Home নিবন্ধ সুন্দর জীবনগঠনে নৈতিকতা -সাকী মাহবুব

সুন্দর জীবনগঠনে নৈতিকতা -সাকী মাহবুব

ইসলাম পুরোপুরি একটি নৈতিক আদর্শের নাম। বিচক্ষণ গবেষক, সমালোচক, ইতিহাসবিদ, চিন্তানায়ক আর বুদ্ধিজীবী মহল তাই ইসলামকে একটি পরিপূর্ণ নৈতিক বিপ্লবের প্ল্যাটফর্ম হিসেবে অভিহিত করেছেন। ইসলামে নৈতিকতার প্রথম, প্রধান এবং বলা যায় একমাত্র বৈশিষ্ট্য হলো এখানে মানুষের চরিত্রের স্বাভাবিক, চিরন্তন এবং সর্বজনীনভাবে প্রত্যাশিত গুণগুলোই গৃহীত হয়েছে। সাধারণভাবে চরিত্রের যে বিশেষ দিক ও গুণগুলোকে অনাদিকাল থেকে মানুষ গ্রহণীয় মনে করে এসেছে তারই প্রথাসিদ্ধ, সুশৃঙ্খল, শোভন উপস্থাপনা হলো ইসলামি নৈতিকতা।

নৈতিকতার পরিচয়

বাংলা ভাষায় নৈতিক শব্দটি এসেছে নীতি শব্দ হতে। নীতি শব্দের অর্থ হলো কর্তব্য নির্ধারণের উপায় বা রীতি, ন্যায়সঙ্গত বা সমাজের হিতকর বিধান, নীতি সম্বন্ধীয়। আর নৈতিকতা হলো নৈতিক চেতনা। তথা ভালো মন্দ বিচারের বোধ। অর্থাৎ কোন আচরণটি ঠিক আর কোনটি ঠিক নয় এর চেতনাই হলো নৈতিকতা।
নৈতিকতার ইংরেজি গড়ৎধষরঃু শব্দটির উৎপত্তি হয়েছে ল্যাটিন সড়ৎধষরঃধং শব্দ থেকে। সড়ৎধষরঃধং অর্থ হলো ধরন, ভালো আচরণ, চরিত্র প্রভৃতি। কাজেই নৈতিকতা হলো কতিপয় বিধান, যার আলোকে মানুষ তার বিবেকবোধ ও ন্যায়বোধ ধারণ ও প্রয়োগ করতে পারে।
সততা, সদাচার, সৌজন্যমূলক আচরণ, সুন্দর স্বভাব, মিষ্টি কথা ও উন্নত চরিত্র এ সবকিছুর সমন্বয় হলো নৈতিকতা।
কেউ কেউ বলেছেন, নৈতিকতা হলো সমাজের বিবেকের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ কতগুলো ধ্যানধারণা ও আদর্শের সমষ্টি।
দার্শনিকদের ভাষায়: সততা, সত্যবাদিতা, অঙ্গীকার রক্ষা, আমানতদারি, ন্যায়বিচার, ধৈর্য, আইনের অনুসরণ, রাষ্ট্রের নিয়মশৃঙ্খলা মেনে চলার নামই নৈতিকতা।
একজন মানুষের দৈনন্দিন জীবনের চাল চলন, ওঠাবসা, আচার ব্যবহার, লেনদেন, সবকিছুই যখন প্রশংসনীয় ও গ্রহণযোগ্য হয় তখন তাকে নৈতিক গুণাবলিসম্পন্ন ব্যক্তি বলে। এই নৈতিকতাসম্পন্ন ব্যক্তিকে রাসূল (সা.) সর্বোত্তম লোক বলে অভিহিত করেছেন। তিনি বলেছেন, ‘নিশ্চয়ই তোমাদের মধ্যে ঐ ব্যক্তিই উত্তম, যার চরিত্র উত্তম।’ (বোখারি ও মুসলিম) নৈতিকতা হলো ব্যক্তির মৌলিক মানবীয় গুণ এবং জীবনের শ্রেষ্ঠ সম্পদ, যা অর্জন করলে তার জীবন সুন্দর ও উন্নত হয়। এর মাধ্যমে সে অর্জন করে সম্মান ও মর্যাদা। ইসলামের অন্যতম উদ্দেশ্য হলো মানুষকে নৈতিকতা শিক্ষা দেওয়া। সীমাহীন ও চরিত্রহীন মানুষ চতুষ্পদ জন্তুর চেয়েও নিকৃষ্ট। মহান আল্লাহ বলেন, ‘তাদের হৃদয় আছে উপলব্ধি করে না, চোখ আছে দেখে না, কান আছে শোনে না; এরা হলো চতুষ্পদ জন্তুর মতো, বরং তার থেকেও নিকৃষ্ট। আর এরাই হলো গাফিল। (সূরা আল আরাফ : ১৭৯)

