যাত্রা শুরু করো। লক্ষ্যে পৌঁছবার আগেই হাল ছেড়ে দিলে তুমি হবে একজন ‘কুইটার’ অর্থাৎ যে দায়িত্ব পালন কিংবা তার ওপর অর্পিত কাজ শেষ না করেই চলে যেতে চায়। একজন কুইটার কখনও জীবনে জয়ী হতে পারেন না আর একজন বিজয়ী কখনো হাল ছাড়ে না।

মার্কোনি (১৮৭৪-১৯৩৭) এমন একটি সিস্টেমের স্বপ্ন দেখেছিলেন যা ইথারের অধরা শক্তিকে ধরতে পারবে। এই অসম্ভব কাজটি সম্ভব করতে গিয়ে কম করে হলেও তিনি পাঁচশত বার ব্যর্থ হয়েছিলেন। একবার নিউ ইয়র্ক টাইমসের সম্পাদকীয়তে তাঁর গবেষণা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছিল। কারণ তিনি গবেষণার নামে দেশের অর্থ অপচয় করছেন। তাঁর সে স্বপ্ন যে বৃথা যায়নি তার জলজ্যান্ত প্রমাণ সারা পৃথিবীর সমস্ত রেডিও ও টেপ রেকর্ডার। তবে মার্কোনি যখন বলেছিলেন তিনি তারের সাহায্য ছাড়া বাতাসের মাধ্যমেই এক জায়গা হতে আরেক জায়গায় খবর প্রেরণ করবেন, এই কথা শুনে বন্ধুরা তাঁকে পাগল ভেবে মানসিক হাসপাতাল পর্যন্ত নিয়ে গিয়েছিল। যে টাইমস সম্পাদকীয়তে তার গবেষণা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছিল পরবর্তীতে সেই টাইমস তাঁর সফলতা নিয়ে প্রতিবেদন ছাপাতে বাধ্য হয়েছিল। বিজ্ঞানী মার্কোনি একজন মানুষের সফলতার জন্য নয়টি ধাপ অনুসরণের কথা বলেছেন-
১. চেষ্টা করুন।
২. আবার চেষ্টা করুন।
৩. আরও একবার চেষ্টা করুন।
৪. একটু ভিন্নভাবে চেষ্টা করুন।
৫. আগামী দিন আবার চেষ্টা করুন।
৬. চেষ্টা করতে থাকুন এবং কারো সাহায্য নিন।
৭. কাজটি করতে কোথায় সমস্যা হচ্ছে তা একজন মেন্টর থেকে ভালোভাবে বুঝে নিন।
৮. এমন কাউকে অনুসরণ করুন যে কাজটি শেষ করতে পেরেছেন।
৯. চেষ্টা করতে থাকুন যতক্ষণ না সফল হচ্ছেন।

বিশ্ব এখন নতুন নতুন আবিষ্কার দেখে অভ্যস্ত। পৃথিবীতে আমরা আজ যত আবিষ্কার দেখতে পাই এসব কিছুর আবিষ্কর্তাগণ স্বপ্নচারী মানুষ ছিলেন। এদের বেশির ভাগই প্রথম জীবনে ব্যর্থ হয়েছিলেন কিন্তু তারা জানতেন ব্যর্থতার মাঝেই লুকিয়ে থাকে সাফল্যের বীজ।

