Home আইটি কর্নার পর্যটনের নতুন দিগন্ত মহাকাশ ভ্রমণ -লতিফ হাসান

পর্যটনের নতুন দিগন্ত মহাকাশ ভ্রমণ -লতিফ হাসান

চলছে পর্যটনের মৌসুম। ভ্রমণপিয়াসী সবাই তাদের সময় এবং সামর্থ্য বিবেচনায় ঘোরাঘুরি করেন এ সময়। কেউ দেশে কেউ বিদেশে। সাধারণত এমনই চলছিল। কিন্তু সম্প্রতি পৃথিবীর গণ্ডি পেরিয়ে মহাকাশ ভ্রমণের দ্বার উন্মোচিত হয়েছে। বিজ্ঞানীরা দীর্ঘদিন থেকে মহাকাশ ভ্রমণ করলেও সাধারণদের জন্য সে সুযোগ ছিল না। সাধারণরা তাদের কল্পনার জগতে ওড়াউড়ি করেছে এতদিন। তবে সেসব কল্পনাকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার ব্যবস্থা হয়েছে এখন। মহাকাশ ভ্রমণের যাবতীয় বিষয়-আশয় নিয়েই আমাদের এবারের লেখা-

এ বছর থেকেই মহাকাশে ঘুরে বেড়ানোর স্বপ্ন বাস্তব রূপ পেয়েছে। ইতোমধ্যেই মহাকাশে বেড়িয়ে আসার সাধ পূর্ণ করেছেন দুই ধনকুবের জেফ বেজোস ও রিচার্ড ব্র্যানসন। তারা পর্যটক হিসেবে মহাকাশ ভ্রমণ করেছেন। এর মাধ্যমেই মহাকাশ পর্যটনের বিষয়টি পূর্ণতা পেয়েছে বলাই যায়! প্রথমবারের মতো পর্যটক হিসেবে মহাকাশের প্রান্ত ঘুরে এসেছেন ব্রিটিশ ধনকুবের রিচার্ড ব্র্যানসন। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান ভার্জিন গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতা তিনি। তিন সহকর্মীকে নিয়ে মহাকাশ ঘুরে এসে মানুষের জয়যাত্রার নতুন মাইলফলকে নাম লিখিয়েছেন তিনি। ওই দিন যুক্তরাষ্ট্রের নিউ মেক্সিকো থেকে মহাকাশের উদ্দেশে যাত্রা করে ব্র্যানসনের মহাকাশ ভ্রমণ কোম্পানি ভার্জিন গ্যালাকটিকের নভোযান। ব্র্যানসনের রকেটটি ৫৩ মাইল উচ্চতায় পৌঁছায়। এ দূরত্বে গেলে যাত্রীরা ওজনহীনতার অভিজ্ঞতা অর্জন করেন। এ যাত্রার মধ্য দিয়ে মহাকাশ পর্যটনের ইতিহাস গড়েন রিচার্ড ব্র্যানসন। মহাকাশযাত্রায় ব্র্যানসনের সঙ্গে ছিলেন পাইলট ডেভ ম্যাকে ও মাইকেল মাসুকসি। অন্য তিনজন হলেন গ্যালাকটিকের কর্মী বেথ মসেস, কলিন বেনেট ও শ্রিসা বান্ডলা। আগামী বছর থেকে তিনি আগ্রহী যাত্রীদের কাছে টিকিট বিক্রি করবেন। ইতোমধ্যে ভার্জিন গ্যালাকটিকের কাছে যাত্রী হিসেবে ৬০০ ব্যক্তি অগ্রিম টিকিটের ফরমায়েশ দিয়ে রেখেছেন। এক ঘণ্টার এই অভিজ্ঞতা নিতে খরচ হবে আড়াই লাখ মার্কিন ডলার বা ২ কোটি ১১ লাখ টাকার বেশি। এ যাত্রায় পাঁচ মিনিটের মতো ওজনহীনতার অভিজ্ঞতা ও পৃথিবীর দিগন্ত দেখার সুযোগ পাওয়া যাবে।

এদিকে আমাজনের ২০০ বিলিয়ন ডলারের মালিক জেফ বেজোস ৯ দিন পরেই ৬৫ মাইল ওপরে ঘুরে আসেন। পৃথিবীর আবহাওয়ামণ্ডল ও মহাকাশের কাল্পনিক সীমা কারমান লাইন সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ৬২ মাইল ওপরে অবস্থিত। সেটাও অতিক্রম করেছিল বেজোসের নভোযান। মহাকাশ সংস্থা ব্লু অরিজিনের সঙ্গে ভার্জিন গ্যালাক্টিকের প্রতিযোগিতার ফলে মহাকাশযাত্রা আরও সুলভ হতে যাচ্ছে বলেই মনে করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।

