Home গল্প শোধ সুকন্যা সামিয়া

শোধ সুকন্যা সামিয়া

গভীর রাত! সবাই নির্বিঘেœ ঘুমাচ্ছে। কিন্তু তনুর চোখে ঘুম নেই। একটা অন্যরকম ভয়ে তনুর ভেতরটা কুঁকড়ে যাচ্ছে। কালকে স্কুল। এতেই তনুর ভয়। না, স্কুলে যাওয়ার জন্য নয়। ভয়টা অন্যখানে। হঠাৎ করেই খোলা জানালা দিয়ে আসা এক ঝলক বাতাসে জানালাটা বন্ধ করে দিল। জানালাটা তো সহজেই বন্ধ করা গেল কিন্তু কাল কী হবে? ভেবেই তনুর প্রাণটা আবার ধক করে উঠল। প্রায় এক সপ্তাহ এটা-ওটা বাহানা দিয়ে স্কুলে যায়নি তনু। কিন্তু কালকে টেস্ট। স্কুলে যেতেই হবে। তনুর হঠাৎ করেই নিজেকে ভীষণ একা লাগল। বিছানায় শুয়ে চোখের পানি মুছতে মুছতে কখন যে ঘুমিয়ে পড়ল নিজেও জানে না।

মায়ের ডাকে ঘুম ভাঙে তনুর। সকাল হয়ে গেছে। ধড়মড়িয়ে উঠে বসে তনু। মেয়ের এই হঠাৎ চমকানো দেখে একটু অবাকই হলেন মা। কিন্তু কিছু বললেন না। ইদানীং লক্ষ করেছেন তনু অল্পতেই কেন জানি ভয় পায়, চমকে ওঠে। ভেবেছেন বয়সের দোষ, এ নিয়ে দুশ্চিন্তার কিছু নেই।
তনু স্কুলের জন্য তৈরি হলো। আজকেও আগের দিনগুলোর মতো একা একাই যেতে হবে। বাবা চলে যান অফিসে। মা ছোটো ভাইকে নিয়ে বাসায়। তাকে নিয়ে যাবার কেউ নেই। মার ধারণা মেয়ে এখন আর ছোটো নেই একা একাই যেতে পারবে।

রাস্তায় নেমে তনু আশপাশে তাকায় যদি তার স্কুলের কোনো মেয়েকে পেয়ে যায়। কিন্তু কারো দেখা পেল না। আজ আবার কোন দৃশ্য দেখতে হবে কে জানে! তনুর মাঝে মাঝে ইচ্ছা করে একাই রুখে দাঁড়াবে। কিন্তু ভয় হয়। এই সমাজ অনেক ভয়ঙ্কর। রাস্তায় চলতে চলতে এসব ভাবতে থাকে তনু। হঠাৎ করেই বুঝতে পারে ওরা ঠিকই আবার আসছে পিছন পিছন!
ভয়ে তনু দাঁড়িয়ে যায়। আশপাশে সবাই চলছে যে যার মতো। কোনোদিকে ভ্রুক্ষেপ নেই কারো। তনুর চিৎকার করে বলতে ইচ্ছা করছে ‘আমাকে বাঁচাও’। তনুর ভয়ই সত্যি হলো। সামনে তার পথ রুখে দাঁড়ায় পাড়ার বখাটে ছেলে সুমন। চারদিক থেকে তার সাঙ্গোপাঙ্গরাসহ ঘিরে ধরে তনুকে। চারপাশের সবাই কেমন যেন দেখেও দেখে না। তনুর চোখ থেকে পানি পড়তে শুরু করে। ওদিকে বখাটেগুলো নানারকম অশ্লীল মন্তব্য ছুড়ে দিচ্ছে তনুর দিকে।

তনু দেখল পাঁচ-ছয়টা মেয়ে এগিয়ে আসছে ওর দিকে। একই ক্লাসে পড়ে ওরা। তনু দৌড়ে গেল ওদিকে। ওদের মাঝে এসে নিজেকে যেন অনেক সাহসী মনে হয় তনুর। দলের বাকি মেয়েরাও তনুর মত ইভটিজিংয়ের শিকার হয়েছে ওই বখাটেদের কাছ থেকে। ওদিকে বখাটেটা আরেকটা মন্তব্য ছোড়ে তনুদের উদ্দেশে।
হঠাৎ করেই কী জানি হলো তনুর। চোখের পানি মুছে ফেলে সে। চোখে চোখ রেখে তাকাল বখাটেটার দিকে। সে খারাপ একটা ইঙ্গিত করল তনুকে। এতক্ষণে একটা ভিড় জমে গেছে আশপাশে। সবাই কেমন যেন মজা দেখছে!

আর সহ্য হলো না তনুর। অনেক সহ্য করেছে এই অত্যাচার। সবার চোখের সামনে এক ঝলক আগুনের মতো তনু হেঁটে গেল বখাটেগুলোর সামনে। গায়ের সর্বশক্তি দিয়ে একটা চড় বসিয়ে দিল সুমনের গালে। এই আকস্মিক ঘটনায় সবাই যেন স্তব্ধ হয়ে গেল।
ভিড়ের মধ্যে একজন এসে দাঁড়াল তনুর পাশে। হাততালি দিয়ে উঠল আরেকজন। আস্তে আস্তে সবাই হাততালি দিতে থাকল তনুর উদ্দেশ্যে। তনুর চোখে আর এখন ভয়ের কোনো চিহ্ন নেই। চোখ দুটো যেন চকচক করছে এক অন্য আভায়। যে আভা শুধু অন্যায়কেই জ¦লে পুড়ে ধ্বংস করে দেয়।
ওদিকে বখাটেরা শাসিয়ে গেল তনুকে পরে দেখে নেবে। কিন্তু তনু আর ভয় পায় না। তনুও জবাব দেয়, সাহস থাকে তো এসো! আজকে আমি একা নই। আমার কোনো ভয় নেই। আর অন্যায় সহ্য করবো না আমি। সবাই আমার সঙ্গে আছে। আজ তোমাদের ভয় পাওয়ার দিন! পুরো সমাজ আজ তোমাদের বিরুদ্ধে। তোমাদের সাথে আর কেউ নেই আজ। তোমাদের দিন শেষ।

সবাই গলা মেলায় তনুর সঙ্গে। বখাটেগুলো কেমন যেন ফাঁদে পড়া ইঁদুরের মতো ভয় পেয়ে লেজ গুটিয়ে পালাল। তনুরাও চলে গেল স্কুলের পথে।
তনু এখন নিয়মিত স্কুলে যায়। তনুর একটুও ভয় লাগে না এখন। কারণ তনু আরও বুঝে গেছে চুপ থাকলে হবে না। অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে হবে। এখন চুপ থাকার মানে সহ্য করা নয়, হেরে যাওয়া। আর তনুরা হারতে চায় না। তারা জিততে চায়!
আমরাও তনুদের সঙ্গে আছি, ছিলাম,
থাকবো সব সময়।

SHARE

Leave a Reply