ইসলামে নৈতিকতার গুরুত্ব

ইসলামের দৃষ্টিতে নৈতিকতার গুরুত্ব অপরিসীম। মানুষের নৈতিকতা ও চরিত্রকে সুন্দর ও মার্জিত করার বিষয়টা ইসলাম যে কত গুরুত্ব দিয়েছে তা বলে শেষ করা যাবে না। ইসলাম ও নৈতিকতা অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত ও অবিচ্ছেদ্য। ইসলাম থেকে নৈতিকতাকে আড়াল করা যায় না। ইসলামের মতে প্রথম নবী হযরত আদম (আ.) থেকে শুরু করে সকল নবী রাসূলই নৈতিকতার শিক্ষা প্রচার করেছেন। তাঁরা সকলেই ছিলেন উন্নত চরিত্রের অধিকারী। মহানবী (সা.) সম্বন্ধে আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘আপনি অবশ্যই মহান উন্নত চরিত্রের অধিকারী।’ (সূরা কলম : ৪) উত্তম নৈতিক চরিত্র শিক্ষা দেওয়ার জন্য আমাদের প্রিয়নবী (সা.)ই সর্বোত্তম আদর্শ। তিনি ছিলেন উত্তম গুণাবলির পরিপূর্ণ মূর্ত প্রতীক। এ প্রসঙ্গে মহান আল্লাহ বলেন, তোমাদের জন্য আল্লাহর রাসূল (সা.)-এর মধ্যে রয়েছে উত্তম আদর্শ। (সূরা আহযাব-২১) পৃথিবীতে যত নবী রাসূল এসেছেন তারা সকলেই নিজ নিজ জাতির চরিত্র সংশোধন করেছেন, তাদের নৈতিক চরিত্র শিক্ষা দিয়েছেন। আর বিশ্বনবী (সা.) এসেছেন নৈতিক চরিত্রকে পূর্ণতা দান করার জন্য। তিনি বলেছেন, ‘উত্তম চারিত্রিক গুণাবলির পূর্ণতা দানের জন্যই আমাকে প্রেরণ করা হয়েছে। (ইবনে মাজাহ) ইসলামের দৃষ্টিতে মানুষের মর্যাদার মাপকাঠি হলো নৈতিক চরিত্র। মহানবী (সা.) বলেন, তোমাদের মধ্যে সেই ব্যক্তিই শ্রেষ্ঠ যার চরিত্র উত্তম। (বোখারি ও মুসলিম) ঈমানের পূর্ণতার মাপকাঠি হলো নৈতিক চরিত্র। মহানবী (সা.) বলেন, মুমিনদের মধ্যে সেই ব্যক্তিই পূর্ণতম ঈমানের অধিকারী, যে ব্যক্তি নৈতিক চরিত্র বিচারে উত্তম। (তিরমিযী) আখলাকে হামিদাহ বা উত্তম নৈতিক চরিত্রই হলো সকল পুণ্যের মূল। এ প্রসঙ্গে মহানবী (সা.) বলেন, ‘উত্তম চরিত্রই পুণ্য।’ (মুসলিম)
কিয়ামতের দিন দুনিয়ার ধনসম্পদ কাজে আসবে না, কাজে আসবে সুন্দর নৈতিক চরিত্র। মহানবী (সা:) বলেন,‘কিয়ামতে মুমিনের দাঁড়িপাল্লায় সবচেয়ে ভারী জিনিস হবে উত্তম নৈতিক চরিত্র।’ (তিরমিযী) এমনিভাবে জনৈক ব্যক্তি বিশ্বনবী (সা.)-এর কাছে জানতে চাইলেন, মহান আল্লাহ মানুষকে অনেক কিছু দান করেছেন, এর মধ্যে সবচেয়ে মূল্যবান দান কোনটি? বিশ্বনবী (সা.) বললেন, ‘সবচেয়ে মূল্যবান দান সুন্দর চরিত্র।’
বস্তুত মানুষকে নৈতিক দিক থেকে পবিত্র ও শুদ্ধ রাখার ব্যাপারে ইসলাম ছাড়া পৃথিবীর আর কোনো জীবনব্যবস্থাই এতো বেশি গুরুত্বারোপ করেনি। মানুষের শান্তি সমৃদ্ধি ও আখিরাতের মুক্তির একমাত্র শর্ত হিসেবে উত্তম ও পবিত্র চরিত্রকে নির্ধারণ করে দিয়েছে ইসলাম। রাসূলুল্লাহ (সা.) কে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, কোন গুণটির জন্য আখিরাতে মানুষ সবচেয়ে বেশি জান্নাতে যাবে? তিনি বলেন, হুসনুল খালক বা উত্তম চরিত্র।
কাজেই ইসলামের নৈতিক বিধিবিধান অনুসরণ করে মানুষ প্রয়োজনীয় গুণাবলি অর্জন ও অনুশীলনের চেষ্টা করবে এটাই স্বাভাবিক। এ দায়িত্ব পালন করা ছাড়া প্রকৃত পক্ষে সে আশরাফুল মাখলুকাতের মর্যাদা অক্ষুণœ রাখতে পারবে না।

SHARE

Leave a Reply