মহাকাশ পর্যটন শুরু করতে তোড়জোড় করে বানানো হচ্ছে বাণিজ্যিক মহাকাশ স্টেশন। এতে সহায়তা করছে যুক্তরাষ্ট্রের মহাকাশ গবেষণা প্রতিষ্ঠান নাসা। বাণিজ্যিক মহাকাশ স্টেশন তৈরিতে তিনটি সংস্থাকে কয়েক কোটি মার্কিন ডলার তহবিল সরবরাহ করছে নাসা। বিজ্ঞানীরা আশা করছেন, আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনের বিকল্প হিসেবে বাণিজ্যিক মহাকাশ স্টেশনগুলো ব্যবহার করা যাবে। নাসার অর্থায়ন পাওয়া সংস্থাগুলো হচ্ছে মার্কিন ধনকুবের জেফ বেজোসের ব্লু অরিজিন, মহাকাশ সংস্থা ন্যানোর‍্যাকস ও প্রতিরক্ষা ঠিকাদার নর্থরপ গ্রুমান। প্রতিষ্ঠান তিনটি মহাকাশ স্টেশন গড়তে যথাক্রমে ১৩ কোটি, ১৬ কোটি ও ১২ কোটি ৫৬ লাখ মার্কিন ডলার অর্থায়ন পেয়েছে। এর আগে অ্যাক্সিওম স্পেস নামের আরেকটি কোম্পানিকে নাসা ১৪ কোটি মার্কিন ডলার অর্থায়ন করেছে। নাসার উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনার মধ্যে রয়েছে চাঁদে বসতি স্থাপন ও মঙ্গল গ্রহে নভোচারী পাঠানোর মতো নানা বিষয়। যাতে সেখানে ভ্রমণ, বসবাস ও কাজ করা সম্ভব হয়।

ব্লু অরিজিন নামের প্রতিষ্ঠানটি আরেক মহাকাশ সংস্থা সিয়েরা স্পেসের সঙ্গে মিলে ‘অরবিটাল রিফ’ নামের মহাকাশ স্টেশন তৈরি করছে। এতে ১০ জনের আবাসন-সুবিধা থাকবে। অরবিটাল রিফকে মহাকাশে ব্যবসাকেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার করা যাবে। এ স্টেশন থেকে মাইক্রোগ্র্যাভিটি নিয়ে গবেষণা ও মহাকাশের উপযোগী নানা যন্ত্রাংশ তৈরির কাজ করা যাবে। এছাড়া মহাকাশ সংস্থা ভয়েজার স্পেস ও লকহিড মার্টিনের সঙ্গে মিলে ন্যানোর‍্যাকস ‘স্টারল্যাব’ নামে মহাকাশ স্টেশন তৈরি করছে। ২০২৭ সালে এ স্টেশন তৈরি হতে পারে। এতে থাকবে একটি জীববিদ্যা ল্যাব, উদ্ভিদের বাসস্থান ল্যাব, ভৌতবিজ্ঞান, গবেষণাগার ও ওয়ার্কবেঞ্চ এলাকা। তাছাড়া আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনে কার্গো সরবরাহ করতে ‘সিগনাস’ নামে মহাকাশযান তৈরি করেছে নর্থরপ গ্রুমান। সংস্থাটি বিভিন্ন মডিউল একত্র করে মহাকাশ স্টেশন তৈরির পরিকল্পনা করেছে। এতে থাকবে বিজ্ঞানবিষয়ক বিভিন্ন গবেষণার সুযোগ ও পর্যটনসুবিধা।

মহাকাশ স্টেশনে পৌঁছানোর পর সেখানে নানা ধরনের তৎপরতায় অংশ নিতে পারবেন পর্যটকরা। সেখানে তাদের ‘জিরো গ্র্যাভিটি’ অর্থাৎ ওজনহীনতার অভিজ্ঞতা হবে। সেখান থেকে মহাকাশ এবং পৃথিবীর চমৎকার দৃশ্য দেখতে পাবেন।
নাসা জানিয়েছে, যারা পর্যটক হিসেবে আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনে যাবেন, তারা সেখানে তিরিশ দিন পর্যন্ত থাকতে পারবেন। তবে পর্যটক হিসেবে আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনে যাওয়ার আগে খুবই কঠোর শারীরিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে হবে সবাইকে। নাসা আশা করছে, পর্যটকদের কাছ থেকে পাওয়া অর্থ তারা মহাকাশে আরও গবেষণা এবং নতুন অভিযানে খরচ করতে পারবেন।

SHARE

Leave a Reply