Home স্বপ্নমুখর জীবন মানুষ তার স্বপ্নের চেয়েও বড়ো -আমিনুল ইসলাম ফারুক

মানুষ তার স্বপ্নের চেয়েও বড়ো -আমিনুল ইসলাম ফারুক

২য় পর্ব
আমাদের স্বপ্ন যত বড়ো আমরাও তত বড়ো। কোনো কোনো সময় তার চেয়েও বড়ো। আমাদের সমাজে একটি নেতিবাচক ধারণা রয়েছে যে, স্বপ্ন সবার দেখা সাজে না। তারা অনেকে মনে করে স্বপ্ন মানেই একটি নিছক কল্পনা মাত্র। কিন্তু আসলে বিষয়টি তা নয়। স্বপ্ন মানে বাস্তব। স্বপ্ন মানেই কাক্সিক্ষত গন্তব্য। আমি কী করতে চাই। কোথায় যেতে চাই। তার নাম স্বপ্ন। আমাদের ব্যর্থতার পেছনে অন্যতম একটি কারণ নতুন প্রজন্মের স্বপ্নের সীমাবদ্ধতা। ছোটো ছোটো কাজের সমষ্টিই জীবন। প্রতিটি চিন্তা কিংবা প্রতিটি স্বপ্ন প্রভাবিত করে জীবনকে। তাই জীবনের লক্ষ্য পূরণে স্বপ্ন দেখতে হবে। স্বপ্ন দেখাতে হবে। স্বপ্নে বাঁচা শিখতে হবে।
আপনি কী করতে পারেন? আপনার কী করতে ভালো লাগে? আপনার পছন্দের বিষয়গুলো কী কী? আপনি নিজেকে ১০ বছর পর কোথায় দেখতে চান? সেই জায়গায় নিজেকে পাওয়ার জন্য আপনি কোন কাজটি করছেন? আজকে আপনার ভাবনা ও কাজ আপনাকে আগামীদিনের ভূমিকায় রাখতে পারবে তো? ভেবেছেন? এই বিষয়গুলো নিয়ে ভাবতে হবে। পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। ধীরে ধীরে নিজেকে তৈরি করতে হবে। নিজেকে তৈরি করার কোনো বয়স নেই। স্বপ্ন, চেষ্টা ও পরিশ্রমের বলে যে কেউ নিজেকে বদলাতে পারে। যারা নিজেকে বদলায় না বদলাতে জানে না তারা স্থবির, তারা মৃত্যুর অপেক্ষায় বেঁচে থাকে। আমি তাদের দলে নেই।

মানুষের প্রতিটি অগ্রগতি বাস্তব হওয়ার পূর্বে তা কল্পনায় গড়ে উঠেছিল ছোটো ছোটো আবিষ্কার। চিকিৎসার নতুন খোঁজ। ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে বিস্ময়। ব্যবসায় সফলতা। এসব সত্যি হয়ে উঠার পূর্বে তা ছিল স্বপ্ন মাত্র। আমাদের চারপাশে ছড়িয়ে আছে সফল হওয়ার অসংখ্য গল্প। সেগুলোকে আলিঙ্গন করে আমাদের এগিয়ে যেতে হবে। নতুন প্রজন্মকে স্বপ্নের পরিধি বাড়াতে হবে। স্বপ্ন অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
আমাদের গতানুগতিক ধ্যান ধারণা ও দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন আনতে হবে। একজন মানুষের জীবনের সবচেয়ে বড়ো স্বপ্ন হলো আমাদের রব আল্লাহকে খুশি করা। আর আল্লাহকে পেতে হলে তাকে রাজি খুশি করতে হলে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হবে। পবিত্র কুরআনে ইরশাদ হয়েছে- যারা আমার উদ্দেশ্যে চেষ্টা সংগ্রাম করবে তাদের আমি পথ দেখাবো। আর আল্লাহ সহনশীল মানুষের সঙ্গে রয়েছেন। (সূরা আনকাবুত-৬৯)
মহান আল্লাহ বান্দাকে শিক্ষা দিয়েছেন তাকে পাওয়ার পথ ও পদ্ধতি। আল্লাহকে পেতে হলে তার সঙ্গে হৃদ্যতা গাঢ় করতে হবে। তার হুকুম পালন করতে হবে। তার স্মরণে উৎসর্গ করতে হবে জীবন ও জীবনের সব কিছু। আল্লাহ বলেন, তুমি তোমার রবের নাম স্মরণ করতে থাকো এবং একমাত্র তার দিকে মনোনিবেশ করো। (সূরা মুজ্জাম্মিল-৮)

