Home স্বাস্থ্য কথা শিশুদের ইন্টারনেট আসক্তি নিয়ন্ত্রণের উপায় -ডা. এহসানুল কবীর

শিশুদের ইন্টারনেট আসক্তি নিয়ন্ত্রণের উপায় -ডা. এহসানুল কবীর

বর্তমান শিশুরা মোবাইল, ট্যাব, ল্যাপটপ, কম্পিউটার নিয়ে বেশি সময় কাটায় ইন্টারনেটে গেম খেলে বা অন্য কাজের মাধ্যমে। এই গেম বা নেট আসক্তি অনেকভাবে তাদের ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। শিশুদেরকে শান্ত রাখার জন্য আমরা স্মার্টফোন বা ল্যাপটপে ভিডিও দেখতে বা গেম খেলতে দেই। আবার একটু বড়ো বাচ্চাদের পড়ার জন্য বা দুনিয়ার সাথে তাল মিলিয়ে চলার জন্য আমরাই মোবাইল, কম্পিউটার ইত্যাদি কিনে দেই। তাদের আবদারের কাছে হার মানি। কিন্তু এই ডিভাইসগুলো ব্যবহার করতে গিয়ে সন্তানের যে শারীরিক মানসিক ও সামাজিক ক্ষতি হয় তার দায়ভার কে নেবে? বাবা-মা হিসেবে অবশ্যই বড়ো দায়িত্ব তাদেরকেই নিতে হবে বৈকি। আমরা কি নিশ্চিত করে বলতে পারব যে, সন্তানরা এসব গ্যাজেটের অসৎ ব্যবহার করবে না? ইন্টারনেটের প্রতি আসক্ত হয়ে পড়বে না? সমাধানটা নিঃসন্দেহে কঠিন এবং অনেকটাই অসম্ভব বটে।
তাহলে গেম বা ইন্টারনেট বা গ্যাজেট আসক্তি কীভাবে নিয়ন্ত্রণ করা যাবে?