তুমি একা একা তো আর সফল হতে পারবে না; এ জন্য অবশ্যই তোমাকে মাস্টারমাইন্ড দল তৈরি করতে হবে। মাস্টারমাইন্ড দল মানে মেধাবী, সৎ এবং পারদর্শী লোকবল বাছাই করে কোনো কাজের সূচনা করা। সেটা হতে পারে কোনো বিষয়ে গ্রুপ স্টাডি করা কিংবা কোনো একটি ব্যবসা আরম্ভ করার মতো কাজ। যখন মাস্টারমাইন্ড দল তৈরি করবে তখন এমন সব লোকজনকে গুরুত্ব দেবে যারা যোগ্য, শতভাগ সৎ এবং পরাজয়ে ভীত নয়। পরাজয়কে পাত্তা না দিয়ে বরং তাকে স্বাগত জানায়। যদি বিশাল কোনো ক্ষতিরও আশঙ্কা থাকে তাতেও সিদ্ধান্তে অনড় এবং অবিচল থাকে। তোমার মাস্টারমাইন্ড দলের প্রথম লক্ষ্য শুধু টাকা উপার্জন করা উচিত হবে না বরং লক্ষ্য অনুযায়ী প্রতিষ্ঠানের ভিত্তিমূল গড়ার প্রতি বেশি মনোযোগী হতে হবে। শুধু টাকার পেছনে নয়, লক্ষ্যে দৌড়াতে পারলে টাকা এমনিতেই তোমার পিছনে ছুটবে।
ইমাম জাওজী (রহ.) একটি চমৎকার কথা বলেছেন- ‘কাউকে কখনো তার অতীতের সফলতা কিংবা ব্যর্থতা দিয়ে মূল্যায়ন করবেন না। বর্তমানে সে যে অবস্থানে আছে সেটাও তার সফলতা নয় বরং ভবিষ্যতে সে যেটা হবে সেটাই তার সফলতা।’

বিপণনবিদ্যার গুরু ফিলিপ কাটলার বলেন- ‘শূন্য থেকে শুরু করতে পারলেই আপনার জয় মধুর হবে।’
জীবনের গতানুগতিক ধারণা অনেককেই আগে বাড়তে দেয় না। ব্যক্তির মাঝে অভ্যন্তরীণ বিপ্লব না ঘটলে তো আর বাহ্যিক বিপ্লব ঘটবে না। মূলত আমরা ভেতর থেকে যেভাবে বদলাই সে অনুযায়ী আমাদের বাইরের বাস্তবতা বদলে যায়। এজন্য সবার আগে নিজেকে বদলানো জরুরি। নিজেকে বদলানোর এমন তিনটি সূত্র আছে যেগুলো অনুসরণের মাধ্যমে আমাদের ভিতর এবং বাহির দুটো অবস্থারই বদল ঘটানো সম্ভব।

১. Knowing more than others (অন্যের চেয়ে বেশি জানো)
২. Working more than others (অন্যের চেয়ে বেশি কাজ করো)
৩. And hope less than others (এবং অন্যের চেয়ে কম প্রত্যাশা করো)।
তুমি হয়তো কোনো কাজ করতে গিয়ে বারবার ব্যর্থ হচ্ছো, হতাশ হয়ে পড়ছো, গতকাল হয়তো পড়েও গিয়েছো তাতে কোনো সমস্যা নেই যদি আজ আবার উঠে দাঁড়াতে পারো। দেখো, মার্কিন লেখক হেলেন কিলার (১৮৮০-১৯৬৮) জন্মের কিছুদিন পরেই বোবা, অন্ধ এবং সমস্ত শরীর কালো হয়ে জনমের মতো পঙ্গু হয়ে যান। শারীরিক এই অক্ষমতা কিন্তু তাকে দাবিয়ে রাখতে পারেনি। Optimism, Light in My Darkness, The Song of the Stone Wall- এর মতো বিখ্যাত বই লিখে ইতিহাসের সেরা মানুষের তালিকায় ঠিকই জায়গা করে নিয়েছেন। তাঁর গোটা জীবন একথাই প্রমাণ করে পরাজয়কে বাস্তবতা হিসেবে মেনে না নিলে কেউ কখনো পরাজিত হয় না। একজন মানুষের অর্জন কত বড়ো তা বুঝতে হলে তোমাকে দেখতে হবে অর্জনের পথে সে কত বড়ো বাধা পেরিয়ে এসেছে। বেটোফেন কানে শুনতে পেতেন না, মিল্টন চোখে দেখতেন না অথচ এরাই কালজয়ী সিম্ফোনি ও সাহিত্য সৃষ্টি করে গেছেন। মিল্টন অন্ধ হয়ে যাবার পরও তাঁর অন্তরের অনুভূতির আলোয় লিখে ফেলেছিলেন জগদ্বিখ্যাত মহাকাব্য ‘Paradise Lost’. এগুলো তাদের পক্ষে সম্ভব হয়েছিল শুধুমাত্র ব্যর্থতাকে পাত্তা না দিয়ে স্বপ্নগুলোকে গঠনমূলক চিন্তা-ভাবনায় রূপান্তরিত করতে পেরেছিলেন বলে।