মুসলমানদের প্রধান স্বপ্ন হলো জান্নাত। আর জান্নাতকে দুঃখ কষ্ট দিয়ে আড়াল করে রাখা হয়েছে। সুতরাং জান্নাতে যেতে চাইলে চেষ্টা সাধনায় নিজেকে উৎসর্গ করতে হবে। রাতদিন পরিশ্রম করে যেতে হবে জান্নাতের উপকরণ সংগ্রহে। হযরত মুহাম্মদ (সা.) বলেন, জান্নাতকে লোভনীয় জিনিস এবং দুঃখ কষ্ট দিয়ে আড়াল করে রাখা হয়েছে। (সহিহ বুখারী-সহিহ মুসলিম সূত্রে রিয়াদুস সালেহিন-১০১)।
সময় ও স্বাস্থ্য আল্লাহর সবচেয়ে বড়ো নেয়ামত। মুহাম্মদ (সা.) বলেন, দুটি নেয়ামত সরাসরি আল্লাহর পক্ষ থেকে আসে। যার ব্যাপারে বহুলোক ক্ষতিগ্রস্ত। (সহিহ বুখারি, হাদিস ৬৪১২, সুনানে তিরমিজি হাদিস-২৩০৪)
সময় ও স্বাস্থ্য আমাদের অনুকূলে থাকার পরও যদি জীবন সুন্দর না হয়, সুখ না হয়, স্বপ্ন পূরণ না হয় তাহলে আমাদের বেঁচে থাকা নিরর্থক। বেঁচে থেকে যারা জীবনকে উজ্জ্বল আলোয় প্রদীপ্ত করছে তারাই সর্বোত্তম মানুষ। হাদিস শরিফে এসেছে, সেই ব্যক্তি উত্তম যার বয়স দীর্ঘ ও কাজ সুন্দর। (সুনানে তিরমিজি সূত্রে রিয়াদুস সালেহিন-১০৮)

স্বপ্নকে হৃদয়ে লালন করুন। আপনার স্বপ্নের গাছটিকে জীবিত রাখুন। প্রতিদিন নিয়ম করে পরিচর্যা করুন। দেখবেন এক সময় আপনার স্বপ্নের বাগানে সুন্দর পাতাসহ রঙিন ফুল ফুটতে শুরু করেছে এবং রঙিন প্রজাপতিরাও আসতে শুরু করেছে। ঠিক আপনি যেমনটি চেয়েছিলেন।
সফল মানুষের জীবন ইতিহাস পর্যবেক্ষণ করলে দেখতে পাবেন, স্বপ্ন বাস্তবায়নের জন্য তাদেরও করতে হয়েছে প্রচুর পরিশ্রমের বুনিয়াদ। সুন্দর বাড়ি তুলতে যেমন পাথরের টুকরোগুলোর প্রয়োজন। সেগুলোর আলাদা হয়তো তেমন মূল্য নেই, সেই রকমভাবে টুকরো টুকরো করে সফল জীবন গড়ে তুলতে হয়।
সৃষ্টিকর্তার কাছে সব মানুষ সমান। তাই তিনি সবাইকে বড়ো হওয়ার জন্য, জীবনে বড়ো কিছু অর্জন করার জন্য স্বপ্ন দেন। যারা তাঁর স্বপ্নটা দেখা মাত্র চিনতে পারেন এবং স্বপ্ন পূরণের জন্য যা কিছু করা প্রয়োজন তা করেন, তাদের জীবনেই স্বপ্ন পূরণ হয়।

আর যারা স্বপ্নটা মাঝ পথে ছেড়ে দেন, তারা সাধারণ জীবনযাপন করেন। আবার আরেক ধরনের মানুষ আছে যারা স্বপ্ন দেখার সাহসই রাখে না। তাদের জীবনে দুঃসময়ের শেষ থাকে না।
আপনার দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন করতে পারলে আপনিও হতে পারবেন সফল। এর জন্য চাই স্বপ্ন দেখার সাহস, কল্পনাশক্তি এবং স্বপ্নের প্রতি পরিপূর্ণ বিশ্বাস রাখার সাহস। আপনার অসম্পূর্ণ ক্ষমতা আয়ত্তে আনা, সব শক্তি কাজে লাগানোর একমাত্র উপায় হলো মনের মতো কাজ করা। স্বপ্নের কাছে আত্মসমর্পণ করা। আপনি যদি স্বপ্নের কাছে আত্মসমর্পণ করতে পারেন, তাহলে আপনি উৎসাহ-উদ্দীপনা, শক্তি, মনোবল, এমনকি সুস্বাস্থ্যও পাবেন। আর স্বপ্নের কাছে আত্মসমর্পণের কোনো নির্দিষ্ট বয়স সীমা নেই।