১. বাবা-মা উভয়কে দলবদ্ধভাবে কাজ করতে হবে।
২. এক্ষেত্রে প্রথমেই বাবা-মা দু’জনকেই একত্রে কাজ করতে হবে এবং একই সুরে কথা বলতে হবে। কারণ দু’জন যদি একসাথে কাজ না করে তাহলে বাচ্চারা ব্যাপারটার গুরুত্ব সহজে বুঝবে না, ভাববে এই ক্ষেত্রে যেহেতু বাবা-মা একজন তো এটাকে নরমালভাবে নিচ্ছেন, ছাড় দিচ্ছেন। তাই তারা বিশেষ সুবিধা নিতে চায়। এছাড়া রাসূল (সা.) বলেছেন, ‘প্রত্যেকেই নিজ নিজ অবস্থানের ওপর দায়িত্বশীল। আর প্রত্যেককে তাদের অধীনস্থদের ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করা হবে।’ তাই বাচ্চাদের ক্ষেত্রে বাবা-মা ও উভয়কেই সমান সচেতন হতে হবে। কীভাবে কী করা হবে তা বাবা-মাকে একত্রে বসে আলোচনা করে ঠিক করতে হবে। এর সুবিধা, অসুবিধা, ফলাফল ইত্যাদির ব্যাপারে আগেই সন্তানকে বুঝিয়ে বলতে হবে।
৩. আপনার সন্তান কী দেখছে সেটার প্রতি লক্ষ রাখুন। তাই বলে অহেতুক গোয়েন্দাগিরি করা যাবে না, তাতে উল্টা রিঅ্যাকশন হতে পারে।
৪. আজকাল বাচ্চাদের নিয়ে টিভি দেখার মতো অবস্থা আর নেই। বাচ্চাদের কার্টুনগুলোতেও বেশির ভাগ সময় দেখা যায় যে, বাবা-মায়ের কাছে কথা লুকানো, মিথ্যা কথা বলা, অন্যের ওপর নিজের দোষ চাপিয়ে দেওয়া, অন্যের ক্ষতি করা, প্রতিহিংসাপরায়ণতা বা অল্প বয়সেই বিপরীত লিঙ্গের প্রতি আকর্ষণ ইত্যাদি জিনিসগুলো দেখানো হয় খুব চটকদারভাবে। হিন্দি সিরিয়ালের কথা তো বাদই দিলাম। সেগুলো এড়িয়ে চলার চেষ্টা থাকতে হবে।
৫. কিছু অনুষ্ঠান আছে শিক্ষণীয় এবং মজারও বটে। সন্তানদেরকে সেসব অনুষ্ঠান দেখার প্রতি আগ্রহী করে তুলতে হবে।
৬. এছাড়া নিজেরা ইউটিউব থেকে বেছে বেছে শিক্ষণীয় কনটেন্টগুলো দেখার প্রতি আকর্ষণ সৃষ্টি করাতে হবে।
৭. বাসার টিভি বা ইন্টারনেটযুক্ত ডিভাইসগুলো ঘরের এমন জায়গায় রাখতে হবে যেখানে সবার সহজ যাতায়াত রয়েছে এবং চলার পথে যেন দেখা যায় যে কে কী দেখছে সেটা বোঝা যায়।
৮. যদি বাচ্চাদের রুমে টিভি বা কম্পিউটার থাকে তাহলে তা ব্যবহারের সময় দরজা জানালা খোলা রাখতে বলতে হবে। সন্তানদের বোঝাতে হবে যে, এটা ওদের প্রতি অবিশ্বাস করার কারণে বলা হচ্ছে না। বরং এটা করা হচ্ছে নেটের খারাপ প্রভাব থেকে রক্ষা করার জন্য।
৯. নির্দিষ্ট একটা নিয়ম তৈরি করতে হবে যা সবাইকে মানতে হবে। যেমন- দিনের একটা নির্দিষ্ট সময় ব্যবহার করতে পারবে বা হোমওয়ার্ক শেষ হলে ব্যবহার করতে পারবে ইত্যাদি।
১০. সন্তান যদি একটু বড়ো হয় এবং নিজে কম্পিউটার চালাতে পারে, তাহলে তাকে রুলস মানার ব্যাপারে বোঝাতে হবে যে ও এটা না মানলে এক সপ্তাহ কম্পিউটার ধরতে দেওয়া হবে না। এই জাতীয় শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে।
১১. শাস্তির ব্যাপারে কঠোর থাকতে হবে। সন্তান যতই কাঁদুক বা বিরক্ত করুক তাকে চুপ করাতে শাস্তিতে শিথিলতা আনা যাবে না।
১২. সন্তান যত বড়ো হবে, সে গ্যাজেট ব্যবহারের ব্যাপারে স্বাধীন হবে এবং ততই বেশি লক্ষ রাখতে হবে।
১৩. অনলাইনের অচেনা মানুষ কত যে বিপজ্জনক এবং কত যে ক্ষতি করতে পারে তা বোঝাতে হবে তাদেরকে। হয়তো অভিভাবকের মনে হতে পারে এত অল্প বয়সে এসব বলে বাচ্চাদেরকে অযথা ভয় পাইয়ে দেওয়ার দরকার কী? কিন্তু মনে রাখতে হবে আমরা দুনিয়ার জন্য সন্তানদেরকে যেভাবে প্রস্তুত করি, সেভাবেই অনলাইনের জন্যও প্রস্তুত করা দরকার।
১৪. অনলাইনে নিজের নম্বর বা বাসার ঠিকানা দিলে এবং নিজের ডিটেলস প্রকাশ করলে কত ক্ষতি হতে পারে তা উদাহরণ দিয়ে তাদেরকে বুঝাতে হবে। দৈনন্দিন জীবনের নিজের ছবি যে অচেনাদের সাথে শেয়ার করা কত খারাপ হতে পারে সেটাও যুক্তি দিয়ে বোঝাতে হবে।
১৫. ভার্চুয়াল জীবনের চেয়ে বাস্তব জীবনকে বেশি গুরুত্ব দিতে শেখাতে হবে। নিঃসন্দেহে একজন সন্তানের মানসিক বিকাশে তার চারপাশের মানুষ ও পরিবেশ অনেক প্রভাব ফেলে। সে যদি ভার্চুয়াল জীবনকেই বেশি সময় দেয় তাহলে তার মানসিক বিকাশ ঠিকমত হবে না বরং ভবিষ্যতে সে বাস্তব জীবনের সাথে খাপ খাইয়ে চলতে সমস্যার সম্মুখীন হবে। বাস্তবজীবন যে ভার্চুয়াল জীবনের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ তা বোঝাতে হবে।
১৬. সন্তানের বাড়ন্ত সময়ে তার সাথে বেশি সময় কাটানোর চেষ্টা করতে হবে।
১৭. নিজের ঘরে এবং আশপাশের প্রতিবেশীদের বা অন্যান্য শিশু-কিশোরদের সাথে কীভাবে কথা বলতে হবে, কীভাবে মিশবে ইত্যাদি শিক্ষা দিতে হবে।
১৮. বই পড়ার অভ্যাস গড়ে তোলা খুব ভালো অভ্যাস।
১৯. ধর্মীয় চর্চা করার প্রতি আকর্ষণ ও আগ্রহ গড়ে তুলতে হবে।

SHARE

Leave a Reply