কোনো কিছু মনেপ্রাণে চাওয়া এবং সেটি পাওয়ার জন্য প্রস্তুত থাকা দু’টি ভিন্ন জিনিস। কেউ যদি বিশ্বাস না করে সে অমুক জিনিসটি পেতে পারে তাহলে তা পাওয়ার জন্য তার প্রস্তুতি সেই মানের হয় না। স্রেফ ইচ্ছে করলে কিংবা আশা থাকলেই হবে না, সেটি পাওয়ার জন্য মনের মধ্যে প্রবল বিশ্বাস আনতে হবে। সন্দেহে ঢাকা মনে বিশ্বাস, সাহস ও আস্থা কোনো কিছুরই জায়গা থাকে না। মানুষের জীবনে সবচেয়ে বড়ো শত্রু হলো তার সংশয় এবং অবিশ্বাস। এই সংশয় এবং অতিরিক্ত অবিশ্বাসের কারণে সে সারাজীবনে কোনো কাজ শুরুই করতে পারেনি।

একটু খেয়াল করলে তোমরা দেখবে, সফল মানুষদের ভাষায় এই শব্দগুলো রয়েছে। আমি করেছি। আমি আশাবাদী আমি পারব। আমাকে দিয়ে এটি সম্ভব। ভুলভ্রান্তি আমার। আমাকে সুযোগ দিতে পারেন। আমি আবার চেষ্টা করে দেখতে পারি। আমি কাজটিতে প্রচণ্ড আনন্দ পাচ্ছি। বিপদে সার্বক্ষণিক স্রষ্টার সাহায্য পাচ্ছি। আমি একা নই, স্রষ্টা আমার সাথে আছেন।

সফল মানুষগুলো প্রচণ্ড আশাবাদী এবং দৃঢ়প্রতিজ্ঞ যার কারণে সবাই তাদেরকে পছন্দ করে। তারা সব সময় সাদামাটা, আকর্ষণীয় ব্যক্তিত্ব, খোলামেলা, বন্ধুবৎসল ও পরোপকারী মনোভাবের অধিকারী হয়ে থাকে। এরা নিজে পরিবর্তন হয় এবং অন্যেরও পরিবর্তন চায় এবং যে কোনো পরিস্থিতিতে নিজেকে খাপ খাইয়ে নিতে পারে। এরা অপরের ভালো কাজের প্রশংসা করেন, সবাইকে সাথে নিয়ে চলেন। সব ব্যর্থতাকে নিজের কাঁধে তুলে নিয়ে অপরের সাহায্য ও সফলতাকে বড়ো করে দেখেন। আমার আমিত্ব ও অহঙ্কারকে পায়ের নিচে পিষ্ট করে অপরকে তার প্রাপ্য স্বীকৃতি দেন।

প্রতিটি কাজে তিনটি প্রশ্ন থাকে- কী করতে হবে? কে করবে? কীভাবে করবে? সফল মানুষগুলো এ তিন প্রশ্নের উত্তর সঠিকভাবে জেনে কাজে নেমে পড়েন। ব্যর্থ মানুষগুলো এই তিন প্রশ্নের মধ্যে ঘুরপাক খান। তোমাদের মনে রাখতে হবে, একশো ভাগ সাফল্যের মধ্যে সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে পারা পঁচিশ ভাগ, কাজ শুরু করতে পারা পঁচিশ ভাগ এবং লেগে থাকা পঞ্চাশ ভাগ। একটু দাঁড়িয়ে থাকার জন্য হলেও পৃথিবীতে তোমাকে কেউ জায়গা দেবে না। পৃথিবীতে কেউ কাউকে জায়গা দেয় না বরং জায়গা করে নিতে হয়। আজ এ পর্যন্তই। সবাই ভালো থাকবে, সুস্থ থাকবে। আল্লাহ হাফিজ।

SHARE

Leave a Reply