জর্জ ফোরম্যান ১৯৯৪ সালে ২০ বছর পর মুষ্টিযুদ্ধের খেতাবি লড়াইয়ে জয়ী হয়ে প্রমাণ করেছিলেন স্বপ্নের কাছে আত্মসমর্পণের কোনো বয়স সীমা নেই, যদি সমর্পণ করা যায় তা হলে জয় সুনিশ্চিত। ১৯৭৪ সালে মোহাম্মদ আলীর হাতে নক আউট হওয়ার ২০ বছর পর ১৯৯৪ সালে ৪৫ বছর বয়সে ২৬ বছরের মাইকেল মুরারকে পরাজিত করে বক্সিংয়ের খেতাবি লড়াই জেতার মত অসম্ভবকে তিনি সম্ভব করেছিলেন, তার স্বপ্নের জোরেই। জেতার পর সাংবাদিকরা প্রশ্ন করেছিলেন কীভাবে সম্ভব করলেন এই অসম্ভব কাজটি? তিনি বলেছিলেন “স্বপ্ন দেখে, ২০ বছর ধরে বিজয়ের এই স্বপ্নই তো আমি সব সময় দেখেছি। বয়স বাড়লেই মানুষ তার স্বপ্ন বিসর্জন দেয় না।” আপনি মনে প্রাণে যা চান তা পাবেনই।

আপনি যতই বড়ো হবেন নিজেকে আলাদা করে আবিষ্কার করবেন। আপনি যা চান, যা বিশ্বাস করেন, যেভাবে ভাবতে ভালোবাসেন, হয়তো কিছুই মিলবে না। একেবারে কাছের মানুষদের সাথে, কিন্তু নিজের স্বপ্নের সাথে আপস করবেন না। নিজেকেও ভালোবাসতে হয়। আগে নিজেকে ভালোবাসুন, তারপর অন্যকে। বর্ষাকালে বৃষ্টি হবে এটাই স্বাভাবিক। আপনার জীবনেও স্বপ্ন পূরণের পথে বাধা-বিপত্তি আসতে পারে। বৃষ্টি হলে বৃষ্টি থেকে রক্ষা পেতে যেমন ছাতা বা বৃষ্টির পোশাক ব্যবহার করেন, নিজের স্বপ্নকেও সেভাবেই রক্ষা করতে হবে আপনাকে। আপনার মাঝেই আছে আলোর দ্যুতি। আপনিও হতে পারবেন আপনার স্বপ্নের সমান বড়ো, এমনকি স্বপ্নের চেয়েও বড়ো।

কারণ আপনি জীবনের প্রথম সংগ্রামে জয়ী হয়েই পৃথিবীর আলো দেখতে পেয়েছেন। বিশ্বাস হচ্ছে না তাহলে চিন্তা করুন এমন একটি প্রতিযোগিতার কথা যেখানে ৫০ কোটি প্রতিযোগী আর মাত্র একজনেরই বেঁচে থাকার জায়গা আছে যে আগে পৌঁছাতে পারবে সেই বেঁচে থাকবে আর বাকি সবাই মারা যাবে। জন্মের বিস্ময়কর নিয়মে পিতার দেহ থেকে যে ৫০ কোটি শুক্রাণু প্রতিযোগিতায় নামে এর একটি মাত্র প্রতিযোগী মাতৃগর্ভে প্রবেশ করে দীর্ঘ দশ মাস দশদিন মায়ের শরীরে ধীরে ধীরে বেড়ে ওঠার সুযোগ পায়; তারপর পূর্ণাঙ্গ মানব শিশু রূপে পৃথিবীতে আসে। আপনি সেই প্রতিযোগী যে ৫০ কোটি প্রতিযোগীর সবাইকে হারিয়ে দিয়ে বিজয়ী হয়েছেন, তার গৌরব কত বড়ো! কত বড়ো সৌভাগ্য আর যোগ্যতার বিজয় এটা!

আপনি নিজেই এরকম একজন বিজয়ী বীর! আমরা যারা পৃথিবীর আলো দেখেছি, সবাই এমনই এক-একজন বিজয়ী বীর। অবিশ্বাস্য কঠিন প্রতিযোগিতায় অসাধারণ যোগত্যার বলে বিজয়ী আমরা প্রত্যেকে। তাই বলা যায় জীবনের প্রতিটি সংগ্রামে জয়ী হবেন, যদি প্রতিটি স্বপ্নকে বিশ্বাসে রূপান্তরিত করতে পারেন। স্মরণীয় বরণীয়রা বিশ্বাস নামক প্রোগ্রামিং দিয়েই মস্তিষ্করূপী মহা জৈব কম্পিউটারকে ব্যবহার করেছেন। স্বপ্নের প্রতি বিশ্বাস একবার গেঁথে গেলে জৈব কম্পিউটার স্বয়ংক্রিয়ভাবে সাফল্যের পথে আপনার সমগ্র অস্তিত্বকে কাজে নিয়োজিত করবে। সহজ স্বতঃস্ফূর্তভাবে অনিবার্য জয়ের লক্ষ্যে পরিচালিত হবে আপনার সকল কর্মকাণ্ড, যার ফলে বিজয় আপনার পদচুম্বন করবে। আর ইতিহাসের পাতায় আপনার নাম লেখা হবে কালজয়ী এক সফল মানুষ হিসেবে।

SHARE

Leave a Reply